ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিতি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট—ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থান ও বিতর্কিত জীবনের প্রতীকী চিত্র।
কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ্বজুড়ে এত আলোচিত?
সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতিতে এমন খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন, যাঁদের নাম শুনলেই একই সঙ্গে রাজনীতি, ব্যবসা, গণমাধ্যম এবং বিতর্কের কথা মনে পড়ে। ডোনাল্ড জন ট্রাম্প (Donald John Trump) সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন।
তিনি একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, টেলিভিশন তারকা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম ও ৪৭তম প্রেসিডেন্ট। তাঁর রাজনৈতিক উত্থান শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বাণিজ্যনীতি এবং গণমাধ্যমের ভাষাও বদলে দিয়েছে।
একদিকে তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি “America First” নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর বক্তব্য, নীতি এবং নেতৃত্বের ধরন মার্কিন রাজনীতিকে আরও বিভক্ত করেছে এবং বহু বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
এই দুই বিপরীত মূল্যায়নের মাঝেই গড়ে উঠেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার।
তবে ট্রাম্পকে বুঝতে হলে শুধু তাঁর প্রেসিডেন্সি নয়, বরং নিউইয়র্কের একজন তরুণ ব্যবসায়ী থেকে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠার পুরো যাত্রাপথ জানা জরুরি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কে?
ডোনাল্ড জন ট্রাম্প একজন মার্কিন ব্যবসায়ী, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং রাজনীতিবিদ।
তিনি প্রথমে রিয়েল এস্টেট খাতে ব্যবসায়িক সাফল্যের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। পরে টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “The Apprentice” -এর সঞ্চালক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক পরিচিতি পান।
২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবার হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করেন। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের নির্বাচনে আবারও জয়ী হয়ে দ্বিতীয়, অক্রমাগত (non-consecutive) মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হন—যা মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন, নিউইয়র্ক সিটির কুইন্স এলাকায়।
তিনি ছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ।
তাঁর বাবা ফ্রেড ট্রাম্প নিউইয়র্কের একজন সফল রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার ছিলেন। মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য আবাসন নির্মাণের মাধ্যমে তিনি ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেন।
তাঁর মা মেরি অ্যান ম্যাকলিওড ট্রাম্প স্কটল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নেন।
ট্রাম্পের পারিবারিক শিকড় ইউরোপে বিস্তৃত। তাঁর পিতৃপরিবারের পূর্বপুরুষরা জার্মানি থেকে এবং মাতৃপরিবার স্কটল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন।
পারিবারিক পরিবেশ: প্রতিযোগিতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ট্রাম্পের শৈশব এমন এক পরিবারে কেটেছে, যেখানে কঠোর পরিশ্রম, প্রতিযোগিতা এবং ব্যবসায়িক সাফল্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো।
তাঁর বাবা বিশ্বাস করতেন, জীবনে সফল হতে হলে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে এবং প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হবে।
বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ফ্রেড ট্রাম্প ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের ব্যবসা, অর্থ এবং সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে আগ্রহী করে তুলতেন।
এই পারিবারিক সংস্কৃতি পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শৈশব: চঞ্চল ও আত্মবিশ্বাসী
শৈশবে ট্রাম্পকে চঞ্চল, উদ্যমী এবং প্রতিযোগিতাপ্রবণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
পরিবারের সদস্য এবং জীবনীকারদের বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি ছোটবেলা থেকেই নেতৃত্ব দিতে এবং নিজের মত প্রতিষ্ঠা করতে পছন্দ করতেন।
তবে তাঁর এই চঞ্চল স্বভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়।
নিউ ইয়র্ক মিলিটারি একাডেমি
১৩ বছর বয়সে ট্রাম্পকে New York Military Academy-এ পাঠানো হয়।
অনেকে এটিকে শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত মনে করলেও, পরিবার পরে জানায় যে এর উদ্দেশ্য ছিল শৃঙ্খলাবোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করা।
এই সামরিকধর্মী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে—
- সময়ানুবর্তিতা,
- নেতৃত্ব,
- শারীরিক সক্ষমতা,
- প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব
—বিশেষভাবে গুরুত্ব পেত।
পরে ট্রাম্প বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে বলেন, এই প্রতিষ্ঠান তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নেতৃত্বের দক্ষতা গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছিল।
উচ্চশিক্ষা
সামরিক একাডেমি শেষ করার পর ট্রাম্প প্রথমে Fordham University-এ ভর্তি হন।
দুই বছর পড়াশোনার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম স্বনামধন্য ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান Wharton School, University of Pennsylvania-এ স্থানান্তরিত হন।
১৯৬৮ সালে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি প্রায়ই উল্লেখ করেছেন যে, ব্যবসা সম্পর্কে তাঁর আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বাস্তব ব্যবসায়িক জীবনে কাজে লেগেছে।
বাবার ব্যবসায় প্রথম পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর ট্রাম্প তাঁর বাবার প্রতিষ্ঠিত Elizabeth Trump & Son কোম্পানিতে যোগ দেন।
কোম্পানিটি মূলত নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ও কুইন্স এলাকায় আবাসিক ভবন নির্মাণ ও পরিচালনা করত।
তবে তরুণ ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল আরও বড়।
তিনি মনে করতেন, শুধু আবাসন ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকলে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত হওয়া সম্ভব নয়।
তাঁর দৃষ্টি ছিল নিউইয়র্কের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও প্রভাবশালী এলাকা— ম্যানহাটন।
ম্যানহাটনের দিকে যাত্রা
১৯৭০-এর দশকে ম্যানহাটনে ব্যবসা শুরু করা সহজ ছিল না।
সেখানে ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত বড় বড় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের আধিপত্য ছিল।
কিন্তু ট্রাম্প ঝুঁকি নিতে আগ্রহী ছিলেন।
তিনি পুরোনো ভবন পুনর্নির্মাণ, বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেন।
এই সময় থেকেই তিনি বুঝতে শুরু করেন যে, শুধু সম্পত্তি নির্মাণ করলেই হবে না; নিজের নামকেও একটি ব্র্যান্ডে পরিণত করতে হবে।
“Trump” নামকে ব্র্যান্ডে রূপ দেওয়া
ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম বড় ব্যবসায়িক কৌশল ছিল নিজের পদবিকেই একটি বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডে পরিণত করা।
তিনি বিশ্বাস করতেন, কোনো ভবনের গায়ে “Trump” নাম থাকলে সেটি আলাদা পরিচিতি পাবে।
পরবর্তী কয়েক দশকে এই ধারণাই তাঁর ব্যবসায়িক পরিচয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
হোটেল, অফিস টাওয়ার, আবাসিক ভবন, গলফ কোর্স—সব ক্ষেত্রেই “Trump” নামটি একটি বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
ব্যক্তিত্ব: আত্মবিশ্বাস নাকি আত্মপ্রচার?
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই ট্রাম্প নিজেকে আত্মবিশ্বাসী, সাহসী এবং বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত একজন ব্যবসায়ী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
সমর্থকদের মতে, এই আত্মবিশ্বাসই তাঁকে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিং এবং আত্মপ্রচারে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন, যা তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যবসায়িক জীবনের শুরু থেকেই এই দুই ধরনের মূল্যায়ন তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়—এবং পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনেও তা অব্যাহত থাকে।
ব্যবসার নতুন লক্ষ্য
সত্তরের দশকের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প আর শুধু একজন ব্যবসায়ীর ছেলে নন; তিনি নিজস্ব পরিচয়ে বড় প্রকল্প হাতে নিতে শুরু করেছেন।
নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট বাজারে নিজের অবস্থান তৈরি করার পাশাপাশি তিনি এমন একটি ব্র্যান্ড গড়ে তুলছিলেন, যা ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে পরিচিত হবে।
কিন্তু সাফল্যের এই যাত্রা ছিল না বাধাহীন। সামনে অপেক্ষা করছিল বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ, ক্যাসিনো ব্যবসা, বিপুল ঋণ, আর্থিক সংকট এবং শেষ পর্যন্ত টেলিভিশনের পর্দায় এক নতুন পরিচয়ে আবির্ভাব—যা তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশের জন্য অপ্রত্যাশিত এক জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
নিউইয়র্কের রিয়েল এস্টেট কিংবদন্তি থেকে টেলিভিশন তারকা: ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্থান
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে বাবার প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প খুব দ্রুত বুঝতে পারেন যে, তিনি শুধু একটি পারিবারিক ব্যবসা পরিচালনা করতে চান না। তাঁর লক্ষ্য ছিল আরও বড়—নিউইয়র্কের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের কাতারে উঠে আসা।
সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে নব্বইয়ের দশকের শুরু পর্যন্ত সময়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়গুলোর একটি। এই সময়েই তিনি একদিকে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পান, অন্যদিকে বিপুল ঋণ ও আর্থিক সংকটের মুখেও পড়েন।
এই সময়ের অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসায়িক দর্শন, জনসম্মুখে ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক ভাষার ভিত্তি তৈরি করে।
ট্রাম্প অর্গানাইজেশন: পারিবারিক ব্যবসা থেকে করপোরেট পরিচয়
বাবার কোম্পানিতে যোগ দেওয়ার কয়েক বছরের মধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যবসার দিক পরিবর্তন করতে শুরু করেন।
তিনি কোম্পানির কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে Trump Organization নামে পরিচিত ব্র্যান্ডে রূপ দেন।
যদিও প্রতিষ্ঠানটি পারিবারিক মালিকানাধীন ছিল, তবুও ট্রাম্প এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন এটি একটি আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য।
তাঁর কৌশল ছিল—
- উচ্চমূল্যের সম্পত্তিতে বিনিয়োগ,
- বিলাসবহুল নকশা,
- আকর্ষণীয় বিপণন,
- এবং নিজের ব্যক্তিগত পরিচিতিকে ব্যবসার অংশ বানানো।
নিউইয়র্কের বড় সুযোগ: Grand Hyatt Hotel
ট্রাম্পের প্রথম বড় সাফল্য আসে নিউইয়র্কের একটি পুরোনো হোটেল পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে।
তিনি রেলস্টেশনের পাশের অবহেলিত Commodore Hotel পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেন।
সরকারি কর-সুবিধা এবং অংশীদারিত্বের মাধ্যমে হোটেলটি সংস্কার করে Grand Hyatt New York হিসেবে চালু করা হয়।
এই প্রকল্পটি ব্যবসায়িকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল তিনটি কারণে—
- এটি ট্রাম্পকে নিউইয়র্কের বড় ডেভেলপার হিসেবে পরিচিত করে।
- বড় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করেন।
- ভবিষ্যতের আরও বড় প্রকল্পের দরজা খুলে যায়।

Trump Tower: একটি ভবন, একটি ব্র্যান্ড
১৯৮৩ সালে নিউইয়র্কের ফিফথ অ্যাভিনিউয়ে উদ্বোধন হয় Trump Tower।
এটি শুধু একটি ভবন ছিল না; এটি ছিল ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডের প্রতীক।
উচ্চমানের আবাসিক অ্যাপার্টমেন্ট, অফিস, বিলাসবহুল দোকান এবং ঝলমলে অ্যাট্রিয়াম—সব মিলিয়ে ভবনটি দ্রুতই নিউইয়র্কের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা হয়ে ওঠে।
ট্রাম্প নিজেও দীর্ঘ সময় এই ভবনের পেন্টহাউসে বসবাস করেন।
পরে তাঁর রাজনৈতিক জীবনেও Trump Tower গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহু সংবাদ সম্মেলন, ব্যবসায়িক ঘোষণা এবং ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার ঘোষণাও এখান থেকেই আসে।
“Luxury” বিক্রি করার কৌশল
ডোনাল্ড ট্রাম্প শুধু ভবন নির্মাণ করতেন না; তিনি একটি জীবনধারা বিক্রি করতেন।
তাঁর প্রকল্পগুলোর বিজ্ঞাপনে বারবার উঠে আসত—
- বিলাসিতা,
- এক্সক্লুসিভিটি,
- উচ্চমান,
- সফলতার প্রতীক।
তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ শুধু একটি ফ্ল্যাট বা অফিস কেনে না; তারা একটি মর্যাদা কিনতে চায়।
এই বিপণন কৌশল পরবর্তী কয়েক দশক ধরে তাঁর ব্যবসার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে থাকে।
আটলান্টিক সিটিতে নতুন জুয়া
ম্যানহাটনে সাফল্যের পর ট্রাম্প নজর দেন Atlantic City-এর ক্যাসিনো শিল্পে।
আশির দশকে তিনি একের পর এক বড় ক্যাসিনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করেন।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- Trump Plaza
- Trump Castle
- Trump Taj Mahal
বিশেষ করে Trump Taj Mahal উদ্বোধনের সময় এটিকে বিশ্বের অন্যতম বিলাসবহুল ক্যাসিনো হিসেবে প্রচার করা হয়।
ট্রাম্প বিশ্বাস করতেন, বিনোদন শিল্প তাঁর ব্যবসাকে আরও দ্রুত সম্প্রসারণ করবে।
ঋণের পাহাড়
তবে দ্রুত সম্প্রসারণের একটি বড় মূল্যও ছিল।
নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ট্রাম্প বিপুল পরিমাণ ঋণ নেন।
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের রিয়েল এস্টেট বাজারে মন্দা দেখা দিলে তাঁর ব্যবসাও বড় ধাক্কা খায়।
তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর কয়েক বিলিয়ন ডলারের ঋণের চাপ সৃষ্টি হয়।
দেউলিয়া কি হয়েছিলেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—তিনি ব্যক্তিগতভাবে দেউলিয়া হয়েছিলেন।
বাস্তবে বিষয়টি কিছুটা ভিন্ন।
ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করেননি।
তবে তাঁর মালিকানাধীন বা নিয়ন্ত্রিত একাধিক কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের দেউলিয়া আইনের Chapter 11 অনুযায়ী পুনর্গঠনের (bankruptcy restructuring) প্রক্রিয়ায় যায়।
এই আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো ঋণ পুনর্বিন্যাস করে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।
সমর্থকদের মতে, এটি ছিল ব্যবসা বাঁচানোর কৌশল।
সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত ঝুঁকি নেওয়ার ফলেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
সংকট থেকে ফিরে আসা
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ট্রাম্প ধীরে ধীরে ব্যবসায়িক কৌশল পরিবর্তন করেন।
তিনি নিজস্ব অর্থে বড় প্রকল্প নির্মাণের পরিবর্তে বিভিন্ন প্রকল্পে নিজের নাম ব্যবহারের লাইসেন্স দিতে শুরু করেন।
অর্থাৎ সব ভবনের মালিক না হয়েও অনেক প্রকল্পে শুধু “Trump” ব্র্যান্ড ব্যবহারের বিনিময়ে আয় করতে থাকেন।
এই মডেল তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।
“Trump” ব্র্যান্ডের বৈশ্বিক বিস্তার
ক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিভিন্ন দেশেও “Trump” নাম ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
হোটেল, আবাসিক ভবন, গলফ রিসোর্ট এবং বাণিজ্যিক প্রকল্পে এই ব্র্যান্ড লাইসেন্স দেওয়া হয়।
বিভিন্ন দেশে “Trump” নামযুক্ত ভবন নির্মিত হলেও সবগুলোর মালিকানা ট্রাম্পের ছিল না।
অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় ডেভেলপাররা ব্র্যান্ড ব্যবহারের অনুমতি নিতেন।
এটি তাঁর ব্যবসায়িক মডেলের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল।
বই লেখক হিসেবে ট্রাম্প
১৯৮৭ সালে প্রকাশিত The Art of the Deal বইটি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
বইটিতে তিনি ব্যবসা, আলোচনার কৌশল এবং সফলতার ধারণা নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
বইটি দীর্ঘ সময় বেস্টসেলার তালিকায় ছিল।
সমর্থকদের কাছে এটি ব্যবসায়িক অনুপ্রেরণার বই হিসেবে জনপ্রিয় হয়।
অন্যদিকে কিছু সমালোচক বইটিকে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের অংশ হিসেবে দেখেছেন।
গণমাধ্যমে ট্রাম্প
নব্বইয়ের দশক থেকে ট্রাম্প নিয়মিত সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় থাকতে শুরু করেন।
তাঁর ব্যবসা, ব্যক্তিগত জীবন, বিবাহ, বিলাসবহুল জীবনধারা এবং সাহসী মন্তব্য তাঁকে গণমাধ্যমের পরিচিত মুখে পরিণত করে।
তিনি খুব দ্রুত বুঝতে পারেন—
মিডিয়ার উপস্থিতি নিজেই একটি ব্যবসায়িক সম্পদ।
এই উপলব্ধি পরবর্তীতে তাঁর রাজনৈতিক সাফল্যেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
The Apprentice: নতুন পরিচয়
২০০৪ সালে NBC চ্যানেলে শুরু হয় রিয়েলিটি শো The Apprentice।
এখানে প্রতিযোগীরা ব্যবসায়িক বিভিন্ন চ্যালেঞ্জে অংশ নিতেন এবং শেষ পর্যন্ত বিজয়ী ট্রাম্পের প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ পেতেন।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বিখ্যাত সংলাপ—
“You’re Fired!”
—ট্রাম্পকে নতুন প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় করে তোলে।
শুধু ব্যবসায়ী নয়, তিনি এখন একজন জাতীয় পর্যায়ের টেলিভিশন তারকা।
ব্যবসায়ী থেকে সেলিব্রিটি
২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ট্রাম্পের পরিচয় আর শুধু রিয়েল এস্টেট উদ্যোক্তা নয়।
তিনি তখন—
- সফল ব্যবসায়ী,
- টেলিভিশন তারকা,
- বেস্টসেলার লেখক,
- বক্তা,
- এবং শক্তিশালী ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড।
এই জনপ্রিয়তা তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের কোটি মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে।
পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে এই পরিচিতি ছিল তাঁর অন্যতম বড় সম্পদ।
রাজনীতির দিকে প্রথম পদক্ষেপ
যদিও ট্রাম্প বহু বছর ধরেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে মন্তব্য করতেন, তবুও দীর্ঘ সময় তিনি পূর্ণকালীন রাজনীতিতে আসেননি।
তিনি কখনো রিপাবলিকান, কখনো ডেমোক্র্যাট, আবার কখনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু ২০১০-এর দশকের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, অভিবাসন, বিশ্বায়ন এবং ওয়াশিংটনের প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর বক্তব্য ক্রমশ জনপ্রিয় হতে থাকে।
আর ২০১৫ সালে তিনি এমন একটি ঘোষণা দেন, যা শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাস বদলে দেয়।
(চলবে — Part 3)
রাজনীতিতে প্রবেশ থেকে হোয়াইট হাউস: ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঐতিহাসিক উত্থান
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে একজন পরিচিত ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন তারকা ছিলেন। তিনি প্রায়ই রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করতেন, বিভিন্ন প্রেসিডেন্টকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করতেন এবং জাতীয় ইস্যুতে নিজের অবস্থান তুলে ধরতেন। তবে দীর্ঘ সময় তিনি নির্বাচনে অংশ নেননি।
অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন একজন সফল উদ্যোক্তা, আবার অনেকের কাছে বিতর্কিত সেলিব্রিটি। কিন্তু ২০১৫ সালে তিনি এমন একটি সিদ্ধান্ত নেন, যা শুধু তাঁর নিজের জীবনই নয়, মার্কিন রাজনীতির গতিপথও বদলে দেয়।
রাজনীতির প্রতি আগ্রহ: বহু বছরের প্রস্তুতি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক আগ্রহ নতুন ছিল না।
১৯৮০-এর দশক থেকেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, বাণিজ্যনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করতেন।
বিভিন্ন সময়ে তিনি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখেন। এমনকি অতীতে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে অনুদানও দিয়েছেন।
১৯৯৯ সালে তিনি Reform Party থেকে প্রেসিডেন্ট পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হওয়ার বিষয়েও আলোচনা করেছিলেন, যদিও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেননি।
২০১১ সালে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার জন্মসনদ নিয়ে তাঁর বিতর্কিত মন্তব্য তাঁকে আবার জাতীয় রাজনীতির আলোচনায় নিয়ে আসে।
এই সময় থেকেই অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ধারণা করতে শুরু করেন যে, ট্রাম্প হয়তো ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।
২০১৫: যে ঘোষণায় বদলে যায় মার্কিন রাজনীতি
২০১৫ সালের ১৬ জুন।
নিউইয়র্কের Trump Tower-এর এস্কেলেটর দিয়ে নিচে নেমে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন।
এই দৃশ্যটি পরবর্তী সময়ে মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্তে পরিণত হয়।
তাঁর ঘোষণার ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আবার শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এবং নিরাপদ করতে হবে।
সেখান থেকেই তাঁর সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক স্লোগান জন্ম নেয়—
“Make America Great Again” (MAGA)
এই চারটি শব্দই পরবর্তী সময়ে শুধু একটি নির্বাচনী স্লোগান নয়, বরং একটি বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনের পরিচয়ে পরিণত হয়।
MAGA: শুধু স্লোগান নয়, একটি রাজনৈতিক দর্শন
“Make America Great Again” বা MAGA ছিল ট্রাম্পের পুরো নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু।
এই দর্শনের মূল বিষয়গুলো ছিল—
- যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও উৎপাদন খাতকে শক্তিশালী করা
- বিদেশে চলে যাওয়া চাকরি ফিরিয়ে আনা
- অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কঠোর করা
- সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা
- চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো
- আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করা
- “America First” নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া
সমর্থকদের মতে, এসব নীতি বহু বছর ধরে উপেক্ষিত আমেরিকান শ্রমজীবী ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে সামনে নিয়ে আসে।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, এই বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদী ছিল এবং সমাজে বিভাজন বাড়িয়েছে।
কেন ট্রাম্পের বার্তা জনপ্রিয় হয়?
২০১৫ সালের যুক্তরাষ্ট্র ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পথে, কিন্তু অনেক শিল্পাঞ্চলে চাকরি হারানোর ক্ষোভ, বিশ্বায়নের প্রভাব এবং অভিবাসন নিয়ে উদ্বেগ ছিল।
বিশেষ করে তথাকথিত “Rust Belt” অঞ্চলের বহু ভোটার মনে করতেন—
- বড় শিল্প বিদেশে চলে যাচ্ছে,
- উৎপাদন কমছে,
- স্থানীয় কর্মসংস্থান হ্রাস পাচ্ছে।
ট্রাম্প এই অসন্তোষকে তাঁর প্রচারণার মূল শক্তিতে পরিণত করেন।
তিনি নিজেকে “ওয়াশিংটনের বাইরের মানুষ” (political outsider) হিসেবে উপস্থাপন করেন।
তাঁর বক্তব্য ছিল—
“আমি রাজনীতিবিদ নই। আমি একজন ব্যবসায়ী, যিনি কাজ শেষ করতে জানেন।”
এই বার্তা অনেক ভোটারের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
রিপাবলিকান প্রাইমারিতে চমক
প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বহু অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ।
তাঁদের মধ্যে ছিলেন—
- জেব বুশ
- মার্কো রুবিও
- টেড ক্রুজ
- জন কেসিক
- বেন কারসন
- ক্রিস ক্রিস্টি
শুরুতে অধিকাংশ রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ট্রাম্প খুব বেশি দূর যেতে পারবেন না।
কারণ—
- তাঁর কোনো সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা ছিল না।
- তিনি প্রথাগত রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহার করতেন না।
- বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তেন।
কিন্তু একের পর এক প্রাইমারি নির্বাচনে জয় পেয়ে তিনি সবাইকে বিস্মিত করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন ব্যবহার
ট্রাম্পের প্রচারণার একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার।
বিশেষ করে Twitter (বর্তমান X)-এ তিনি সরাসরি ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে তিনি নিজের বক্তব্য নিজেই প্রকাশ করতেন।
এই কৌশল রাজনৈতিক প্রচারণায় নতুন ধারা তৈরি করে।
সমর্থকদের মতে, এতে তিনি জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পেরেছিলেন।
সমালোচকদের মতে, অনেক সময় তাঁর পোস্ট বিতর্ক ও ভুল তথ্য ছড়ানোর অভিযোগের জন্ম দিয়েছে।
“America First”
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির মূল ধারণা ছিল—
America First
এই নীতির মূল বক্তব্য—
- যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
- আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা।
- মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি।
- যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প ও কর্মসংস্থান রক্ষা।
এই নীতি পরবর্তীতে তাঁর প্রেসিডেন্সির অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
২০১৬ সালের নির্বাচন
রিপাবলিকান মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী হন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন।
নির্বাচনী প্রচারণা ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
আলোচনার প্রধান বিষয়গুলো ছিল—
- অর্থনীতি
- স্বাস্থ্যসেবা
- অভিবাসন
- ইমেইল বিতর্ক
- জাতীয় নিরাপত্তা
- সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ
দুই প্রার্থীর মধ্যে টেলিভিশন বিতর্ক বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষ দেখেন।
নির্বাচনের আগের পূর্বাভাস
বেশিরভাগ জাতীয় জরিপে হিলারি ক্লিনটন এগিয়ে ছিলেন।
অনেক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তাঁর জয়ের সম্ভাবনাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছিল।
তবে ট্রাম্প গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জোরালো প্রচারণা চালিয়ে যান।
বিশেষ করে—
- পেনসিলভানিয়া
- মিশিগান
- উইসকনসিন
- ফ্লোরিডা
—এসব রাজ্যে তাঁর প্রচারণা শেষ পর্যন্ত বড় ভূমিকা রাখে।
অপ্রত্যাশিত বিজয়
৮ নভেম্বর ২০১৬।
ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলেকটোরাল কলেজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছেন।
তিনি জনপ্রিয় ভোটে পিছিয়ে থাকলেও ইলেকটোরাল কলেজে জয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এটি ছিল আধুনিক মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় অঘটন।
বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম এটিকে “রাজনৈতিক ভূমিকম্প” বলে বর্ণনা করে।
কেন ট্রাম্প জিতলেন?
ট্রাম্পের বিজয় নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়—
- Rust Belt অঞ্চলে অপ্রত্যাশিত সমর্থন
- অর্থনৈতিক অসন্তোষ
- গ্রামীণ ভোটারদের উচ্চ উপস্থিতি
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যকর ব্যবহার
- রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের একাংশের অনাস্থা
- পরিবর্তনের প্রত্যাশা
তবে গবেষকদের মধ্যে এখনো এই বিজয়ের কারণ নিয়ে বিস্তর আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলমান।
হোয়াইট হাউসে প্রবেশ
২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন কয়েকজন প্রেসিডেন্টের একজন, যাঁদের আগে কোনো নির্বাচিত সরকারি বা সামরিক উচ্চপদে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না।
উদ্বোধনী ভাষণে তিনি আবারও “America First” নীতির ওপর জোর দেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর সামনে অপেক্ষা করছিল আরও বড় চ্যালেঞ্জ।
কর সংস্কার, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ, কোভিড-১৯ মহামারি, দুটি ইমপিচমেন্ট এবং বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অবস্থান—সব মিলিয়ে তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্সি হয়ে ওঠে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প (২০১৭–২০২১): নীতি, বিতর্ক এবং এক অভূতপূর্ব প্রেসিডেন্সি
২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার মাধ্যমে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু করেন।
এর আগে তিনি কখনো গভর্নর, সিনেটর, কংগ্রেসম্যান বা সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন না। একজন ব্যবসায়ী ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব থেকে সরাসরি বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাজনৈতিক পদে পৌঁছানো আধুনিক মার্কিন ইতিহাসে বিরল ঘটনা।
প্রথম দিন থেকেই তাঁর প্রশাসন প্রচলিত রাজনৈতিক ধারা থেকে ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। সমর্থকদের কাছে এটি ছিল “প্রতিষ্ঠানবিরোধী” (anti-establishment) নেতৃত্বের সূচনা, আর সমালোচকদের কাছে এটি ছিল মার্কিন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন।
প্রথম দিনেই নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শপথ গ্রহণের পরপরই ট্রাম্প একাধিক নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন।
তাঁর প্রশাসনের প্রথম দিকের অগ্রাধিকার ছিল—
- অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ
- সরকারি নিয়ন্ত্রণ (Regulation) কমানো
- কর হ্রাস
- উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানো
- জ্বালানি খাত সম্প্রসারণ
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি পুনর্বিবেচনা
তাঁর প্রশাসন যুক্তি দেয়, এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানকে শক্তিশালী করবে।
Tax Cuts and Jobs Act
২০১৭ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম বড় আইন ছিল Tax Cuts and Jobs Act।
এটি কয়েক দশকের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় কর সংস্কারের একটি।
এর মাধ্যমে—
- করপোরেট করের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়।
- ব্যক্তি আয়করের বিভিন্ন স্তরে পরিবর্তন আনা হয়।
- ব্যবসায়িক বিনিয়োগে উৎসাহ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
সমর্থকদের মতে—
- এতে ব্যবসায় বিনিয়োগ বেড়েছে।
- শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
- কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমালোচকদের মতে—
- এর বড় সুবিধা ধনী ব্যক্তি ও বড় করপোরেশনগুলো পেয়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদে বাজেট ঘাটতি বেড়েছে।
অর্থনীতি: শক্তিশালী সূচনা
কোভিড-১৯ মহামারির আগে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তুলনামূলক শক্তিশালী ছিল।
এই সময়—
- বেকারত্বের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়।
- শেয়ারবাজারে রেকর্ড উচ্চতা দেখা যায়।
- ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
- ব্যবসায়িক আস্থার উন্নতি হয়।
সমর্থকরা এসব অর্জনের কৃতিত্ব ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থনৈতিক নীতিকে দেন।
তবে অনেক অর্থনীতিবিদ উল্লেখ করেন, এই প্রবৃদ্ধির একটি অংশ ওবামা প্রশাসনের সময় শুরু হওয়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ধারাবাহিকতাও ছিল।
সীমান্ত প্রাচীর ও অভিবাসন নীতি
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সবচেয়ে আলোচিত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর একটি ছিল—
মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণ।
তাঁর যুক্তি ছিল—
- অবৈধ অভিবাসন কমানো,
- মাদক পাচার নিয়ন্ত্রণ,
- সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা।
এই প্রকল্পকে ঘিরে কংগ্রেসে দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধ দেখা দেয়।
এক পর্যায়ে বাজেট নিয়ে মতবিরোধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের দীর্ঘতম আংশিক সরকারি অচলাবস্থা (government shutdown) ঘটে।
প্রাচীরের কিছু অংশ নতুনভাবে নির্মিত হয় এবং অনেক অংশ সংস্কার করা হয়, তবে নির্বাচনী প্রচারণায় যে পরিমাণ নির্মাণের কথা বলা হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা (Travel Ban)
২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের নাগরিকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
প্রশাসনের যুক্তি ছিল—
এটি জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।
সমালোচকদের মতে—
এটি বৈষম্যমূলক এবং ধর্মীয়ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট ছিল।
বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়।
পরবর্তীতে সংশোধিত সংস্করণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বহাল রাখে।
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ
ট্রাম্প প্রশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ ছিল চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ।
তাঁর অভিযোগ ছিল—
- চীন অন্যায্য বাণিজ্য সুবিধা নিচ্ছে।
- মার্কিন প্রযুক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- উৎপাদনশিল্পের চাকরি বিদেশে চলে যাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র শত শত বিলিয়ন ডলারের চীনা পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে।
চীনও পাল্টা শুল্ক আরোপ করে।
সমর্থকদের মতে—
এটি যুক্তরাষ্ট্রের শিল্প রক্ষার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
সমালোচকদের মতে—
এতে কৃষক, আমদানিকারক এবং ভোক্তারা অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়েন।
“America First” পররাষ্ট্রনীতি
ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ছিল—
America First।
এই নীতির অধীনে তিনি—
- বহু আন্তর্জাতিক চুক্তি পুনর্বিবেচনা করেন।
- মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি জানান।
- বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে গুরুত্ব দেন।
এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত পররাষ্ট্রনীতির তুলনায় একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে বিবেচিত হয়।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে আলোচিত কূটনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি ছিল উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন-এর সঙ্গে বৈঠক।
২০১৮ সালে সিঙ্গাপুরে এবং পরে ভিয়েতনাম ও কোরীয় উপদ্বীপে তাঁদের একাধিক বৈঠক হয়।
এটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনো দায়িত্বে থাকা মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার নেতার সরাসরি বৈঠক।
যদিও দীর্ঘমেয়াদে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচিতে স্থায়ী পরিবর্তন আসেনি, তবুও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।
আব্রাহাম চুক্তি (Abraham Accords)
২০২০ সালে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায়—
- সংযুক্ত আরব আমিরাত,
- বাহরাইন,
- পরে মরক্কো ও সুদান
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়।
এই চুক্তিগুলো Abraham Accords নামে পরিচিত।
সমর্থকদের মতে—
এটি মধ্যপ্রাচ্যে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য।
অন্যদিকে সমালোচকরা বলেন—
ফিলিস্তিন ইস্যুর স্থায়ী সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এ অঞ্চলের সংঘাত পুরোপুরি দূর হবে না।
সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি নিয়োগ
ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনজন বিচারপতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দেন—
- Neil Gorsuch
- Brett Kavanaugh
- Amy Coney Barrett
এর ফলে সুপ্রিম কোর্টে রক্ষণশীল বিচারকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের আইন ও সামাজিক নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কোভিড-১৯ মহামারি
২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারি যুক্তরাষ্ট্রে বড় সংকট সৃষ্টি করে।
ট্রাম্প প্রশাসন—
- জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে,
- অর্থনৈতিক সহায়তা প্যাকেজে কাজ করে,
- ভ্যাকসিন উন্নয়নে Operation Warp Speed চালু করে।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে অল্প সময়ে একাধিক কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন উন্নয়ন ও বিতরণের পথ তৈরি হয়।
তবে মহামারির শুরুতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন, মাস্ক ব্যবহার, জনস্বাস্থ্যবিষয়ক বার্তা এবং প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
প্রথম ইমপিচমেন্ট
২০১৯ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রথম ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হয়।
অভিযোগ ছিল—
ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তার বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে নিজের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে তদন্তের চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা।
প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives) তাঁকে ইমপিচ করে।
কিন্তু সিনেটে প্রয়োজনীয় ভোট না পাওয়ায় তিনি দায়মুক্ত হন এবং পদে বহাল থাকেন।
২০২০ সালের নির্বাচন
২০২০ সালে ট্রাম্প পুনর্নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী জো বাইডেন।
নির্বাচনের প্রধান বিষয়গুলো ছিল—
- কোভিড-১৯
- অর্থনীতি
- স্বাস্থ্যনীতি
- বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন
- আইনশৃঙ্খলা
নভেম্বরের নির্বাচনে জো বাইডেন বিজয়ী হন।
দ্বিতীয় ইমপিচমেন্ট
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল ভবনে হামলার পর ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দ্বিতীয়বার ইমপিচমেন্ট আনা হয়।
অভিযোগ ছিল, তিনি তাঁর সমর্থকদের উসকে দিয়েছিলেন।
ট্রাম্প এই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
আবারও প্রতিনিধি পরিষদ তাঁকে ইমপিচ করে, কিন্তু সিনেটে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পাওয়ায় তিনি খালাস পান।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দুইবার ইমপিচড হলেও কোনোবারই সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হননি।
প্রেসিডেন্সির সমাপ্তি, কিন্তু রাজনৈতিক জীবনের নয়
২০২১ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময় অনেকেই ধারণা করেছিলেন, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার হয়তো শেষ হয়ে গেছে।
কিন্তু বাস্তবে ঠিক উল্টোটি ঘটে।
ক্ষমতা ছাড়ার পরও তিনি রিপাবলিকান পার্টির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে থেকে যান।
একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক আইনি মামলা শুরু হয়, অন্যদিকে লক্ষ লক্ষ সমর্থক তাঁকে আবারও প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখতে চান।
আর এই দুই সমান্তরাল বাস্তবতাই ২০২৪ সালের নির্বাচনের ভিত্তি তৈরি করে—যেখানে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও মার্কিন রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসেন।
(চলবে — Part 5)
ক্ষমতার বাইরে থেকেও রাজনীতির কেন্দ্রে: ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন ও দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সি
২০২১ সালের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউস ছাড়ার পর অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অধ্যায় হয়তো শেষ হয়ে গেছে। ক্যাপিটল হামলা, দ্বিতীয় ইমপিচমেন্ট এবং একাধিক আইনি তদন্তের কারণে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছরে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। রিপাবলিকান পার্টির বড় একটি অংশের সমর্থন ধরে রেখে ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে বিরল এক রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের নজির স্থাপন করেন।
২০২০ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
২০২০ সালের নির্বাচনে জো বাইডেন বিজয়ী হওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর প্রচারণা দল বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নির্বাচনের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করে।
তাঁদের অভিযোগ ছিল—
- কিছু অঙ্গরাজ্যে ভোট গণনায় অনিয়ম হয়েছে।
- ডাকযোগে (Mail-in) ভোট নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
- নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি ছিল।
এই অভিযোগের ভিত্তিতে বিভিন্ন আদালতে একাধিক মামলা করা হয়।
তবে অধিকাংশ মামলাই আদালতে খারিজ হয়ে যায় অথবা প্রয়োজনীয় প্রমাণের অভাবে সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচন কর্মকর্তা, বিচার বিভাগ এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের মূল্যায়ন ছিল যে, ফলাফল পরিবর্তন করার মতো ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর অনেক সমর্থক দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকেন। ফলে বিষয়টি মার্কিন রাজনীতিতে গভীর বিতর্কের অংশ হয়ে ওঠে।
৬ জানুয়ারি ২০২১: ক্যাপিটল ভবনের ঘটনা
২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইলেকটোরাল কলেজের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া চলছিল।
এর আগে ওয়াশিংটনে ট্রাম্প সমর্থকদের একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ট্রাম্প বক্তব্য রাখেন।
পরে সমাবেশের একটি অংশ ক্যাপিটল ভবনের দিকে অগ্রসর হয় এবং ভবনে প্রবেশ করে। এতে আইনপ্রণয়ন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
এই ঘটনায় কয়েকজনের মৃত্যু, বহু মানুষ আহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ঘটনাটি নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন
ঘটনাটিকে ঘিরে এখনো রাজনৈতিক মতভেদ রয়েছে।
- সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে উসকে দিয়েছিল।
- ট্রাম্প ও তাঁর আইনজীবীরা বারবার বলেছেন, তিনি শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং সহিংসতাকে সমর্থন করেননি।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ইমপিচমেন্ট আনা হয়, যদিও পরে সিনেটে তিনি খালাস পান।
ক্ষমতার বাইরে থেকেও রিপাবলিকান রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু
হোয়াইট হাউস ছাড়ার পরও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা রিপাবলিকান ভোটারদের একটি বড় অংশের মধ্যে অটুট থাকে।
অনেক প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পের সমর্থন (endorsement) পাওয়ার চেষ্টা করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২১–২০২৪ সময়কালে রিপাবলিকান পার্টির নীতিনির্ধারণ ও নির্বাচনী কৌশলে ট্রাম্পের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আইনি চ্যালেঞ্জ
২০২১ সালের পর ট্রাম্পকে ঘিরে একাধিক দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা শুরু হয়।
এর মধ্যে আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল—
- গোপন নথি (classified documents) সংরক্ষণ সংক্রান্ত তদন্ত
- ২০২০ সালের নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
- ব্যবসায়িক আর্থিক নথিপত্র
- নিউইয়র্কে ব্যবসায়িক রেকর্ড সংক্রান্ত মামলা
এসব মামলার কিছুতে আদালতের রায় হয়েছে, কিছু মামলার আপিল হয়েছে এবং কিছু বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া চলমান বা পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে এগুলোর চূড়ান্ত ফলাফল সময়ের সঙ্গে আরও পরিবর্তিত হতে পারে।
ট্রাম্প সবসময় দাবি করে আসছেন যে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অনেক মামলাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। অন্যদিকে তদন্তকারী সংস্থাগুলো বলেছে, তারা প্রচলিত আইনের ভিত্তিতেই তদন্ত পরিচালনা করেছে।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণা
২০২২ সালের শেষ দিকে ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
রিপাবলিকান প্রাইমারিতে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে ছিলেন—
- রন ডেস্যান্টিস
- নিকি হ্যালি
- ভিভেক রামাস্বামী
- ক্রিস ক্রিস্টি
প্রাইমারির বিভিন্ন ধাপে ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়ন নিশ্চিত করেন।
নির্বাচনের প্রধান ইস্যু
২০২৪ সালের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্ন ছিল—
- মূল্যস্ফীতি
- সীমান্ত নিরাপত্তা
- অবৈধ অভিবাসন
- অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
- ইউক্রেন যুদ্ধ
- মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি
- চীনের সঙ্গে সম্পর্ক
- জ্বালানি নীতি
ট্রাম্প তাঁর প্রচারণায় আবারও America First নীতিকে সামনে আনেন।
কমলা হ্যারিসের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী হন তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস।
নির্বাচনী প্রচারণায় উভয় প্রার্থী অর্থনীতি, অভিবাসন, গণতন্ত্র, পররাষ্ট্রনীতি এবং সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন।
প্রচারাভিযান ছিল সাম্প্রতিক মার্কিন ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল ও আলোচিত নির্বাচন।
২০২৪ সালের বিজয়
২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ইলেকটোরাল কলেজে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বিজয়ী হন।
এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ৪৫তম ও ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।
তিনি গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড-এর পর দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি অক্রমাগত (non-consecutive) দুই মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন।
এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে একটি ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন হিসেবে বিবেচিত হয়।
দ্বিতীয় মেয়াদের সূচনা
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন।
দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই তাঁর প্রশাসন কয়েকটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয়ে কাজ শুরু করে।
এর মধ্যে ছিল—
- সীমান্ত নিরাপত্তা আরও কঠোর করা
- অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন
- ফেডারেল প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ
- জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর নীতি
- শুল্ক ও বাণিজ্য নীতিতে পরিবর্তন
- সরকারি ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা
এগুলোর অনেকগুলোই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল।
পররাষ্ট্রনীতিতে নতুন অগ্রাধিকার
দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন আবারও America First নীতির ওপর জোর দেয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাঁদের মূল অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে ছিল—
- মিত্র দেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর আহ্বান
- চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা
- বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল পুনর্বিন্যাস
- মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত সম্পর্ক
- ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নতুন কূটনৈতিক অবস্থান
এসব নীতির প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ ও বিতর্ক চলতে থাকে।
দ্বিতীয় প্রেসিডেন্সিকে ঘিরে বিতর্ক
প্রথম মেয়াদের মতো দ্বিতীয় মেয়াদও শুরু থেকেই ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
সমর্থকদের মতে—
- তিনি দ্রুত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন।
- সীমান্ত নিরাপত্তা ও অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখেছেন।
সমালোচকদের মতে—
- তাঁর কিছু নীতি সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক তৈরি করেছে।
- নির্বাহী ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কের ধরনে পরিবর্তন এসেছে।
ফলে তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদও প্রথমটির মতোই গভীর রাজনৈতিক আলোচনা ও গবেষণার বিষয় হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য
ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য সম্ভবত তাঁর প্রত্যাবর্তন।
ব্যবসায়িক সংকট, নির্বাচনী পরাজয়, ইমপিচমেন্ট, আইনি মামলা এবং রাজনৈতিক বিতর্ক—এসবের পরও তিনি আবার যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে ফিরে আসেন।
এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, সমর্থকদের একটি বড় অংশের কাছে তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ নন; বরং একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতীক।
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর প্রত্যাবর্তন মার্কিন সমাজের বিদ্যমান রাজনৈতিক বিভাজনকেও আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
যে দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করা হোক না কেন, আধুনিক মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব যে দীর্ঘস্থায়ী হবে—সে বিষয়ে অধিকাংশ গবেষক একমত।
(চলবে — Part 6 | সমাপ্তি)
ব্যক্তিগত জীবন, উত্তরাধিকার ও বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাব
ব্যবসায়ী, টেলিভিশন তারকা এবং দুই মেয়াদে (অক্রমাগত) মার্কিন প্রেসিডেন্ট—ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচয় বহুস্তরবিশিষ্ট। তবে রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসায়িক দর্শন এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও সমানভাবে আলোচিত।
এই শেষ অধ্যায়ে তাঁর জীবনের মানবিক, পারিবারিক এবং ঐতিহাসিক দিকগুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
ব্যক্তিগত জীবন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের আলোচনায় রয়েছে।
তিনি মোট তিনবার বিয়ে করেছেন।
প্রথম স্ত্রী: ইভানা ট্রাম্প
১৯৭৭ সালে ট্রাম্প চেক বংশোদ্ভূত ব্যবসায়ী ও মডেল ইভানা ট্রাম্পকে বিয়ে করেন।
তাঁদের তিন সন্তান—
- ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র
- ইভাঙ্কা ট্রাম্প
- এরিক ট্রাম্প
১৯৯২ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
দ্বিতীয় স্ত্রী: মার্লা ম্যাপলস
১৯৯৩ সালে অভিনেত্রী মার্লা ম্যাপলসকে বিয়ে করেন।
তাঁদের একমাত্র কন্যা—
টিফানি ট্রাম্প
১৯৯৯ সালে তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়।
তৃতীয় স্ত্রী: মেলানিয়া ট্রাম্প
২০০৫ সালে ট্রাম্প স্লোভেনিয়ায় জন্মগ্রহণকারী সাবেক মডেল মেলানিয়া ট্রাম্পকে বিয়ে করেন।
তাঁদের ছেলে—
ব্যারন ট্রাম্প
মেলানিয়া ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি হিসেবে শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগে কাজ করেন।
সন্তানদের ভূমিকা
ট্রাম্পের বড় সন্তানরা বহু বছর ধরে পারিবারিক ব্যবসায় যুক্ত।
বিশেষ করে—
- Donald Trump Jr.
- Eric Trump
Trump Organization-এর বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন।
অন্যদিকে Ivanka Trump প্রথম প্রেসিডেন্সির সময় হোয়াইট হাউসে উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন।
জীবনযাপন ও আগ্রহ
ট্রাম্প নিজেকে একজন কর্মপাগল ব্যবসায়ী হিসেবে তুলে ধরেন।
তাঁর কয়েকটি পরিচিত অভ্যাস—
- ভোরে কাজ শুরু করা
- দীর্ঘ বৈঠক করা
- সংবাদমাধ্যম নিবিড়ভাবে অনুসরণ করা
- গলফ খেলা
- ব্যবসায়িক বৈঠক ও জনসমাবেশে সক্রিয় থাকা
তাঁর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ে বিলাসবহুল হোটেল, গলফ রিসোর্ট এবং আকাশচুম্বী ভবনের বিশেষ স্থান রয়েছে।
ব্যবসায়িক উত্তরাধিকার
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবসায়িক ক্যারিয়ার কয়েকটি কারণে অনন্য।
তিনি শুধু ভবন নির্মাণ করেননি।
তিনি নিজের নামকেও একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেন।
Trump Organization-এর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে—
- হোটেল
- আবাসিক ভবন
- অফিস টাওয়ার
- গলফ রিসোর্ট
- লাইসেন্সিং ব্যবসা
পরিচালিত হয়েছে।
সমর্থকদের মতে, তিনি ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার অন্যতম সফল উদাহরণ।
সমালোচকদের মতে, তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি ঋণ, মামলা এবং আর্থিক পুনর্গঠনও তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাজনৈতিক দর্শন
ট্রাম্পের রাজনৈতিক দর্শনের কয়েকটি মূল স্তম্ভ—
- America First
- সীমান্ত নিরাপত্তা
- অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ
- অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ
- কর হ্রাস
- নিয়ন্ত্রণ (Regulation) কমানো
- উৎপাদনশিল্পে বিনিয়োগ
- শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা
এই নীতিগুলো রিপাবলিকান রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক এবং নতুন সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি করেছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব
ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তাঁর সময়ে—
- চীনের সঙ্গে বাণিজ্য প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পায়।
- ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে বিতর্ক বাড়ে।
- মধ্যপ্রাচ্যে Abraham Accords স্বাক্ষরিত হয়।
- উত্তর কোরিয়ার নেতার সঙ্গে ঐতিহাসিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
- বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়।
দ্বিতীয় মেয়াদেও তাঁর নীতিগুলো বিশ্ব অর্থনীতি ও কূটনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলছে।
সমর্থকদের মূল্যায়ন
ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে তিনি—
- প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে সফল নেতৃত্ব দিয়েছেন।
- যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
- সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করেছেন।
- আন্তর্জাতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান শক্তিশালী করেছেন।
- সাধারণ ভোটারদের উদ্বেগকে মূলধারার রাজনীতিতে তুলে এনেছেন।
অনেক সমর্থকের কাছে MAGA শুধু একটি স্লোগান নয়; এটি একটি রাজনৈতিক পরিচয়।
সমালোচকদের মূল্যায়ন
অন্যদিকে সমালোচকদের মতে—
- তাঁর বক্তব্য অনেক সময় সমাজে মেরুকরণ বাড়িয়েছে।
- সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ভাষা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
- নির্বাচন-পরবর্তী বক্তব্য রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছে।
- কিছু নীতি আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ককে জটিল করেছে।
- প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রথাগত কূটনৈতিক রীতিনীতি থেকে সরে এসেছেন।
এই সমালোচনাগুলোও ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সম্মাননা ও স্বীকৃতি
ট্রাম্প মূলত তাঁর ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য পরিচিত।
তাঁর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ব্যবসা, রিয়েল এস্টেট ও টেলিভিশন খাতে স্বীকৃতি পেলেও, তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে ঘিরে প্রশংসা ও সমালোচনা—উভয়ই সমানভাবে আলোচিত।
এক নজরে টাইমলাইন
- ১৯৪৬ — নিউইয়র্কের কুইন্সে জন্ম।
- ১৯৬৮ — Wharton School থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক।
- ১৯৭১ — পারিবারিক ব্যবসার নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা।
- ১৯৮০ — Grand Hyatt প্রকল্পে বড় সাফল্য।
- ১৯৮৩ — Trump Tower উদ্বোধন।
- ১৯৮৭ — The Art of the Deal প্রকাশ।
- ২০০৪ — The Apprentice শুরু।
- ২০১৫ — প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা ঘোষণা।
- ২০১৬ — যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।
- ২০১৭ — প্রথমবার শপথ গ্রহণ।
- ২০১৯ — প্রথম ইমপিচমেন্ট।
- ২০২০ — কোভিড-১৯ মহামারি; নির্বাচনে পরাজয়।
- ২০২১ — দ্বিতীয় ইমপিচমেন্ট; হোয়াইট হাউস ত্যাগ।
- ২০২৪ — পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত।
- ২০২৫ — যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বার শপথ।
সংক্ষিপ্ত FAQ
ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুরো নাম কী?
ডোনাল্ড জন ট্রাম্প (Donald John Trump)।
তিনি কতবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন?
দুইবার—২০১৭–২০২১ এবং ২০২৫ সাল থেকে শুরু হওয়া দ্বিতীয় (অক্রমাগত) মেয়াদে।
তিনি কোন রাজনৈতিক দলের নেতা?
রিপাবলিকান পার্টি।
তাঁর বিখ্যাত রাজনৈতিক স্লোগান কী?
Make America Great Again (MAGA)।
ট্রাম্প কি ব্যবসায়ী ছিলেন?
হ্যাঁ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি মূলত রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
উপসংহার
ডোনাল্ড ট্রাম্প আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। ব্যবসায়ী হিসেবে তাঁর উত্থান, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড নির্মাণ, টেলিভিশন তারকা হিসেবে জনপ্রিয়তা এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়া—সব মিলিয়ে তাঁর জীবন সমসাময়িক ইতিহাসের একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায়।
তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নেতা, যিনি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থেকে এসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর নেতৃত্বের ধরন, রাজনৈতিক ভাষা এবং কিছু নীতি যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও গভীর করেছে।
তবে একটি বিষয় নিয়ে প্রায় সবাই একমত—ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বাদ দিয়ে ২১শ শতকের মার্কিন রাজনীতি, বৈশ্বিক কূটনীতি এবং রাজনৈতিক যোগাযোগের ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। তিনি শুধু একজন প্রেসিডেন্ট নন; তিনি এমন এক রাজনৈতিক ঘটনা, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতির নানা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন আলোচিত হবে।

12 thoughts on “ডোনাল্ড ট্রাম্প: ব্যবসায়ী থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট—এক বিতর্কিত ও প্রভাবশালী জীবনের শুরু”