২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের ১০ বছর পূর্তিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান

২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর গত এক দশকে তুরস্কের রাজনৈতিক কাঠামো, সামরিক প্রভাব ও ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।

২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের এক দশক পর তুরস্কে কী বদলেছে? সেনাবাহিনীর প্রভাব থেকে প্রেসিডেন্টের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের বিশ্লেষণ।

১৬ জুলাই | আঙ্কারা-ইস্তানবুল | TheBuzzLens

মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটি অভ্যুত্থানচেষ্টা কীভাবে একটা গোটা জাতির রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিতে পারে — তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ তুরস্ক। ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী রাতের ১০ বছর পূর্তিতে দেখা যাচ্ছে, এর প্রভাব শুধু সেদিনের মৃত্যু আর ধ্বংসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি — বরং গত এক দশকে পুরো তুর্কি রাজনীতিকেই নতুন করে সাজিয়েছে।

ব্যাপক শুদ্ধি অভিযান

অভ্যুত্থানচেষ্টার জন্য সরকার তখন দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ধর্মগুরু ফেতুল্লাহ গুলেনের নেটওয়ার্ককে, যিনি ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অভিযোগ অস্বীকার করে গেছেন। এর জেরে জারি হওয়া জরুরি অবস্থা ২০১৮ সাল পর্যন্ত সাতবার মেয়াদ বাড়িয়ে বলবৎ রাখা হয়। হাজার হাজার সেনাসদস্য, বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারীকে গ্রেপ্তার বা বরখাস্ত করা হয়, বন্ধ হয়ে যায় শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

এরদোয়ানের হাতে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ

বিশ্লেষকদের মতে অভ্যুত্থানচেষ্টার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল রাজনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তন। ২০১৭ সালে অল্প ব্যবধানে ভোটাররা সংসদীয় ব্যবস্থা বাতিল করে শক্তিশালী প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থার পক্ষে রায় দেন, যা কার্যকর হয় পরের বছর। প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফ্রিডম হাউজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই ব্যবস্থায় আইনপ্রণেতাদের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে, আর প্রেসিডেন্ট প্রায়ই স্বাধীন সরকারি সংস্থার কাজে হস্তক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কর্তৃত্ববাদ ও ভিন্নমত দমনের অভিযোগ

গুলেন-সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে হাজার হাজার বিচারক-প্রসিকিউটরকে অপসারণের পর মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। ২০২৬ সালের রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের সূচকে ১৮০ দেশের মধ্যে তুরস্কের অবস্থান ১৬৩তম। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা— ইস্তানবুলের মেয়র একরেম ইমামোগলু, যাকে এরদোয়ানের সবচেয়ে শক্তিশালী সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করা হয়, ২০২৫ সালের মার্চে দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এবং তার বিচার এখনো চলছে। ২০২৬ সালের মে মাসে আদালতের এক আদেশ প্রধান বিরোধী দল সিএইচপি-র নেতৃত্বেও হস্তক্ষেপ করে, যাকে বিরোধীরা ‘বিচারিক অভ্যুত্থান’ বলে অভিহিত করেছে।

সেনাবাহিনীর যুগের অবসান

দশকের পর দশক ধরে নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্রের অভিভাবক মনে করা তুর্কি সামরিক বাহিনী এখন সম্পূর্ণভাবে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে। বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ জুলাই ছিল আধুনিক তুর্কি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যখন সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে একটি সামরিক হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করেছিল, আর সেই থেকে রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের যুগ কার্যত শেষ হয়ে গেছে।

বদলে যাওয়া পররাষ্ট্রনীতি

অভ্যুত্থানচেষ্টার পর তুরস্ক উত্তর সিরিয়ায় তিনটি বড় সামরিক অভিযান চালায় আইএস ও ওয়াইপিজি-র বিরুদ্ধে। একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় বিরোধ তৈরি হয়, যার ফলে ওয়াশিংটন তুরস্ককে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বাদ দেয়। তবে সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন, যদিও কংগ্রেসে এর বিরোধিতার সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদানের প্রক্রিয়া ২০১৮ সাল থেকেই কার্যত থমকে আছে।

💬 আপনার মতামত জানান


এক রাতের ঘটনা কীভাবে একটা জাতির পুরো রাজনৈতিক কাঠামো বদলে দিতে পারে— এই ইতিহাস থেকে আপনার পর্যবেক্ষণ কী? মতামত জানান কমেন্টে 👇

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *