মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দিচ্ছেন

বক্তব্য দিচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। — ফাইল ছবি

নাট্যমঞ্চে অভিনয় করা এক তরুণ কীভাবে শিক্ষকতা, ছাত্ররাজনীতি ও দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিব হলেন? জেনে নিন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জীবন ও রাজনৈতিক উত্থানের গল্প।

একসময় মঞ্চের আলোয় দাঁড়িয়ে সংলাপ বলতেন তিনি। নাটক ছিল তাঁর আনন্দের জায়গা, সংস্কৃতি ছিল আত্মপ্রকাশের পথ। সেই মানুষটিই পরে পা রাখলেন রাজনীতির উত্তাল মিছিলে, তারপর শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকতা করলেন, সরকারি চাকরি করলেন, স্থানীয় সরকারে নেতৃত্ব দিলেন, সংসদে গেলেন, মন্ত্রী হলেন—আর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে হয়ে উঠলেন বিএনপির মহাসচিব।

আজ সেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে ঘিরেই আলোচনার কেন্দ্র বঙ্গভবন।

তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষ পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত করা হয়নি; বরং সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচনায় ছিল। মির্জা ফখরুল নিজেও তখন বলেছিলেন, রাষ্ট্রপতি পদে কে মনোনয়ন পাবেন, তা বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।

তাহলে প্রশ্নটা শুধু ‘মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন কি না’—এখানে থেমে থাকে না।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, ঠাকুরগাঁওয়ের এক সংস্কৃতিমনস্ক তরুণ কীভাবে বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির এত কাছে পৌঁছালেন?

সেই গল্প বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় প্রায় ছয় দশক আগে।

রাজনীতির আগে ছিল মঞ্চ

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তাঁর বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক; পরিবারের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলও ছিল শক্তিশালী। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকারও ছিলেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের যুব ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন। অর্থাৎ ফখরুলের পারিবারিক পরিবেশে রাজনীতি ছিল, কিন্তু তাঁর নিজের পরিচয় শুরু থেকেই শুধু রাজনৈতিক ছিল না।

ঠাকুরগাঁওয়ের সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল ছাত্রজীবন থেকেই। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই জানিয়েছেন, স্থানীয় প্রাচীন নাট্যচর্চার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল এবং নাট্যব্যক্তিত্ব ফণীভূষণ পালিতের হাতে তাঁর নাটকের হাতেখড়ি। অভিনয় ও নাট্যনির্দেশনার সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। এমনকি বহু বছর পরও যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়—নাট্যজন, শিক্ষক নাকি রাজনীতিক, কোন পরিচয়টি বেশি উপভোগ করেন—তিনি সাংস্কৃতিক জগতের কথাই আগে বলেছেন।

এই সাংস্কৃতিক শিকড়টি তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বোঝার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ রাজনীতিতে তাঁর প্রকাশভঙ্গি বরাবরই তুলনামূলকভাবে সংযত, বক্তব্যে যুক্তির ব্যবহার এবং মানুষের সামনে কথা বলার দক্ষতা তাঁর পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। নাট্যমঞ্চ হয়তো তাঁকে রাজনীতিক বানায়নি, কিন্তু জনসমক্ষে কথা বলা, মানুষের মনোযোগ ধরে রাখা এবং ভিন্ন মতের মানুষের সামনে নিজের বক্তব্য তুলে ধরার যে অভিজ্ঞতা, তা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে মিশে গেছে।

১৯৬৯-এর উত্তাল রাজপথে তরুণ ফখরুল

ঢাকা কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়তে আসেন ফখরুল। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন।

তিনি সংগঠনটির সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির সক্রিয় নেতৃত্বে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে গ্রেপ্তার ও কারাবরণের কথাও সরকারি জীবনীতে উল্লেখ আছে।

এই সময়টি তাঁর রাজনৈতিক চরিত্র গঠনের প্রথম বড় স্কুল।

বাংলাদেশ তখনও স্বাধীন দেশ নয়। পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজের ক্ষোভ, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে।

এই পরিবেশে বেড়ে ওঠা ফখরুলের কাছে রাজনীতি শুরু থেকেই ছিল শুধু নির্বাচন বা ক্ষমতা দখলের বিষয় নয়; আন্দোলন, সংগঠন ও রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়েও ভাবার অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর।

কিন্তু ১৯৭১-এর পর তাঁর জীবনের পথ সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে চলে যায়নি।

বরং তিনি অন্য একটি পথ বেছে নেন।

রাজনীতির মঞ্চ থেকে শ্রেণিকক্ষে

স্বাধীনতার পর মির্জা ফখরুল শিক্ষকতায় প্রবেশ করেন। ১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। সরকারি প্রশাসনের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনেও কাজ করেছেন।

এই পর্যায়টি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত অধ্যায়।

কারণ এখানেই তিনি সরাসরি দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন ও শিক্ষা ব্যবস্থাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান।

আর এই পথ তাঁকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে যায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের কাছাকাছি।

জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে—কিন্তু রাজনীতির কেন্দ্রে তখনও নন

সরকারি চাকরির সময় মির্জা ফখরুল তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি নথি ও তাঁর জীবনীতে বলা হয়েছে, জিয়াউর রহমানের প্রশাসনের শেষ দিকে তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন এবং ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগ পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন।

এই সম্পর্ককে সরাসরি ‘জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক হবে না। কারণ তাঁর দায়িত্ব ছিল প্রশাসনিক এবং তিনি তখন বিএনপির সক্রিয় রাজনীতিতেও ছিলেন না।

তবে জিয়াউর রহমানের শাসনামলের রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ওপর প্রভাব ফেলেছিল কি না—এটি তাঁর পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থান বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

আরেকটি বিষয়ও এখানে লক্ষণীয়।

জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু ফখরুল তখনও দলের নেতা নন। তাঁর বিএনপিতে প্রবেশ ঘটে আরও পরে, এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে, ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে।

অর্থাৎ ফখরুলের বিএনপি-যাত্রা ছিল দলের প্রতিষ্ঠাকালীন রাজনীতির অংশ হিসেবে নয়; বরং দীর্ঘ শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় রাজনীতির পর একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার গল্প।

১৯৮৬: সরকারি চাকরি ছেড়ে অনিশ্চিত রাজনৈতিক পথে

১৯৮৬ সালে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতির দিকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এই সিদ্ধান্তটি তাঁর জীবনের অন্যতম বড় মোড়।

একদিকে ছিল তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ক্যারিয়ার; অন্যদিকে ছিল বাংলাদেশের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তিনি দ্বিতীয় পথ বেছে নিলেন।

দুই বছর পর, ১৯৮৮ সালে, নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে এই সাফল্য তাঁকে নিজের এলাকায় একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সাহায্য করে।

এরপর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯২ সালে তাঁকে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি করা হয়।

এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ দলীয় রাজনৈতিক উত্থান।

পরাজয়ও ছিল তাঁর রাজনৈতিক শিক্ষার অংশ

রাজনীতিতে তাঁর উত্থান কিন্তু সরলরেখায় হয়নি।

১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি পরাজিত হন। ১৯৯৬ সালেও একই আসন থেকে নির্বাচনে লড়াই করে জয় পাননি।

এখানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

তিনি নির্বাচনে পরাজিত হয়েও রাজনীতি ছাড়েননি।

বরং সংগঠনের ভেতরে নিজের অবস্থান তৈরি করতে থাকেন। স্থানীয় নেতৃত্ব থেকে জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে ওঠার এই ধীর পথটি পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

অনেক রাজনীতিকের উত্থান ঘটে একটি বড় নির্বাচনী বিজয় দিয়ে।

ফখরুলের ক্ষেত্রে উত্থানটি ছিল অনেক বেশি ধীর।

প্রথমে ছাত্রনেতা, তারপর শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, জেলা নেতা—তারপর জাতীয় নেতা।

২০০১: অবশেষে সংসদে প্রবেশ

দীর্ঘ অপেক্ষার পর আসে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তিনি জয়ী হন এবং সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়ার দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

এই পর্যায়ে মির্জা ফখরুল আর শুধু ঠাকুরগাঁওয়ের নেতা নন।

তিনি জাতীয় সরকারের অংশ।

এখানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সামনে আসে—খালেদা জিয়া

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হিসেবে তিনি দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় কাঠামোর আরও কাছে চলে আসেন। তবে তাঁর পরবর্তী উত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আসবে সরকারে থাকার সময়ে নয়, বরং বিএনপি ক্ষমতার বাইরে যাওয়ার পর।

২০০৮-এর পর: সংসদে নেই, কিন্তু রাজনীতির মঞ্চে আরও দৃশ্যমান

২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি আবারও ঠাকুরগাঁও-১ আসন হারান।

কিন্তু এবার তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা অন্যভাবে বাড়তে থাকে।

২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। গণমাধ্যমে দলটির অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হিসেবেও তাঁর উপস্থিতি ক্রমশ বাড়তে থাকে।

এই সময় থেকেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণও তীব্র হতে থাকে।

শেখ হাসিনা -এর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায়। বিএনপি বিরোধী দলে। নির্বাচন, গণতন্ত্র, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, রাজনৈতিক আন্দোলন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে দুই দলের সংঘাত ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

এই পরিবেশে মির্জা ফখরুল হয়ে ওঠেন বিএনপির অন্যতম প্রধান প্রকাশ্য কণ্ঠ।

শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আসলে কী?

রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের মতো এখানে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প নয়; বরং এটি দুই ভিন্ন রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধির সম্পর্ক।

শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন সরকারপ্রধান হিসেবে; মির্জা ফখরুল বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন বিরোধী রাজনীতির অন্যতম মুখ হিসেবে।

দুই পক্ষের রাজনৈতিক বক্তব্যে তীব্র বিরোধিতা ছিল।

ফখরুল বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে কর্তৃত্ববাদ, নির্বাচনব্যবস্থা সংকুচিত করা এবং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষ থেকেও বিএনপি ও তার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছে।

তাই তাঁদের সম্পর্ককে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের গত দুই দশকের রাজনীতির প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়ে না।

এটি মূলত ছিল আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি—বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী দ্বিদলীয় রাজনৈতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

২০১১: দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে সামনে এলেন ফখরুল

২০১১ সালে বিএনপির মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন মারা গেলে মির্জা ফখরুল ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এর আগে তিনি ছিলেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব।

এটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি।

কারণ বিএনপি তখন বিরোধী দলে। সামনে রাজনৈতিক সংঘাত, আন্দোলন, নির্বাচন ও সাংগঠনিক সংকট—সব একসঙ্গে।

আর এই জায়গাতেই ফখরুলের ব্যক্তিত্বের একটি বৈশিষ্ট্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তিনি ছিলেন না সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ নেতা।

তিনি ছিলেন না দলের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি।

কিন্তু তিনি ছিলেন এমন একজন নেতা, যিনি দলের বক্তব্য ধারাবাহিকভাবে জনসমক্ষে তুলে ধরতে পারতেন।

২০১৬ সালে তিনি বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন।

সেই থেকে তিনি দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ।

রাজপথ, কারাগার ও দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি

বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তাঁর সময়ের বড় অংশ কেটেছে বিরোধী রাজনীতির কঠিন বাস্তবতার মধ্যে।

সমাবেশ, মিছিল, গ্রেপ্তার, মামলা, রাজনৈতিক সংঘাত—এসব তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।

২০২৩ সালের অক্টোবরেও বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি গ্রেপ্তার হন; সে সময় তাঁর গ্রেপ্তার আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও গুরুত্ব পায়।

এখানে তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে শুধু পদ-পদবির তালিকা দিয়ে বোঝা কঠিন।

একজন সাবেক শিক্ষক ও মন্ত্রীকে দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী দলের সংগঠক ও মুখপাত্রের ভূমিকা পালন করতে হয়েছে।

এটাই তাঁর ‘সংগ্রাম’-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক: উত্তরাধিকার নাকি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়?

বিএনপির বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোয় মির্জা ফখরুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো দলের চেয়ারম্যান/শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ক।

তারেক রহমান বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফখরুল দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান সেতু হিসেবে কাজ করেছেন।

এই সম্পর্ককে শুধু ‘দলের মহাসচিব ও শীর্ষ নেতার সম্পর্ক’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ধরা পড়ে না।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে ফখরুলের ভূমিকা হচ্ছে মাঠের সংগঠন, দলের বক্তব্য এবং জাতীয় রাজনীতির মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।

আর এখানেই তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ তিনি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনিক সময় দেখেছেন, খালেদা জিয়ার সরকারের মন্ত্রী ছিলেন, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনীতি করেছেন এবং এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক পর্যায়েও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আছেন।

একজন মানুষের জীবনে বাংলাদেশের চার দশকেরও বেশি রাজনৈতিক পরিবর্তনের এমন সরাসরি ধারাবাহিকতা খুব বেশি দেখা যায় না।

জিয়াউর রহমান থেকে তারেক রহমান—একটি রাজনৈতিক সেতু

ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনের একটি অনন্য দিক এখানেই।

তিনি সরাসরি জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতিতে দলকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আর এখন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপিতেও কেন্দ্রীয় ভূমিকায় রয়েছেন।

তবে এর অর্থ এই নয় যে তাঁর রাজনৈতিক জীবন কেবল একটি পরিবারের ওপর নির্ভরশীল ছিল।

বরং তাঁর উত্থানের ভেতরে স্থানীয় রাজনীতি, নির্বাচনী পরাজয়, সাংগঠনিক কাজ, শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং দীর্ঘদিনের দলীয় দায়িত্ব—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করেছে।

এই জায়গাতেই ফখরুলকে বিএনপির অন্য অনেক নেতার থেকে আলাদা করে দেখা যায়।

মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে সংস্কৃতির ছাপ কতটা?

রাজনীতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেও নাটক ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

ঠাকুরগাঁওয়ে তাঁর পুরোনো নাট্যজীবনের স্মৃতি নিয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারগুলোতে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, সাংস্কৃতিক জগতই তাঁর কাছে সবচেয়ে উপভোগের জায়গা ছিল। এমনকি সাম্প্রতিক এক অনুষ্ঠানে তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তিও করেন।

এটি নিছক ব্যক্তিগত শখ হিসেবে দেখলেও ভুল হবে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ—সব পর্যায়েই সাংস্কৃতিক কর্মীরা রাজনৈতিক চেতনা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন।

ফখরুল সেই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ধারারই একজন পুরোনো অংশগ্রহণকারী।

আর তাই বঙ্গভবনের আলোচনায় তাঁর নাম কেন আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে?

২০২৬ সালের জুলাইয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার পর নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন—এই প্রশ্নে একাধিক নাম সামনে আসে। মির্জা ফখরুল তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি হয়ে ওঠেন।

তাঁর পক্ষে যে যুক্তিগুলো রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দীর্ঘদিনের অবস্থান, সংসদীয় ও মন্ত্রিসভার অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ হিসেবে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।

তবে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নাম আলোচনায় থাকা আর আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন পাওয়া—দুটি এক বিষয় নয়।

২৫ ও ২৭ জুলাইয়ের বক্তব্যে ফখরুল নিজেই বলেছেন, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রার্থী মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে।

অর্থাৎ বঙ্গভবনের দরজা তাঁর জন্য রাজনৈতিকভাবে আলোচিত হলেও, তখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাঁর হাতে ছিল না।

নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবন—যদি শেষ পর্যন্ত সেই পথেই যান

মির্জা ফখরুলের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হয়তো তাঁর কোনো একটি পদ নয়।

বরং পথটি।

ঠাকুরগাঁওয়ের নাট্যমঞ্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতি।

সেখান থেকে শিক্ষকতা।

শিক্ষকতা থেকে সরকারি প্রশাসন।

জিয়াউর রহমানের সময়ের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে স্থানীয় রাজনীতি।

পৌর চেয়ারম্যান থেকে বিএনপির জেলা নেতৃত্ব।

দুই নির্বাচনী পরাজয়ের পর সংসদ সদস্য।

সেখান থেকে প্রতিমন্ত্রী।

তারপর দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব।

ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব।

অবশেষে বিএনপির মহাসচিব।

আর এখন রাষ্ট্রপতি পদকে ঘিরে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে।

এই দীর্ঘ পথের মধ্যে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একাধিক যুগের মধ্য দিয়ে হেঁটেছেন।

জিয়াউর রহমানের সময়ের বাংলাদেশ দেখেছেন।

খালেদা জিয়ার সরকারের অংশ ছিলেন।

শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী রাজনীতির প্রধান মুখগুলোর একজন ছিলেন।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির নতুন রাজনৈতিক পর্যায়েও আছেন।

তাই মির্জা ফখরুলের জীবনী আসলে শুধু একজন বিএনপি নেতার জীবনী নয়।

এটি বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি থেকে গণতন্ত্রের আন্দোলন, সামরিক-পরবর্তী রাজনীতি, দুই প্রধান দলের দীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশের একটি ব্যক্তিগত প্রতিচ্ছবি।

আর তাঁর সামনে এখন যে প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি শুধু তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন কি না—তা নয়।

আরও বড় প্রশ্ন হলো, যে মানুষটি জীবনের শুরুতে মঞ্চে চরিত্রে অভিনয় করতেন, তিনি যদি একদিন বঙ্গভবনে বসেন, তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে তাঁর নিজের চরিত্রটি কেমন হবে?

সেটির উত্তর সময়ই দেবে।

কিন্তু একটি বিষয় ইতিমধ্যেই স্পষ্ট—মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের উত্থান কোনো এক রাতের রাজনৈতিক ঘটনা নয়।

এটি প্রায় ছয় দশকের এক দীর্ঘ যাত্রা।

আর সেই যাত্রার শুরুটা হয়েছিল ক্ষমতার করিডরে নয়—

ঠাকুরগাঁওয়ের একটি নাট্যমঞ্চে

2 thoughts on “ঠাকুরগাঁওয়ের নাট্যমঞ্চ থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু: মির্জা ফখরুলের উত্থানের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *