Trump-on-Hit-List

এক রাতে ২৮টি ইরানি নৌযান ধ্বংস, তেলের বাজারেও কাঁপন — ঠিক কী ঘটছে হরমুজে?

৯ জুলাই | আঙ্কারা-তেহরান | TheBuzzLens

তুরস্কের আঙ্কারায় চলমান ন্যাটো সম্মেলনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংকট নতুন করে বিস্ফোরক মোড় নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি তার কাছে এখন কার্যত শেষ, আর তেহরানের সঙ্গে আর দর কষাকষি করা স্রেফ সময়ের অপচয়। এই ঘোষণার কিছু ঘণ্টার মধ্যেই মাটিতে বাস্তবায়িত হয়েছে বাস্তব সামরিক পদক্ষেপ।

রাজনৈতিক অ্যাঙ্গেল: ট্রাম্পের কড়া ভাষা ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি স্বীকার :
সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ইরানি নেতৃত্বকে বর্ণনা করতে ট্রাম্প একের পর এক কঠোর শব্দ ব্যবহার করেন — অসুস্থ, মন্দ, প্রতারক। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি নিজের ব্যক্তিগত ঝুঁকির কথাও খোলাখুলি স্বীকার করেছেন, জানিয়েছেন ইরানের হিট লিস্টে তিনি নিজেই এখন শীর্ষে। তবে তার বক্তব্যে একটা স্ববিরোধিতাও স্পষ্ট — একদিকে চুক্তি শেষের ঘোষণা, অন্যদিকে তিনি মনে করেন না যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নতুন করে শুরু হবে। ইরান শহীদ প্রধান নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজায় লাখো মানুষের প্রতিশোধের হুংকারের মধ্যেই এই মন্তব্য এলো, যা পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে।

কূটনৈতিক অ্যাঙ্গেল: চুক্তি ভাঙার আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত :
জুনে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়া হয়েছিল এবং হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পারমাণবিক কর্মসূচি ও প্রণালী ব্যবস্থাপনার মতো জটিল প্রশ্নগুলো ৬০ দিনের আলোচনার জন্য মুলতবি রাখা হয়েছিল। এখন উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে এই চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে। সেন্টকম আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, ৭ জুলাই ৮০-এর বেশি লক্ষ্যবস্তুতে প্রথম দফা হামলার পর দ্বিতীয় দফায় বান্দার আব্বাস, সিরিক, কেশম, বুশেহর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আক-কালাসহ একাধিক স্থানে হামলা চালানো হয়, যাতে মোট লক্ষ্যবস্তুর সংখ্যা প্রায় ৯০-এ পৌঁছায়। জবাবে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “আমরা মাথা নত করি না” — যা কূটনৈতিক সমাধানের পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক অ্যাঙ্গেল: তেলের বাজারে কম্পন :
এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে। যুদ্ধবিরতি শেষের ঘোষণার পরপরই আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) বাড়ে সাড়ে ৪ শতাংশের বেশি। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল বাণিজ্য যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিচালিত হয়, সেখানে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কায় বাজার সতর্ক অবস্থানে চলে গেছে। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো খার্গ দ্বীপ — ইরানের মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ যেখান দিয়ে হয় — যেখানে হামলার খবর নিশ্চিত করেছেন স্বয়ং ট্রাম্প। তিনি সরাসরি হুমকি দিয়েছেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপ দখলও করে নিতে পারে।

সামরিক বাস্তবতা: রণক্ষেত্রে যা ঘটছে :
আগের রাতে প্রায় ২৮টি ইরানি নৌযান বা মাইন-স্থাপনকারী বোট ধ্বংস করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেন্টকমের ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা বিঘ্নিত করার ইরানি সক্ষমতা আরও দুর্বল করাই মূল লক্ষ্য। বান্দার আব্বাস ও সিরিকের আশপাশে নতুন করে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে, আর ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে বান্দার আব্বাস ও কেশমের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে হামলা মোকাবিলা করছে।

এরপর কী?
পার্লামেন্ট স্পিকার কালিবাফের অনড় অবস্থান আর ট্রাম্পের একের পর এক হুমকি বিবেচনায়, বিশ্লেষকরা মনে করছেন কূটনীতির সুযোগ থাকলেও তা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। যদিও অতীতে ট্রাম্প একাধিকবার নিজের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন, তবে হামলার মাত্রা ও পূর্বপরিকল্পনার স্পষ্টতা দেখে অনেকেই মনে করছেন, চুক্তি সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার।

💬 আপনার মতামত জানান
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান এই নতুন সংঘাত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেবে বলে মনে করেন? মতামত জানান কমেন্টে 👇

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *