রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট নিয়ে প্রশ্ন

সিদ্ধার্থের পরনের শার্ট নিয়ে পরিবারের বক্তব্য ও পুলিশের ব্যাখ্যায় তৈরি হয়েছে প্রশ্ন।

পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় সিদ্ধার্থের গায়ে গেঞ্জি ছিল বলে দাবি করেছেন তার বাবা। পরে শার্ট পরা অবস্থায় তাকে দেখা যায়। একই ধরনের শার্ট পরা ছিলেন এক পুলিশ কর্মকর্তাও।

২৫ আগস্ট, ২০২৬ : বাজলেন্স ডেস্ক

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ দাসের পরনের শার্ট নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পরিবারের দাবি, পুলিশ যখন তাকে আটক করে তখন তার গায়ে ছিল শুধু একটি কালো-ঘিয়া রঙের গেঞ্জি। কিন্তু পরে সাংবাদিকদের সামনে আনা হলে তার পরনে দেখা যায় একটি নকশার শার্ট। একই ধরনের শার্ট পরা অবস্থায় ঘটনাস্থলে ছিলেন রংপুর ডিবির কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা শুরু হয়েছে।

তবে পুলিশ কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তী বিষয়টিকে নিছক কাকতালীয় বলে দাবি করেছেন। তার ভাষ্য, একই ধরনের শার্ট অনেকের কাছেই থাকতে পারে এবং সিদ্ধার্থের শার্টের সঙ্গে তার শার্টের কোনো সম্পর্ক নেই।

আরও পড়তে পারেন : ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ পুলিশের এএসআই গ্রেপ্তার

‘তখন তার গায়ে একটি গেঞ্জি ছিল’

সোমবার বিকেলে ছেলের পরনের শার্ট নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সিদ্ধার্থের বাবা বিনয় দাস বলেন, ভোররাতে পুলিশ তার বাড়িতে এসে সিদ্ধার্থের খোঁজ করে। পরে তিনি নিজেই চাচার বাড়ি থেকে ছেলেকে ঘুম থেকে ডেকে পুলিশের হাতে তুলে দেন।

বিনয়ের দাবি, পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় সিদ্ধার্থের গায়ে কোনো শার্ট ছিল না। তার পরনে ছিল একটি গেঞ্জি।

তিনি বলেন, পরে সাংবাদিকদের সামনে ছেলেকে দেখতে গিয়ে তার গায়ে একটি শার্ট দেখতে পান। ওই শার্ট সিদ্ধার্থের নিজের নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

সিদ্ধার্থের বড় ভাই পার্থ দাসও একই বক্তব্য দিয়েছেন। তার ভাষ্য, আটকের সময় ভাইয়ের গায়ে ঘিয়া রঙের গেঞ্জি ছিল এবং ওই নকশার কোনো শার্ট সিদ্ধার্থের কখনো ছিল না। শার্টটি কীভাবে তার গায়ে এল, সে বিষয়ে পুলিশই ভালো বলতে পারবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরও পড়তে পারেন : ‘স্যার’ ও ‘কাকি’ ডাকত যারা, তারাই একে একে চারজনকে হত্যা: এরপর খেজুর-শসা খাওয়ার দাবি পুলিশের

একই ধরনের শার্ট পরা ছিলেন ডিবি কর্মকর্তা

বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে দেখা যায়, ঘটনাস্থলে তদন্ত কার্যক্রমে থাকা রংপুর মহানগর পুলিশের ডিবি কর্মকর্তা সনাতন চক্রবর্তীর পরনেও একই ধরনের রঙ ও নকশার শার্ট ছিল।

পরে সিদ্ধার্থকে যখন পুলিশের হেফাজত থেকে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়, তখন তার পরনেও একই ধরনের শার্ট দেখা যায়। এ নিয়েই সামাজিক মাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।

তবে এখানেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো—শার্টের মিল পাওয়া গেছে বলেই এর সঙ্গে কোনো অপরাধ বা তদন্তে অনিয়মের সম্পর্ক প্রমাণিত হয় না। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে এমন কোনো স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

আরও পড়তে পারেন : ‘রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে ফ্যামিলি কার্ড!” বিএনপি নেতার প্রস্তাব

পুলিশের বক্তব্য: ‘এটি কাকতালীয়’

অভিযোগ ও প্রশ্নের বিষয়ে সনাতন চক্রবর্তী বলেছেন, সিদ্ধার্থের পরনের শার্টটি দেখতে তার শার্টের মতো হলেও দুটো আলাদা শার্ট।

তার দাবি, তিনি যে শার্টটি পরেছিলেন সেটি আড়ং থেকে কেনা। একই ধরনের ডিজাইনের শার্ট অনেক মানুষের কাছেই থাকতে পারে।

সনাতন আরও বলেন, তার নিজের শার্ট এবং সিদ্ধার্থের শার্ট দুটিই আলাদা এবং এর মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি অভিযোগ করেন, শার্টের বিষয়টি সামনে এনে তদন্তকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

আরও পড়তে পারেন : সিলেটে এত ছিনতাই, ধরা পড়ছে কারা—আর কারা থাকছে আড়ালে?

তাহলে প্রশ্নটা কোথায়?

এখানে মূল প্রশ্নটি শার্ট একই রকম কি না—শুধু সেটি নয়।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, সিদ্ধার্থকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় তার গায়ে ছিল গেঞ্জি। পরে তাকে শার্ট পরা অবস্থায় দেখা গেল কেন—এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা কী?

অন্যদিকে পুলিশের বক্তব্য হলো, সিদ্ধার্থকে যখন তাদের অফিসে আনা হয়, তখনও তার গায়ে ওই শার্টই ছিল। সনাতন চক্রবর্তী আরও বলেছেন, তার নিজের শার্টও তখন একই ছিল।

অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য বক্তব্যে দুটি আলাদা দাবি সামনে এসেছে।

পরিবার বলছে: আটকের সময় গায়ে ছিল গেঞ্জি।

পুলিশ কর্মকর্তা বলছেন: পুলিশের কাছে আনার সময় সিদ্ধার্থের গায়ে ওই শার্টই ছিল।

এই দুই বক্তব্যের মধ্যকার সময়টিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়তে পারেন : ১৩ বছরের ছাত্র নিখোঁজ, শিক্ষিকার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার পর বেরিয়ে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

রংপুরের চার হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কোথায়?

এই শার্টের বিতর্কের পেছনে রয়েছে আরও গুরুতর একটি ঘটনা।

রংপুর নগরের মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী এবং তাদের দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছে, তারা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ছাদে ইয়াবা সেবন করতে দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো চলমান এবং আদালতে দেওয়া জবানবন্দির পাশাপাশি তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণও গুরুত্বপূর্ণ।

আরও পড়তে পারেন : ‘বেশি উইড়েন না’—বিএনপি নেতাকে হত্যার হুমকি, ব্যাগে গুলি-কাফনের কাপড়

শার্টের রহস্যের উত্তর কোথায়?

এই মুহূর্তে সবচেয়ে দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—শার্টের বিষয়টিকে প্রশ্ন হিসেবে দেখা, প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে নয়।

পরিবারের বক্তব্য তদন্তকারীদের জন্য একটি যাচাইযোগ্য দাবি। একইভাবে পুলিশের বক্তব্যও তদন্তের অংশ হিসেবে যাচাই করা প্রয়োজন।

আটকের সময়কার ছবি বা ভিডিও, পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার সময়ের দৃশ্য, পোশাকের জব্দ তালিকা, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত নথি সামনে এলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

ততক্ষণ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি বা ভিডিও দেখে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

কারণ চার হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর একটি মামলায় একটি শার্টের মিলের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেই পোশাক কখন, কোথা থেকে এবং কী পরিস্থিতিতে সিদ্ধার্থের গায়ে এল, তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *