গ্যাস সংকট নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন রুহুল কবির রিজভী।
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | বাজলেন্স ডেস্ক
দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সংকট আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। তাঁর দাবি, সংকটটি শুধু বাংলাদেশের নয়; বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবও এর সঙ্গে জড়িত।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ কথা বলেন।
রিজভী বলেন, মহেশখালীর গ্যাস টার্মিনালে যে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, তা মেরামত করা হয়েছে। টার্মিনালে পর্যাপ্ত গ্যাস পুনরায় সরবরাহ করা গেলে আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমানে বাসাবাড়িতে গ্যাসের চাপ কম থাকলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে। একই সঙ্গে মিল-কারখানায়ও পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা জানান তিনি।
আরও পড়তে পারেন : ‘টুকু আসে, টুকু যায়, কতক্ষণ থাকে তা বোঝাই যায় না’: রুমিন ফারহানা
‘গ্যাস সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়’
রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য, বর্তমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকটকে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিরও এর ওপর প্রভাব রয়েছে।
বিশেষ করে LNG বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের ওঠানামা দেশের গ্যাস সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থায় দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি আমদানি করা LNG গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে LNG কার্গো সময়মতো পাওয়া, জাহাজ চলাচল, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং সরবরাহ চেইনের স্থিতিশীলতা—সবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়তে পারেন : LNG কী? Liquefied Natural Gas কীভাবে বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্য বদলে দিয়েছে?
মহেশখালীর টার্মিনাল কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশে আমদানি করা LNG সমুদ্রপথে এনে FSRU বা Floating Storage and Regasification Unit-এর মাধ্যমে গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। মহেশখালীর LNG টার্মিনাল ব্যবস্থায় কোনো কারিগরি সমস্যা দেখা দিলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে যেতে পারে।
জুলাইয়ে মহেশখালীর LNG টার্মিনালে কারিগরি সমস্যার কারণে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে যাওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
আগস্টে LNG সরবরাহ ও রিগ্যাসিফিকেশনেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছিল। পরে সেপ্টেম্বরের জন্য অতিরিক্ত LNG কার্গো আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পেট্রোবাংলার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসে ১০টি LNG কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে; এর মধ্যে আটটির ব্যবস্থা ইতোমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন : Supply Chain কী? China থেকে Bangladesh—বিশ্ববাণিজ্যের অদৃশ্য অবকাঠামো কীভাবে কাজ করে?
বৈশ্বিক Energy Geopolitics-ও কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে মহেশখালীর টার্মিনালের কারিগরি সমস্যার কথা এসেছে। কিন্তু এর পাশাপাশি বৃহত্তর Energy Geopolitics-ও বাংলাদেশের মতো LNG আমদানিনির্ভর দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে LNG সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে Strait of Hormuz বা হরমুজ প্রণালি বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় সেখানে উত্তেজনা বাড়লে তেল ও LNG পরিবহন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে LNG কার্গো বিকল্প পদ্ধতিতে স্থানান্তরের ঘটনাও ঘটছে। এর প্রভাব আন্তর্জাতিক LNG বাজারে পড়েছে এবং এশিয়ার স্পট LNG-এর দামও বেড়েছে।
অর্থাৎ, একটি LNG কার্গোর ক্ষেত্রে শুধু গ্যাস কেনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। উৎপাদনকারী দেশ থেকে জাহাজে LNG তোলা, নির্দিষ্ট সমুদ্রপথে পরিবহন, বীমা, জাহাজের নিরাপত্তা এবং বন্দরে পৌঁছানো—পুরো global energy supply chain-এর স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়তে পারেন : Strait of Hormuz কী? বিশ্বের জ্বালানি রাজনীতিতে এই সরু জলপথ এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
বাংলাদেশ কেন বেশি সংবেদনশীল?
বাংলাদেশের নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরে কমছে। একই সময়ে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। ফলে LNG আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।
জুলাইয়ে গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় নতুন শিল্প সংযোগ ও বিদ্যমান সংযোগের লোড বাড়ানোর অনুমোদন স্থগিত করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং সীমিত LNG আমদানি সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করেছে।
সেপ্টেম্বরে বাড়তি LNG কার্গো আনার উদ্যোগ তাই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, নতুন কার্গোগুলোর বড় অংশ স্পট মার্কেট থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তবে স্পট মার্কেটের ওপর বেশি নির্ভরতারও ঝুঁকি রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে একই পরিমাণ LNG কিনতে বাংলাদেশের বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতে পারে।
আরও পড়তে পারেন : Chokepoint কী? একটি সরু পথ বন্ধ হলেই কেন কেঁপে ওঠে বিশ্ববাণিজ্য?
হরমুজ সংকটের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্যাস ঘাটতির সরাসরি সম্পর্ক আছে?
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি।
বর্তমান গ্যাস সংকটের পুরোটা হরমুজ প্রণালির সমস্যার কারণে—এমন দাবি করার মতো তথ্য নেই। মহেশখালী LNG টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এবং দেশে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি সংকটের তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপটের অংশ।
তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অস্থিরতা LNG সরবরাহ, জাহাজ চলাচল ও মূল্যকে প্রভাবিত করতে পারে। আর বাংলাদেশ যেহেতু LNG আমদানি করে, তাই বৈশ্বিক Supply Chain-এ বড় ধরনের বিঘ্ন হলে তার পরোক্ষ প্রভাব দেশের ওপর পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
আরও পড়তে পারেন : Energy Geopolitics কী? তেল-গ্যাস কীভাবে যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করে?
এক–দেড় সপ্তাহ পর কি সত্যিই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে?
রিজভী আগামী এক থেকে দেড় সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। তবে বাস্তবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না, তা নির্ভর করবে LNG কার্গো সময়মতো দেশে আসা, টার্মিনালের সক্ষমতা, গ্যাসের জাতীয় উৎপাদন এবং বিতরণ ব্যবস্থার ওপর।
সরকার সেপ্টেম্বর মাসে একাধিক LNG কার্গো আনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি জরুরি LNG ও জ্বালানি কেনার জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন রিজভী।
ফলে এখন নজর থাকবে দুটি বিষয়ের দিকে—LNG সরবরাহ কত দ্রুত বাড়ে এবং জাতীয় গ্রিডে সেই গ্যাস কতটা কার্যকরভাবে পৌঁছায়।
সংকটের রাজনৈতিক বার্তাও আছে
রিজভী বলেন, সরকার সংকট মোকাবিলায় বসে নেই এবং জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। একই সঙ্গে সংকটকে রাজনৈতিকভাবে পুঁজি করে ‘ঘোলা পানিতে মাছ শিকার’ না করার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্যের বাইরে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করছে না। LNG আমদানি, আন্তর্জাতিক বাজার, বৈশ্বিক জ্বালানি রাজনীতি এবং সমুদ্রপথের নিরাপত্তা—সবকিছুই ধীরে ধীরে বাংলাদেশের energy security-এর অংশ হয়ে উঠছে।
তাই আগামী এক–দেড় সপ্তাহে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন হয়ে থাকছে—দেশীয় গ্যাস উৎপাদন, LNG আমদানি সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক energy supply chain-এর ঝুঁকি কীভাবে সামলানো হবে।
