বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতিতে বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির প্রতীকী চিত্র

বাংলাদেশ ফার্স্ট নীতি ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক কূটনৈতিক অবস্থানের প্রতীকী চিত্র।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’—এই নীতি কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে সত্যিই নতুন পথে নিয়ে যাচ্ছে? ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্য, BRICS ও G7-এর পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থা এবং AI-নির্ভর নতুন ভূরাজনীতির মধ্যে বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—জাতীয় স্বার্থকে কতটা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

“বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না”—একটি বাক্য। কিন্তু এর ভেতরে কি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য আছে, নাকি এটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত?

প্রশ্নটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের সর্বশেষ টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে। ২০২৬ সালের আগস্টে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল মিডিয়া অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা -র বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। অন্যদিকে ভারত বলেছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি মিডিয়া সংগঠনের উদ্যোগ এবং ভারত সরকার এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না বা শেখ হাসিনার বক্তব্যকে সমর্থন করে না।

ঘটনাটি তাই শুধু শেখ হাসিনাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এর গভীরে রয়েছে একটি বড় প্রশ্ন—একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মাটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক সরকারপ্রধানের রাজনৈতিক বক্তব্যকে ঢাকা কীভাবে দেখছে, আর নয়াদিল্লিই বা সেটিকে কীভাবে সামলাচ্ছে?

আর এখানেই “বাংলাদেশ ফার্স্ট” বা বাংলাদেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রই কেবল বন্ধুত্ব দিয়ে টিকে থাকে না। সেখানে বন্ধুত্বের পাশাপাশি থাকে স্বার্থ, নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, জ্বালানি, শ্রমবাজার, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য। একটি ছোট বা মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্য এই ভারসাম্য আরও কঠিন। তাকে একই সঙ্গে প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়, বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে হয় এবং বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজের কৌশলগত জায়গাটিও নিশ্চিত করতে হয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

“নতজানু রাষ্ট্র” বলতে আসলে কী বোঝায়?

পররাষ্ট্রনীতির ভাষায় “নতজানু রাষ্ট্র” কোনো নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক-আইনি শ্রেণি নয়। এটি মূলত রাজনৈতিক ও বিশ্লেষণাত্মক একটি শব্দ। সাধারণত এমন রাষ্ট্রকে বোঝাতে ব্যবহার করা হয়, যে নিজের জাতীয় স্বার্থের জায়গা থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক স্বার্থকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেয়।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে।

কোনো দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা মানেই নতজানু হওয়া নয়। আবার কোনো দেশের সঙ্গে কঠোর অবস্থান নেওয়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রমাণ নয়।

একটি কার্যকর পররাষ্ট্রনীতির আসল পরীক্ষা হলো—রাষ্ট্রটি কি নিজের স্বার্থ নির্ধারণ করতে পারছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করতে পারছে?

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত এই সমীকরণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি। ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশ তিন দিক থেকে ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে এবং দুই দেশের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্ক। ফলে ঢাকার পক্ষে নয়াদিল্লিকে উপেক্ষা করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের সব কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করাও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অর্থ ভারতবিরোধিতা নয়।

বরং অর্থ হলো—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি হবে পারস্পরিক স্বার্থ।

এই পার্থক্যটিই বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক ভাষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন উত্তেজনা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। ২০২৬ সালের আগস্টে দিল্লি থেকে তাঁর ভার্চুয়াল বক্তব্যের আয়োজন আবারও বিষয়টিকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে বক্তব্য দেন; একই ঘটনায় ঢাকা প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায় এবং ভারতকে আগে থেকেই অনুষ্ঠানটি বন্ধ করার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানায়।

ভারতের অবস্থান ছিল ভিন্ন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অনুষ্ঠানটির সঙ্গে সরকারি সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে এবং শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ভারত সরকারের অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে জানায়।

কূটনীতিতে এখানেই একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে।

একটি রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আশ্রয় বা অবস্থানের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু সেই ব্যক্তির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক কীভাবে প্রভাবিত হবে, সেটি তখন স্বাভাবিকভাবেই দ্বিপক্ষীয় আলোচনার অংশ হয়ে যায়।

বিশেষ করে যখন ওই ব্যক্তি নিজ দেশের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র।

ফলে ঢাকা যদি মনে করে দিল্লির মাটি ব্যবহার করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তাহলে প্রতিবাদ জানানো তার কূটনৈতিক অধিকারের মধ্যেই পড়ে। একইভাবে ভারত যদি বলে যে একটি বেসরকারি সংগঠনের অনুষ্ঠানের জন্য সরকার দায়ী নয়, সেটিও তার অবস্থান।

কিন্তু দুই অবস্থানের মাঝখানে যে বাস্তব প্রশ্নটি থেকে যায়, তা হলো—এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের পারস্পরিক আস্থাকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করছে?

কারণ কূটনীতিতে শুধু আনুষ্ঠানিক বক্তব্য নয়, perception বা ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার রাজনৈতিক মহলে যদি ক্রমাগত এমন ধারণা তৈরি হয় যে দিল্লি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণে কোনো একটি পক্ষকে সুবিধা দিচ্ছে, তাহলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর তার প্রভাব পড়বে। আবার দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে যদি ধারণা তৈরি হয় যে ঢাকা ভারতকে কেবল অতীতের রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখছে, তাহলে সম্পর্কের অন্য ক্ষেত্রগুলোও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অর্থাৎ শেখ হাসিনা এখন শুধু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের perception gap-এর একটি প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

আওয়ামী লীগ, ভারত এবং সম্পর্কের পুরোনো কাঠামো

২০০৯ থেকে ২০২৪—দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক।

এই সময়ে নিরাপত্তা সহযোগিতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, আঞ্চলিক connectivity এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় দুই দেশের সম্পর্ক উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়েছে।

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ভারত বাংলাদেশের জন্য বিদ্যুৎ, পণ্যবাণিজ্য ও আঞ্চলিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে থাকে।

এই সম্পর্কের ইতিবাচক দিক যেমন ছিল, তেমনি বাংলাদেশের ভেতরে এর ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্নও তৈরি হয়েছিল।

তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। সীমান্তে প্রাণহানি নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে। বাণিজ্য ভারসাম্য, অশুল্ক বাধা এবং আঞ্চলিক connectivity-এর সুফল দুই দেশের জন্য কতটা সমান—এসব প্রশ্নও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।

অর্থাৎ সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, অসম্পূর্ণ ইস্যুগুলো থেকেই যায়।

এখানেই “বন্ধুত্ব” এবং “সমতা”-র মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়।

একটি রাষ্ট্র চাইতে পারে তার প্রতিবেশী শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক। কিন্তু একই সঙ্গে সে চাইবে সেই সম্পর্কের ভেতরে তার নিজস্ব স্বার্থও দৃশ্যমান থাকুক।

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির ভাষায় সম্ভবত সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এখানেই।

ভারত নয়, শুধু ভারতও নয়

বাংলাদেশের কূটনৈতিক বাস্তবতা বোঝার জন্য শুধু ভারতকে দেখলে পুরো ছবিটি পাওয়া যায় না।

বাংলাদেশ এখন এমন এক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অবস্থান করছে যেখানে ভারত–চীন–যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাশিয়া, উপসাগরীয় দেশগুলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলো।

এখানে BRICS -এর উত্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

BRICS কোনো NATO -র মতো সামরিক জোট নয়, আবার G7-এর মতো উন্নত শিল্পোন্নত অর্থনীতির রাজনৈতিক সমন্বয় কাঠামোও নয়। এটি মূলত উদীয়মান ও বৃহৎ অর্থনীতির একটি প্ল্যাটফর্ম, যার সম্প্রসারণ বিশ্ব অর্থনীতিতে Global South-এর ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো—সে কি একক কোনো শক্তির ছায়ায় থাকবে, নাকি বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে নিজস্ব স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক তৈরি করবে?

এই জায়গায় G7 এবং BRICS -এর মতো কাঠামোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককে কেবল “কোন পক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ?”—এই প্রশ্নে নামিয়ে আনা ভুল হবে।

কারণ বাংলাদেশ G7-এর সদস্য নয়, BRICS -এরও পূর্ণ সদস্য নয়। কিন্তু উভয় ব্যবস্থার অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলে।

একইভাবে NATO -র সদস্য না হয়েও বাংলাদেশের জন্য NATO -ভুক্ত দেশগুলোর বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা নীতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ আজকের পৃথিবীতে একটি রাষ্ট্রকে কোনো একটি ব্লকে ঢুকতে না হয়েও একাধিক ব্লকের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে হয়।

এটাই বাংলাদেশের জন্য strategic balancing-এর বাস্তবতা।

“Bangladesh First” কি নতুন কোনো জোটনীতি?

“Bangladesh First” শুনতে রাজনৈতিক স্লোগানের মতো মনে হতে পারে। কিন্তু একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় নীতিতে এটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন এর বাস্তব প্রয়োগ দেখা যাবে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক।

বাংলাদেশ যদি ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চায়, সেটি Bangladesh First -এর বিরোধী নয়।

চীনের কাছ থেকে অবকাঠামো বিনিয়োগ নিলেও সেটি বিরোধী নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি বাড়াতে চাইলেও নয়।

G7 -ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ সহযোগিতা করলেও নয়।

BRICS -এর New Development Bank বা Global South -এর অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ালেও নয়।

এমনকি NATO -ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিরক্ষা বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা করলেও নয়।

কারণ “First” মানে “Only” নয়।

বাংলাদেশ ফার্স্টের অর্থ হওয়া উচিত—যে অংশীদারের কাছ থেকেই সহযোগিতা নেওয়া হোক, চূড়ান্ত হিসাবটি করতে হবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের ভিত্তিতে।

এই নীতি বাস্তবায়ন করা অবশ্য সহজ নয়।

কারণ বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিটি সিদ্ধান্তের একটি geopolitical cost থাকে।

চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা চীনের জন্য কৌশলগত প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে আবার মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শ্রমমানের মতো বিষয়ও যুক্ত হতে পারে।

আর ইউরোপীয় বাজারের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একই ধরনের শর্ত ও প্রত্যাশা থাকতে পারে।

তাই বাংলাদেশের জন্য আসল দক্ষতা হবে এক পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়; বরং একাধিক পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের bargaining power বাড়ানো।

নতুন প্রজন্মের বাংলাদেশও কি এই পরিবর্তন চাইছে?

এখানে রাজনীতির বাইরেও একটি সামাজিক পরিবর্তন লক্ষ্য করার মতো।

বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম—বিশেষ করে Gen Z—আন্তর্জাতিক ঘটনাকে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক দ্রুত এবং সরাসরি অনুসরণ করে। তাদের কাছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন বা ইউরোপ কেবল দূরের ভূরাজনীতি নয়; এসব দেশের প্রযুক্তি, সংস্কৃতি, শিক্ষা, চাকরি, পণ্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ।

ফলে ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতির জনসমর্থনও আগের মতো শুধু রাষ্ট্রীয় প্রচারণার ওপর নির্ভর করবে না।

একটি তরুণ বাংলাদেশি জানতে চাইবে—ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে তার চাকরির বাজার কী হবে?

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে কী ধরনের বিনিয়োগ আসবে?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ফলে রপ্তানি ও প্রযুক্তি খাতে কী সুবিধা হবে?

G7 অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক কীভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারকে প্রভাবিত করবে?

BRICS-এর পরিবর্তিত অর্থনৈতিক কাঠামো বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার তৈরি করতে পারে কি না?

এমনকি AI -এর মতো প্রযুক্তি কীভাবে ভবিষ্যতের কূটনীতি ও অর্থনীতিকে বদলে দেবে—সেটিও এই প্রজন্মের প্রশ্ন।

অর্থাৎ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ধীরে ধীরে শুধু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন থাকছে না; এটি অর্থনীতি ও নাগরিক জীবনের প্রশ্নও হয়ে উঠছে।

আর এ কারণেই “বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না”—এই বক্তব্যকে শুধু ভারতবিরোধী রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে দেখলে এর গভীরতর অর্থটি ধরা পড়বে না।

আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ কি এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে পারবে, যেখানে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু নির্ভরশীলতা থাকবে না; সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু একতরফা ছাড় নয়; কৌশলগত অংশীদারত্ব থাকবে, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্র থাকবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু ঢাকা–দিল্লি সম্পর্কের মধ্যে পাওয়া যাবে না।

এর উত্তর খুঁজতে হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, চীন–ভারত প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের Indo-Pacific কৌশল, BRICS -এর বিস্তার এবং G7 -ভিত্তিক বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন—সবকিছুকে একই ছবির মধ্যে দেখতে হবে।

আর সেই ছবিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কোনো বড় শক্তির পক্ষে দাঁড়ানো নয়, বরং নিজের পক্ষে দাঁড়ানোর মতো সক্ষমতা তৈরি করা।

সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলাদেশের নতুন কূটনৈতিক পরীক্ষার দ্বিতীয় অধ্যায়।

বন্ধুত্ব, নির্ভরতা ও স্বার্থের মাঝখানে বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে বোঝার সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে এটিকে শুধু “বন্ধুত্ব” অথবা “বিরোধিতা”—এই দুই শব্দের একটিতে আটকে ফেলা। দুই দেশের সম্পর্ক তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল। ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত, নদী, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, নিরাপত্তা, অভিবাসন এবং আঞ্চলিক রাজনীতি—সবকিছু মিলিয়ে ভারত বাংলাদেশের জন্য একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, বড় বাজার, নিরাপত্তা-অংশীদার এবং একটি শক্তিশালী ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা।

তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা যাচাই করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ভারত থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়; বরং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ কতটা কার্যকরভাবে আদায় করতে পারে, সেটি দেখা।

এখানেই “বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না” বক্তব্যটির আসল পরীক্ষা।

বাংলাদেশের জন্য ভারতকে এড়িয়ে চলা যেমন অসম্ভব, তেমনি এককভাবে নির্ভর করাও ঝুঁকিপূর্ণ

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের প্রায় পুরো স্থলসীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভারতীয় ভূখণ্ড। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের অন্যান্য রাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বাস্তবতা দুই দেশকে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

কিন্তু ভূগোল একটি রাষ্ট্রকে প্রতিবেশীর সঙ্গে সহযোগিতা করতে বাধ্য করতে পারে; নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিতে বাধ্য করে না।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ যদি ভারতের বাজার ব্যবহার করে, ভারতের মাধ্যমে তৃতীয় দেশে পণ্য পাঠায়, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে কিংবা আঞ্চলিক connectivity প্রকল্পে অংশ নেয়, তাহলে সেটি স্বাভাবিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা। একইভাবে ভারত যদি বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক বা নৌপথ ব্যবহার করে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করে, সেটিও দুই দেশের পারস্পরিক অর্থনৈতিক স্বার্থের অংশ হতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠবে—এই সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল?

আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে reciprocity বা পারস্পরিক সুবিধা তাই খুব গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শক্তিশালী প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো, সহযোগিতার ভাষা ধীরে ধীরে একতরফা সুবিধা দেওয়ার ভাষায় পরিণত হওয়া। আর সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক দক্ষতা হলো, সেই সম্পর্ককে এমন জায়গায় নিয়ে যাওয়া যেখানে উভয় পক্ষই একে অপরকে প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে দেখে।

বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের লক্ষ্য হওয়া উচিত ঠিক সেটিই।

তিস্তা থেকে সীমান্ত—অসম্পূর্ণ ইস্যুগুলো কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের বড় অর্জনগুলোর একটি হলো স্থলসীমান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন। ছিটমহল বিনিময়ের মতো দীর্ঘদিনের জটিল সমস্যার সমাধান দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

কিন্তু অন্যদিকে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি এখনো হয়নি।

এটি শুধু একটি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ নয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা, পরিবেশ এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে তিস্তার পানি সরাসরি যুক্ত।

সীমান্তে প্রাণহানিও দীর্ঘদিনের সংবেদনশীল বিষয়। বাংলাদেশ বারবার সীমান্তে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবিক আচরণের দাবি জানিয়েছে।

এসব ইস্যু দেখিয়ে দেয়, একটি সম্পর্ককে “বন্ধুত্বপূর্ণ” বললেই তার সব সমস্যা শেষ হয়ে যায় না।

বরং প্রকৃত বন্ধুত্বের পরীক্ষা হয় কঠিন ইস্যুতে।

বাংলাদেশ যদি তার স্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে না পারে, তাহলে সম্পর্কটি ভারসাম্যপূর্ণ কি না—সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্যদিকে ভারত যদি বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধান খোঁজে, তাহলে সেটিই হবে দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ভিত্তি।

অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি ভারতবিরোধী হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সেটি ভারতকে আরও কার্যকর অংশীদারে পরিণত করার কৌশল হতে পারে।

চীন কেন বাংলাদেশের কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে?

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে চীনকে বাদ দেওয়া যায় না।

গত দুই দশকে চীন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে। অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে।

কিন্তু এখানেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো কি ভারতের বিকল্প?

না।

চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে দেখা বাংলাদেশের জন্য যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি ভারতকে চীনের বিকল্প হিসেবে দেখাও নয়।

কারণ দুই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রকৃতি আলাদা।

ভারত বাংলাদেশের প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে অনিবার্য অংশীদার।

চীন বাংলাদেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক শক্তি, বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক উৎপাদনব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

ফলে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত—দুই দেশের প্রতিযোগিতাকে নিজের জন্য সুযোগে পরিণত করা, সংঘাতে পরিণত করা নয়।

এখানেই ছোট ও মধ্যম রাষ্ট্রের কূটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

বড় শক্তির প্রতিযোগিতা ছোট রাষ্ট্রের জন্য বিপদ, আবার সুযোগও

চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশের সামনে দুটি সম্ভাবনা তৈরি হয়।

প্রথমটি ঝুঁকি।

দুই শক্তির কোনো একটি পক্ষ যদি বাংলাদেশকে নিজের কৌশলগত বলয়ের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে ঢাকার ওপর চাপ বাড়তে পারে। একটি সিদ্ধান্ত অন্য দেশের কাছে সন্দেহজনক মনে হতে পারে। অবকাঠামো প্রকল্পও তখন কেবল অর্থনৈতিক প্রকল্প না থেকে ভূরাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হতে পারে।

দ্বিতীয়টি সুযোগ।

বাংলাদেশ যদি কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে, তাহলে প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, বাজার এবং অর্থায়ন থেকে সুবিধা নিতে পারে।

এটিই strategic balancing।

তবে balancing মানে প্রতিটি দেশকে সমান গুরুত্ব দেওয়া নয়। বরং প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলাদা স্বার্থ নির্ধারণ করা।

চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা করা যেতে পারে।

ভারতের সঙ্গে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক connectivity নিয়ে কাজ করা যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রপ্তানি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিনিয়োগের সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে।

ইউরোপের সঙ্গে সবুজ অর্থনীতি, শ্রমমান ও রপ্তানি বাজারের সম্পর্ক শক্তিশালী করা যেতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগের সম্পর্ক বাড়ানো যেতে পারে।

এগুলো একে অপরের বিকল্প নয়।

বরং একসঙ্গে এগুলো বাংলাদেশের bargaining power বাড়াতে পারে।

BRICS-এর দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের হিসাব

BRICS সম্প্রসারণের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্ম এখন আরও বড় হয়েছে।

এর ফলে Global South -এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা আগের তুলনায় অনেক বেশি জোরালো।

কিন্তু বাংলাদেশকে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার রাখতে হবে—BRICS কোনো “পশ্চিমবিরোধী” বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে সরলভাবে ব্যাখ্যা করলে বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করা হবে।

কারণ BRICS -এর সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেও বিরাট অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।

ভারত ও চীনের সম্পর্কই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।

তারা একই BRICS কাঠামোর অংশ হলেও সীমান্ত, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে।

অর্থাৎ BRICS -এ থাকা মানেই একটি দেশ অন্য সব সম্পর্ক ছেড়ে দিয়েছে—এমন নয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য।

যদি BRICS -এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ে, সেটিকে বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখা যেতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে G7 -ভুক্ত অর্থনীতি, ইউরোপীয় বাজার, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কও ধরে রাখতে হবে।

কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতি এখনও মূলত পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

এই বাস্তবতা বলে দেয়—বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে “একটি পক্ষ” বেছে নেওয়ার ধারণা অর্থনৈতিকভাবেও অকার্যকর।

G7-এর সঙ্গে সম্পর্ক কেন BRICS-এর মতোই গুরুত্বপূর্ণ?

G7 হলো বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী উন্নত অর্থনীতির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম। এর সদস্যরা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় বড় প্রভাব রাখে।

বাংলাদেশের জন্য G7 গুরুত্বপূর্ণ মূলত তিনটি কারণে।

প্রথমত, বাজার।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন রপ্তানি খাত পশ্চিমা বাজারের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ।

ডিজিটাল অবকাঠামো, AI, সবুজ প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা এবং উচ্চমূল্যের শিল্পে উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তৃতীয়ত, বৈশ্বিক নিয়ম।

শ্রম অধিকার, পরিবেশ, মানবাধিকার, ডেটা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির নৈতিক ব্যবহার—এসব বিষয় ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

ফলে বাংলাদেশ যদি BRICS -এর দিকে যায়, তাতে G7-এর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার প্রয়োজন নেই।

বরং একটি পরিণত পররাষ্ট্রনীতি উভয় কাঠামোর সঙ্গেই কাজ করতে পারে।

এখানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে তার অবস্থান।

দক্ষিণ এশিয়া, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করার কারণে বাংলাদেশ আঞ্চলিক supply chain-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

কিন্তু সেই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে কেবল ভূগোল যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, দক্ষ শ্রমশক্তি এবং বিশ্বাসযোগ্য নীতি।

NATO-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সরাসরি সামরিক জোটের প্রশ্ন নয়

NATO প্রসঙ্গেও একই ভুল করা যাবে না।

বাংলাদেশ NATO-র সদস্য নয় এবং সদস্য হওয়ার প্রশ্নও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রীয় বিষয় নয়। কিন্তু NATO-ভুক্ত দেশগুলো বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই বাংলাদেশের জন্য NATO -ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা ও তুরস্কের মতো NATO -ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্কের নিজস্ব গুরুত্ব রয়েছে।

এখানে আবারও একই শিক্ষা পাওয়া যায়।

কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অর্থ সেই রাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে পুরোপুরি গ্রহণ করা নয়।

বাংলাদেশ যদি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা বেছে নিতে পারে, সেটিই স্বাধীন কূটনীতির লক্ষণ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা: বাজার থেকে কৌশলগত সম্পর্ক

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব আলাদা।

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার। একই সঙ্গে দুই দেশের মধ্যে শ্রম অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

ভবিষ্যতে AI এবং emerging technology এই সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হতে পারে।

এখানেও বাংলাদেশের সামনে একই চ্যালেঞ্জ—কোনো একটি বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেই পুরো সম্পর্ককে শত্রুতায় পরিণত করা যাবে না।

আবার বাজার বা বিনিয়োগের প্রয়োজন আছে বলে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে সবকিছু মেনে নেওয়াও সম্ভব নয়।

একটি পরিণত রাষ্ট্রের কূটনীতি আসলে এই মাঝামাঝি জায়গাটিই তৈরি করে।

Trump যুগের বৈশ্বিক রাজনীতি বাংলাদেশকে কী শেখায়?

Donald Trump -এর নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র ও বাণিজ্যনীতি যদি আরও বেশি transaction-based বা স্বার্থনির্ভর হয়ে ওঠে, তাহলে বাংলাদেশের মতো রপ্তানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।

এখানে আবেগ দিয়ে নয়, অর্থনৈতিক হিসাব দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হবে—কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার ধরে রাখা যায়, কীভাবে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায় এবং কীভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে দীর্ঘমেয়াদি করা যায়।

এটি শুধু Washington-এর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নয়।

একই ধরনের হিসাব ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারত যদি নিজের শিল্প, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক connectivity-এর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, বাংলাদেশকেও নিজের স্বার্থকে একইভাবে সংজ্ঞায়িত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এটিই স্বাভাবিক।

রাষ্ট্রগুলো বন্ধুত্বের ভাষায় কথা বললেও সিদ্ধান্ত নেয় স্বার্থের ভিত্তিতে।

বাংলাদেশও যদি একই বাস্তবতায় নিজের স্বার্থকে স্পষ্টভাবে সামনে রাখে, তাহলে সেটিকে “বিরোধিতা” বলা যাবে না।

আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি—পররাষ্ট্রনীতি কি দলীয় রাজনীতির বাইরে যেতে পারবে?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাগুলোর একটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে এটি দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে জড়িয়ে থাকা।

আওয়ামী লীগ ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে কৌশলগত সহযোগিতা হিসেবে দেখিয়েছে।

বিএনপির রাজনীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে অন্য ধরনের ভাষা বেশি দৃশ্যমান হয়েছে।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যদি সরকার বদলানোর সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে বদলে যায়, তাহলে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর কাছে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কমে।

এখানে একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির, যার কিছু মৌলিক বিষয় সরকার বদলালেও স্থির থাকবে।

সার্বভৌমত্ব।

জাতীয় নিরাপত্তা।

বাণিজ্যিক স্বার্থ।

পানি।

সীমান্ত নিরাপত্তা।

শ্রমবাজার।

রপ্তানি বাজার।

জ্বালানি নিরাপত্তা।

আঞ্চলিক connectivity।

এগুলো কোনো একটি দলের সম্পত্তি হওয়া উচিত নয়।

শেখ হাসিনা, তারেক রহমান, ড. ইউনূস—নেতৃত্ব বদলাতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বদলাবে না।

এটাই হওয়া উচিত বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির institutionalisation।

Gen Z-এর যুগে কূটনীতি আর শুধু কূটনীতিকদের বিষয় নয়

একসময় পররাষ্ট্রনীতি ছিল মূলত রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কূটনীতিক এবং সামরিক নীতিনির্ধারকদের বিষয়।

এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে।

একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে TikTok, Facebook, YouTube, X বা অন্য প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। Gen Z -এর বড় অংশ বিদেশি রাজনীতি, যুদ্ধ, নির্বাচন, AI, অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সংকট সম্পর্কে সরাসরি তথ্য পায়।

এর ফলে রাষ্ট্রের foreign policy narrative নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হয়েছে।

কোনো সরকার একটি ঘটনা একভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকরা তার বিপরীত ব্যাখ্যা হাজির করতে পারে।

AI -generated content এবং deepfake এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে।

আগামী দিনে কোনো দেশের বিরুদ্ধে ভুয়া ভিডিও বা কৃত্রিম বক্তব্য ছড়িয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা সম্ভব হবে আরও সহজে।

এমনকি কোনো নেতার কণ্ঠস্বর নকল করে এমন বক্তব্যও তৈরি করা সম্ভব, যা বাস্তবে তিনি কখনো বলেননি।

ফলে বাংলাদেশের কূটনীতির ভবিষ্যতে cybersecurity এবং information integrity-ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা হলো—স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি শুধু রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকে তৈরি হয় না; এটি এখন তথ্যযুদ্ধের ক্ষেত্রেও রক্ষা করতে হবে।

Dark Web থেকে Deepfake—ভূরাজনীতির নতুন যুদ্ধক্ষেত্র

বিশ্ব রাজনীতিতে প্রযুক্তি এখন আর আলাদা কোনো খাত নয়।

AI সামরিক প্রযুক্তি, intelligence analysis, cyber operations, misinformation এবং economic competition—সবকিছুকে বদলে দিচ্ছে।

Dark Web -এর মতো গোপন ডিজিটাল নেটওয়ার্কে অবৈধ অর্থ, তথ্য ও সাইবার কার্যক্রমের প্রবাহ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ ডিজিটাল অর্থনীতি যত বড় হবে, সাইবার ঝুঁকিও তত বাড়বে।

একটি রাষ্ট্র যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হতে চায়, কিন্তু তার critical digital infrastructure অন্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল থাকে, তাহলে সেই স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

অর্থাৎ “Bangladesh First” ভবিষ্যতে শুধু ভূখণ্ড ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন হবে না।

এটি হবে—

ডেটা কার হাতে?

AI infrastructure কোথা থেকে আসছে?

সাইবার নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করছে?

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ?

দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কোথায় সংরক্ষিত হচ্ছে?

এগুলোও জাতীয় সার্বভৌমত্বের অংশ।

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির শেষ কথা: সক্ষমতা

সবশেষে একটি কঠিন সত্য স্বীকার করতে হবে।

কোনো দেশ শুধু শক্ত ভাষায় কথা বলে স্বাধীন হয়ে যায় না।

স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির জন্য অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োজন।

দক্ষ কূটনীতিক প্রয়োজন।

শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন।

সামরিক ও নিরাপত্তা সক্ষমতা প্রয়োজন।

বৈচিত্র্যময় বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রয়োজন।

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিজস্ব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ যদি একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত রপ্তানি নির্ভরশীল হয়, একটি দেশের কাছ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি নির্ভরতা তৈরি করে, একটি দেশের বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করে বা একটি দেশের রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর ক্ষমতার স্থিতি নির্ভর করে, তাহলে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” বলা যত সহজই হোক, বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হবে।

তাই বাংলাদেশের প্রকৃত স্বাধীনতা শুরু হবে অর্থনৈতিক diversification থেকে।

একাধিক বাজার।

একাধিক বিনিয়োগ উৎস।

একাধিক জ্বালানি উৎস।

একাধিক প্রযুক্তি অংশীদার।

একাধিক শ্রমবাজার।

একটি শক্তিশালী দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা।

এগুলো যত বাড়বে, বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বাধীনতাও তত বাড়বে।

আর এখানেই পররাষ্ট্রনীতি অর্থনীতির সঙ্গে এক হয়ে যায়।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক স্বাধীনতাকে যতটা রক্ষা করতে পারে, তার একটি বড় অংশ নির্ভর করে সে কতটা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে তার ওপর।

বাংলাদেশের সামনে তাই আসল প্রশ্ন এখন আর শুধু—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে?

প্রশ্নটি আরও বড়:

বাংলাদেশ কি ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, BRICS, G7 এবং বৃহত্তর Global South-এর সঙ্গে এমনভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করতে পারবে, যাতে কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করেও নিজের bargaining power বাড়ানো যায়?

এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে “বাংলাদেশ ফার্স্ট” একটি রাজনৈতিক স্লোগান থাকবে, নাকি সত্যিই একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় কৌশলে পরিণত হবে।

কূটনীতির আসল পরীক্ষা: ভারতকে সামলে বহুমুখী বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক সব সময়ই একটি বিশেষ জায়গা দখল করে এসেছে। ভৌগোলিক বাস্তবতা, সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, জ্বালানি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াত—সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মতো করে দেখা যায় না। ফলে ঢাকার জন্য ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়াও দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।

সাম্প্রতিক শেখ হাসিনা ইস্যু সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। নয়াদিল্লিতে একটি বেসরকারি মিডিয়া সংগঠনের আয়োজনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য নিয়ে ঢাকা তীব্র আপত্তি জানায়। বাংলাদেশ বলেছে, এই ঘটনা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। অন্যদিকে ভারত জানিয়েছে, অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আয়োজন এবং এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।

এই অবস্থানকে শুধু আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি, শেখ হাসিনা বনাম বর্তমান সরকার কিংবা বাংলাদেশ বনাম ভারত—এই সরল রাজনৈতিক কাঠামোয় দেখলে বিষয়টির বড় অংশই অদৃশ্য থেকে যায়। আসল প্রশ্ন আরও গভীরে।

একটি রাষ্ট্র কীভাবে তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রাখতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তরই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলোর একটি।

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মানে কি কারও বিরুদ্ধে যাওয়া?

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কথাটি রাজনৈতিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু কূটনীতিতে এর বাস্তব অর্থ স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

একটি রাষ্ট্র যদি নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, তার অর্থ এই নয় যে তাকে ভারতবিরোধী, চীনপন্থী, যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী কিংবা কোনো নির্দিষ্ট জোটের পক্ষের রাষ্ট্র হতে হবে। বরং এর অর্থ হলো—প্রতিটি সম্পর্ককে আলাদা করে মূল্যায়ন করা এবং যেখানে বাংলাদেশের স্বার্থ মেলে সেখানে সহযোগিতা করা, আর যেখানে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে সেখানে আলোচনার মাধ্যমে নিজের অবস্থান রক্ষা করা।

আধুনিক বিশ্বে এই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা কাঠামোর পাশাপাশি G7, উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর BRICS, সামরিক জোট NATO এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক জোট—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এখন আর এককেন্দ্রিক নয়।

বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য তাই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে কোনো একটি শক্তির ছায়ায় দাঁড়ানো নয়; বরং একাধিক শক্তির সঙ্গে এমন সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে একটি সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি না হয়।

এখানে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ এবং ASEAN অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো প্রত্যেকেই বাংলাদেশের জন্য আলাদা ধরনের সুযোগ তৈরি করে।

অর্থাৎ বহুমুখী কূটনীতি মানে সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের কথা বলা নয়; বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ককে বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করতে পারা।

এই জায়গাতেই বর্তমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এবং সবচেয়ে বড় ঝুঁকি—দুটিই একসঙ্গে রয়েছে।

ভারতকে বাদ দিয়ে নয়, ভারতের ওপর নির্ভর না করে

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বাস্তবতা বুঝতে হলে আবেগের বাইরে যেতে হয়।

ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী শক্তিগুলোর একটি। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে। আবার বাংলাদেশের জন্য ভারত বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের একটি অপরিহার্য অংশ।

অন্যদিকে পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পারস্পরিক প্রভাব এবং শেখ হাসিনার অবস্থান—এসব বিষয় সম্পর্ককে বারবার কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

তাই ঢাকার সামনে বাস্তব কৌশলটি সম্ভবত ‘ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা’ নয়। বরং সম্পর্কের অসমতা কমানো।

এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখতেই পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক যদি এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে অন্য পক্ষ ধরে নেয় যে বাংলাদেশ নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে নিজের স্বার্থের চেয়ে প্রতিবেশীর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে, তখন সেটি কৌশলগত নির্ভরশীলতায় পরিণত হতে পারে।

আবার উল্টো দিকেও একই সমস্যা রয়েছে। ভারতকে সম্পূর্ণ প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করলে বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বাস্তব ক্ষতি হতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অবস্থান হতে পারে—ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী, কিন্তু স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণকারী রাষ্ট্র।

আজকের বিশ্বে এটিই আসলে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের মূল ধারণা।

শেখ হাসিনা ইস্যু কেন এত বড় কূটনৈতিক পরীক্ষা?

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে ঢাকা তাকে ফেরত চেয়ে আসছে। ভারত জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ অনুরোধটি তারা তাদের আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী বিবেচনা করছে।

কিন্তু এর সঙ্গে আরও একটি প্রশ্ন যুক্ত হয়েছে—ভারতের মাটিতে থেকে শেখ হাসিনা কতটা রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে পারবেন?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনি নয়; কূটনৈতিকও।

একদিকে ভারত তার ভূখণ্ডে আয়োজিত একটি বেসরকারি অনুষ্ঠানের দায় নিতে অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের দৃষ্টিতে বিষয়টি নিছক একটি ব্যক্তিগত বা বেসরকারি অনুষ্ঠানের সীমায় আটকে নেই, কারণ বক্তা একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং দুই দেশের সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি রাজনৈতিক চরিত্র।

এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই কূটনীতির জটিলতা।

ঢাকা যদি প্রতিটি ঘটনাকে ভারতের রাষ্ট্রীয় নীতির প্রমাণ হিসেবে দেখে, তাহলে সম্পর্কের পুনর্গঠন কঠিন হবে। আবার দিল্লি যদি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তাহলেও আস্থার সংকট আরও গভীর হবে।

সুতরাং দুই পক্ষের জন্যই বড় পরীক্ষা হলো—কীভাবে এমন একটি ইস্যু সামলানো যায়, যা একই সঙ্গে আইনি, রাজনৈতিক, জনমতনির্ভর এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত।

আজকের বাংলাদেশে এই বিষয়টির আরেকটি মাত্রা রয়েছে। Gen Z -এর বড় একটি অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক ঘটনাকে সরাসরি অনুসরণ করে। ফলে কূটনৈতিক সংকট এখন শুধু রাষ্ট্রীয় বৈঠক বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বক্তব্য, একটি ভিডিও কিংবা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লাখো মানুষের রাজনৈতিক ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এটি পুরোনো কূটনীতির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা।

কূটনীতি এখন শুধু রাষ্ট্রদূতদের কাজ নয়

ডিজিটাল যুগ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের চরিত্র বদলে দিয়েছে।

একসময় একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে সাধারণ মানুষ জানতে পারত সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে। এখন একজন রাজনৈতিক নেতা সরাসরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের বক্তব্য দিতে পারেন। একটি পুরোনো ভিডিও নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাইরাল হতে পারে। AI দিয়ে তৈরি ভুয়া বক্তব্য কিংবা deepfake ভিডিও কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

এমনকি তথ্যের উৎস যাচাই করাও এখন কূটনৈতিক সক্ষমতার অংশ।

বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে রাজনৈতিক মেরুকরণ তীব্র, একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা খুব দ্রুত অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হতে পারে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা অন্য রাজনৈতিক শক্তি—প্রত্যেকেই একই আন্তর্জাতিক ঘটনাকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

ফলে ভবিষ্যতের পররাষ্ট্রনীতি শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকবে না। এর সঙ্গে যুক্ত হবে তথ্যযুদ্ধ, সাইবার নিরাপত্তা, AI governance, গণমাধ্যম এবং জনমত ব্যবস্থাপনা।

এখানে Dark Web -এর মতো অদৃশ্য ডিজিটাল পরিসরও পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এখন শুধু সীমান্ত বা সামরিক শক্তির বিষয় নয়; তথ্য কোথা থেকে ছড়াচ্ছে, কারা বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালাচ্ছে এবং কোন তথ্য বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিম—এসবও জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের ‘সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটিও ধীরে ধীরে বিস্তৃত হচ্ছে।

ভূখণ্ডের সার্বভৌমত্বের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন তথ্যগত সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা।

বহুমুখী কূটনীতির পরীক্ষায় BRICS ও G7

বাংলাদেশের সামনে এই পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুযোগগুলোর একটি হলো বিভিন্ন অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনা।

BRICS -এর সম্প্রসারণ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে Global South-এর গুরুত্ব বাড়িয়েছে। অন্যদিকে G7 এখনো বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী উন্নত অর্থনীতিগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয় কাঠামো। বাংলাদেশকে তাই কোনো একটি প্ল্যাটফর্মকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কোন জায়গায় কোন অংশীদার বাংলাদেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ?

রপ্তানি বাজারে পশ্চিমা দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ। অবকাঠামো ও উৎপাদন বিনিয়োগে এশীয় শক্তিগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। আবার আঞ্চলিক সংযোগে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর গুরুত্ব আলাদা।

এই বাস্তবতাকে বোঝার জন্য একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কূটনীতি কোনো ফুটবল ম্যাচ নয়, যেখানে একটি দলকে বেছে নিয়ে অন্য দলকে হারাতে হয়।

একটি রাষ্ট্র একই সময়ে G7 দেশের বাজারে রপ্তানি করতে পারে, BRICS দেশের বিনিয়োগ নিতে পারে, NATO সদস্য দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা করতে পারে এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে পারে।

এটাই আধুনিক বহুমুখী কূটনীতির বাস্তবতা।

বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো এই ভারসাম্য যেন নীতিগত অস্পষ্টতায় পরিণত না হয়। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব’ তখনই কার্যকর হয়, যখন এর পেছনে সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থ, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান এবং দর-কষাকষির সক্ষমতা থাকে।

শুধু ভারসাম্যের কথা বললেই ভারসাম্য তৈরি হয় না।

অর্থনৈতিক শক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান এবং নির্ভরযোগ্য কূটনৈতিক সক্ষমতাই একটি দেশকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেয়।

এ কারণেই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতির ওপর নির্ভর করবে না। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে দেশের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান।

আর এখানেই আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি একই জায়গায় এসে মিলিত হয়।

অর্থনৈতিক শক্তি ছাড়া ‘স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি’ কতটা সম্ভব?

একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত তার অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। রাজনৈতিকভাবে কোনো রাষ্ট্র যতই নিজের সিদ্ধান্তের স্বাধীনতার কথা বলুক, যদি তার অর্থনীতি একটি নির্দিষ্ট দেশ, বাজার, ঋণদাতা, জ্বালানি সরবরাহকারী বা বিনিয়োগকারীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে কূটনীতির টেবিলে তার দর-কষাকষির ক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়।

এই বাস্তবতা বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’কে কার্যকর করতে হলে শুধু রাজনৈতিক অবস্থান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন এমন একটি অর্থনীতি, যা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে, কিন্তু কোনো একটি সম্পর্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হবে না।

এখানেই অর্থনৈতিক কূটনীতি সামনে আসে।

বাংলাদেশের রপ্তানি, প্রবাসী আয়, বিদেশি বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো—প্রতিটি ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক অংশীদার প্রয়োজন। ফলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অর্থ হলো সুযোগের পরিধি যতটা সম্ভব বাড়ানো।

বাংলাদেশ যদি একদিকে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানি করে, অন্যদিকে চীন থেকে অবকাঠামো ও উৎপাদন বিনিয়োগ নেয়, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়ায়, জাপান থেকে উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণ করে এবং মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করে—তাহলে প্রতিটি সম্পর্ককে অন্যটির বিকল্প না বানিয়েও জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব।

এ ধরনের কৌশলকে অনেক সময় ‘multi-alignment’ বা বহুমুখী সমন্বয়ের রাজনীতি বলা হয়।

এটি কোনো দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশল নয়। বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যখন একাধিক শক্তিকেন্দ্রে বিভক্ত হয়ে যায়, তখন মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য এটিই বাস্তবসম্মত পথ হয়ে উঠতে পারে।

চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র: তিন শক্তির মাঝখানে বাংলাদেশের হিসাব

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এমন যে, তাকে একই সঙ্গে কয়েকটি বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করতে হয়।

ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। চীন বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো ও উৎপাদন খাতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক শক্তি। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার প্রধান শক্তিগুলোর একটি।

এই তিন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা যত বাড়বে, বাংলাদেশের কূটনীতির গুরুত্বও তত বাড়তে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়বে।

কারণ কোনো একটি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক অন্য একটি শক্তির কাছে ভুল বার্তা দিতে পারে। আবার সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে যদি বাংলাদেশ নিজের অগ্রাধিকার স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করতে না পারে, তাহলে নীতিগত অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সম্পর্কের ভারসাম্য নয়, স্বার্থের ভারসাম্য।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রয়োজন হতে পারে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ। ভারতের ক্ষেত্রে প্রয়োজন সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগে কার্যকর সমাধান। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে রপ্তানি বাজার, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, শ্রমমান ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংযোগ।

অর্থাৎ তিনটি সম্পর্কের উদ্দেশ্য এক নয়।

এই পার্থক্য বোঝাই পররাষ্ট্রনীতির পরিপক্বতার লক্ষণ।

BRICS-এর দিকে তাকানো, কিন্তু G7-এর বাজার না হারানো

বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য BRICS -এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সম্ভাবনা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে Global South-এর মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো অর্থায়ন এবং বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থার বিকাশ ভবিষ্যতে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কিন্তু BRICS -কে পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির একটি বড় অংশ পশ্চিমা বাজারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির বাজার বাংলাদেশের শিল্প ও কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমান অবস্থান হতে পারে—BRICS -এর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানো এবং একই সঙ্গে G7 -কেন্দ্রিক উন্নত অর্থনীতির বাজার ও বিনিয়োগ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের অর্থনীতি যদি শুধু সস্তা শ্রমের ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতা কঠিন হবে। কিন্তু যদি দক্ষতা, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা এবং উচ্চমূল্যের পণ্যে যেতে পারে, তাহলে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যেও বাংলাদেশ নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।

অর্থাৎ কূটনীতির সবচেয়ে বড় হাতিয়ার শেষ পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো বিবৃতি নয়—দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা।

NATO প্রসঙ্গেও একই শিক্ষা

বাংলাদেশ NATO সদস্য নয় এবং হওয়ার প্রশ্নও বর্তমান বাস্তবতায় নেই। কিন্তু NATO -কে ঘিরে পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তৈরি করে।

আধুনিক নিরাপত্তা এখন শুধু সেনাবাহিনী, সীমান্ত কিংবা যুদ্ধবিমান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সাইবার নিরাপত্তা, সমুদ্র নিরাপত্তা, সাপ্লাই চেইন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং তথ্যযুদ্ধ—সবই জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য বঙ্গোপসাগর এই বাস্তবতাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।

দেশের সমুদ্রবন্দর, সমুদ্রপথ, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সংযোগ শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়; এগুলো কৌশলগত সম্পদও।

ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নীতিকে কেবল প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না।

AI -নির্ভর সাইবার আক্রমণ থেকে শুরু করে deepfake-ভিত্তিক রাজনৈতিক বিভ্রান্তি—ভবিষ্যতের নিরাপত্তা সংকট অনেক সময় এমন জায়গা থেকে আসতে পারে, যেটিকে প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামো সহজে শনাক্ত করতে পারবে না।

এই কারণে NATO -র মতো জোটের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য সরাসরি মডেল না হলেও প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তার পরিবর্তিত ধারণা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

Gen Z-এর পৃথিবীতে কূটনীতির ভাষাও বদলাবে

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতি শুধু বর্তমান প্রজন্মের নীতিনির্ধারকদের হাতে থাকবে না। আগামী দশকগুলোতে দেশের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে আজকের তরুণ প্রজন্ম—বিশেষ করে Gen Z এবং তাদের পরবর্তী Gen Alpha

এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নতুন প্রজন্মের আন্তর্জাতিক পৃথিবী আগের প্রজন্মের মতো নয়।

একজন তরুণ একই দিনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক খবর, ভারতের কোনো ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিতর্ক, ইউরোপের যুদ্ধ, চীনের প্রযুক্তি এবং মধ্যপ্রাচ্যের কোনো সংকট সম্পর্কে জানতে পারে।

তার কাছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর দূরের কোনো বিষয় নয়।

একটি TikTok বা Facebook ভিডিও, YouTube বিশ্লেষণ কিংবা X-এর পোস্ট কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক ঘটনা সম্পর্কে তার ধারণা তৈরি করতে পারে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় কূটনীতিকেও মানিয়ে নিতে হবে।

ভবিষ্যতে একটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি শুধু রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যে তৈরি হবে না। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, উদ্যোক্তা, শিক্ষার্থী, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক, প্রবাসী এবং সাধারণ নাগরিক—সবাই কোনো না কোনোভাবে সেই ভাবমূর্তি তৈরি করবে।

এখানে AI আবারও গুরুত্বপূর্ণ।

AI দিয়ে অনুবাদ, তথ্য বিশ্লেষণ, কূটনৈতিক গবেষণা এবং জনমত পর্যবেক্ষণ সহজ করা সম্ভব। কিন্তু একই প্রযুক্তি দিয়ে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া বক্তব্য ও deepfake তৈরি করাও সম্ভব।

ফলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কূটনীতিতে AI literacy এবং তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় দক্ষতার অংশ হয়ে উঠতে পারে।

আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কে প্রায়ই দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পায়। আওয়ামী লীগের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু সিদ্ধান্তকে বিএনপি সমালোচনা করেছে; বিএনপির সময়কার পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নানা প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যদি প্রতিবার সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পূর্ণ দিক পরিবর্তন করে, তাহলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে দেশের নীতিগত ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।

এখানে বাংলাদেশের সামনে একটি বড় প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টন, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রপ্তানি, জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো সহযোগিতা কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে শ্রমবাজার—এসব বিষয় কোনো এক সরকারের একক সম্পদ নয়। এগুলো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ।

তাই সরকার বদলালেও জাতীয় স্বার্থের মূল কাঠামো যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেটিই পররাষ্ট্রনীতির পরিপক্বতার লক্ষণ।

এই জায়গায় আওয়ামী লীগ বা বিএনপি—কোনো দলই একা পুরো সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।

প্রয়োজন একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্য, যেখানে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েই অন্তত কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে একমত থাকবে—বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং কোনো একক বিদেশি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলা।

‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ হওয়ার ভয় কোথায়?

কোনো রাষ্ট্রকে ‘ক্লায়েন্ট স্টেট’ বলা খুব শক্তিশালী রাজনৈতিক শব্দ। কিন্তু এর ব্যবহার করার আগে বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা জরুরি।

একটি দেশ কোনো পরাশক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হলেই ক্লায়েন্ট স্টেট হয়ে যায় না। সামরিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক বিনিয়োগ কিংবা রাজনৈতিক বন্ধুত্ব—এসব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ।

ক্লায়েন্ট সম্পর্ক তখনই উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে, যখন একটি রাষ্ট্র নিজের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে অন্য রাষ্ট্রের পছন্দকে নিজের জাতীয় স্বার্থের ওপর স্থান দিতে শুরু করে এবং সেই নির্ভরতা থেকে বের হওয়ার সক্ষমতা হারায়।

বাংলাদেশের জন্য তাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত অন্য কোনো দেশের বিরোধিতা নয়; বরং নিজের policy autonomy বা নীতিগত স্বাধীনতা শক্তিশালী করা।

এই স্বাধীনতা তৈরি হয় কয়েকটি স্তরে—শক্তিশালী অর্থনীতি, বৈচিত্র্যময় রপ্তানি বাজার, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, স্থিতিশীল প্রতিষ্ঠান, কার্যকর কূটনৈতিক কাঠামো এবং জনগণের আস্থা।

অর্থাৎ ‘নতজানু রাষ্ট্র’ না হওয়ার সবচেয়ে কার্যকর উপায় কোনো বড় রাজনৈতিক ঘোষণা নয়।

এমন একটি রাষ্ট্র তৈরি করা, যাকে অন্যরা প্রয়োজনীয় অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করবে।

কূটনীতির নতুন শক্তি: মধ্যস্থতাকারী হওয়ার সুযোগ

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আরেকটি সম্ভাবনা হলো বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতায় না গিয়ে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী বা সেতুবন্ধনের ভূমিকা তৈরি করা।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি করে। বঙ্গোপসাগর, BIMSTEC, ASEAN-এর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা, দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগ—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশ চাইলে নিজেকে একটি regional connector হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।

এটি শুধু কূটনৈতিক মর্যাদার বিষয় নয়। এর সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্যও রয়েছে।

আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়লে বন্দর, সড়ক, রেল, লজিস্টিকস, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্প খাতে নতুন বিনিয়োগ তৈরি হতে পারে।

তবে এখানেও একই শর্ত প্রযোজ্য—ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।

শুধু মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকলেই কোনো দেশ শক্তিশালী হয়ে যায় না।

সিঙ্গাপুরের উদাহরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তার ভৌগোলিক অবস্থান তাকে সুযোগ দিয়েছে, কিন্তু বন্দর, আইন, অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা সেই অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্যও একই শিক্ষা প্রযোজ্য।

আসল পরিবর্তন কোথায়?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো কোনো একটি দেশকে কেন্দ্র করে নয়। পরিবর্তনটি হওয়া উচিত চিন্তার ধরনে।

আগের প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশ কোন দেশের দিকে ঝুঁকছে?

ভবিষ্যতের প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাংলাদেশ কীভাবে নিজের স্বার্থ অনুযায়ী প্রত্যেক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে?

এই পার্থক্য ছোট মনে হলেও কৌশলগতভাবে বিশাল।

ভারতের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলেই বাংলাদেশ ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র—এমন নয়। চীনের সঙ্গে বড় বিনিয়োগ থাকলেই বাংলাদেশ চীনপন্থী—এমনও নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রপ্তানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা থাকলেই বাংলাদেশ পশ্চিমাপন্থী হয়ে যায় না।

একইভাবে BRICS -এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা G7-এর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করার বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। NATO সদস্য না হয়েও NATO-ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনীতি, প্রযুক্তি বা নিরাপত্তা সহযোগিতা করা সম্ভব।

আধুনিক কূটনীতি মূলত এই বহুস্তরীয় সম্পর্ক পরিচালনার শিল্প।

বাংলাদেশের সামনে এখন সেই পরীক্ষাই।

একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়, যখন তার কাছে বিকল্প থাকে।

একটি বাজার বন্ধ হলে অন্য বাজারে যাওয়ার সুযোগ, একটি বিনিয়োগকারী পিছিয়ে গেলে অন্য বিনিয়োগকারী খোঁজার সক্ষমতা, একটি শ্রমবাজার সংকুচিত হলে নতুন শ্রমবাজার তৈরি করার দক্ষতা এবং একটি রাজনৈতিক সম্পর্ক কঠিন হলে অন্য অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগানোর কৌশল—এই বিকল্পগুলোই একটি দেশের কূটনৈতিক শক্তির প্রকৃত ভিত্তি।

আর এই শক্তি তৈরি করতে হলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত করতে হবে নিজের ভেতরেই—মানুষ, প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি এবং অর্থনীতিতে।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো রাষ্ট্রকে কেউ স্থায়ীভাবে শক্তিশালী করে দেয় না।

নিজের সক্ষমতাই শেষ পর্যন্ত নিজের কূটনৈতিক স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সামনে আসল পরীক্ষা কোথায়?

‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’—এই নীতিকে কার্যকর করতে হলে কেবল শক্ত ভাষার কূটনৈতিক বক্তব্য যথেষ্ট নয়। একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির শক্তি শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় তার অর্থনীতি, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, জ্বালানি, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত অংশীদারত্ব কতটা স্বাধীনভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তার ওপর।

বাংলাদেশের সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—দেশটি কি সত্যিই একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোতে পারবে, যেখানে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে; কিন্তু কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হবে না?

এই প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। একদিকে G7 ও পশ্চিমা জোটের নেতৃত্বাধীন অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কাঠামো, অন্যদিকে BRICS -এর সম্প্রসারণ এবং Global South -এর ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য নতুনভাবে গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো, পুরোনো ‘একটি শক্তির ওপর নির্ভর করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’ ধরনের কূটনীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর নাও হতে পারে। বরং প্রয়োজন issue-based diplomacy—যেখানে প্রতিটি বিষয়ে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে অংশীদার নির্বাচন করা হবে।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও সেই বাস্তবতার বাইরে নয়।

বাংলাদেশের জন্য ভারত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। সীমান্ত, নদীর পানি, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা, যোগাযোগ, আঞ্চলিক সংযোগ—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ রয়েছে। একইভাবে ভারতের জন্যও বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব কম নয়।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বন্ধুত্ব আর নির্ভরতা এক জিনিস নয়।

একটি পরিণত রাষ্ট্রের কূটনীতিতে প্রতিবেশীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকতে পারে, আবার একই সঙ্গে মতপার্থক্যও থাকতে পারে। তিস্তা, সীমান্ত হত্যা, বাণিজ্য ভারসাম্য, পানি ব্যবস্থাপনা কিংবা প্রত্যর্পণের মতো বিষয়ে বাংলাদেশের স্বার্থ স্পষ্টভাবে তুলে ধরা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধান চাওয়া কোনোভাবেই বৈরিতা নয়।

বরং সেটিই স্বাভাবিক রাষ্ট্রীয় কূটনীতি।

এখানেই ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির বাস্তব পরীক্ষা।

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের যে কাঠামো তৈরি হয়েছিল, সেটির অনেক অংশ নিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বিতর্ক ছিল। একইভাবে বিএনপি ও তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতিকে নিয়েও ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে—বাংলাদেশ কি সত্যিই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে, নাকি শুধু এক ধরনের নির্ভরতা থেকে অন্য ধরনের নির্ভরতার দিকে যাচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে।

শুধু ভারত নয়, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের মাঝেও ভারসাম্য

বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে চীনের সম্পর্ক গভীর। অবকাঠামো, শিল্প, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদার। তৈরি পোশাক, শ্রম অধিকার, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা—বিভিন্ন বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের গুরুত্ব রয়েছে।

ফলে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো—চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে নিজের অবস্থান কীভাবে নির্ধারণ করা যায়।

এখানে BRICSG7—দুই কাঠামোর কথাই প্রাসঙ্গিক।

বাংলাদেশ যদি BRICS-এর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ায়, তার অর্থ এই নয় যে দেশটি G7 বা পশ্চিমা বিশ্বের বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখার অর্থও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক কমিয়ে দেওয়া নয়।

একবিংশ শতাব্দীর কূটনীতি ক্রমেই এমন জায়গায় যাচ্ছে, যেখানে একটি দেশ একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে কাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এই বহুমুখী কূটনীতি বরং একটি সুযোগ।

কিন্তু সেটি সফল করতে হলে কথার চেয়ে প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি এবং নীতির ধারাবাহিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনৈতিক কূটনীতিই হতে পারে সবচেয়ে বড় শক্তি

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে economic diplomacy-এর ওপর।

শ্রমবাজার, রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ—এসব এখন আর শুধু অর্থ মন্ত্রণালয় বা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়। এগুলো সরাসরি পররাষ্ট্রনীতির অংশ।

বাংলাদেশ যদি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, নতুন বাজার তৈরি করতে পারে এবং দক্ষ শ্রমশক্তিকে আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠাতে পারে, তাহলে কূটনীতি সরাসরি অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে।

এখানে বাংলাদেশের Gen Z প্রজন্মও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল অর্থনীতি, সফটওয়্যার, AI, সাইবার নিরাপত্তা, ফ্রিল্যান্সিং, ই-কমার্স এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশের তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতের কূটনীতি শুধু রাষ্ট্রদূতদের বৈঠকের ওপর নির্ভর করবে না; মানবসম্পদও দেশের একটি কৌশলগত সম্পদ হয়ে উঠবে।

কিন্তু এর জন্য শিক্ষা ও দক্ষতার সংস্কার প্রয়োজন।

বিশ্ব যখন AI-নির্ভর অর্থনীতির দিকে যাচ্ছে, তখন শুধু কম মজুরির শ্রমশক্তি দিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে পারবে না। আগামী দশকে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে দক্ষ তরুণ জনগোষ্ঠী—আর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে দক্ষতার ঘাটতি।

এ কারণেই পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে আলাদা করে দেখার সুযোগ কমছে।

AI থেকে Deepfake—নতুন কূটনীতির অদৃশ্য যুদ্ধ

আন্তর্জাতিক রাজনীতির আরেকটি পরিবর্তন এসেছে প্রযুক্তির কারণে।

আগে একটি রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি গঠনে সংবাদমাধ্যম, কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রীয় প্রচারণা বড় ভূমিকা রাখত। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কয়েক মিনিটের মধ্যে একটি রাজনৈতিক narrative তৈরি করতে পারে।

AI-generated content, deepfake video এবং automated disinformation ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক আলোচনার নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাষ্ট্রে এর গুরুত্ব আরও বেশি।

কোনো রাজনৈতিক নেতা কী বলেছেন, কোন ভিডিওটি সত্যি, কোন বক্তব্য সম্পাদিত, কোন ছবি AI দিয়ে তৈরি—এসব প্রশ্ন ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

শেখ হাসিনা, বিএনপি, আওয়ামী লীগ, তারেক রহমান কিংবা ড. ইউনূসকে ঘিরে যেকোনো আন্তর্জাতিক বিতর্কেও এই প্রযুক্তিগত বাস্তবতা বিবেচনায় রাখতে হবে।

কারণ misinformation এখন শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির সমস্যা নয়; এটি পররাষ্ট্রনীতিরও অংশ।

একটি deepfake ভিডিও কোনো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বিদেশি জনগণের ধারণা বদলে দিতে পারে। একটি মিথ্যা তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তার কূটনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। আবার কোনো বাস্তব ঘটনা ‘AI-generated’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতাও তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার একটি অংশ হবে information resilience—ভুল তথ্য শনাক্ত করা, দ্রুত যাচাই করা এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এখানে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

Dark Web ও সাইবার নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা

ডিজিটাল নিরাপত্তার আলোচনায় Dark Web -এর প্রসঙ্গও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

Dark Web নিজে কোনো একক রাজনৈতিক শক্তি নয়, কিন্তু এর বিভিন্ন অংশে অবৈধ তথ্য, চুরি হওয়া ডেটা, সাইবার অপরাধ এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

একটি রাষ্ট্রের সরকারি নথি, কূটনৈতিক যোগাযোগ বা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর তথ্য ফাঁস হলে সেটি শুধু সাইবার অপরাধের ঘটনা থাকে না; জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

তাই বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে নিজেকে একটি সক্ষম মধ্যম শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তাহলে কূটনৈতিক সক্ষমতার পাশাপাশি cyber diplomacy ও cyber security-তেও বিনিয়োগ করতে হবে।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ এমন সময়ে, যখন AI, deepfake, cyberattack এবং তথ্যযুদ্ধ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে ‘নতজানু রাষ্ট্র’ থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ কী?

এখানেই পুরো বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি।

একটি রাষ্ট্র অন্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখলেই সেটি নতজানু হয়ে যায় না। আবার কোনো শক্তির সঙ্গে মতবিরোধ করলেই রাষ্ট্র স্বাধীন হয়ে যায় না।

রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রকৃত পরীক্ষা হলো—নিজের জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।

কোনো চুক্তি করার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা, নদীর পানি নিয়ে নিজের অধিকার তুলে ধরা, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বিদেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করা, বিনিয়োগের শর্ত নিয়ে দর-কষাকষি করা এবং একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা—এসবই বাস্তব কূটনৈতিক স্বাধীনতার অংশ।

এখানে আবেগের চেয়ে প্রতিষ্ঠান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ কোনো সরকার আজ শক্ত অবস্থান নিলেই একটি দেশ স্থায়ীভাবে শক্তিশালী হয়ে যায় না। শক্তিশালী রাষ্ট্র তৈরি হয় এমন প্রতিষ্ঠান দিয়ে, যা সরকার পরিবর্তনের পরও জাতীয় স্বার্থের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে।

এই জায়গায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তারেক রহমান, বিএনপি ও নতুন পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষা

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনে তাই কেবল ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ স্লোগানকে জনপ্রিয় করার প্রশ্ন নেই। বরং সেটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় নীতিতে রূপ দেওয়াই বড় পরীক্ষা।

বিএনপি যদি এই নীতিকে বাস্তব অর্থে কার্যকর করতে চায়, তাহলে সেটিকে দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের বাইরে নিয়ে গিয়ে রাষ্ট্রীয় কৌশলে পরিণত করতে হবে।

কারণ সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক দল বদলাবে, নেতৃত্ব বদলাবে—কিন্তু বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা বদলাবে না।

ভারত প্রতিবেশী থাকবে।

চীন বড় অর্থনৈতিক শক্তি থাকবে।

যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে থাকবে।

ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের শ্রমবাজার ও জ্বালানি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

BRICSG7-এর মতো শক্তি কাঠামোগুলোও আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোনো একটি সরকারের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক দর্শনের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।

প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি national strategy।

‘Bangladesh First’ কি বাস্তব নীতি হতে পারবে?

শেষ পর্যন্ত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ কতটা সফল হবে, তার উত্তর কয়েকটি সূচকে পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশ কি তার রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যময় করতে পারছে?

বিদেশি বিনিয়োগের জন্য কি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে পারছে?

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য কি আরও দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি করতে পারছে?

চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে কি ভারসাম্য বজায় রাখতে পারছে?

প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ থাকলেও কি আলোচনার পথ খোলা রাখছে?

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে কি বাংলাদেশ নিজের অবস্থান আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারছে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—দেশের অভ্যন্তরে কি এমন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে, যা পররাষ্ট্রনীতিকে শক্তিশালী করবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিবাচক হলে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ একটি কার্যকর রাষ্ট্রীয় দর্শনে পরিণত হতে পারে।

অন্যথায় এটি শুধু একটি রাজনৈতিক স্লোগান হয়ে থাকার ঝুঁকি থাকবে।

বাংলাদেশের সামনে যে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অধ্যায়। কিন্তু ভবিষ্যতের নীতি শুধু অতীতের প্রতিক্রিয়া দিয়ে তৈরি করা যাবে না।

একইভাবে বিএনপি বা তারেক রহমানের সরকার যদি আগের নীতির বিপরীত অবস্থান নেয়, সেটিও যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ নিজের জন্য কী ধরনের রাষ্ট্রীয় কৌশল তৈরি করছে?

একটি পরিণত কৌশলে ভারতবিরোধিতা থাকবে না, চীননির্ভরতাও থাকবে না, আমেরিকান নির্ভরতাও থাকবে না।

থাকবে বাংলাদেশের স্বার্থ।

এটাই সম্ভবত ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’-এর সবচেয়ে পরিণত ব্যাখ্যা।

কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রুর চেয়ে স্থায়ী স্বার্থ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ কোন পথে যাবে?

বাংলাদেশ এখন এমন একটি সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন দেশের জনসংখ্যা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতি—সবকিছু একই সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।

Gen Z -এর নেতৃত্বে নতুন প্রজন্মের কর্মশক্তি তৈরি হচ্ছে। AI অর্থনীতির কাঠামো বদলে দিচ্ছে। Deepfake তথ্যযুদ্ধকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। Dark Web ও সাইবার অপরাধ নিরাপত্তার নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। BRICS বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে। G7 উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

এই পরিবর্তনের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পথ হতে পারে কৌশলগত ভারসাম্য।

ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়।

চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করে নয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য থাকবে, কিন্তু নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা হারিয়ে নয়।

মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু শুধু শ্রমবাজারের ওপর নির্ভর করে নয়।

আর আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের অবস্থান হবে এমন—যেখানে ঢাকা অন্যের agenda অনুসরণ করার বদলে নিজের স্বার্থ ও অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনায় বসবে।

‘বাংলাদেশ আর নতজানু রাষ্ট্র হবে না’—এই বক্তব্য তাই শুধু একটি রাজনৈতিক ঘোষণা হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না।

এর প্রকৃত অর্থ হবে অনেক বড়।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়, যখন তার অর্থনীতি শক্তিশালী, প্রতিষ্ঠান কার্যকর, জনগণ দক্ষ, কূটনীতি ভারসাম্যপূর্ণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিজের হাতে থাকে।

বাংলাদেশের সামনে সেই সুযোগ আছে।

কিন্তু সুযোগ আর অর্জন এক নয়।

সার্বভৌমত্ব শুধু সীমান্ত রক্ষা করার নাম নয়; অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, তথ্যের নিরাপত্তা, কূটনৈতিক স্বাধীনতা এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষমতাও সার্বভৌমত্বের অংশ।

সেই অর্থে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ সফল হবে কি না, তার আসল বিচার হবে কোনো একটি বক্তৃতায় নয়—বরং আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ কতটা শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং আত্মনির্ভর রাষ্ট্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তার ওপর।

আর সেই পরীক্ষায় শুধু সরকার নয়, বাংলাদেশের পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই উত্তীর্ণ হতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *