শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন নাহিদ ইসলাম.
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ব্রিকস (BRICS) স্মমেলনে ভারত সফরের সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) ঢাকার শাহবাগে ইনকিলাব মঞ্চের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল তিনটি বিষয়—
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের নতুন সমীকরণ এবং দিল্লিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য।
‘সম্পর্কের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ভারত নয়’
নাহিদ ইসলাম বলেন, শেখ হাসিনা -কে কীভাবে বাংলাদেশে ফেরানো হবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কীভাবে নতুন করে নির্ধারিত হবে—এসব প্রশ্নের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি সামনে আসতে পারে না।
তাঁর বক্তব্যের অর্থ, দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রত্যর্পণ, সীমান্ত, পানি ও পারস্পরিক স্বার্থের মতো বিষয়গুলোর সমাধানের সঙ্গে যুক্ত করে দেখতে হবে।
দিল্লিতে হাসিনার বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন
গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লি থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নাহিদ ইসলামের দাবি, ওই বক্তব্যের পেছনে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থন ছিল। ভারত সরকার এ ধরনের বক্তব্যের দায় নিচ্ছে না—এমন অবস্থানেরও সমালোচনা করেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন যদি ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে এবং বাংলাদেশ সরকার সেটির দায় অস্বীকার করে, তাহলে যেমন তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না, দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য।
তবে ভারত সরকার ওই বক্তব্যের আয়োজনে কী ধরনের ভূমিকা রেখেছিল—এ বিষয়ে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য তাঁর রাজনৈতিক দাবি হিসেবে এসেছে; এর পক্ষে কোনো স্বাধীন প্রমাণ তিনি উপস্থাপন করেননি।
‘দিল্লির বার্তা’ হিসেবে দেখার আহ্বান
নাহিদ ইসলাম বলেন, দিল্লি থেকে শেখ হাসিনা যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, সেগুলোকে শুধু শেখ হাসিনার বক্তব্য হিসেবে না দেখে ভারতের অবস্থানের বার্তা হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত।
তিনি ৫ আগস্টের ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনের অবস্থান জানতে চেয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আরও কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপের কথাও বলেন।
তাঁর অভিযোগ, ওই সংবাদ সম্মেলন বাংলাদেশের গণতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে।
‘ছায়াযুদ্ধের’ অভিযোগ
শেখ হাসিনার দিল্লি থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার ঘটনাকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘ছায়াযুদ্ধ’ ঘোষণার মতো বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম।
তবে এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হলে তার প্রভাব শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না—বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন ও আঞ্চলিক কূটনীতিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্বের কারণে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডোর, যেটি বহুল পরিচিত ‘চিকেন নেক’ নামে, ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সংযোগপথ। বাংলাদেশও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
‘চিকেন নেক’ থেকে বঙ্গোপসাগর—কেন গুরুত্বপূর্ণ
শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। মাত্র কয়েক দশক কিলোমিটার প্রশস্ত এই ভূখণ্ডের কৌশলগত গুরুত্ব ভারতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগের আলোচনায় বারবার উঠে আসে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ভারতকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সংযোগের সুযোগ দিতে পারে।
তাই ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের টানাপোড়েনকে শুধু দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় রাজনীতি দিয়ে দেখা হয় না। এর সঙ্গে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, বঙ্গোপসাগর এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতিও যুক্ত।
ব্রিকস সম্মেলনও কি নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত?
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও আলোচনা বাড়ছে। BRICS সম্মেলন সহ বহুপক্ষীয় ফোরামগুলোতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
BRICS -এর সম্প্রসারণ এবং Global South -এর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির আলোচনায় বাংলাদেশও তার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থকে কীভাবে এগিয়ে নেবে—সেটি ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
তবে কোনো নির্দিষ্ট BRICS সম্মেলনের সিদ্ধান্তকে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার মতো তথ্য এই ঘটনায় নেই।
ভারতের উদ্দেশে নাহিদের বার্তা
নাহিদ ইসলাম বলেন, ভারত যদি বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তাহলে শেখ হাসিনা ও নিহত শরীফ ওসমান হাদীকে ফেরত পাঠানো, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং সীমান্ত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে।
অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কয়েকটি নির্দিষ্ট ইস্যুকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা উঠে এসেছে।
এর মধ্যে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।
সামনে কোন সমীকরণ?
নাহিদ ইসলামের মন্তব্যে বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান কি দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করবে?
একই সঙ্গে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের সঙ্গে যুক্ত করার বক্তব্যও নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করতে পারে।
শেষ পর্যন্ত ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক কোন পথে যাবে, তা নির্ভর করবে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি প্রত্যর্পণ, পানি, সীমান্ত ও আঞ্চলিক স্বার্থের মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের অবস্থান কতটা কাছাকাছি আসে তার ওপর।

1 thought on “শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হলে তারেক রহমানের ভারত সফর নয়: নাহিদ”