ভারতে ককরোচ আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

প্রশ্নফাঁস ও বেকারত্বের প্রতিবাদে ভারতের তরুণদের ‘ককরোচ’ আন্দোলন নতুন রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে।

প্রশ্নফাঁস ও বেকারত্বের ক্ষোভ থেকে ভারতে তৈরি হওয়া ‘ককরোচ’ আন্দোলন এখন বিজেপির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। তরুণদের এই আন্দোলন কি বদলে দিচ্ছে মোদি সরকারের রাজনৈতিক কৌশল?

১৯-ই আগস্ট ২০২৬ বাজলেন্স আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভারতে শিক্ষার্থীদের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) ঘিরে তৈরি আন্দোলন এখন ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব ও তরুণদের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ইতোমধ্যে রাজপথে বড় আকার নিয়েছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইনস্টাগ্রামে সিজেপির যাত্রা শুরু হয়। পরে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে ধারাবাহিক ছাত্র আন্দোলনে রূপ নেয়।

টানা সাত সপ্তাহের বিক্ষোভের পর দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগও আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করেছে।

আরও পড়ুন : দেশের ভবিষ্যতের চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ত্বক বেশি উজ্জ্বল’—মোদিকে কটাক্ষ দিপকের

ইনস্টাগ্রাম থেকে রাজপথে ‘ককরোচ’ আন্দোলন

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দল নয়। বরং শিক্ষার্থীদের তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যা তরুণদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের একটি প্রতীকী মঞ্চে পরিণত হয়েছে।

প্রশ্নফাঁস ও কর্মসংস্থানের সংকটের মতো বিষয়কে সামনে রেখে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে অনলাইন কার্যক্রম সরাসরি বিক্ষোভে রূপ নেয়।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এটি প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে তরুণদের বিভিন্ন অংশকে এক জায়গায় আনার চেষ্টা করেছে।

আরও পড়ুন : Cockroach Janta Party (CJP)-এর সংসদ অভিযান ঘিরে কড়া বার্তা, ১৬৩ BNSS জারি

বিজেপির শক্ত ঘাঁটিতেও ধাক্কা?

আন্দোলনের প্রভাব নিয়ে আলোচনার আরেকটি কারণ সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল।

আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিহারের বাঁকিপুর বিধানসভা কেন্দ্রের মতো বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতেও দলটি পরাজয়ের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি উপনির্বাচনের ফলাফলও তরুণ ভোটারদের মধ্যে শাসক দলের প্রতি অসন্তোষের ইঙ্গিত দিয়েছে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

তবে এসব নির্বাচনী ফলাফলকে শুধুমাত্র ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় রাজনৈতিক কারণও নির্বাচনের ফলাফলে ভূমিকা রাখে।

তারপরও আন্দোলনটি বিজেপির সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক অসন্তোষকে কীভাবে মোকাবিলা করবে দলটি?

আরও পড়ুন : আন্দোলনের উত্তাপে নতুন কৌশল মোদির! মন্ত্রীদের ইনস্টাগ্রামে ‘রিলস’ বানানোর নির্দেশ

মোদির সোশ্যাল মিডিয়া কৌশলও কি কাজে আসছে না?

তরুণদের কাছে পৌঁছাতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন।

‘ককরোচ’ আন্দোলনের সময়ও ইনস্টাগ্রামে সেলফি-ভিডিওসহ বিভিন্ন প্রচারণামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু তরুণদের প্রতিক্রিয়া ছিল মিশ্র। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্তদের একটি অংশ এসব প্রচারণাকে যথেষ্ট মনে করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এর কারণ শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তরুণদের সামনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলো—বিশেষ করে চাকরি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব ইস্যুতে রাজনৈতিক বার্তার কার্যকারিতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পুরোনো কৌশল কি আর কাজ করছে না?

বিজেপির জন্য আন্দোলনটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই।

অতীতে সরকারবিরোধী অনেক আন্দোলনকে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা আদর্শিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে মোকাবিলা করার সুযোগ ছিল। কিন্তু ‘ককরোচ’ আন্দোলনের ক্ষেত্রে সেই প্রচলিত বিভাজন তুলনামূলকভাবে কঠিন।

কারণ এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তরুণদের দৈনন্দিন উদ্বেগ—পরীক্ষা, চাকরি এবং ভবিষ্যৎ।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলন প্রচলিত রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে শুধু আদর্শিক পাল্টা প্রচারণা দিয়ে এর প্রভাব কমানো কঠিন হতে পারে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কি রাজনৈতিক দল হবে?

এখনই এমন কোনো ইঙ্গিত নেই যে সিজেপি প্রচলিত রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনী রাজনীতিতে নামছে।

বরং বিশ্লেষকদের ধারণা, প্ল্যাটফর্মটি সরাসরি রাজনৈতিক দল না হলেও এর তৈরি করা চাপ জাতীয় রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে বিরোধী দলগুলো যদি তরুণদের চাকরি, পরীক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষাবিষয়ক অসন্তোষকে রাজনৈতিক এজেন্ডায় আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে, তাহলে সিজেপির আন্দোলনের প্রভাব নির্বাচনী রাজনীতিতেও দেখা যেতে পারে।

বিজেপির সামনে এখন বড় প্রশ্ন

বিজেপি তাদের হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শিক অবস্থান থেকে সরে যাবে—এমন কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। তবে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের ধরনে পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা দলটি উপলব্ধি করছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।

এখানে বিজেপির জন্য চ্যালেঞ্জ দুটি।

একদিকে নিজেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক ভিত্তি ধরে রাখা, অন্যদিকে দ্রুত বদলে যাওয়া তরুণ ভোটারদের কাছে নতুন করে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা।

‘ককরোচ’ আন্দোলন শেষ পর্যন্ত একটি সাময়িক ছাত্র আন্দোলন হয়ে থাকবে, নাকি ভারতের তরুণ রাজনীতির নতুন প্রতীকে পরিণত হবে—তা এখনই নিশ্চিত নয়।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: ভারতের রাজনীতিতে জেন-জি প্রজন্মের ক্ষোভকে আর সহজে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *