তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে বীণা সিক্রির মন্তব্য

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ও শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু নিয়ে নতুন করে কূটনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করায় ঢাকার অবস্থানকে ‘রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি। সফর ঘিরে বাড়ছে কূটনৈতিক টানাপোড়েন।

১৯-ই আগস্ট, ২০২৬ | বাজলেন্স ডেস্ক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির টানাপোড়েনের মধ্যে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সফরের পরিবেশ তৈরির সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়টি যুক্ত করায় বাংলাদেশের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে ‘অত্যন্ত রূঢ়’ ও ‘অহংকারী’ বলে মন্তব্য করেন।

বীণা সিক্রির বক্তব্য এমন সময়ে এলো, যখন তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ চললেও এখনো কোনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হয়নি।

আরও পড়ুন : তারেক রহমান ভারতে না গেলে ‘সুযোগ হারাবে’, বন্ধ হতে পারে যোগাযোগের পথ: সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক

সফরের সঙ্গে হাসিনার প্রত্যর্পণ কেন জড়াল?

বীণা সিক্রির আপত্তির মূল জায়গা হলো—একটি দ্বিপক্ষীয় রাজনৈতিক সফরের সঙ্গে শেখ হাসিনা -এর প্রত্যর্পণের মতো দীর্ঘমেয়াদি আইনি প্রক্রিয়াকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করা।

তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ধরনের বক্তব্য দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির স্বাভাবিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ যদি দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিষয় হয়, তাহলে সেটিকে তারেক রহমানের ভারত সফরের সঙ্গে যুক্ত করার যৌক্তিকতা কোথায়?

বীণা সিক্রির ভাষ্য অনুযায়ী, প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। তাই এটিকে সফরের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখালে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগই বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আরও পড়ুন : ভারতে বিক্ষোভ, তবু তারেক রহমানকে মোদির আমন্ত্রণ—BRICS ঘিরে কী বার্তা দিচ্ছে দিল্লি?

‘ভারতকে প্রথম সফরের আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল’

সাবেক এই ভারতীয় কূটনীতিক আরও দাবি করেন, তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

ভারতের প্রত্যাশা ছিল, তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে নয়াদিল্লিকে বেছে নেবেন।

কিন্তু বীণা সিক্রির বক্তব্য অনুযায়ী, ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও ওই আমন্ত্রণের আনুষ্ঠানিক জবাব ঢাকা দেয়নি। কয়েক সপ্তাহ আগে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য দ্বিতীয় আমন্ত্রণের বিষয়েও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি বলে তিনি দাবি করেন।

এ কারণেই তিনি মনে করেন, সফরটি নিয়ে ঢাকার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন : দিল্লির ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমান কি যাচ্ছেন না? ঢাকা–দিল্লি টানাপোড়েনে নতুন সমীকরণ

ঢাকার অবস্থান কী?

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম সম্প্রতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের পরিবেশ তৈরিতে ভারতকে শেখ হাসিনাসহ পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঢাকার পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার একটি প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

বাংলাদেশের বক্তব্য অনুযায়ী, এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধ না হলে তারেক রহমানের সফরের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ তৈরি করা কঠিন হতে পারে।

তবে ভারত সরকার জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। ভারতের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি একটি বেসরকারি গণমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল।

আরও পড়ুন : শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ না হলে তারেক রহমানের ভারত সফর নয়: নাহিদ

বীণা সিক্রির আপত্তি কোথায়?

বীণা সিক্রি মনে করেন, দুই দেশের সরকার যখন সফরের তারিখ চূড়ান্ত করার জন্য আলোচনা চালাচ্ছে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য চাপ বা শর্তারোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

তার মতে, সফরটি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ হলে ঢাকা ও নয়াদিল্লির উচিত প্রকাশ্য বক্তব্যের বদলে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনাকে অগ্রাধিকার দেওয়া

অর্থাৎ, বীণা সিক্রির বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন—রাজনৈতিক সফর এবং প্রত্যর্পণের আইনি প্রক্রিয়াকে কি একই সমীকরণে রাখা উচিত?

হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে ঢাকার চাপ

২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা ও দণ্ডের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

ঢাকা ভারতের কাছে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে শহীদ শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদেরও হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।

ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর এখন শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় সফরের বিষয় নয়; এর সঙ্গে প্রত্যর্পণ, বিচার, রাজনৈতিক আস্থা এবং দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎও জড়িয়ে গেছে।

সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত নয়

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শহীদুল করিম জানিয়েছেন, তারেক রহমানের ভারত সফর নিয়ে নয়াদিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

এ অবস্থায় বীণা সিক্রির মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

একদিকে ঢাকা চাইছে, সফরের আগে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ কয়েকটি বিষয়ে ভারতের কাছ থেকে দৃশ্যমান পদক্ষেপ। অন্যদিকে ভারতের সাবেক এই কূটনীতিক বলছেন, এমন শর্তারোপ কূটনৈতিকভাবে অপ্রয়োজনীয় এবং ‘রূঢ়’।

ফলে প্রশ্ন এখন একটাই—তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর কি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সুযোগ হবে, নাকি শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুই সেটিকে আরও কঠিন করে তুলবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *