বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে BRICS-এর ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে তুলে ধরা প্রতীকী চিত্র।
BRICS কী, কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন বিশ্বজুড়ে এত আলোচনা?
বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলে কয়েক বছর আগেও যে কয়েকটি নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যেত, তার মধ্যে ছিল G7, NATO, IMF বা World Bank। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরেকটি সংক্ষিপ্ত নাম দ্রুত আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে—BRICS।
কেউ একে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র বলছেন, কেউ পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ মনে করছেন, BRICS মূলত উদীয়মান অর্থনীতির একটি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম, যার ভূমিকা সময়ের সঙ্গে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—BRICS নিয়ে আলোচনা যত বাড়ছে, বিভ্রান্তিও তত বাড়ছে।
অনেকে মনে করেন BRICS একটি সামরিক জোট। কেউ আবার বিশ্বাস করেন এটি G7-এর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী। আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন দাবি দেখা যায় যে BRICS খুব শিগগিরই মার্কিন ডলারকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে।
বাস্তবতা কি সত্যিই এমন?
এই পূর্ণাঙ্গ Explainer-এ আমরা BRICS সম্পর্কে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তথ্যভিত্তিক, নিরপেক্ষ ও সহজ ভাষায় জানব। এর ইতিহাস, কাঠামো, উদ্দেশ্য, সদস্য দেশ, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, বৈশ্বিক প্রভাব, সমালোচনা, প্রচলিত ভুল ধারণা এবং বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাব্য তাৎপর্য—সবকিছুই ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হবে।
BRICS কী?
BRICS হলো বিশ্বের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতির (Emerging Economies) একটি আন্তঃসরকারি সহযোগিতা প্ল্যাটফর্ম।
এটি কোনো সামরিক জোট নয়, কোনো মুক্তবাণিজ্য অঞ্চলও নয়। বরং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থনীতি, উন্নয়ন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি বহুপাক্ষিক ফোরাম।
বর্তমানে BRICS -এর সদস্যসংখ্যা আগের তুলনায় বেড়েছে। জোটটি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে, যার ফলে এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে।
তবে BRICS-এর মূল পরিচয় এখনো একই—উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতার একটি প্ল্যাটফর্ম।
BRICS নামের অর্থ কী?
BRICS নামটি পাঁচটি ইংরেজি অক্ষরের সমন্বয়ে তৈরি।
প্রথমদিকে এটি ছিল BRIC, যার অর্থ—
- B – Brazil
- R – Russia
- I – India
- C – China
পরবর্তীতে South Africa যোগ দেওয়ার পর নামের শেষে S যুক্ত হয় এবং জোটটির নাম হয় BRICS।
আজ সদস্যসংখ্যা বাড়লেও ঐতিহাসিক ও আন্তর্জাতিক পরিচয়ের কারণে BRICS নামটিই বহাল রয়েছে।
BRICS কি কোনো চুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা?
না।
এটি জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) বা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) -এর মতো চুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়।
BRICS -এর কোনো একক সংবিধান নেই, কোনো স্থায়ী সংসদ নেই এবং সদস্যদের ওপর বাধ্যতামূলক আইনও প্রযোজ্য হয় না।
বরং এটি নিয়মিত শীর্ষ সম্মেলন, মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক, বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনা এবং যৌথ ঘোষণার মাধ্যমে পরিচালিত একটি সহযোগিতামূলক কাঠামো।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকেরা BRICS -কে প্রায়ই informal intergovernmental grouping বা cooperation forum হিসেবে বর্ণনা করেন।
BRICS কেন তৈরি করা হয়েছিল?
বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে উন্নত শিল্পোন্নত দেশগুলোর প্রভাব বেশি ছিল।
কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের মতো দেশগুলো দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে শুরু করে।
এতে একটি প্রশ্ন সামনে আসে—
বিশ্ব অর্থনীতির বড় অংশ যদি উদীয়মান দেশগুলো থেকে আসে, তাহলে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণেও কি তাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়া উচিত নয়?
এই প্রেক্ষাপট থেকেই BRICS -এর ধারণা বাস্তব রূপ নিতে শুরু করে।
এর প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো।
- অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
- অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন।
- বহুপাক্ষিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ।
- বৈশ্বিক উন্নয়ন ইস্যুতে সমন্বিত অবস্থান গড়ে তোলা।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
BRICS প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ছিল না। বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোই ছিল এর সূচনালগ্নের প্রধান লক্ষ্য।
কেন BRICS এত আলোচনায়?
গত কয়েক বছরে BRICS নিয়ে আন্তর্জাতিক আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, জোটটির সম্প্রসারণ।
দ্বিতীয়ত, সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব।
তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো নিয়ে চলমান বিতর্ক।
চতুর্থত, Global South নামে পরিচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রবণতা।
পঞ্চমত, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা।
এই সব কারণ মিলিয়ে BRICS এখন কেবল একটি অর্থনৈতিক শব্দ নয়; বরং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম আলোচিত বিষয়।
BRICS নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
BRICS নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন আলোচনায় কিছু ভুল ধারণা প্রায়ই দেখা যায়।
ভুল ধারণা ১: BRICS একটি সামরিক জোট
বাস্তবতা: না। BRICS কোনো সামরিক জোট নয় এবং এর NATO-এর মতো যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই।
ভুল ধারণা ২: BRICS বিশ্ব সরকার তৈরি করছে
বাস্তবতা: এমন কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা বা কাঠামো নেই।
ভুল ধারণা ৩: BRICS ইতোমধ্যে ডলারের বিকল্প চালু করেছে
বাস্তবতা: সদস্য দেশগুলো কিছু ক্ষেত্রে নিজস্ব মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে, তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলার এখনও প্রধান রিজার্ভ ও লেনদেনের মুদ্রা।
ভুল ধারণা ৪: BRICS ও G7 একই ধরনের জোট
বাস্তবতা: দুটি জোটের ইতিহাস, কাঠামো, উদ্দেশ্য এবং কার্যপদ্ধতি এক নয়। পরবর্তী অংশে এ বিষয়টি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হবে।
এই Explainer-এ কী কী জানা যাবে?
এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশগুলোতে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হবে—
- BRICS-এর জন্মের ইতিহাস
- কীভাবে একটি অর্থনৈতিক ধারণা বাস্তব জোটে পরিণত হলো
- সদস্য দেশ ও সম্প্রসারণ
- BRICS কীভাবে পরিচালিত হয়
- New Development Bank (NDB)
- Contingent Reserve Arrangement (CRA)
- BRICS ও Global South
- BRICS বনাম G7: মৌলিক পার্থক্য
- De-dollarization বিতর্ক
- BRICS-এর সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা
- বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্য
- FAQ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
এই ধারাবাহিক আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো পক্ষকে সমর্থন বা সমালোচনা করা নয়। বরং বিশ্বজুড়ে আলোচিত এই জোট সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং আন্তর্জাতিক গবেষণার ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ধারণা দেওয়া।
BRICS-এর জন্মের ইতিহাস—একটি অর্থনৈতিক ধারণা থেকে বৈশ্বিক জোটে রূপান্তর
আগের অংশে আমরা জেনেছি BRICS কী, কেন এটি গঠিত হয়েছিল এবং কেন আজ এটি আন্তর্জাতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু BRICS -এর প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে হলে এর জন্মের ইতিহাস জানা জরুরি।
কারণ আজ যে BRICS -কে অনেকেই একটি প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক জোট হিসেবে দেখেন, তার শুরুটা মোটেও রাজনৈতিক ছিল না। বরং এটি ছিল ভবিষ্যৎ বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে করা একটি গবেষণার ফল।
২০০১: একটি গবেষণাপত্রের মাধ্যমে BRIC-এর জন্ম
BRICS-এর ইতিহাস শুরু হয় ২০০১ সালে।
সেই বছর আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Goldman Sachs-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ Jim O’Neill একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, যার শিরোনাম ছিল “Building Better Global Economic BRICs”।
এই গবেষণায় তিনি যুক্তি দেন, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত এবং চীনের অর্থনীতি আগামী কয়েক দশকে এত দ্রুত বাড়তে পারে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাবে।
এই চার দেশের নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে তিনি BRIC শব্দটি তৈরি করেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
BRIC তখন কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক জোট ছিল না। এটি ছিল ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি একটি বিশ্লেষণাত্মক ধারণা।

কেন এই চারটি দেশ?
Jim O’Neill-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চার দেশের মধ্যে কিছু মিল ছিল, যা তাদের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করেছিল।
এর মধ্যে ছিল—
- বড় জনসংখ্যা
- দ্রুত শিল্পায়ন
- বিস্তৃত অভ্যন্তরীণ বাজার
- প্রাকৃতিক সম্পদ
- ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাড়তি অংশগ্রহণ
তখনকার অনেক বিশ্লেষকের কাছেই এই পূর্বাভাস সাহসী মনে হয়েছিল।
কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে বিশেষ করে চীন ও ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি BRIC ধারণাকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
গবেষণা থেকে বাস্তব কূটনীতিতে
২০০১ সালের পর BRIC শব্দটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
এরপর সংশ্লিষ্ট চার দেশের নীতিনির্ধারকেরাও বুঝতে শুরু করেন যে, শুধু অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নয়—আন্তর্জাতিক মঞ্চেও তাদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় উপকারী হতে পারে।
২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।
এই বৈঠককে অনেক গবেষক BRIC -এর কূটনৈতিক যাত্রার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করেন।
প্রথম BRIC শীর্ষ সম্মেলন
২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গ শহরে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম BRIC শীর্ষ সম্মেলন।
এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
কারণ প্রথমবারের মতো চার দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা একই প্ল্যাটফর্মে বৈশ্বিক অর্থনীতি, আর্থিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়ন নিয়ে যৌথভাবে আলোচনা করেন।
এই সম্মেলনের পর BRIC আর শুধু একটি অর্থনৈতিক শব্দ থাকেনি; এটি বাস্তব আন্তর্জাতিক সহযোগিতার একটি কাঠামোতে রূপ নিতে শুরু করে।
দক্ষিণ আফ্রিকা কেন যোগ দিল?
২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জোটে আমন্ত্রণ জানানো হয়।
২০১১ সাল থেকে দেশটি পূর্ণ সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ শুরু করে।
এরপর BRIC-এর সঙ্গে South Africa-এর S যুক্ত হয়ে নাম হয় BRICS।
দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তর্ভুক্তির পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল—
- আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
- উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য বাড়ানো।
- আফ্রিকার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করা।
- বৈশ্বিক দক্ষিণের (Global South) কণ্ঠস্বর আরও বিস্তৃত করা।
অর্থনীতির আকারের দিক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকা অন্য চার সদস্যের তুলনায় ছোট হলেও, আফ্রিকা মহাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি হিসেবে এর উপস্থিতি BRICS-এর বৈশ্বিক পরিচিতি বাড়ায়।
বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের প্রভাব
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট BRICS -এর গুরুত্ব বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখে।
এই সংকটের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি প্রশ্ন জোরালো হয়ে ওঠে—
বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব কি কেবল উন্নত দেশগুলোর হাতেই থাকবে, নাকি উদীয়মান অর্থনীতিগুলোকেও আরও বড় ভূমিকা দিতে হবে?
BRICS-এর সদস্য দেশগুলো মনে করেছিল—
- আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো দরকার।
- বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া উচিত।
- উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি করা প্রয়োজন।
এই অবস্থান পরবর্তী বছরগুলোতে BRICS-এর অন্যতম প্রধান নীতিগত আলোচনায় পরিণত হয়।
BRICS কি শুরু থেকেই G7-এর বিকল্প ছিল?
এটি সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্নগুলোর একটি।
সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—না।
BRICS গঠনের শুরুতে এর ঘোষিত লক্ষ্য ছিল না G7 -কে প্রতিস্থাপন করা।
বরং লক্ষ্য ছিল—
- উদীয়মান অর্থনীতির মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি,
- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থায় সংস্কারের দাবি,
- উন্নয়ন সহযোগিতা জোরদার করা,
- এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে আরও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তি এবং বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্কের কারণে অনেক বিশ্লেষক BRICS-কে G7-এর একটি বিকল্প শক্তিকেন্দ্র হিসেবে আলোচনা করতে শুরু করেন।
এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি; BRICS-এর আনুষ্ঠানিক ঘোষিত উদ্দেশ্য নয়।

BRICS-এর সম্প্রসারণ: একটি নতুন অধ্যায়
প্রথম এক দশকেরও বেশি সময় BRICS পাঁচ সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশ সদস্য হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করতে শুরু করে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ শীর্ষ সম্মেলনের পর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এর মাধ্যমে BRICS শুধু সদস্যসংখ্যায় নয়, ভৌগোলিক উপস্থিতি, জ্বালানি সম্পদ, বাণিজ্যিক সক্ষমতা এবং কৌশলগত গুরুত্বেও আরও বিস্তৃত হয়।
কোন কোন দেশ যোগ দিয়েছে, সম্প্রসারণ কীভাবে হয় এবং সদস্যপদের প্রক্রিয়া কী—এসব বিষয় পরবর্তী অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
ইতিহাস থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
BRICS-এর জন্ম কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে শুরু হয়নি।
এটি প্রথমে ছিল একটি অর্থনৈতিক পূর্বাভাস।
তারপর তা কূটনৈতিক সহযোগিতায় রূপ নেয়।
পরে উন্নয়ন অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব, বাণিজ্য, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক নীতিগত সমন্বয়ের একটি প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।
এই বিবর্তনই BRICS -কে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার বিষয় করে তুলেছে।
আর ঠিক এই কারণেই BRICS -কে বোঝার জন্য শুধু বর্তমান নয়, এর ঐতিহাসিক যাত্রাপথও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
BRICS কীভাবে পরিচালিত হয়? সদস্য দেশ, সম্প্রসারণ, New Development Bank (NDB) ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া
আগের অংশে আমরা দেখেছি, BRICS-এর জন্ম একটি অর্থনৈতিক গবেষণাপত্র থেকে হলেও সময়ের সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে—এত ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনীতি ও আঞ্চলিক স্বার্থসম্পন্ন দেশগুলো কীভাবে একসঙ্গে কাজ করে?
এই অংশে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হবে।
বর্তমানে BRICS-এর সদস্য কারা?
BRICS-এর মূল সদস্য ছিল পাঁচটি দেশ—
- ব্রাজিল
- রাশিয়া
- ভারত
- চীন
- দক্ষিণ আফ্রিকা
পরবর্তীতে জোটটি সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয় এবং নতুন সদস্য যুক্ত হতে শুরু করে।
২০২৪ সাল থেকে পূর্ণ সদস্য হিসেবে যোগ দেয়:
- মিশর (Egypt)
- ইথিওপিয়া (Ethiopia)
- ইরান (Iran)
- সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates)
এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ২০২৫ সালে পূর্ণ সদস্যপদ লাভ করে, যা BRICS -এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিসর আরও বিস্তৃত করে।
দ্রষ্টব্য: বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকটি দেশ BRICS -এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব বা সদস্যপদে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে আগ্রহ প্রকাশ, অংশীদার রাষ্ট্র (Partner Country) এবং পূর্ণ সদস্যপদ—এই তিনটি বিষয় এক নয়। তাই সর্বশেষ সরকারি ঘোষণার ভিত্তিতে সদস্যসংখ্যা বিবেচনা করা উচিত।
নতুন সদস্য কীভাবে যুক্ত হয়?
BRICS-এর কোনো উন্মুক্ত সদস্যপদ আবেদন ব্যবস্থা নেই।
নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় এবং সাধারণভাবে ঐকমত্য (Consensus) ভিত্তিক সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়।
বিবেচনায় আসতে পারে—
- আন্তর্জাতিক ভূমিকা
- অর্থনৈতিক সক্ষমতা
- আঞ্চলিক গুরুত্ব
- বহুপাক্ষিক সহযোগিতার আগ্রহ
- BRICS-এর উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য
এ কারণে সদস্যপদ শুধু অর্থনীতির আকারের ওপর নির্ভর করে না; কূটনৈতিক ও কৌশলগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
BRICS -এর কোনো সদর দপ্তর আছে?
এখানে একটি বিষয় অনেকেই ভুল বোঝেন।
BRICS -এর নিজস্ব কোনো কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর বা স্থায়ী সচিবালয় নেই, যেমনটি জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
বরং এটি একটি বিকেন্দ্রীভূত (decentralized) সহযোগিতা কাঠামো।
প্রতি বছর একটি সদস্য দেশ সভাপতিত্ব (Chairmanship) গ্রহণ করে।
সেই দেশই বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন করে এবং বছরের কর্মসূচির সমন্বয় করে।
BRICS কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়?
BRICS -এর সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো Consensus-based Decision Making।
অর্থাৎ—
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে যৌথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এখানে সাধারণত ভোটাভুটি করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় না।
এই পদ্ধতির সুবিধা হলো—
- সব সদস্যের মতামত গুরুত্ব পায়।
- যৌথ মালিকানার অনুভূতি তৈরি হয়।
- দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা সহজ হয়।
অন্যদিকে, সমালোচকেরা বলেন—
ঐকমত্যভিত্তিক কাঠামো হওয়ায় অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগে।
BRICS Summit কী?
প্রতি বছর BRICS -এর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
এটি BRICS -এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত বৈঠক।
এখানে আলোচনা হয়—
- বৈশ্বিক অর্থনীতি
- আন্তর্জাতিক বাণিজ্য
- উন্নয়ন সহযোগিতা
- জলবায়ু পরিবর্তন
- প্রযুক্তি
- স্বাস্থ্য
- খাদ্য নিরাপত্তা
- আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা
- বৈশ্বিক সংঘাত ও কূটনৈতিক বিষয় (যেখানে প্রাসঙ্গিক)
সম্মেলনের শেষে একটি Joint Declaration প্রকাশ করা হয়, যেখানে সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অবস্থান তুলে ধরা হয়।
Sherpa Process কী?
BRICS Summit -এর আগে দীর্ঘ প্রস্তুতি চলে।
প্রতিটি সদস্য দেশ একজন করে Sherpa নিয়োগ করে।
Sherpa হলেন সেই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি শীর্ষ সম্মেলনের এজেন্ডা, আলোচ্য বিষয়, যৌথ ঘোষণার খসড়া এবং বিভিন্ন নীতিগত বিষয় নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় করেন।
আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে G20 -সহ আরও অনেক বহুপাক্ষিক ফোরামেও একই ধরনের Sherpa ব্যবস্থা রয়েছে।
New Development Bank (NDB) কী?
BRICS-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো New Development Bank (NDB)।
এটি ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২০১৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে।
এর সদর দপ্তর চীনের সাংহাইয়ে অবস্থিত।
NDB -এর প্রধান উদ্দেশ্য
- অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন
- টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ
- উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে সহায়তা
- বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নে নতুন বিকল্প তৈরি করা
NDB শুধু BRICS সদস্যদের জন্য নয়; নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করলে অন্যান্য দেশও সদস্য হতে পারে।
Contingent Reserve Arrangement (CRA) কী?
BRICS -এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো Contingent Reserve Arrangement (CRA)।
এটি মূলত একটি আর্থিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
কোনো সদস্য দেশ স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক মুদ্রার চাপে পড়লে সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
এটি IMF -এর বিকল্প নয়।
বরং আন্তর্জাতিক আর্থিক অস্থিরতার সময় সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার ধারণা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
BRICS শুধু সরকারপ্রধানদের বৈঠক নয়
অনেকের ধারণা BRICS মানেই বছরে একবার নেতাদের সম্মেলন।
বাস্তবে এর কার্যক্রম অনেক বিস্তৃত।
বছরজুড়ে অনুষ্ঠিত হয়—
- অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক
- কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের বৈঠক
- পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক
- বাণিজ্য বিষয়ক আলোচনা
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহযোগিতা
- স্বাস্থ্য খাতের বৈঠক
- কৃষি সহযোগিতা
- শিক্ষা ও বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক
- ব্যবসায়িক ফোরাম
- নারী উদ্যোক্তা ও যুব ফোরাম
- থিংক ট্যাংক ও গবেষণা সংলাপ
অর্থাৎ BRICS এখন একটি বহুমাত্রিক সহযোগিতা কাঠামো।
BRICS কি আইনগতভাবে সদস্যদের বাধ্য করতে পারে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর—না।
BRICS -এর সিদ্ধান্ত সাধারণত রাজনৈতিক অঙ্গীকার (Political Commitment) এবং পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এগোয়।
এটি WTO -এর মতো বাণিজ্য বিরোধ নিষ্পত্তির আদালত নয়, আবার EU -এর মতো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর বাধ্যতামূলক আইনও প্রয়োগ করে না।
ফলে সদস্য দেশগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী নীতি নির্ধারণে স্বাধীন থাকে।
BRICS-এর কাঠামো বুঝতে কেন এই অংশ গুরুত্বপূর্ণ?
BRICS সম্পর্কে অনেক আলোচনাই এর রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু বাস্তবে জোটটির কার্যকারিতা বোঝার জন্য এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো জানা জরুরি।
কারণ BRICS—
- কোনো সামরিক জোট নয়,
- কোনো সুপার-স্টেট নয়,
- কোনো একক অর্থনৈতিক ইউনিয়নও নয়।
বরং এটি বিভিন্ন দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সমন্বয়, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক সংলাপের একটি প্ল্যাটফর্ম।
এই কাঠামোই ব্যাখ্যা করে কেন BRICS নিয়ে প্রত্যাশা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতাও।
BRICS কেন এখন বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু? Global South, সম্প্রসারণ ও নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা
BRICS-এর ইতিহাস, কাঠামো এবং কার্যপ্রণালী জানার পর এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক—কেন এই জোট এখন এত আলোচনায়?
মাত্র এক দশক আগেও BRICS -কে অনেকে উদীয়মান অর্থনীতির একটি সংলাপমঞ্চ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সদস্য সম্প্রসারণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে আলোচনা, Global South -এর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যের পরিবর্তন—এসব কারণে BRICS আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
Global South: কেন এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ?
BRICS নিয়ে আলোচনা করতে গেলে Global South শব্দটি প্রায়ই সামনে আসে।
Global South বলতে সাধারণত এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিকে বোঝানো হয়। এটি কেবল ভৌগোলিক পরিচয় নয়; বরং উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নের সঙ্গেও যুক্ত।
BRICS-এর অনেক সদস্য দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছে যে, আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার তুলনায় এখনও সীমিত। তাই তারা বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়।
এই অবস্থানই Global South -এর অনেক দেশের কাছে BRICS -কে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরেছে।
কেন এত দেশ BRICS-এ যোগ দিতে আগ্রহী?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ৩০টিরও বেশি দেশ BRICS -এর পূর্ণ সদস্য বা অংশীদার (Partner Country) হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে—
- উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা।
- উন্নয়ন ও অবকাঠামো অর্থায়নের নতুন সুযোগ খোঁজা।
- দক্ষিণ-দক্ষিণ (South-South) সহযোগিতা বৃদ্ধি।
- আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিসরে নতুন অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা।
- দ্রুত বর্ধনশীল বাজারগুলোর সঙ্গে সংযোগ বাড়ানো।
তবে আগ্রহ প্রকাশ করলেই সদস্য হওয়া যায় না। BRICS -এ পূর্ণ সদস্য ও Partner Country—এই দুটি ভিন্ন মর্যাদা রয়েছে, এবং নতুন সদস্য বা অংশীদার গ্রহণের সিদ্ধান্ত সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়।
BRICS -এর সম্প্রসারণ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
দীর্ঘ সময় BRICS পাঁচ সদস্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে এর ভৌগোলিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
সম্প্রসারণের ফলে জোটটির মধ্যে এখন—
- মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি,
- আফ্রিকার নতুন প্রতিনিধিত্ব,
- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অংশগ্রহণ,
- এবং জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আরও বৈচিত্র্য এসেছে।
এছাড়া Partner Country ব্যবস্থার মাধ্যমে BRICS পূর্ণ সদস্য না করেও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কাঠামোগত সহযোগিতা বাড়ানোর পথ তৈরি করেছে।
স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিয়ে এত আলোচনা কেন?
BRICS -সংক্রান্ত আলোচনায় প্রায়ই Local Currency Trade বা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের বিষয়টি উঠে আসে।
এর অর্থ হলো—দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সব সময় তৃতীয় কোনো আন্তর্জাতিক মুদ্রার ওপর নির্ভর না করে, পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিজ নিজ মুদ্রা ব্যবহার করার সুযোগ বাড়ানো।
এটি নতুন কোনো ধারণা নয়। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার নিয়ে কাজ হয়েছে।
BRICS -এর ক্ষেত্রেও কিছু সদস্য দেশ এই ধরনের ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে। তবে এটি সব সদস্যের জন্য বাধ্যতামূলক নয় এবং সব বাণিজ্যও এভাবে পরিচালিত হয় না।

De-dollarization: বাস্তবতা বনাম প্রচার
BRICS নিয়ে আলোচনার আরেকটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ হলো De-dollarization।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
De-dollarization মানে মার্কিন ডলারকে একদিনে বাতিল করে দেওয়া নয়।
বরং কিছু দেশ আন্তর্জাতিক লেনদেনে বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে, যাতে ঝুঁকি বৈচিত্র্যপূর্ণ করা যায় এবং নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লেনদেন আরও সহজ হয়।
তবে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলার এখনও বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তাই “BRICS ইতোমধ্যেই ডলারের বিকল্প তৈরি করেছে”—এমন দাবি বাস্তব পরিস্থিতিকে অতিরঞ্জিত করে।
BRICS Pay ও BRICS Bridge কী?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে BRICS Pay এবং BRICS Bridge নাম দুটি নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।
BRICS Pay -কে সাধারণভাবে এমন একটি সম্ভাব্য আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট অবকাঠামো হিসেবে আলোচনা করা হয়, যার লক্ষ্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থপ্রদানকে আরও সহজ ও কার্যকর করা। তবে এটি এখনও সর্বত্র চালু বা একক বৈশ্বিক পেমেন্ট ব্যবস্থা হয়ে যায়নি।
অন্যদিকে BRICS Bridge ধারণাটি বিভিন্ন দেশের আর্থিক অবকাঠামো ও আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদানের সংযোগ উন্নত করার আলোচনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ক্ষেত্রেও বিভিন্ন প্রস্তাব, প্রযুক্তিগত উদ্যোগ ও নীতিগত আলোচনা চলছে; সবকিছু এখনও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়িত কাঠামো নয়।
তাই BRICS Pay বা BRICS Bridge সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব অতিরঞ্জিত দাবি দেখা যায়, সেগুলোকে অফিসিয়াল ঘোষণা থেকে আলাদা করে দেখা উচিত।
অর্থনীতির বাইরেও BRICS কেন গুরুত্বপূর্ণ?
BRICS এখন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
বর্তমানে জোটটির আওতায় নিয়মিত আলোচনা হয়—
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
- ডিজিটাল অর্থনীতি
- জলবায়ু পরিবর্তন
- স্বাস্থ্য সহযোগিতা
- খাদ্য নিরাপত্তা
- জ্বালানি নিরাপত্তা
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
- উদ্ভাবন
- শিক্ষা
- স্টার্টআপ সহযোগিতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্প, উদ্ভাবন এবং স্টার্টআপ সহযোগিতাও BRICS-এর আলোচনায় আরও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই আলোচনার মূল শিক্ষা
BRICS আজ আলোচনায় শুধু সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর কারণে নয়।
বরং কারণ, এটি এমন এক সময়ে আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যখন বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে।
এই পরিবর্তনের ফলে BRICS -কে কেউ নতুন সম্ভাবনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখেন, আবার কেউ এর বাস্তব সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এই দুই দৃষ্টিভঙ্গিই বোঝা জরুরি।
BRICS বনাম G7—প্রতিদ্বন্দ্বী, বিকল্প নাকি ভিন্ন ধরনের দুই জোট?
BRICS নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে তুলনাটি করা হয়, সেটি হলো G7 বনাম BRICS। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই এমন দাবি দেখা যায় যে BRICS ইতোমধ্যেই G7-কে ছাড়িয়ে গেছে, আবার অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন G7-এর সামনে BRICS -এর কোনো বাস্তব প্রভাব নেই।
বাস্তবে এই দুটি অবস্থানই বিষয়টিকে অতিরিক্ত সরলীকরণ করে।
BRICS ও G7 -এর উদ্দেশ্য, সদস্যপদ, অর্থনৈতিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকা এক নয়। তাই এদের তুলনা করতে হলে বিভিন্ন সূচক আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হয়।
G7 কী প্রতিনিধিত্ব করে?
G7 হলো বিশ্বের সাতটি উন্নত শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক অর্থনীতির একটি নীতিগত সমন্বয় ফোরাম।
এই দেশগুলো বহু দশক ধরে—
- বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা,
- প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন,
- আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং,
- উচ্চ মূল্য সংযোজন শিল্প,
- এবং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অর্থবাজার, রিজার্ভ মুদ্রা, বৈশ্বিক বিনিয়োগ এবং উন্নত প্রযুক্তিতে G7 দেশগুলোর প্রভাব এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী।
BRICS কোথায় আলাদা?
BRICS -এর শক্তি ভিন্ন জায়গায়।
এখানে রয়েছে—
- বৃহৎ জনসংখ্যা,
- দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি,
- গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র,
- জ্বালানি সম্পদ,
- কৃষি উৎপাদন,
- এবং উদীয়মান ভোক্তা বাজার।
এই কারণেই BRICS-কে অনেক গবেষক “Emerging Economic Powerhouse” হিসেবে বর্ণনা করেন।
কোন জোট অর্থনৈতিকভাবে বড়?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে কোন সূচক ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
যদি Nominal GDP (বর্তমান বাজারদরে মোট অর্থনীতি) বিবেচনা করা হয়, তাহলে G7 এখনও সম্মিলিতভাবে এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে Purchasing Power Parity (PPP) বা ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে পরিমাপ করলে সম্প্রসারিত BRICS-এর সম্মিলিত অর্থনীতি অনেক বিশ্লেষণে G7 -কে অতিক্রম করেছে বলে দেখা যায়।
এই পার্থক্যই ব্যাখ্যা করে কেন একই বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ভিন্ন ফলাফল দেখায়।
প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থায় কার প্রভাব বেশি?
এখানে এখনো G7-এর অবস্থান শক্তিশালী।
কারণ—
- বিশ্বের বৃহত্তম আর্থিক বাজারগুলোর বেশিরভাগই G7 দেশগুলোতে।
- ডলার, ইউরো ও ইয়েনের মতো প্রধান আন্তর্জাতিক মুদ্রা G7 অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।
- বৈশ্বিক ব্যাংকিং, বীমা, পুঁজিবাজার ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনে G7 দীর্ঘদিনের নেতৃত্ব ধরে রেখেছে।
অন্যদিকে BRICS দ্রুত শিল্প, উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও অবকাঠামো বিনিয়োগে প্রভাব বাড়াচ্ছে।
BRICS-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
BRICS-এর সামনে কয়েকটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
১. সদস্যদের ভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ
চীন, ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাত—প্রতিটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এক নয়।
ফলে সব বিষয়ে একমত হওয়া সহজ নয়।
২. চীনের প্রভাব নিয়ে বিতর্ক
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, BRICS -এর অর্থনৈতিক শক্তির বড় অংশই চীনের ওপর নির্ভরশীল।
অন্য গবেষকেরা বলেন, ভারত, ব্রাজিল, মধ্যপ্রাচ্য ও নতুন সদস্যদের ভূমিকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোটটি আরও বহুমাত্রিক হচ্ছে।
এই বিতর্ক এখনও চলমান।
৩. সম্প্রসারণের সুবিধা ও জটিলতা
নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় BRICS -এর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পরিধি বেড়েছে।
তবে সদস্য যত বাড়বে, নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছানো তত কঠিন হতে পারে।
এটি অনেক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের আলোচনায় উঠে এসেছে।
৪. প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা
BRICS -এর—
- স্থায়ী সচিবালয় নেই,
- বাধ্যতামূলক আইন নেই,
- সদস্যদের ওপর নীতি চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও নেই।
ফলে এর কার্যকারিতা অনেকটাই সদস্যদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল।
BRICS কি পশ্চিমা ব্যবস্থার বিকল্প?
এটি সবচেয়ে বিতর্কিত প্রশ্নগুলোর একটি।
এ বিষয়ে গবেষকদের মধ্যে একক মত নেই।
একটি মত হলো—
BRICS আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করতে নয়, বরং আরও বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে চায়।
অন্য মত হলো—
সময়ের সঙ্গে BRICS এমন কিছু আর্থিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত BRICS নিজেই আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার পূর্ণ বিকল্প কাঠামো গড়ে তুলেছে—এমনটি বলা যায় না।

Myth vs Reality
Myth: BRICS খুব শিগগিরই G7-কে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে।
Reality: বর্তমানে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। দুই জোটের শক্তির ক্ষেত্র ভিন্ন।
Myth: BRICS-এর সব সদস্যের অবস্থান একই।
Reality: সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও কৌশলগত বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে।
Myth: BRICS মানেই ডলারের অবসান।
Reality: কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা এখনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মূল্যায়ন হলো—
- G7 এখনও বৈশ্বিক অর্থ, প্রযুক্তি ও আর্থিক ব্যবস্থায় প্রভাবশালী।
- BRICS দ্রুত অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।
- দুটি জোটকে “জয়-পরাজয়” হিসেবে নয়, বরং পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের দুটি ভিন্ন কেন্দ্র হিসেবে দেখা অধিক বাস্তবসম্মত।
বাংলাদেশের জন্য BRICS-এর গুরুত্ব, ভবিষ্যৎ, FAQ ও নির্ভরযোগ্য সূত্র
আগের পাঁচটি পর্বে আমরা BRICS -এর জন্ম, ইতিহাস, সদস্যপদ, কার্যপ্রণালী, বৈশ্বিক গুরুত্ব এবং G7 -এর সঙ্গে তুলনা নিয়ে আলোচনা করেছি। এখন প্রশ্ন হলো—এই পুরো বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ? এবং ভবিষ্যতে BRICS-এর ভূমিকা কীভাবে বিবর্তিত হতে পারে?
বাংলাদেশের জন্য BRICS কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশ বর্তমানে BRICS -এর পূর্ণ সদস্য নয়। তবে তাই বলে এই জোটের সিদ্ধান্ত বা কার্যক্রম বাংলাদেশের জন্য অপ্রাসঙ্গিক নয়।
বিশ্ব অর্থনীতি ক্রমেই আরও আন্তঃসংযুক্ত হয়ে উঠছে। ফলে BRICS সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক, আর্থিক বা বাণিজ্যিক নীতির পরিবর্তন অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
১. বাণিজ্য
বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে চীন ও ভারত রয়েছে, যারা BRICS-এর সদস্য। এসব দেশের অর্থনৈতিক নীতি, আমদানি-রপ্তানি প্রবণতা বা সরবরাহ শৃঙ্খলে পরিবর্তন বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
২. বিনিয়োগ ও অবকাঠামো
BRICS সদস্য দেশগুলোর অনেক প্রতিষ্ঠান এশিয়া ও আফ্রিকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, শিল্প এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ করছে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লে বাংলাদেশও পরোক্ষভাবে এর সুযোগ পেতে পারে।
৩. বৈশ্বিক অর্থনীতি
যদি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, অর্থায়ন বা সরবরাহ শৃঙ্খল আরও বহুমুখী হয়, তাহলে রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশ কি BRICS -এর সদস্য হতে পারে?
এটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে।
তবে সদস্যপদ কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়া নয়।
BRICS -এর সম্প্রসারণ সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয় এবং প্রতিটি আবেদন নিজস্ব কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচিত হয়।
তাই কোনো দেশের সদস্যপদ সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করার আগে BRICS -এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা অনুসরণ করা উচিত।
ভবিষ্যতে BRICS কোথায় যেতে পারে?
এটি এমন একটি প্রশ্ন, যার নির্দিষ্ট উত্তর আজ কেউ দিতে পারে না।
তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণী সংস্থার বিশ্লেষণে কয়েকটি সম্ভাব্য প্রবণতা উঠে আসে—
- উন্নয়ন অর্থায়নে New Development Bank-এর ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
- সদস্য ও অংশীদার দেশের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে।
- স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিয়ে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ অব্যাহত থাকতে পারে।
- ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু অর্থায়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা BRICS-এর আলোচনায় আরও গুরুত্ব পেতে পারে।
- Global South -এর বিভিন্ন দেশের মধ্যে নীতিগত সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে এসবই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণের সারাংশ। এগুলো BRICS-এর আনুষ্ঠানিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হিসেবে দেখা উচিত নয়।
প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
BRICS-এর পূর্ণরূপ কী?
Brazil, Russia, India, China এবং South Africa—এই পাঁচ দেশের নামের আদ্যক্ষর থেকে BRICS নামটি এসেছে। পরবর্তীতে জোটে নতুন সদস্য যুক্ত হলেও নামটি অপরিবর্তিত রয়েছে।
BRICS কি একটি সামরিক জোট?
না। এটি কোনো সামরিক জোট বা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নয়।
BRICS-এর প্রধান লক্ষ্য কী?
অর্থনৈতিক সহযোগিতা, উন্নয়ন, বহুপাক্ষিক সংলাপ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব জোরদার করা।
BRICS-এর নিজস্ব মুদ্রা আছে?
বর্তমানে না। একক BRICS মুদ্রা চালু হয়নি।
BRICS কি ডলারের বিকল্প তৈরি করেছে?
না। কিছু সদস্য স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থায় ডলার এখনও প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা।
BRICS কি G7-কে প্রতিস্থাপন করবে?
এমন কোনো আনুষ্ঠানিক লক্ষ্য নেই। দুটি জোটের উদ্দেশ্য ও কাঠামো ভিন্ন।
BRICS-এর সদর দপ্তর কোথায়?
BRICS-এর নিজস্ব স্থায়ী সদর দপ্তর নেই। তবে New Development Bank (NDB)-এর সদর দপ্তর চীনের সাংহাইয়ে।
New Development Bank কী?
BRICS প্রতিষ্ঠিত একটি বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক, যা অবকাঠামো ও টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন করে।
BRICS-এ নতুন সদস্য কীভাবে যোগ দেয়?
সদস্য দেশগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ কি BRICS-এর সদস্য?
বর্তমানে নয়।
মূল বিষয়গুলো এক নজরে (Key Takeaways)
- BRICS-এর সূচনা ২০০১ সালে একটি অর্থনৈতিক ধারণা হিসেবে।
- ২০০৯ সালে প্রথম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে এটি বাস্তব সহযোগিতা প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়।
- বর্তমানে এটি অর্থনীতি, উন্নয়ন, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে কাজ করে।
- New Development Bank (NDB) জোটটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
- BRICS কোনো সামরিক জোট নয়।
- এটি G7-এর হুবহু বিকল্পও নয়; বরং ভিন্ন কাঠামোর একটি বহুপাক্ষিক প্ল্যাটফর্ম।
- Global South -এর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনায় BRICS গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
- সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সহযোগিতার ক্ষেত্রও বিস্তৃত হচ্ছে।
- BRICS সম্পর্কে প্রচলিত অনেক দাবির ক্ষেত্রে অফিসিয়াল তথ্য যাচাই করা জরুরি।
উপসংহার
BRICS-কে শুধু একটি অর্থনৈতিক জোট বা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যায় না।
এটি এমন এক সময়ে বিকশিত হয়েছে, যখন বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সেই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে BRICS উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে BRICS এখনও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন স্বার্থ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার পরিবর্তন—সবকিছুই এর ভবিষ্যৎ পথচলাকে প্রভাবিত করবে।
সুতরাং BRICS -কে নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার বদলে, অফিসিয়াল নথি, গবেষণা এবং নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত।
এই কারণেই BRICS আগামী বছরগুলোতেও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতি বোঝার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র (Official References)
International Monetary Fund (IMF)
World Trade Organization (WTO)
Council on Foreign Relations (CFR)
Center for Strategic and International Studies (CSIS)
সম্পাদকীয় নোট
এই নিবন্ধে BRICS -সম্পর্কিত তথ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিসিয়াল নথি, যৌথ ঘোষণাপত্র এবং স্বীকৃত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। যেহেতু BRICS -এর সদস্যপদ, অংশীদার দেশ, শীর্ষ সম্মেলনের সিদ্ধান্ত ও বিভিন্ন উদ্যোগ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, তাই সর্বশেষ তথ্যের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট অনুসরণ করা উচিত।

10 thoughts on “BRICS কী? কেন এই জোট নিয়ে এত আলোচনা?”