Global South-এর উত্থান ও বিশ্ব রাজনীতিতে পরিবর্তনশীল শক্তির ভারসাম্য

Global South-এর উত্থান বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে নতুন শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Global South কি সত্যিই বিশ্ব রাজনীতির নতুন শক্তি হয়ে উঠছে? ভারত, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিলসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর উত্থান কীভাবে BRICS, G7, AI, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে—জেনে নিন পুরো বিষয়টি।

বিশ্ব রাজনীতিতে এমন কিছু শব্দ আছে, যেগুলো কয়েক বছর আগেও মূলধারার আলোচনায় খুব বেশি শোনা যেত না। Global South বা গ্লোবাল সাউথ এখন তেমনই একটি শব্দ। আন্তর্জাতিক সম্মেলন, জাতিসংঘের অধিবেশন, বাণিজ্য আলোচনা থেকে শুরু করে BRICS, G7NATO নিয়ে বিতর্ক—প্রায় সব ক্ষেত্রেই শব্দটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

কিন্তু Global South বলতে আসলে কী বোঝায়?

শুধু দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত দেশগুলোর একটি তালিকা কি Global South? নাকি এটি উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের পুরোনো বিভাজনের নতুন নাম? আবার কেউ কেউ এটিকে পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার বিপরীতে একটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও দেখেন।

বাস্তবতা এর চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

Global South কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়, কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক অঞ্চলও নয়। এটি মূলত একটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক ধারণা—যার সঙ্গে ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, উন্নয়ন বৈষম্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন গভীরভাবে জড়িত।

এ কারণেই ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, বাংলাদেশ বা নাইজেরিয়ার মতো দেশকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আলোচনায় Global South-এর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও তাদের অর্থনীতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি কিংবা জাতীয় স্বার্থ এক নয়।

আর এখানেই Global South-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যটি ধরা পড়ে—এটি ঐক্যের চেয়ে অভিন্ন অভিজ্ঞতার ধারণা বেশি।

Global South বলতে আসলে কী বোঝায়?

সহজভাবে বললে, Global South বলতে সাধারণত এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এমন অনেক দেশকে বোঝানো হয়, যাদের ইতিহাসে ঔপনিবেশিকতা, উন্নয়নগত বৈষম্য, তুলনামূলক কম বৈশ্বিক প্রভাব অথবা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অসম অবস্থানের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।

Global South মানেই “গরিব দেশ” নয়।

চীন ও ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতি, ব্রাজিলের মতো আঞ্চলিক শক্তি কিংবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উচ্চ-আয়ের অর্থনীতিও বিভিন্ন প্রসঙ্গে Global South-এর আলোচনায় আসে। আবার দক্ষিণ গোলার্ধে অবস্থিত অস্ট্রেলিয়া Global South-এর প্রচলিত সংজ্ঞার অংশ নয়।

অর্থাৎ “South” শব্দটি এখানে মূলত মানচিত্রের নিচের অংশ বোঝাচ্ছে না। এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোয় ঐতিহাসিক অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত একটি ধারণা।

একই কারণে Global South-কে অনেক সময় developing world, emerging economies কিংবা post-colonial world-এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়। কিন্তু এগুলো পুরোপুরি সমার্থক নয়।

একটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত উন্নতি করলেও তার ঔপনিবেশিক ইতিহাস বা বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন তাকে Global South-এর আলোচনার সঙ্গে যুক্ত রাখতে পারে।

এই পার্থক্যটি বোঝা জরুরি, কারণ এখান থেকেই বোঝা যায় কেন Global South নিয়ে বর্তমান বিতর্ক শুধু অর্থনীতি নিয়ে নয়; এটি একই সঙ্গে ভূরাজনীতি, কূটনীতি, বাণিজ্য, জলবায়ু, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে।

“Global South” শব্দটির পেছনে ইতিহাস কোথায়?

Global South ধারণাটির শিকড় আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক পুরোনো বিভাজনে গিয়ে পৌঁছায়।

বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বিশ্ব রাজনীতিতে “First World”, “Second World” এবং “Third World”—এই ধরনের শ্রেণিবিন্যাস জনপ্রিয় হয়েছিল। তখন এটি মূলত শীতল যুদ্ধের রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই কাঠামো দুর্বল হয়ে যায়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, বিশ্বায়নের বিস্তার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক উত্থান পুরোনো “তৃতীয় বিশ্ব” ধারণাটিকে ক্রমেই অপ্রতুল করে তোলে।

এরপর Global South শব্দটি তুলনামূলকভাবে বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

কারণ “Third World” শব্দটি অনেক ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও পশ্চাৎপদতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছিল। বিপরীতে Global South একটি দেশের বর্তমান GDP বা মাথাপিছু আয়কে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে ধরে না; বরং ইতিহাস, উন্নয়ন, ক্ষমতা ও বৈশ্বিক সম্পর্কের বৃহত্তর কাঠামোকে বিবেচনায় নেয়।

বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ দীর্ঘ সময় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির অধীনে ছিল। তাদের অর্থনীতি, বাণিজ্যপথ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রশাসনিক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক স্বার্থ অনুযায়ী গড়ে উঠেছিল।

স্বাধীনতার পর এসব দেশের সামনে তাই শুধু রাষ্ট্র গঠন নয়, নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা গড়ে তোলার প্রশ্নও সামনে আসে।

এখান থেকেই পরবর্তীতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যায়।

Bandung থেকে আজকের Global South

Global South-এর রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাসে Bandung Conference একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুংয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার ২৯টি দেশ সম্মেলনে অংশ নেয়। তখন পৃথিবী শীতল যুদ্ধের দুই প্রধান শক্তিকেন্দ্র—যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন—নিয়ে বিভক্ত।

নতুন স্বাধীন দেশগুলোর একটি বড় অংশ চাইছিল, তারা যেন কেবল কোনো একটি পরাশক্তির অনুসারী হয়ে না থাকে।

এই চিন্তা পরবর্তীতে Non-Aligned Movement বা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন-এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আজকের Global South অবশ্য Bandung-এর সময়কার পৃথিবীর মতো নয়। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখনো একই রয়ে গেছে:

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম তৈরি হবে কার স্বার্থে, এবং সেই নিয়ম তৈরির টেবিলে কারা বসবে?

এই প্রশ্নটি বর্তমান Global South আলোচনার কেন্দ্রেও রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক, IMF, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা কিংবা বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কাঠামোয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।

ফলে Global South-এর বর্তমান উত্থানকে শুধু “পশ্চিমবিরোধী” কোনো প্রকল্প হিসেবে দেখলে বিষয়টির বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।

অনেক দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ভারত, রাশিয়া ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়।

তাদের লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রে কোনো একটি ব্লকে যোগ দেওয়া নয়; বরং নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বা strategic autonomy বাড়ানো।

Global South কি পশ্চিমের বিপরীত শক্তি?

এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়।

Global South- কে অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে Global South—দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত শিবির তৈরি হয়েছে।

বাস্তবে এমন সরল বিভাজন নেই।

উদাহরণ হিসেবে ভারতের কথাই ধরা যাক।

ভারত BRICS-এর সদস্য, আবার একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। Quad-এর মতো কাঠামোয়ও ভারত যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কাজ করে।

আবার ইন্দোনেশিয়া Global South -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হলেও তার পররাষ্ট্রনীতি কোনো একক ভূরাজনৈতিক শিবিরে আটকে নেই।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।

ঢাকার জন্য ভারত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক অংশীদার। চীন গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বড় বাণিজ্যিক ও কৌশলগত অংশীদারদের একটি। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই Global South-এর দেশগুলোর কৌশল অনেক সময় “কার বিরুদ্ধে” নয়, বরং “কীভাবে নিজের স্বার্থ সর্বোচ্চ করা যায়”—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

এই জায়গায় Global South-এর সঙ্গে G7 -এর পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ।

G7 মূলত বিশ্বের কয়েকটি উন্নত শিল্পোন্নত অর্থনীতির একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমন্বয় কাঠামো। অন্যদিকে Global South কোনো সমজাতীয় ক্লাব নয়।

ফলে G7-এর মতো একটি নির্দিষ্ট সদস্য তালিকা দিয়ে Global South-কে সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

তাহলে BRICS কোথায় দাঁড়ায়?

Global South নিয়ে বর্তমান আলোচনায় BRICS সবচেয়ে দৃশ্যমান প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি।

মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে শুরু হওয়া BRICS পরে দক্ষিণ আফ্রিকাকে অন্তর্ভুক্ত করে। এরপর জোটটির সম্প্রসারণ ঘটে এবং এর সদস্যসংখ্যা ও প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনা আরও বাড়ে।

BRICS -এর গুরুত্ব শুধু এর সদস্য দেশগুলোর GDP -তে নয়।

এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এর মাধ্যমে বিশ্বের কিছু বড় উদীয়মান অর্থনীতি আন্তর্জাতিক আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

New Development Bank, স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় সংস্কার এবং ডলারনির্ভরতার বিকল্প নিয়ে আলোচনা—এসব বিষয় BRICS-কে Global South -এর বৃহত্তর বিতর্কের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

তবে BRICS -কে Global South -এর সমার্থক ভাবাও ঠিক হবে না।

কারণ Global South-এর বহু দেশ BRICS-এর সদস্য নয়। আবার BRICS-এর সদস্য দেশগুলোর নিজেদের মধ্যেও অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থের বড় পার্থক্য রয়েছে।

অর্থাৎ BRICS হলো Global South -এর একটি গুরুত্বপূর্ণ institutional platform, কিন্তু Global South নিজে কোনো একক প্রতিষ্ঠান নয়।

কেন এখন আবার Global South নিয়ে এত আলোচনা?

এর পেছনে কয়েকটি পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করছে।

প্রথমত, বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে আরও বহুমুখী হচ্ছে। চীন, ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া এবং অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির আকার ও প্রভাব বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজাচ্ছে।

তৃতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুরোনো সমীকরণ আরও জটিল হয়েছে। অনেক Global South দেশ পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর সঙ্গে পুরোপুরি একাত্ম হয়নি; আবার রাশিয়ার সঙ্গেও তাদের সম্পর্ক একরকম নয়।

চতুর্থত, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে উন্নয়নশীল দেশগুলো অর্থায়ন, climate justice এবং ঐতিহাসিক দায় নিয়ে আরও জোরালো অবস্থান নিচ্ছে।

পঞ্চমত, AI বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা -এর মতো নতুন প্রযুক্তি বৈশ্বিক ক্ষমতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। AI-এর compute, semiconductor, data এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো কার হাতে থাকবে—এই প্রশ্ন ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

ফলে Global South এখন শুধু “উন্নয়নশীল দেশগুলোর সমস্যা” নিয়ে কথা বলছে না।

তারা ক্রমেই প্রশ্ন তুলছে—আগামী বিশ্বের নিয়মগুলো কে তৈরি করবে?

আর এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে Global South -এর সঙ্গে BRICS, G7, NATO, জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন প্রযুক্তির রাজনীতিকে আলাদা করে দেখা কঠিন।

বিশ্বব্যবস্থার এই পরিবর্তন বোঝার জন্য তাই শুধু কোন দেশ কত বড় অর্থনীতি—সেটি দেখলেই হবে না। দেখতে হবে কার হাতে বাজার, কার হাতে প্রযুক্তি, কার হাতে জ্বালানি, কার হাতে জনসংখ্যা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।

সেখানেই Global South-এর প্রকৃত গুরুত্ব শুরু।

Global South -এর গুরুত্ব বোঝার জন্য তাই শুধু কোন দেশ কত বড় অর্থনীতি—সেটি দেখলেই হবে না। দেখতে হবে কার হাতে বাজার, কার হাতে প্রযুক্তি, কার হাতে জ্বালানি, কার হাতে জনসংখ্যা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে—কার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। এই জায়গাতেই Global South -এর উত্থানকে নতুন করে দেখা দরকার।

Global South-এর শক্তি কোথায়—জনসংখ্যা, অর্থনীতি নাকি বাজার?

Global South -এর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর জনসংখ্যা। বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষ এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বসবাস করে। ফলে এসব অঞ্চলের মানুষের আয়, ভোগ, নগরায়ণ ও কর্মসংস্থানের ধরন বদলালে তার প্রভাব শুধু স্থানীয় অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বৈশ্বিক বাজারেও তার প্রতিফলন পড়ে।

ভারত এর সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি। বিশাল জনসংখ্যা, দ্রুত বাড়তে থাকা ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি খাত এবং বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার ভারতকে শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করেছে।

ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনা দেখা যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহৎ এই অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদ, উৎপাদন, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে Global South-এর গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি।

আফ্রিকার ক্ষেত্রেও জনসংখ্যা ভবিষ্যতের বড় সম্পদ হতে পারে। তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত নগরায়ণ এবং ভোক্তা বাজারের বিস্তার আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে মহাদেশটির গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

তবে এখানেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা রয়েছে।

বড় জনসংখ্যা নিজে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করে না।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে জনসংখ্যাকে যুক্ত করা না গেলে বড় জনসংখ্যা সুযোগের বদলে বোঝাও হয়ে উঠতে পারে।

এই জায়গাটি বাংলাদেশের জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রমবাজার এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল অর্থনীতি দেশটিকে Global South-এর বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করেছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের ওপর।

অর্থাৎ Global South -এর আসল শক্তি শুধু people নয়—productive people

অর্থনীতির কেন্দ্র কি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে?

গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উল্লেখযোগ্য অংশ এখন উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো থেকে আসে।

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ভারত প্রযুক্তি, সেবা ও উৎপাদন খাতে দ্রুত এগোচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া নিকেলসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, ব্যাটারি শিল্প এবং উৎপাদন খাতে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ব্রাজিল কৃষি, খাদ্য, জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

এই পরিবর্তনকে কেউ কেউ economic rebalancing হিসেবে দেখেন।

একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্র বলতে মূলত পশ্চিম ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও জাপানকে বোঝানো হতো। এখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র আরও বিস্তৃত হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে পশ্চিমা অর্থনীতি তার প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ডলারের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিশ্বের অন্যতম বড় বাজার। জাপান, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির প্রযুক্তি, পুঁজি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানও বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব রাখে।

অর্থাৎ পরিবর্তনটি “পশ্চিমের পতন” এবং “Global South -এর উত্থান”—এমন সরল সমীকরণ নয়।

বরং বিশ্বব্যবস্থা এককেন্দ্রিকতা থেকে বহুকেন্দ্রিকতার দিকে এগোচ্ছে কি না—এটাই বড় প্রশ্ন।

G7 বনাম Global South: আসল পার্থক্য কোথায়?

এই প্রশ্নে G7 -এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

G7 হলো কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত একটি অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফোরাম। ইউরোপীয় ইউনিয়নও এর আলোচনায় অংশ নেয়।

G7-এর দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে বড় প্রভাব রাখছে।

Global South-এর সঙ্গে এর পার্থক্য হলো—Global South কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রগোষ্ঠী নয়।

তবু দুই ধারণার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন রয়েছে।

G7 -ভুক্ত দেশগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশে ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে Global South-এর অনেক দেশ মনে করে, বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক ও জনমিতিক গুরুত্বকে যথেষ্ট প্রতিফলিত করে না।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ তার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ।

ভারত, ব্রাজিল ও আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর দাবি বহু বছর ধরে আলোচনায় রয়েছে। এর পেছনে যুক্তি হলো—বিশ্বের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের চেয়ে অনেক বদলে গেছে, তখন আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোও বদলানো প্রয়োজন।

এখানে Global South-এর একটি মৌলিক দাবি স্পষ্ট হয়:

বিশ্বব্যবস্থায় শুধু অংশগ্রহণ নয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাতেও প্রতিনিধিত্ব চাই।

NATO কি Global South-এর বিপরীত?

NATO -কে Global South-এর বিপরীতে দাঁড় করানোও পুরোপুরি সঠিক নয়।

NATO একটি সামরিক ও রাজনৈতিক জোট, যার মূল উদ্দেশ্য সদস্যদের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা। Global South কোনো সামরিক জোট নয়।

তবু ইউক্রেন যুদ্ধের পর NATO এবং Global South -এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা বেড়েছে।

কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান এবং Global South -এর অনেক দেশের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য দেখা গেছে।

অনেক উন্নয়নশীল দেশ রাশিয়ার আগ্রাসনকে সমর্থন করেনি। আবার একই সঙ্গে তারা পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থায় পুরোপুরি যোগ দেয়নি।

এর পেছনে নীতিগত অবস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও রয়েছে।

অনেক দেশ রাশিয়ার জ্বালানি, সার, খাদ্য বা অন্যান্য পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও অক্ষুণ্ণ রাখতে চায়।

ফলে Global South -এর কূটনীতি প্রায়ই alignment -এর বদলে balancing-এর ওপর দাঁড়ায়।

এই প্রবণতা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

“Strategic Autonomy”—Global South-এর নতুন কূটনৈতিক ভাষা

Strategic autonomy বা কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন এখন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।

এর অর্থ কোনো দেশ সবসময় কোনো একটি পরাশক্তির সঙ্গে থাকবে না। বরং প্রতিটি বিষয়ে নিজের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করবে।

ভারত এই ধারণার অন্যতম পরিচিত উদাহরণ।

ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি সম্পর্কও বজায় রেখেছে।

চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকলেও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ করার পথে যায়নি।

এই ধরনের বহুমুখী কূটনীতিই Global South -এর অনেক দেশের বাস্তবতা।

বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের রাষ্ট্রের জন্যও এই ধারণা গুরুত্বপূর্ণ।

একটি দেশের অর্থনীতি যদি কোনো একক বাজার, কোনো একটি দেশ, কোনো একটি জ্বালানি উৎস বা কোনো একটি রাজনৈতিক অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার কৌশলগত স্বাধীনতা কমে যেতে পারে।

তাই বৈচিত্র্যপূর্ণ বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক একটি দেশের bargaining power বাড়াতে পারে।

চীন: Global South-এর নেতা, নাকি নিজের স্বার্থে কাজ করা বৃহৎ শক্তি?

Global South -এর আলোচনায় চীনের ভূমিকা সবচেয়ে জটিল।

চীন নিজেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে এবং Global South-এর দেশগুলোর সঙ্গে অবকাঠামো, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক বাড়িয়েছে।

Belt and Road Initiative-এর মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চীনের সমর্থকেরা এটিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো ঘাটতি পূরণের সুযোগ হিসেবে দেখেন।

সমালোচকেরা অবশ্য ঋণের শর্ত, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, স্থানীয় অর্থনীতির ওপর প্রভাব এবং কৌশলগত নির্ভরতার প্রশ্ন তোলেন।

বাস্তবতা সম্ভবত এর মাঝামাঝি।

চীন নিঃসন্দেহে Global South -এর অনেক দেশের উন্নয়ন অংশীদার। একই সঙ্গে চীন নিজেও একটি বৃহৎ রাষ্ট্র, যার নিজের অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।

তাই Global South -এর দেশগুলো চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করলেও তাকে অন্ধভাবে অনুসরণ করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এখানেই Global South -এর বৈচিত্র্য আবার সামনে আসে।

ভারতের উত্থান কেন আলাদা?

চীনের পাশাপাশি ভারতের উত্থান Global South -এর ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারত বিশ্বের বৃহৎ জনসংখ্যার দেশগুলোর একটি, দ্রুত বাড়তে থাকা অর্থনীতি, শক্তিশালী প্রযুক্তি ও সেবা খাত এবং বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে।

ভারত একই সঙ্গে Global South -এর কণ্ঠস্বর হওয়ার চেষ্টা করছে এবং নিজেকে একটি বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছে।

এখানে ভারতের অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

Global South -এর নেতৃত্ব শুধু পশ্চিমের বিরোধিতা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ভারত, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া বা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দেশগুলো নিজেদের বৈশ্বিক প্রভাব বাড়াতে চাইছে।

এই পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা সম্ভবত এমন হবে না যেখানে একটি দেশ বা একটি জোট সব সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করবে।

বরং বিভিন্ন শক্তি, আঞ্চলিক জোট ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মের মধ্যে দরকষাকষি বাড়বে।

Indonesia: Global South-এর আরেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার

ইন্দোনেশিয়া এই পরিবর্তনের একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ।

বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক মডেলের সঙ্গে সরাসরি মেলে না। এর পেছনে রয়েছে দেশটির নিজস্ব ইতিহাস, Pancasila, বহুধর্মীয় সমাজ এবং জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্রচিন্তা।

কিন্তু Global South -এর দৃষ্টিকোণ থেকে ইন্দোনেশিয়ার গুরুত্ব শুধু ধর্মীয় পরিচয়ে নয়।

দেশটির বিশাল জনসংখ্যা, প্রাকৃতিক সম্পদ, ASEAN-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে অবস্থান এবং Indo-Pacific অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্ব তাকে বৈশ্বিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করছে।

ইন্দোনেশিয়া দেখায়, Global South -এর কোনো একটি “মডেল” নেই।

একটি দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারে, গণতান্ত্রিক হতে পারে, ASEAN -এর অংশ হতে পারে এবং একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখতে পারে।

এটি Global South -এর বৈচিত্র্যেরই উদাহরণ।

Global South-এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা: ঐক্যের অভাব

এত সম্ভাবনার পরও Global South-এর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—তারা কি সত্যিই একসঙ্গে কাজ করতে পারবে?

উত্তর সহজ নয়।

ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত বিরোধ ও কৌশলগত প্রতিযোগিতা রয়েছে। সৌদি আরব ও ইরানের মতো দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোরও জাতীয় স্বার্থ ভিন্ন।

অর্থাৎ Global South-এর অভিন্ন সমস্যা থাকলেও অভিন্ন সমাধান সবসময় নেই।

জলবায়ু অর্থায়নের প্রশ্নে তারা কাছাকাছি অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু বাণিজ্য, নিরাপত্তা বা প্রযুক্তির ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ভিন্ন হতে পারে।

এই কারণেই Global South -কে একটি “নতুন বিশ্বজোট” হিসেবে দেখা এখনই অতিরঞ্জিত।

বরং এটিকে একটি negotiating space হিসেবে দেখা বেশি বাস্তবসম্মত—যেখানে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

আর সেই দরকষাকষির ক্ষমতাই আগামী দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে Global South -এর প্রকৃত শক্তি নির্ধারণ করতে পারে।

Global South -এর শক্তি তাই শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা জনসংখ্যার আকারে নয়; আসল প্রশ্ন হলো, এই দেশগুলো নিজেদের স্বার্থকে কতটা সমন্বিতভাবে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে নিয়ে যেতে পারে। আর এই জায়গায় এসে আলোচনাটি অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার দিকে চলে যায়।

ডলারনির্ভর বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন কেন বাড়ছে?

Global South নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার কাঠামো।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় মার্কিন ডলার একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক লেনদেনের বড় অংশ এখনো ডলারকেন্দ্রিক।

এই ব্যবস্থার সুবিধা যেমন আছে, তেমনি অনেক উন্নয়নশীল দেশ এর সীমাবদ্ধতাও অনুভব করে।

বিশেষ করে যখন কোনো দেশ আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে, তখন ডলারভিত্তিক আর্থিক অবকাঠামো তার বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর এই প্রশ্ন আরও সামনে এসেছে। বিভিন্ন দেশ তখন ভাবতে শুরু করেছে—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কি স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার বাড়ানো যায়? দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডলারের পরিবর্তে অন্য মুদ্রা ব্যবহার করা সম্ভব কি না? আর বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় বিকল্প অবকাঠামো তৈরি করা যায় কি না?

এখান থেকেই de-dollarization শব্দটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরও পরিচিত হয়ে ওঠে।

তবে de-dollarization -কে অনেক সময় যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক ধীর এবং জটিল।

ডলারকে সরিয়ে দেওয়া সহজ নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির আকার, গভীর আর্থিক বাজার, ডলারের তারল্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এর ব্যবহার এবং বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর দীর্ঘ সম্পর্ক—সবকিছু মিলে ডলারকে একটি বিশেষ অবস্থান দিয়েছে।

তাই Global South -এর অনেক দেশ ডলার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে বিকল্প বাড়াতে আগ্রহী।

অর্থাৎ প্রশ্নটি হয়তো “ডলারের পতন হবে কি না” নয়।

বরং প্রশ্ন হলো—বিশ্ব অর্থনীতিতে কি একটির বদলে একাধিক মুদ্রা ও আর্থিক ব্যবস্থা পাশাপাশি শক্তিশালী হবে?

BRICS কেন এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ?

BRICS -এর অন্যতম আলোচিত বিষয় এখানেই।

জোটটির সদস্যরা স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং নিজস্ব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা করেছে।

New Development Bank সেই প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

এটি বিশ্বব্যাংক বা IMF -এর সরাসরি বিকল্প হয়ে গেছে—এমন দাবি করা এখনই বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু এর অস্তিত্বই দেখায় যে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের অর্থায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে চাইছে।

এখানে একটি বড় পরিবর্তন ঘটছে।

আগে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন অর্থায়নের আলোচনায় প্রধানত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোই কেন্দ্রীয় ছিল। এখন চীন, ভারত, ব্রাজিল ও অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠানও আলোচনায় আসছে।

তবে BRICS -এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ কতটা সমন্বিত করা যায় তার ওপর।

কারণ বড় অর্থনীতি হওয়া এবং একই আর্থিক কৌশল অনুসরণ করা এক বিষয় নয়।

Global South-এর জন্য বাণিজ্য কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য Global South -এর অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

অনেক উন্নয়নশীল দেশ দীর্ঘদিন ধরে কাঁচামাল, কৃষিপণ্য, পোশাক বা শ্রমনির্ভর পণ্য রপ্তানি করেছে এবং উন্নত দেশ থেকে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি ও শিল্পপণ্য আমদানি করেছে।

এই কাঠামো বদলানোর চেষ্টা এখন বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে।

ভারত প্রযুক্তি ও সেবা খাত বাড়াতে চাইছে। ইন্দোনেশিয়া কাঁচামাল রপ্তানির পাশাপাশি শিল্পায়ন ও downstream manufacturing বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বাংলাদেশ পোশাকের বাইরে ওষুধ, চামড়া, আইটি ও অন্যান্য খাতে রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে চাইছে।

আফ্রিকার অনেক দেশও কাঁচামাল রপ্তানির বদলে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন বাড়াতে আগ্রহী।

এখানে Global South -এর জন্য মূল প্রশ্ন হলো:

শুধু বিশ্ববাজারে পণ্য বিক্রি করলেই কি যথেষ্ট, নাকি উৎপাদন শৃঙ্খলের বেশি অংশ নিজেদের দেশে রাখা দরকার?

এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।

যে দেশ কেবল কাঁচামাল সরবরাহ করে, তার bargaining power সাধারণত সীমিত। কিন্তু যে দেশ কাঁচামাল থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড ও সেবা পর্যন্ত পুরো value chain -এর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তার অর্থনৈতিক ক্ষমতা অনেক বেশি।

এ কারণেই Global South -এর শিল্পনীতি এখন শুধু GDP growth নিয়ে নয়; value addition ও supply-chain control নিয়েও।

Critical minerals: নতুন ভূরাজনীতির কেন্দ্র

এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় উদাহরণ হলো critical minerals।

ইলেকট্রিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, semiconductor এবং উন্নত প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন খনিজের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

নিকেল, কোবাল্ট, লিথিয়াম, কপার, rare earth elements—এসব উপাদান ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইন্দোনেশিয়ার নিকেল সম্পদ তাই শুধু একটি প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক শিল্পনীতি ও ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও critical minerals -এর বড় মজুত রয়েছে।

এর ফলে Global South -এর কিছু দেশ প্রথমবারের মতো এমন সম্পদ হাতে পাচ্ছে, যা আগামী দশকের প্রযুক্তি ও জ্বালানি পরিবর্তনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এখানেও ঝুঁকি আছে।

যদি উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু খনিজ উত্তোলন করে কাঁচামাল রপ্তানি করে, তাহলে তারা পুরোনো commodity-dependent অর্থনৈতিক কাঠামোতেই আটকে থাকতে পারে।

বরং স্থানীয় processing, battery manufacturing, technology transfer এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে value chain -এর বড় অংশ নিজেদের অর্থনীতিতে রাখা গেলে সম্পদের প্রকৃত সুবিধা পাওয়া সম্ভব।

AI কি Global South-এর জন্য সুযোগ, নাকি নতুন বৈষম্য?

বিশ্ব রাজনীতির পরবর্তী বড় শক্তিক্ষেত্র শুধু তেল, গ্যাস বা খনিজ নয়।

এটি Artificial Intelligence বা AI

AI -এর দ্রুত বিস্তার বিশ্ব অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রতিরক্ষা, গণমাধ্যম ও কর্মসংস্থানের কাঠামো বদলে দিচ্ছে।

কিন্তু AI -এর সুবিধা সবাই সমানভাবে পাচ্ছে না।

উন্নত দেশগুলোতে বড় প্রযুক্তি কোম্পানি, বিপুল computing capacity, উন্নত semiconductor ecosystem এবং বিশাল data infrastructure রয়েছে। অন্যদিকে অনেক Global South দেশ এখনো basic digital infrastructure, high-speed connectivity এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার ঘাটতির সঙ্গে লড়ছে।

এতে একটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে—AI divide

আগে digital divide বলতে মূলত ইন্টারনেট বা কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগের পার্থক্য বোঝানো হতো। ভবিষ্যতে প্রশ্ন হতে পারে—কোন দেশের কাছে নিজস্ব AI infrastructure আছে? কার কাছে advanced chips আছে? কারা নিজস্ব AI model তৈরি করতে পারে? কারা শুধু অন্য দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করবে?

এখানে Global South -এর জন্য সুযোগও আছে।

AI স্থানীয় ভাষায় শিক্ষা, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি সেবা এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দেশে বাংলা ভাষাভিত্তিক AI, কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবায় AI -এর ব্যবহার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, data governance এবং নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো।

Deepfake থেকে Dark Web: প্রযুক্তির অন্ধকার দিকও আছে

প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে ঝুঁকিও বাড়ছে।

Deepfake প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাস্তব মানুষের মুখ, কণ্ঠ বা বক্তব্যকে এমনভাবে পরিবর্তন করা সম্ভব, যা সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা আলাদা করা কঠিন করে দিতে পারে।

রাজনীতি, নির্বাচন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে এটি বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

Global South -এর অনেক দেশে যেখানে media literacy তুলনামূলক কম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে misinformation দ্রুত ছড়াতে পারে, সেখানে deepfake ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে Dark Web

Dark Web নিজে কোনো একক অপরাধের সমার্থক নয়; এটি ইন্টারনেটের এমন অংশকে বোঝায়, যা সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে সহজে পাওয়া যায় না এবং বিশেষ সফটওয়্যার বা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রবেশ করা যায়।

এর কিছু বৈধ ব্যবহার থাকলেও অবৈধ মার্কেট, চুরি করা তথ্য, ম্যালওয়্যার ও অন্যান্য সাইবার অপরাধের সঙ্গে Dark Web -এর একটি উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে।

Global South -এর দ্রুত ডিজিটালাইজেশন তাই একই সঙ্গে সুযোগ ও ঝুঁকি তৈরি করছে।

একটি দেশ যদি ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলে কিন্তু cybersecurity, privacy এবং AI governance শক্তিশালী করতে না পারে, তাহলে প্রযুক্তি তার জন্য অর্থনৈতিক সম্পদের পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও হয়ে উঠতে পারে।

Gen Z কেন Global South-এর ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত?

এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চরিত্র হলো তরুণ প্রজন্ম।

বিশ্বের অনেক Global South দেশ তুলনামূলক তরুণ জনসংখ্যার অধিকারী। ফলে Gen Z এবং পরবর্তী Gen Alpha প্রজন্মের হাতে এই পরিবর্তনের বড় অংশের দায়িত্ব থাকবে।

তাদের জন্য ইন্টারনেট কোনো বিলাসিতা নয়; এটি শিক্ষা, বিনোদন, যোগাযোগ, কাজ এবং পরিচয়ের অংশ।

এখানেই Gen Z-এর সঙ্গে Global South -এর ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ তৈরি হয়।

একজন তরুণ বাংলাদেশি, ভারতীয়, ইন্দোনেশীয় বা নাইজেরিয়ান একই দিনে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি, কোরিয়ার জনপ্রিয় সংস্কৃতি, ইউরোপের রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা জাপানের বিনোদন অনুসরণ করতে পারে।

অর্থাৎ ডিজিটাল যুগে পরিচয়ের সীমারেখা আগের মতো স্থির নেই।

Gen Z -এর পর Gen Alpha আরও বেশি AI -নির্ভর পরিবেশে বেড়ে উঠছে। তাদের শিক্ষা, কাজ এবং সামাজিক যোগাযোগের ধরন আগের প্রজন্মের তুলনায় আরও ভিন্ন হতে পারে।

এটি Global South -এর জন্য বড় সুযোগ, কারণ তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে তুলতে পারলে demographic advantage অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ নিতে পারে।

কিন্তু বিপরীতটিও সত্য।

যদি শিক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারে, তাহলে তরুণ জনসংখ্যা ভবিষ্যতের workforce না হয়ে unemployment ও inequality-এর বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন: Global South-এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর একটি

Global South -এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দাবি হলো climate justice।

বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশ যুক্তি দেয়, শিল্পায়নের ঐতিহাসিক সময়কালে উন্নত দেশগুলো বিপুল পরিমাণ greenhouse gas নির্গমন করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির বড় অংশ এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি—এসব সমস্যা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বাস্তব অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

Global South তাই শুধু জলবায়ু অভিযোজনের জন্য অর্থ চায় না; তারা loss and damage, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়নের দাবিও তোলে।

এখানে আবার একই প্রশ্ন ফিরে আসে—আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার টেবিলে কার প্রভাব কতটা?

কারণ জলবায়ু নীতির সিদ্ধান্ত যদি প্রধানত বড় অর্থনীতিগুলো নির্ধারণ করে, কিন্তু তার বাস্তব খরচ বহন করে ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, তাহলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

বাংলাদেশের জন্য Global South কেন গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য Global South কোনো দূরের ভূরাজনৈতিক ধারণা নয়।

দেশটির অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী শ্রমবাজার, কৃষি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব প্রয়োজন।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক স্বার্থ তাই একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার ওপর নির্ভর করে।

ভারত ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশীদের একটি। চীন বড় বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

এই বাস্তবতায় Global South -এর ধারণা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত জায়গা তৈরি করতে পারে।

কারণ বাংলাদেশ একদিকে উন্নয়নশীল বিশ্বের অভিন্ন স্বার্থ—জলবায়ু অর্থায়ন, বাণিজ্য সুবিধা, শ্রমবাজার, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অর্থায়ন—নিয়ে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে বড় শক্তিগুলোর সঙ্গে নিজস্ব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কও বজায় রাখতে পারে।

এখানে লক্ষ্য কোনো একটি শক্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়।

লক্ষ্য হতে পারে নিজের bargaining power বাড়ানো।

আর সেই জায়গায় বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের জন্য আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক কূটনীতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

Global South -এর ভবিষ্যৎ তাই শুধু দিল্লি, বেইজিং, ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসে নির্ধারিত হবে না। এর একটি অংশ নির্ধারিত হবে ঢাকা, জাকার্তা, ব্রাসিলিয়া, নাইরোবি ও অন্যান্য উদীয়মান কেন্দ্রেও।

কিন্তু এই নতুন বাস্তবতা কি সত্যিই একটি নতুন বিশ্বব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে?

নাকি পুরোনো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন কাঠামোর মধ্যেই Global South ধীরে ধীরে নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দিকে তাকানো ছাড়া উপায় নেই।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দিকে তাকানো ছাড়া উপায় নেই। কারণ Global South-এর উত্থানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়তো নতুন কোনো জোট তৈরি করা নয়; বরং পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ম কতটা বদলানো যায়, সেটি।

জাতিসংঘে Global South-এর প্রশ্ন: প্রতিনিধিত্ব নাকি ক্ষমতার পুনর্বণ্টন?

জাতিসংঘের জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। সেই সময়ের বিশ্বব্যবস্থা আর আজকের বিশ্বব্যবস্থা এক নয়।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সময় এশিয়া ও আফ্রিকার বহু দেশ তখনও ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে। আজ সেই দেশগুলোর অধিকাংশই স্বাধীন রাষ্ট্র। তাদের জনসংখ্যা বেড়েছে, অর্থনীতি বড় হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ বেড়েছে এবং অনেক দেশ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদের কাঠামো এখনো মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী ক্ষমতার বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে।

এই জায়গাতেই Global South -এর সংস্কারের দাবি জোরালো হয়।

ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। ব্রাজিলও একই ধরনের দাবি করছে। আফ্রিকান দেশগুলোও মহাদেশটির প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা বলছে।

এখানে বিষয়টি শুধু কয়েকটি দেশের পদ পাওয়ার প্রশ্ন নয়।

প্রশ্ন হলো—বিশ্বের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো কি বর্তমান জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করছে?

এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই।

কারণ নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো পরিবর্তন করতে হলে বর্তমান ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি প্রয়োজন। ফলে সংস্কারের দাবি যতই শক্তিশালী হোক, বাস্তবায়নের পথ অত্যন্ত কঠিন।

তবু এই দাবি নিজেই একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

Global South এখন শুধু আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম মেনে চলতে চায় না; তারা নিয়ম তৈরির প্রক্রিয়াতেও বেশি প্রভাব চায়।

IMF ও World Bank নিয়ে অসন্তোষ কেন?

জাতিসংঘের বাইরে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও একই প্রশ্ন আছে।

International Monetary Fund বা IMF এবং World Bank দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।

তাদের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বহু উন্নয়নশীল দেশ আর্থিক সংকট, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসে এসব প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পেয়েছে।

তবে Global South -এর সমালোচনার জায়গাটিও দীর্ঘদিনের।

অনেক উন্নয়নশীল দেশ মনে করে, এসব প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কাঠামোয় তাদের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্ব যথেষ্ট প্রতিফলিত হয় না।

এখানে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব রয়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতিতে একটি দেশের অবদান যদি বাড়ে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার প্রভাব না বাড়ে, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

এই কারণেই quota reform, voting power এবং governance reform-এর মতো বিষয়গুলো Global South -এর আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ।

China-led বিকল্প কি সত্যিই বিকল্প?

এখানে আবার চীনের ভূমিকা সামনে আসে।

চীন নিজস্ব অর্থনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়নে বড় ভূমিকা তৈরি করেছে। Asian Infrastructure Investment Bank, Belt and Road Initiative এবং New Development Bank-এর মতো উদ্যোগগুলো Global South -এর জন্য নতুন অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করেছে।

কিন্তু এগুলোকে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা কতটা বাস্তবসম্মত?

সম্ভবত এখনই নয়।

বিশ্বব্যাংক, IMF, আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক অনেক গভীর।

চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প বা পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু একটি রাতের মধ্যে পুরো আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা বদলে যাবে—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত।

বরং বাস্তব পরিবর্তন হতে পারে ধীরে ধীরে।

উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি একাধিক উৎস থেকে ঋণ, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে, তাহলে তাদের negotiating position শক্তিশালী হতে পারে।

অর্থাৎ Global South-এর শক্তি হয়তো কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের জায়গা দখল করার মধ্যে নয়; বরং বিকল্পের সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে।

G7, BRICS এবং Global South—তিনটি কি একই প্রতিযোগিতার অংশ?

এই তিনটি নাম প্রায়ই একই আলোচনায় আসে, কিন্তু তাদের প্রকৃতি আলাদা।

G7 হলো উন্নত শিল্পোন্নত অর্থনীতির একটি রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ফোরাম।

BRICS হলো বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি সহযোগিতা কাঠামো, যার পরিধি সময়ের সঙ্গে বেড়েছে।

আর Global South হলো আরও বিস্তৃত একটি ধারণা, যার কোনো নির্দিষ্ট সদস্য তালিকা নেই।

তাই G7 বনাম BRICS বনাম Global South—এভাবে তিনটিকে একই স্তরে দাঁড় করানো ঠিক হবে না।

বরং এদের মধ্যে সম্পর্ককে দেখা যায় বিশ্বব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের বিভিন্ন স্তর হিসেবে।

G7 -এর হাতে রয়েছে বিশাল অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক ক্ষমতা।

BRICS -এর শক্তি হলো বিশ্বের বড় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর সমন্বয় এবং বিকল্প অর্থনৈতিক সহযোগিতা গড়ে তোলার চেষ্টা।

Global South -এর শক্তি হলো এর বিস্তৃত জনসংখ্যা, বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ, উন্নয়ন প্রয়োজন এবং সম্মিলিত রাজনৈতিক ও নৈতিক দাবি।

এই তিনটি বাস্তবতা একে অপরকে প্রভাবিত করছে।

NATO-এর সঙ্গে Global South-এর সম্পর্কও কেন গুরুত্বপূর্ণ?

NATO নিয়ে Global South -এর অবস্থান বুঝতে হলে সামরিক জোট এবং রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য বুঝতে হবে।

NATO মূলত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর সদস্যরা নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে কাজ করে।

Global South -এর কোনো এমন সামরিক কাঠামো নেই।

তবে NATO -র নেতৃত্বে থাকা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে Global South-এর বহু দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

এ কারণে আন্তর্জাতিক সংকটে তারা প্রায়ই একটি কঠিন ভারসাম্য বজায় রাখে।

একদিকে আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের নীতি সমর্থন করা, অন্যদিকে কোনো পরাশক্তির কৌশলগত অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত না হওয়া—এই দ্বৈত বাস্তবতা অনেক উন্নয়নশীল দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে দেখা যায়।

এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে strategic flexibility হিসেবে দেখা যায়।

কারণ একটি ছোট বা মাঝারি রাষ্ট্রের জন্য পরাশক্তিগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রতিযোগিতায় কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

নতুন বিশ্বব্যবস্থা কি সত্যিই আসছে?

“New World Order” শব্দটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে নতুন বিশ্বব্যবস্থা তৈরি হওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া।

বর্তমান পরিবর্তনকে তিনটি প্রবণতায় দেখা যেতে পারে।

প্রথমত, multipolarity বা বহুকেন্দ্রিকতা বাড়ছে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিমা দেশগুলোর বাইরে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি, ডেটা, AI, semiconductor এবং critical minerals-এর মতো নতুন সম্পদ ভূরাজনীতির কেন্দ্র হয়ে উঠছে।

এই তিনটি পরিবর্তন Global South -এর গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

কিন্তু বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব মানেই শান্তিপূর্ণ বিশ্ব নয়।

বরং শক্তির কেন্দ্র যত বাড়ে, প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রও তত বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা, ভারত-চীন সম্পর্ক, রাশিয়া-পশ্চিম দ্বন্দ্ব, Indo-Pacific অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি—সবকিছু একই সময়ে চলতে থাকলে ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর জন্য কূটনৈতিক ভারসাম্য আরও কঠিন হবে।

Global South-এর সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ কোথায়?

সুযোগের প্রথম জায়গা হলো বাজার

বিশাল জনসংখ্যা এবং দ্রুত নগরায়ণ Global South-কে ভবিষ্যতের অন্যতম বড় consumer market-এ পরিণত করতে পারে।

দ্বিতীয় সুযোগ হলো উৎপাদন

চীনকেন্দ্রিক supply chain-এর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে বহু আন্তর্জাতিক কোম্পানি ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, মেক্সিকোসহ বিভিন্ন দেশে উৎপাদন বাড়ানোর কথা ভাবছে।

তৃতীয় সুযোগ হলো প্রযুক্তি

AI, fintech, digital public infrastructure, renewable energy এবং biotechnology -এর মতো ক্ষেত্রে Global South -এর দেশগুলো leapfrog করতে পারে।

ভারতের ডিজিটাল পাবলিক অবকাঠামো কিংবা বিভিন্ন আফ্রিকান দেশের mobile payment ecosystem দেখিয়েছে যে সব ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোর পুরোনো পথ অনুসরণ করতেই হবে—এমন নয়।

চতুর্থ সুযোগ হলো South-South cooperation

একটি উন্নয়নশীল দেশের অভিজ্ঞতা অন্য উন্নয়নশীল দেশের জন্য অনেক সময় বেশি প্রাসঙ্গিক হতে পারে।

কৃষি, সস্তা স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল পেমেন্ট, ক্ষুদ্রঋণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো ক্ষেত্রে এক দেশ অন্য দেশের অভিজ্ঞতা গ্রহণ করতে পারে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী?

Global South -এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নিজেদের মধ্যকার বিভাজন।

যদি প্রতিটি দেশ আলাদাভাবে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া বা অন্য শক্তির সঙ্গে দরকষাকষি করে, তাহলে তাদের সম্মিলিত bargaining power সীমিত থাকবে।

আরেকটি ঝুঁকি হলো commodity dependence।

প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই উন্নয়ন নিশ্চিত হয় না। আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সম্পদসমৃদ্ধ হওয়া এবং টেকসই উন্নয়ন অর্জন এক বিষয় নয়।

তৃতীয় ঝুঁকি হলো ঋণ।

অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত ঋণ ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা সীমিত করতে পারে।

চতুর্থ ঝুঁকি হলো প্রযুক্তিগত নির্ভরতা।

যদি Global South শুধু অন্য দেশের AI model, semiconductor, cloud infrastructure এবং digital platform ব্যবহার করে, তাহলে প্রযুক্তিগত সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন থেকেই যাবে।

পঞ্চম ঝুঁকি হলো misinformation ও digital manipulation।

Deepfake, AI-generated content এবং social media manipulation রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এখানে Gen Z ও Gen Alpha-এর মতো ডিজিটাল প্রজন্ম একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ এবং সবচেয়ে বড় পরীক্ষার অংশ।

Global South কি পশ্চিমা ব্যবস্থাকে বদলে দিতে পারবে?

এখানে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উত্তর হলো—পুরোপুরি বদলে দেওয়া সম্ভবত খুব কঠিন; কিন্তু পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব।

বিশ্বব্যবস্থা সাধারণত একদিনে বদলায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি হয়েছিল, সেগুলো এখনো কার্যকর। একই সঙ্গে নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন জোট এবং নতুন অর্থনৈতিক কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে।

BRICS-এর বিস্তার, Asian Infrastructure Investment Bank, New Development Bank, South-South cooperation এবং স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্যের মতো উদ্যোগগুলো দেখাচ্ছে যে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে বিকল্প কাঠামোর চাহিদা আছে।

কিন্তু এগুলো এখনো পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করেনি।

সম্ভবত ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা হবে hybrid

পুরোনো প্রতিষ্ঠান থাকবে, কিন্তু নতুন শক্তির প্রভাব বাড়বে।

ডলার থাকবে, পাশাপাশি অন্যান্য মুদ্রার ব্যবহার বাড়তে পারে।

G7 থাকবে, কিন্তু BRICS ও অন্যান্য আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মের গুরুত্বও বাড়বে।

NATO থাকবে, কিন্তু নিরাপত্তা কাঠামো শুধু ইউরোপকেন্দ্রিক থাকবে না।

আর Global South থাকবে এমন একটি বৃহৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর হিসেবে, যার সদস্যদের স্বার্থ সবসময় এক না হলেও তাদের সম্মিলিত bargaining power ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের অর্থ কী?

বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এই পরিবর্তন একটি কৌশলগত সুযোগ।

বাংলাদেশকে কোনো একটি শক্তির সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ বেঁধে না রেখে বহুমুখী সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী সম্পর্ক, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক, ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি—সবকিছুর মধ্যে ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ASEAN, BIMSTEC, SAARC, OIC এবং Global South -এর অন্যান্য বহুপাক্ষিক কাঠামোতেও সক্রিয় থাকা বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিসর বাড়াতে পারে।

এখানে মূল বিষয় হলো—কোনো পক্ষের “শিবির” হওয়া নয়; বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থের জায়গা শক্ত করা।

বাংলাদেশের জন্য climate diplomacy -ও গুরুত্বপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি দেশ হিসেবে বাংলাদেশ Global South -এর climate justice agenda -তে একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হতে পারে।

একইভাবে তৈরি পোশাক, শ্রমবাজার, খাদ্য নিরাপত্তা, AI governance ও digital economy নিয়েও বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

তবে এই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

শক্তিশালী অর্থনীতি ছাড়া শক্তিশালী কূটনীতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ছাড়া AI যুগে কৌশলগত স্বাধীনতা অর্জন কঠিন।

দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া তরুণ জনসংখ্যা demographic dividend -এ পরিণত হয় না।

আর প্রতিষ্ঠানগত স্থিতিশীলতা ছাড়া আন্তর্জাতিক আস্থাও টেকসই হয় না।

অর্থাৎ Global South -এর উত্থান বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করলেও সেই সুযোগ কাজে লাগানোর দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিজের।

এবং এখানেই Global South -এর সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আবার ফিরে আসে—বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো কি শুধু নতুন বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক বদলাবে, নাকি নিজেরাই এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে যেখানে ক্ষমতার বণ্টন আরও ন্যায্য হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু BRICS বা G7 -এর বৈঠকে পাওয়া যাবে না। এর উত্তর নির্ধারিত হবে আগামী দিনের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু, বাণিজ্য এবং কূটনীতির বাস্তব ফলাফলে।

Global South-এর ভবিষ্যৎ: নতুন শক্তি, নাকি নতুন দরকষাকষির যুগ?

শেষ পর্যন্ত Global South -কে বোঝার সবচেয়ে কার্যকর উপায় সম্ভবত এটিকে কোনো নতুন “জোট” হিসেবে না দেখে একটি পরিবর্তনশীল শক্তিক্ষেত্র হিসেবে দেখা।

কারণ Global South-এর দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যবস্থা এক নয়, অর্থনীতি এক নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয় এক নয়, এমনকি বৈদেশিক নীতির অগ্রাধিকারও এক নয়। ভারত ও ব্রাজিলের স্বার্থ যেমন এক নয়, তেমনি বাংলাদেশের বাস্তবতা ইন্দোনেশিয়া বা নাইজেরিয়ার সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

তবু তাদের মধ্যে একটি অভিন্ন অভিজ্ঞতা রয়েছে—বিশ্বব্যবস্থার সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা অনেক সময় নিজেদের অর্থনৈতিক ও জনসংখ্যাগত গুরুত্বের তুলনায় কম প্রভাবশালী মনে করে।

এই জায়গাটিই Global South -এর রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তি।

Global South কি একদিন একক শক্তিতে পরিণত হবে?

সম্ভাবনা আছে, কিন্তু সেটি সম্ভবত একটি একক সামরিক বা রাজনৈতিক জোটের আকারে হবে না।

বরং ভবিষ্যতে Global South -এর শক্তি দেখা যেতে পারে বিভিন্ন ইস্যুভিত্তিক জোটে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে এক ধরনের সহযোগিতা, বাণিজ্যে আরেক ধরনের সমন্বয়, প্রযুক্তিতে অন্য ধরনের অংশীদারত্ব এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় ভিন্ন প্ল্যাটফর্ম—এমন একটি বহুস্তরীয় সহযোগিতা তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ Global South -এর ভবিষ্যৎ হয়তো “একসঙ্গে সব বিষয়ে এক অবস্থান” নয়।

বরং যে বিষয়ে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে, সে বিষয়ে একসঙ্গে দরকষাকষি।

এটি অনেক বেশি বাস্তবসম্মত মডেল।

BRICS এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হলেও BRICS নিজেই Global South -এর সমার্থক নয়। একইভাবে G7 উন্নত বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হলেও পুরো পশ্চিমা বিশ্বকে G7 দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

আর NATO তো মূলত নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার কাঠামো।

তাই আগামী দিনের বিশ্বকে শুধু “G7 বনাম BRICS” বা “পশ্চিম বনাম Global South”—এই দ্বৈত কাঠামোয় দেখলে বাস্তবতার বড় অংশ বাদ পড়ে যাবে।

বিশ্ব সম্ভবত আরও জটিল হবে।

ভবিষ্যতের ভূরাজনীতি হবে “একসঙ্গে অনেক সম্পর্কের” রাজনীতি

একটি দেশের জন্য আগামী দিনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতাগুলোর একটি হতে পারে strategic flexibility

একটি দেশ একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রযুক্তি সহযোগিতা করতে পারে, চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে পারে, ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও যোগাযোগ নিয়ে কাজ করতে পারে, ইউরোপের সঙ্গে রপ্তানি সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে এবং BRICS-সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মেও যুক্ত হতে পারে।

এটি পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তব আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন সম্পর্ক ক্রমেই স্বাভাবিক হচ্ছে।

কারণ কোনো দেশই এখন সব প্রয়োজন একটি মাত্র অংশীদারের কাছ থেকে পূরণ করতে পারে না।

জ্বালানি এক জায়গা থেকে, প্রযুক্তি অন্য জায়গা থেকে, বাজার আরেক জায়গা থেকে এবং বিনিয়োগ অন্য কোনো দেশ থেকে আসতে পারে।

এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতি শুধু আদর্শের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও জাতীয় স্বার্থের সমন্বিত হিসাব।

Global South -এর অনেক দেশ এই নতুন কৌশল গ্রহণ করছে।

Gen Z ও Gen Alpha কি এই পরিবর্তনের সামাজিক ভিত্তি তৈরি করবে?

ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে একটি বিষয় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়—মানুষ।

কিন্তু Global South -এর সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ হতে পারে তার তরুণ জনগোষ্ঠী।

Gen Z এমন এক প্রজন্ম, যারা জাতীয় সীমারেখার পাশাপাশি ডিজিটাল বিশ্বের মধ্যেও বেড়ে উঠেছে। তাদের কাছে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি, বিদেশি ব্র্যান্ড, বৈশ্বিক বিনোদন, AI tools এবং social media স্বাভাবিক জীবনের অংশ।

তাদের পরের প্রজন্ম Gen Alpha আরও গভীরভাবে AI -নির্ভর পরিবেশে বড় হচ্ছে।

ফলে আগামী দিনের Global South -এর নাগরিকেরা আগের প্রজন্মের তুলনায় আন্তর্জাতিক বিশ্বের সঙ্গে আরও সরাসরি যুক্ত থাকবে।

একজন তরুণ বাংলাদেশের উদ্যোক্তা ভারতের বাজারে কাজ করতে পারে, চীনের supply chain ব্যবহার করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের cloud infrastructure ব্যবহার করতে পারে এবং ইউরোপে পণ্য রপ্তানি করতে পারে—সবকিছু একই ব্যবসার অংশ হিসেবে।

এই বাস্তবতা রাষ্ট্রের প্রচলিত সীমানাকে অর্থনৈতিকভাবে আরও নমনীয় করে তুলছে।

তবে একই সঙ্গে নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে।

AI-generated misinformation, deepfake, cybercrime এবং Dark Web -ভিত্তিক অপরাধের বিস্তার ডিজিটাল সমাজকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করতে পারে।

তাই Global South-এর ভবিষ্যৎ শুধু তরুণ জনসংখ্যা কত বড় তার ওপর নির্ভর করবে না।

নির্ভর করবে তাদের কতটা দক্ষ, শিক্ষিত, প্রযুক্তিবান্ধব এবং critical thinker হিসেবে গড়ে তোলা যায় তার ওপর।

AI যুগে Global South কি শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী থাকবে?

এটি সম্ভবত আগামী দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত AI model, semiconductor technology এবং computing infrastructure-এর বড় অংশ কয়েকটি উন্নত অর্থনীতি ও প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে কেন্দ্রীভূত।

Global South যদি শুধু এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে, তাহলে পুরোনো অর্থনৈতিক নির্ভরতার নতুন ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি হতে পারে।

একসময় উন্নয়নশীল দেশগুলো কাঁচামাল রপ্তানি করত এবং উন্নত দেশ থেকে প্রযুক্তি কিনত।

ভবিষ্যতে একই কাঠামো হতে পারে—

data Global South থেকে যাবে, কিন্তু AI value তৈরি হবে অন্য কোথাও।

এই ঝুঁকি এড়াতে স্থানীয় AI ecosystem তৈরি, নিজস্ব ভাষার data, দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা এবং regional technology cooperation গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলা ভাষার AI থেকে আফ্রিকান ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি—এই ক্ষেত্রগুলোতে Global South-এর নিজস্ব প্রয়োজন পশ্চিমা বাজারের চেয়ে অনেক আলাদা।

এখানে নতুন ধরনের technological sovereignty -এর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

Global South-এর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা: বিকল্প তৈরি করা

Global South যদি সত্যিই শক্তিশালী হতে চায়, তাহলে শুধু পশ্চিমা ব্যবস্থার সমালোচনা যথেষ্ট হবে না।

প্রয়োজন বিকল্প তৈরি করা।

শুধু ডলার ব্যবস্থার সমালোচনা নয়—নিরাপদ ও কার্যকর বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

শুধু IMF -এর সমালোচনা নয়—উন্নয়ন অর্থায়নের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

শুধু পশ্চিমা প্রযুক্তির সমালোচনা নয়—নিজস্ব প্রযুক্তি, গবেষণা ও মানবসম্পদ গড়ে তুলতে হবে।

শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রতিনিধিত্ব দাবি নয়—যেসব দেশ নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উঠে আসছে, তাদের নিজেদের মধ্যেও সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

এই জায়গায় BRICS -এর ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যদি BRICS শুধু রাজনৈতিক বিবৃতির প্ল্যাটফর্ম হয়ে থাকে, তাহলে এর প্রভাব সীমিত থাকবে।

কিন্তু যদি এটি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো সহযোগিতার বাস্তব কাঠামো তৈরি করতে পারে, তাহলে Global South -এর bargaining power বাড়বে।

তবু এখানেও বাস্তবতা হলো—সদস্য দেশগুলোর স্বার্থের পার্থক্য অনেক।

তাই BRICS -এর সাফল্য নির্ভর করবে তারা কতটা বাস্তব সহযোগিতা তৈরি করতে পারে তার ওপর।

G7 কি তাহলে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে?

না।

এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।

G7 -এর দেশগুলো এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আর্থিক বাজার, প্রতিরক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বিপুল প্রভাব রাখে।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও আর্থিক শক্তি, ইউরোপের বিশাল বাজার এবং জাপানের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা—এসবের কারণে G7 দীর্ঘ সময় গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।

বরং ভবিষ্যতের পরিবর্তনটি সম্ভবত G7-এর বিলুপ্তি নয়।

পরিবর্তনটি হবে G7-এর একচ্ছত্র প্রভাবের পাশে আরও অনেক শক্তির উত্থান।

এখানেই multipolar world-এর ধারণা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একটি বহুকেন্দ্রিক বিশ্বে কোনো একটি দেশ বা জোট সব বিষয়ে নেতৃত্ব দেবে না।

কখনো G7 গুরুত্বপূর্ণ হবে, কখনো BRICS, কখনো ASEAN, কখনো African Union, কখনো আঞ্চলিক জোট বা নির্দিষ্ট ইস্যুভিত্তিক অংশীদারিত্ব।

রাষ্ট্রগুলোও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করবে।

NATO-এর ভবিষ্যৎ এবং Global South

NATO -ও এই পরিবর্তনের বাইরে থাকবে না।

ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো, রাশিয়া-পশ্চিম সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকা এবং Indo-Pacific অঞ্চলের কৌশলগত প্রতিযোগিতা NATO-কে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে।

কিন্তু Global South -এর দেশগুলোর বড় অংশ NATO -এর সদস্য নয় এবং হওয়ার প্রয়োজনও নেই।

তাদের জন্য মূল বিষয় হলো নিরাপত্তা কাঠামোতে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করা।

Indo-Pacific অঞ্চলে সমুদ্রপথ, বাণিজ্য, জ্বালানি, critical minerals এবং supply chain নিরাপত্তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকার উপকূলীয় দেশগুলোর জন্য এসব বিষয় সরাসরি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত।

অতএব Global South -এর নিরাপত্তা ভবিষ্যতে শুধু সামরিক শক্তির প্রশ্ন হবে না।

এটি হবে economic security + food security + energy security + cyber security + climate security—সবকিছুর সমন্বয়।

তাহলে Global South কি সত্যিই নতুন বিশ্বশক্তি?

সম্ভবত সবচেয়ে সঠিক উত্তর হলো—Global South নিজে কোনো একক বিশ্বশক্তি নয়; কিন্তু Global South-এর সম্মিলিত গুরুত্বকে উপেক্ষা করার সুযোগও আর আগের মতো নেই।

বিশ্বের জনসংখ্যার বড় অংশ এখানে।

বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন ও ভোক্তা বাজারের বড় অংশ এখানে।

প্রাকৃতিক সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ এখানে।

ভবিষ্যতের তরুণ workforce -এর বড় অংশ এখানে।

আর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশও এই অঞ্চলের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এই বাস্তবতাগুলো Global South-কে রাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

কিন্তু শক্তিশালী হওয়ার জন্য শুধু সম্পদ বা জনসংখ্যা যথেষ্ট নয়।

প্রয়োজন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, প্রযুক্তি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

এখানেই Global South -এর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো “ক্ষমতার বিস্তার”

গত শতকের বিশ্ব রাজনীতিকে অনেকাংশে কয়েকটি শক্তিকেন্দ্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যেত।

আজ সেই চিত্র বদলাচ্ছে।

চীন একটি বড় শক্তি।

ভারত দ্রুত উঠে আসছে।

ইন্দোনেশিয়া আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বাড়াচ্ছে।

ব্রাজিল লাতিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।

আফ্রিকার জনসংখ্যা ও বাজারের গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও বিনিয়োগ শক্তি এখনো গুরুত্বপূর্ণ।

আর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় শক্তিগুলোও তাদের অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা ধরে রেখেছে।

অর্থাৎ বিশ্ব এখন এমন একটি পর্যায়ে যাচ্ছে যেখানে ক্ষমতা শুধু এক জায়গায় জমা থাকছে না।

এটাই Global South-এর উত্থানের সবচেয়ে বড় অর্থ।

শেষ কথা: Global South আসলে কী বদলাচ্ছে?

Global South হয়তো রাতারাতি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা বদলে দেবে না।

BRICS হয়তো ডলারকে সরিয়ে দেবে না।

G7 হয়তো অদৃশ্য হয়ে যাবে না।

NATO হয়তো দুর্বল হয়ে পড়বে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

কিন্তু এর মধ্যেও একটি পরিবর্তন ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান।

বিশ্বের অনেক দেশ এখন আর কোনো একটি শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে নিজেদের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণভাবে বেঁধে রাখতে চাইছে না।

তারা বিকল্প চাইছে।

বাজারে বিকল্প, বিনিয়োগে বিকল্প, প্রযুক্তিতে বিকল্প, কূটনীতিতে বিকল্প এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বিকল্প।

এই পরিবর্তনই Global South -এর সবচেয়ে বড় শক্তি।

আর ভবিষ্যতের বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সম্ভবত হবে না—“কে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে?”

বরং প্রশ্নটি হবে—

“কে কাকে কতটা প্রভাবিত করতে পারবে, আর কোন দেশ নিজের স্বার্থ রক্ষায় কতটা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে?”

সেই অর্থে Global South কোনো একক ব্লক নয়।

এটি একটি পরিবর্তনশীল বাস্তবতা—যেখানে ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, বাংলাদেশ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বহু দেশ নিজেদের জায়গা নতুন করে নির্ধারণ করছে।

আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি, প্রযুক্তি, কূটনীতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যও।

হয়তো এটাই Global South -এর সবচেয়ে বড় গল্প:

বিশ্বব্যবস্থা আর শুধু কয়েকটি শক্তির গল্প নয়—ক্ষমতার টেবিলে এখন আরও অনেক কণ্ঠস্বর জায়গা করে নিতে চাইছে।

কিন্তু সেই কণ্ঠস্বরগুলো কতটা শক্তিশালী হবে, তা নির্ভর করবে তারা শুধু নিজেদের সংখ্যা দেখাবে, নাকি সেই সংখ্যাকে অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক প্রভাবেও রূপান্তর করতে পারবে।

সেখানেই Global South -এর আসল ভবিষ্যৎ।