বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাস্যোজ্জ্বল আনুষ্ঠানিক প্রতিকৃতি, পটভূমিতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী হওয়া, এবং সবশেষে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড—শেখ হাসিনার প্রায় আট দশকের জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ বিবরণ।

কেন শেখ হাসিনাকে নিয়ে এখনো এত আলোচনা?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের জীবন ও রাজনৈতিক যাত্রা দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের সঙ্গে এত গভীরভাবে জড়িয়ে আছে, যতটা শেখ হাসিনার। তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন; তিনি একই সঙ্গে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দীর্ঘদিনের দলীয় নেতা এবং এমন একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য, যার ইতিহাস বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।

গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে বড় অবকাঠামো প্রকল্প, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল বলে তাঁর সমর্থক ও সরকারি সূত্রগুলো দাবি করে। একই সময়ে তাঁর সরকার নির্বাচন, মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলে দীর্ঘদিন সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাঁর টানা প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে, যার রেশ এখনো—২০২৬ সাল পর্যন্ত—চলমান। এই জীবনীতে সেই পুরো যাত্রাপথই তুলে ধরা হলো—শৈশব থেকে ক্ষমতার শীর্ষে ওঠা, দীর্ঘ শাসনকাল, এবং সবশেষে ক্ষমতাচ্যুতি ও তার পরবর্তী আইনি-রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যন্ত।


শেখ হাসিনা কে?

শেখ হাসিনা বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি। তিনি একাধিক মেয়াদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী থাকার রেকর্ড গড়েছেন।

তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি এবং দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বেগম শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জ্যেষ্ঠ কন্যা।

তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত রূপান্তরের প্রতীক। অন্যদিকে সমালোচক, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারীদের একটি বড় অংশ তাঁকে দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেন—একটি অভিযোগ যা তাঁর বিরুদ্ধে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়েও প্রতিফলিত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দুই ভিন্ন মূল্যায়নের মধ্যেই শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনকে বুঝতে হয়।


জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়

শেখ হাসিনার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। তাঁর জন্মের সময় উপমহাদেশ সদ্য ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীন হয়েছে এবং ভারত বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। পূর্ব বাংলা তখন পাকিস্তানের পূর্বাংশ—পূর্ব পাকিস্তান।

তাঁর বাবা শেখ মুজিবুর রহমান তখন তরুণ রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচিতি লাভ করছিলেন। ভাষা আন্দোলন, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং বাঙালির রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ পরিবারের পরিবেশকেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছিল। ফলে শেখ হাসিনার শৈশব এমন একটি পরিবারে কেটেছে, যেখানে রাজনীতি ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

পরিবার

তাঁর মা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নীরব কিন্তু প্রভাবশালী ভূমিকা পালনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শেখ হাসিনার ভাইবোনরা হলেন শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও শেখ রেহানা। পরবর্তীকালে এই পরিবারের জীবনে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনা সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে আসে, যা তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক জীবনের গতিপথ আমূল বদলে দেয়।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

শেখ হাসিনার শৈশবের উল্লেখযোগ্য অংশ কেটেছে ঢাকায়, যেখানে বাড়িতে নিয়মিত রাজনৈতিক আলোচনা ও দলীয় নেতাদের আসা-যাওয়া ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তবু পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষা ও শৃঙ্খলা তাঁর লালন-পালনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছিল বলে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন।

প্রাথমিক-মাধ্যমিক শিক্ষা ঢাকায় শেষ করার পর তিনি আজিমপুর গার্লস স্কুল ও বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাংলা সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন—যে সময়টায় ছয় দফা আন্দোলন, আগরতলা মামলা ও ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মতো ঘটনায় পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে উঠছিল।

১৯৭১: মুক্তিযুদ্ধের সময়

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অভিযানের পর শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরিবারের সদস্যরা নজরদারির মধ্যে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়—এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে বলে জীবনীবিদরা মনে করেন।

বিবাহ, ব্যক্তিগত জীবন ও ছাত্ররাজনীতি

১৯৬৮ সালে শেখ হাসিনা পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়াকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে দুই সন্তান—সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ—পরবর্তীকালে নিজ নিজ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে সংগঠনের কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন—যদিও তখনও কেউ ধারণা করতে পারেনি যে ভবিষ্যতে তিনিই বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী হবেন।


১৫ আগস্ট ১৯৭৫: যে দিন শেখ হাসিনার জীবন আমূল বদলে যায়

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এর আগে বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, খাদ্যসংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে লড়াই করছিল, আর সরকারের একদলীয় ব্যবস্থা (বাকশাল) চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল—সমর্থকদের মতে এটি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টা, সমালোচকদের মতে রাজনৈতিক বহুমত সীমিত করার পদক্ষেপ।

এমন প্রেক্ষাপটে সেই ভোরে সেনাবাহিনীর একাংশ ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে অভিযান চালায়, যাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য ও ঘনিষ্ঠ স্বজন। শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা সেই সময় পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে—এই বিদেশ সফরই তাঁদের জীবন রক্ষা করে।

নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফিরতে পারেননি এবং দীর্ঘ সময় বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক সহায়তায় কার্যত নির্বাসিত জীবন কাটান। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১—এই প্রায় ছয় বছর তাঁর জীবনের সবচেয়ে অনিশ্চিত সময়গুলোর একটি। এই সময় বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগ কার্যত নেতৃত্বের সংকটে পড়ে, আর দলের ভেতরে ধীরে ধীরে গুরুত্ব পেতে থাকে একটি প্রশ্ন—কে নেতৃত্ব দেবেন?

১৯৮১: দলীয় সভাপতি ও দেশে প্রত্যাবর্তন

শেখ হাসিনা তখনো বিদেশে থাকা অবস্থাতেই আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়—তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম বড় মোড়। একই বছরের ১৭ মে তিনি দীর্ঘ নির্বাসন শেষে বাংলাদেশে ফিরে আসেন; ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী তাঁকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হন। দেশে ফিরে তিনি ঘোষণা দেন, ক্ষমতার জন্য নয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্যই তিনি ফিরেছেন।

তবে সামনে অপেক্ষা করছিল কঠিন বাস্তবতা—আওয়ামী লীগ তখন সামরিক শাসনের অধীনে বিরোধী দলে, আর তাঁকে একই সঙ্গে দল পুনর্গঠন এবং বঙ্গবন্ধু-পরবর্তী প্রজন্মের কাছে দলের অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়।


সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে

১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে সামরিক শাসন জারি করেন। এই সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুটি বড় রাজনৈতিক দলই সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে, যদিও তাদের কৌশল সবসময় অভিন্ন ছিল না। শেখ হাসিনা জেলা-উপজেলা পর্যায়ে দল পুনর্গঠনের পাশাপাশি গণমিছিল, হরতাল, জনসভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচির মাধ্যমে আন্দোলনে অংশ নেন, যার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে একাধিকবার মামলা হয় ও পুলিশি বাধার ঘটনা ঘটে।

এই সময়েই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার সম্পর্কের একটি জটিল অধ্যায় শুরু হয়—দুই নেত্রীই সামরিক-বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্র হয়ে ওঠে, যা পরবর্তী কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিকে মূলত এই দুই ধারাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত করে।

১৯৯০ সালের শেষ দিকে ছাত্রসমাজ, পেশাজীবী সংগঠন ও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতন ঘটে এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হন, আর শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি সংসদীয় বিরোধী রাজনীতির নেতৃত্ব দেন।

এই সময় বিরোধী দলগুলো দাবি তোলে যে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। দীর্ঘ আন্দোলন ও রাজনৈতিক সমঝোতার পর সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়, যা ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পথ তৈরি করে।

১৯৯৬: প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বাধিক আসন লাভ করে সরকার গঠন করে—স্বাধীনতার ২৫ বছর পর শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হন। এই মেয়াদে (১৯৯৬–২০০১) তাঁর সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়—যদিও বিরোধী দল একই সময়ে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা অব্যাহত রাখে।


২০০১-২০০৮: বিরোধী দলে ফিরে যাওয়া, গ্রেনেড হামলা ও ১/১১

২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি; বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে খালেদা জিয়া দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের ব্যাখ্যায় পার্থক্য দেখা যায় এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচিত হয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায় আওয়ামী লীগের এক সমাবেশে গ্রেনেড হামলায় দলের কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ বহু মানুষ নিহত হন এবং শেখ হাসিনা নিজেও আহত হন, যার জের ধরে তিনি পরবর্তীতে শ্রবণশক্তি-সংক্রান্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। এই ঘটনার তদন্ত ও বিচার নিয়ে দীর্ঘ আইনি-রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে, তবে এটি যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ ঘটনা—এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (‘১/১১’) জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর রাষ্ট্র পরিচালনা করে, যে সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় ও একাধিক মামলা দায়ের হয়। শেখ হাসিনা ও তাঁর দল এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করে, আর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এগুলোকে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এই সময় আলোচিত ‘মাইনাস টু’ তত্ত্ব—দুই প্রধান নেত্রীকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরানোর আলোচনা—শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।

২০০৮: দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী ও “ডিজিটাল বাংলাদেশ”

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বড় জয় পেয়ে শেখ হাসিনা দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন। নির্বাচনী ইশতেহারে তাঁর “ডিজিটাল বাংলাদেশ” প্রতিশ্রুতি পরবর্তী বছরগুলোতে তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান নীতিগত কর্মসূচি হয়ে ওঠে।


২০০৯–২০২৪: টানা শাসন, উন্নয়নের দাবি এবং বিতর্কের দীর্ঘ অধ্যায়

পরবর্তী প্রায় দেড় দশক বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ একক শাসনপর্বে পরিণত হয়। এই সময়ে সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার ও মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তারের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়। বিদ্যুৎ খাতে একাধিক কেন্দ্র নির্মাণ ও বেসরকারি বিনিয়োগের নীতির ফলে সরকারি তথ্য অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে, যদিও সমালোচকরা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

এই সময়ে কয়েকটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বিশেষভাবে আলোচিত হয়—নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত পদ্মা সেতু (বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার পর), ঢাকার প্রথম মেট্রোরেল, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তলদেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম নদীর নিচের সড়ক টানেল বঙ্গবন্ধু টানেল, এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, পায়রা বন্দরের মতো আরও একাধিক প্রকল্প। সরকারের দাবি অনুযায়ী এসব প্রকল্প দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ, আর অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করেন এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব থাকতে পারে।

এই সময় মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, তৈরি পোশাক শিল্পের সম্প্রসারণ ও দারিদ্র্য হ্রাসের বিভিন্ন সূচক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও কোভিড-১৯ মহামারি ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সহিংসতার পর বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে কক্সবাজারে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন সংস্থা বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করে, যদিও দীর্ঘমেয়াদে এই উপস্থিতি অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন। একই সময়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এবং ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ভারসাম্যপূর্ণ রাখার চেষ্টা করে।

নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনকাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে—বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ ছিল, নির্বাচনী পরিবেশ সমান ছিল না; আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে সরকার ধারাবাহিকভাবে দাবি করেছে, নির্বাচন সংবিধান ও আইনের আওতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেপ্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে—যার অনেকগুলোই সরকার প্রত্যাখ্যান করে আইনশৃঙ্খলা ও সন্ত্রাসবাদ দমনের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছিল।

এই দীর্ঘ সময়ে দুটি প্রধান মূল্যায়ন পাশাপাশি টিকে থেকেছে—সমর্থকদের কাছে অবকাঠামো, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা বৃদ্ধির অধ্যায়; সমালোচকদের কাছে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হওয়া, নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ও মানবাধিকার ইস্যুর অধ্যায়। এই দুই বাস্তবতার সমান্তরাল অস্তিত্বই শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের সংকটের প্রেক্ষাপট তৈরি করে।


২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান: কীভাবে একটি কোটা-সংস্কার আন্দোলন সরকার পতনে রূপ নিল?

২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের একটি আন্দোলন শুরু হয়। প্রাথমিকভাবে এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট নীতিগত দাবি নিয়ে আন্দোলন। তবে আন্দোলনের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যবহার এবং একাধিক শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনার পর পরিস্থিতি দ্রুত রূপ বদলাতে থাকে।

জাতিসংঘের একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই-আগস্টের এই গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন মানুষ নিহত হন। আন্দোলনকারী ও পরবর্তীতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অভিযোগপত্র অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ সরাসরি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এসেছিল বলে অভিযোগ আনা হয়েছে—এই অভিযোগ শেখ হাসিনা ও তাঁর তৎকালীন সরকারের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা অস্বীকার করেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভাষ্যকারদের একটি বড় অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা রাজনৈতিক অসন্তোষ—নির্বাচন নিয়ে সীমিত প্রতিযোগিতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, এবং প্রশাসনে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ—এই আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট দাবি থেকে ব্যাপক সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপান্তরে ভূমিকা রেখেছিল। এই বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে দমননীতির পরিবর্তে সংলাপের পথ বেছে নিলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত বলে তাঁরা মূল্যায়ন করেন—যদিও এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক মূল্যায়ন, প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নয়।

ক্ষমতাচ্যুতি ও দেশত্যাগ

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দ্রুত পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দেশ ত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এর মাধ্যমে ২০০৯ সাল থেকে শুরু হওয়া তাঁর টানা শাসনপর্বের সমাপ্তি ঘটে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে তাঁর সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের অবসান হয়। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক গুরুত্ব পায়।

দেশত্যাগের পরপরই ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস-এর নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তাঁকে এই দায়িত্বে প্রস্তাব করেন এবং রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন এতে সম্মতি দেন। এই অন্তর্বর্তী সরকারই পরবর্তীতে রাষ্ট্র পরিচালনা, বিচার প্রক্রিয়া এবং নতুন নির্বাচনের পথ তৈরির দায়িত্ব পালন করে।

ভারতে অবস্থান ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রচেষ্টা

দেশত্যাগের পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। এই সময়ে তিনি একাধিকবার টেলিফোন সাক্ষাৎকার ও অডিও বার্তার মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের বক্তব্যকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে বারবার আপত্তি জানিয়েছে। বাংলাদেশের একজন উপদেষ্টা ভারতীয় হাইকমিশনারকে এ বিষয়ে সরাসরি অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় পার্লামেন্টের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি প্রতিবেদনে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকার স্পষ্টভাবে জানায়, শেখ হাসিনাকে ভারতের ভূখণ্ড থেকে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, বক্তব্য বা প্ল্যাটফর্ম পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে দেশটির মানবিক ঐতিহ্য ও সংকটাপন্ন ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার নীতির আলোকে, তবে একই সঙ্গে ভারত কঠোরভাবে এই নীতি অনুসরণ করছে যে তার ভূখণ্ড থেকে অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে দেওয়া হবে না।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের রায়

দেশত্যাগের পর শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের সাবেক একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর রায় ঘোষণা করে, যেখানে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, আর সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, ১৮ জুলাই শেখ হাসিনার সঙ্গে তৎকালীন কয়েকজন মন্ত্রীর টেলিফোন কথোপকথনে ড্রোনের মাধ্যমে অবস্থান নির্ণয় করে অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে ট্রাইব্যুনাল জানায়, যার ফলে একাধিক স্থানে বিক্ষোভকারী নিহত হন এবং কিছু ক্ষেত্রে লাশ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগও আনা হয়। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম রায়ের পর বলেন, বিশ্বের যেকোনো আদালতে এই ধরনের সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপিত হলে একই ধরনের শাস্তি হতো। ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনালের ৪৫৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ শুরু থেকেই এই ট্রাইব্যুনাল ও তার কার্যক্রমকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ করে আসছে এবং বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল এই রায়কে “ভবিষ্যতের জন্য একটি বার্তা” বলে বর্ণনা করেছেন। রায় ঘোষণার পর অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খানকে হস্তান্তরের আহ্বান জানানো হয়।

প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া

মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনা ও দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিদের ফেরত পাঠাতে ভারত সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে জানায়, এই প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতের প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, তবে প্রকাশ্যে এখনো কোনো চূড়ান্ত অগ্রগতির কথা জানানো হয়নি।

এরই মধ্যে ২০২৬ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা নিজেই আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, দেশে ফিরলে শেখ হাসিনাকে হত্যা মামলার বিচারের মুখোমুখি হতে হবে এবং সরকার বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এই প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছে। তবে এই ঘোষণা কতটা বাস্তবায়িত হবে এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার প্রকৃত অগ্রগতি কী দাঁড়াবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার, নির্বাচন ও তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় দেড় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয় এবং দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হয়। এই নির্বাচনী পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন শাসন থেকে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করে। নতুন সরকারের অধীনেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান মামলা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া ও ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পরিচালিত হচ্ছে।

সাবেক ক্ষমতাসীন বৃত্তের বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়া: সালমান এফ রহমানের মামলা

শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর তাঁর সাবেক শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান-কে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে শেয়ারবাজার জালিয়াতি, ব্যাংক ঋণ আত্মসাৎ ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে একাধিক পৃথক মামলা দায়ের করে—এর মধ্যে একটি মামলায় ৩৪ জনের বিরুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। জুলাই আন্দোলন-সংক্রান্ত হত্যাচেষ্টা মামলায়ও তাঁকে একাধিকবার গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সালমান এফ রহমানের মামলাগুলো শেখ হাসিনার সাবেক সরকারের ঘনিষ্ঠ বৃত্তের বিরুদ্ধে চলমান বৃহত্তর আইনি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।


ব্যক্তিগত জীবন

রাজনীতির বাইরে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জীবন তুলনামূলকভাবে সংযত। তাঁর স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া ২০০৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয় তথ্যপ্রযুক্তি ও নীতি-সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করেছেন, আর সায়মা ওয়াজেদ মানসিক স্বাস্থ্য ও অটিজম সচেতনতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত। শেখ হাসিনা বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বই পড়া, গান শোনা ও প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর আগ্রহের কথা উল্লেখ করেছেন।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নেতৃত্বের মূল্যায়ন

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়ন, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও শিশুস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। তবে একই সময়ে তাঁর সরকারের নীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমালোচনাও প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর নেতৃত্বের ধরন নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। সমর্থকদের মতে তিনি দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ছিলেন। অন্যদিকে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং সমালোচকদের একটি বড় অংশের মূল্যায়নে, তাঁর শাসনামলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছিল, রাজনৈতিক বিরোধিতার পরিসর সংকুচিত হয়েছিল এবং শেষ পর্যায়ে আন্দোলনের প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ঘাটতি ছিল বলে তাঁরা মনে করেন—এই মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে ব্যবহৃত “স্বৈরশাসন” ও “ফ্যাসিবাদী শাসন” শব্দবন্ধেও প্রতিফলিত হয়েছে, যদিও শেখ হাসিনা ও তাঁর দল এই চরিত্রায়ণ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার নিয়ে একক কোনো মূল্যায়ন নেই। সমর্থকদের দৃষ্টিতে তাঁর নাম যুক্ত পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে। অন্যদিকে সমালোচক, ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের আলোচনায় উঠে আসে নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক, মানবাধিকার পরিস্থিতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচন এবং সবশেষে জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে ব্যবহৃত সহিংসতার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ও মৃত্যুদণ্ডের রায়।

ফলে শেখ হাসিনার উত্তরাধিকার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সবশেষে ক্ষমতাচ্যুতির প্রেক্ষাপট ও তার আইনি পরিণতি—এই তিনটি দিকই এখন একসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


এক নজরে টাইমলাইন

  • ১৯৪৭ — গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম
  • ১৯৬৮ — ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিবাহ
  • ১৯৭৫ — ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড; বিদেশে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান
  • ১৯৮১ — আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত ও দেশে প্রত্যাবর্তন
  • ১৯৯৬ — প্রথমবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী
  • ২০০১ — নির্বাচনে পরাজয়ের পর বিরোধী দলে
  • ২০০৪ — ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আহত
  • ২০০৮ — দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত
  • ২০০৯–২০২৪ — টানা শাসনকাল
  • ২০২৪ (৫ আগস্ট) — গণঅভ্যুত্থানের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে দেশত্যাগ
  • ২০২৪ (৮ আগস্ট) — ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন
  • ২০২৫ (১৭ নভেম্বর) — আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের রায়
  • ২০২৬ (ফেব্রুয়ারি) — জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বিজয়ী
  • ২০২৬ (জুলাই) — দেশে ফেরার ঘোষণা, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া চলমান

সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (FAQ)

শেখ হাসিনার জন্ম কবে? ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর।

তিনি কতবার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন? তিনি একাধিক মেয়াদে (১৯৯৬-২০০১ এবং ২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাঁর রাজনৈতিক দল কোনটি? বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

১৫ আগস্ট ১৯৭৫ সালে তিনি কীভাবে বেঁচে যান? সে সময় তিনি ও তাঁর বোন শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন।

তিনি কীভাবে ক্ষমতাচ্যুত হন? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান।

তাঁর বিরুদ্ধে কী রায় হয়েছে? আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ২০২৫ সালের নভেম্বরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি অভিযোগে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

তিনি এখন কোথায়? ২০২৪ সাল থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন।


উপসংহার

শেখ হাসিনার জীবন শুধু একজন রাজনৈতিক নেতার জীবনী নয়; এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাষ্ট্রগঠন, গণতন্ত্র, সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং সবশেষে একটি গণঅভ্যুত্থান ও তার আইনি পরিণতির ইতিহাসও বটে। তিনি এমন এক নেতা, যাঁর রাজনৈতিক যাত্রায় ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, দীর্ঘ সংগ্রাম, নির্বাচনী সাফল্য ও বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নির্বাচন ও মানবাধিকার নিয়ে দীর্ঘ সমালোচনা এবং শেষ পর্যন্ত একটি গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুতি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায়।

এই অধ্যায় এখনো সম্পূর্ণভাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেনি—প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলমান। তাই শেখ হাসিনাকে মূল্যায়ন করতে হলে তাঁকে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাস্তবতার বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা প্রয়োজন। সময়ের সঙ্গে নতুন তথ্য, রায় ও রাজনৈতিক অগ্রগতি এই জীবনীতে যুক্ত হতে থাকবে।


External References

  • জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) — জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থান প্রতিবেদন
  • আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ — চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়
  • রয়টার্স — বাংলাদেশ কভারেজ
  • বিবিসি বাংলা
  • প্রথম আলো
  • দ্য ডেইলি স্টার
  • Council on Foreign Relations — Bangladesh
  • Human Rights Watch — Bangladesh

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *