মাটির ঢালে বিন্না বা ভেটিভার ঘাসের ঘন শিকড়

গভীর ও ঘন শিকড়ের কারণে ভেটিভার বা বিন্না ঘাস মাটির ক্ষয় ও ঢালের অস্থিতিশীলতা কমাতে ব্যবহার করা হয়।

মাঠে-ঘাটে সাধারণ ঘাস হিসেবে দেখা গেলেও বিন্না ঘাসের শিকড় মাটিকে শক্ত করে ধরে রাখতে পারে। বাংলাদেশে বাঁধ, সড়ক ও পাহাড় রক্ষায় এর সম্ভাবনা কতটা?

২০ আগস্ট, ২০২৬ | বাজলেন্স ডেস্ক

বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে এক ধরনের লম্বা ঘাস দেখা যায়। বাংলায় যার নাম বিন্না ঘাস। পতিত জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এই ঘাসকে ব্যাপক হারে ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশের সরকার।

মূলত বিভিন্ন দেশে পাহাড়ের ক্ষয়রোধ ও পাহাড়ধস বন্ধে পার্শ্বঢালে এই বিন্না ঘাস লাগানো হয়ে থাকে।

যে কারণে বিন্না ঘাস কোন কোন প্রকল্পে ব্যবহার করা যায় তা পর্যালোচনার জন্য সোমবার সরকার একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করেছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম প্রায় দুই দশক ধরে এই ঘাস নিয়ে গবেষণা করছেন।

যে কারণে সরকার এই ঘাসের উপযোগিতা যাচাই করতে যে কমিটি গঠন করেছে সেখানেও যুক্ত করা হয়েছে অধ্যাপক ইসলামকে।

কোন এক সাক্ষাতকারে মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বলছিলেন, “এই ঘাসের লম্বা মূল বা শেকড় খুব দ্রুত মাটির গভীরে ঢুকে, মাটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রাখে। যে কারণে প্রকৌশল বিদ্যায় এই ঘাস ব্যবহার করে রাস্তা ঘাট, পাহাড় ধ্বস, নদীর ভাঙনও রক্ষা করা হয়”।

যে কারণে বর্তমান সরকারও এই ঘাসটি কোন কোন খাতে ব্যবহার করতে পারে সে জন্য একটি গাইডলাইন তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বর্তমান সরকার বাংলাদেশজুড়ে খাল খননের কার্যক্রম শুরু করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টির সময় এই খালগুলো ভরাট হয়ে যাবে। যে কারণে বাঁধ রক্ষা ও খাল ভরাট রোধে এই বিন্না ঘাসই সাশ্রয়ী এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হতে পারে।

এছাড়াও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, পাহাড় ধস রক্ষায় বৈজ্ঞানিকভাবে এই ঘাসকে ব্যবহারের কথা বলছেন তারা।

তবে উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, পথে ঘাটে পতিত জমিতে পড়ে থাকা এই ঘাস দামি সুগন্ধিসহ নানা কাজেই ব্যবহার হয়ে থাকে এই ঘাসের শেকড় বা অন্যান্য অংশ।

বিন্না ঘাস বা ভেটিভার কী?

বাংলাদেশের গ্রামগঞ্জে পথে ধারে, পরিত্যক্ত জমি কিংবা চর এলাকায় গুল্মজাতীয় এই ঘাসটি দেখা যায়। এর ইংরেজি নাম ভেটিভার, তবে বাংলাদেশে বিন্না ঘাস নামেও পরিচিত।

গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও এই ঘাসটি বেন্না ঘাস, খসখস কিংবা ছন নামেও পরিচিত। এই ঘাস একটি বহুবর্ষজীবী উদ্ভিদও।

ভেটিভার বা বিন্না ঘাস দেখতে লম্বা সরু পাতা, ঘন ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে। এটি সাধারণত দেড় থেকে তিন মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। কিন্তু এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর শিকড়।

প্রায় দুই দশকের গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে বুয়েটের অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “এই ঘাসের শেকড়গুলো অত্যন্ত লম্বা ও শক্তিশালী হয়। শেকড় দুই থেকে তিন মিটার কখনো কখনো চার মিটার পর্যন্ত মাটির ভেতর ভেদ করতে পারে”।

লম্বা ও সরু এই ঘাসের পাতাগুলো লম্বা সরু হয়ে থাকে। পথে ঘাটে কিংবা পতিত জমিতে ঝোপের মতো বেড়ে ওঠে এই ঘাসটি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রিন্সিপাল এক্সপেরিমেন্টাল অফিসার মোহাম্মদ আব্দুর রহিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এই ঘাস দেখতে সাধারণ হলেও এর ক্ষমতা অসাধারণ। এর শিকড় শুধু মাটিকে আঁকড়ে ধরেই রাখে না, বরং ভূমির স্তরগুলোকে একটি প্রাকৃতিক জালের মতো ধরে রাখে”।

গবেষকদের মতে, এর শেকড়গুলো মাটির ভেতরে জালের মতো ছড়িয়ে থাকার কারণে মাটি, পাহাড় কিংবা ভূমির ক্ষয়রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

যে কারণে বাংলাদেশের অন্য ঘাস থেকে এই বিন্না ঘাসকে একেবারেই আলাদা মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

গবেষকরা বলছিলেন, শুধু প্রযুক্তি নয়, প্রাকৃতিক ঔষধি গুণও রয়েছে এই বিন্না ঘাসের। বিশেষ করে এর শিকড় থেকে পাওয়া যায় সুগন্ধযুক্ত তেল। সুগন্ধি, প্রসাধনী এবং বিভিন্ন সুগন্ধি পণ্যেও এর ব্যবহার করা হয়ে থাকে এই বিন্না ঘাস।

ভূমির ক্ষয়রোধে ঘাস যখন প্রযুক্তি

গবেষকদের মতে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভেটিভার বা বিন্না ঘাস ভূমির ক্ষয়রোধ, পাহাড় ধস কিংবা নদীর ভাঙন রোধে কাজ করে।

থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, চীন, ব্রাজিল, ভিয়েতনাম ও আফ্রিকান দেশগুলোতে এই ঘাস ভূমিধ্বস রোধ, রাস্তার বাঁধ স্লোপ সুরক্ষা, নদীতীর সংরক্ষণ ও কৃষি জমি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

গবেষকরা বলছেন, এই ঘাসটি জন্মের চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে এর শেকড় মাটির গভীরে পৌঁছে জালের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এরপরই এই ঘাস ঢাল, বাঁধ কিংবা মাটির ক্ষয়রোধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।

এই হিম ঠাণ্ডা কিংবা খরতাপ-সব পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে বলেও মনে করেন গবেষক ও উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা।

গবেষকদের মতে, বৃষ্টির সময় পানির স্রোত যখন ঢাল, বাঁধ কিংবা রাস্তার পাশ দিয়ে নামে তখন সেখানে এই জাতীয় ঘাস বা গুল্ম থাকলে সেটি মাটির ক্ষয়রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম নিজেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকল্পে এই ঘাসটির ব্যবহার নিয়ে কাজ করছেন।

তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “আমাদের দেশে বিভিন্ন সময় রড, সিমেন্ট, জিও ব্যাগ কিংবা বিভিন্ন ম্যাটেরিয়াল দিয়ে বাঁধ রক্ষার কাজ করা হয়েছে থাকে। কিন্তু এই ঘাসের শেকড় এতটাই শক্তিশালী যে এটিই বাঁধ রক্ষায় আরো কার্যকরী ভূমিকা পালন করে”।

তবে তার মতে, সব ধরনের পরিস্থিতি বা সব জায়গায় আবার এই ঘাস ব্যবহার করে মাটির ক্ষয়রোধ বা বাঁধ রক্ষা সম্ভব হবে না।

কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন, “ধরেন একটা খরস্রোতা নদীর বাঁধ রক্ষা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে যদি আপনি এই ঘাস রোপন করেন সেটি কোন কাজে লাগবে না। তবে এটি পাহাড়ের ক্ষয়রোধ কিংবা সড়ক ও জনপথের রাস্তার পাশে এই ঘাসগুলো লাগালে তা মাটির ক্ষয়রোধে বেশ ভালো কাজে দিবে”।

এই ঘাসের সবচেয়ে বড় দুইটি উপকারিতাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন গবেষকরা। তার প্রথমটি হলো সাশ্রয়ী আর দ্বিতীয়টি পরিবেশবান্ধব।

একটি উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক ইসলাম বলছিলেন, ধরেন আপনি একটা বাঁধরক্ষায় রড সিমেন্ট বা কনক্রিটের ব্যবহার করলেন। সেখানে যদি আপনার খরচ হয় ১০০ টাকা। তার বিপরীতে আপনি যদি এই বিন্না ঘাসের সঠিক ব্যবহার করতে পারেন তাহলে সেটি করতে পারবেন মাত্র দশ টাকায়।

তবে, তার মতে সব জায়গায় যে এই ঘাস ব্যবহার করেই ক্ষয়রোধ বা ভুমি ধস ঠেকানো যাবে না। সে সব জায়গায় জিও ব্যাগ, কিংবা সিমেন্টের ব্লক বা রড দিয়েই বাঁধ রক্ষা করতে হবে।

ছবির ক্যাপশান,প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে হওয়া এক সভায় বিন্না ঘাস নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

হঠাৎ বাংলাদেশে আলোচনা যে কারণে

বাংলাদেশে বিশেষত চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, কক্সবাজারের পাহাড়ি অঞ্চল এবং পদ্মা, যমুনা, মেঘনা নদীতীরবর্তী এলাকা ধস ও ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকে বছরজুড়েই।

গত ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই নির্বাচনে জিতলে বেশ কিছু উন্নয়নমূলক কাজের প্রতিশ্রুতি ছিল বিএনপির। তার মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিশ্রুতি ছিল খাল খনন।

যে কারণে নির্বাচনের পরই এই খাল খননের কর্মসূচি উদ্বোধন করেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছেন এবং খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে স্বল্প খরচে ও পরিবেশ বান্ধব উপায়ে এই বাঁধ ও খালের নাব্যতা রক্ষায় কি করা যায় সেটি নিয়ে নানা আলোচনাও হয়।

বিশেষ করে নদী ও খালের তীর, বাঁধ, পাহাড়ি ঢল ও হাওর অঞ্চলে বিন্না ঘাসের ব্যবহার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি অবকাঠামোর স্থায়িত্ব বাড়াতে পারে সেটি নিয়ে কয়েকটি বৈঠকে এই বিন্না ঘাসের ব্যবহারের উদ্যোগ নেয় সরকার।

গত সপ্তাহে ঢাকায় এ নিয়ে একটি বৈঠক হয়। যেখানে বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছে, নদীভাঙন, ভূমিক্ষয় ও মাটির ক্ষয় রোধে বিন্না ঘাস একটি কার্যকর, পরিবেশবান্ধব ও স্বল্পব্যয়ী প্রাকৃতিক সমাধান হতে পারে।

পরে গত সোমবার সচিবালয়ে এ নিয়ে একটি বৈঠকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে কোন কোন প্রকল্পে এই বিন্না ঘাস ব্যবহার করা যায় তার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে টেকনিক্যাল কমিটি হয়েছে।

ওই কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “বেশ কয়েকটি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছে কোন কোন খাতে বা কোন কোন জায়গায় এই বিন্না ঘাসের ব্যবহার করা যায় সেই সম্ভাব্যতা যাচাই করা”।

তার মতে, খালের পাড়, বড় বড় রাস্তার পাশের মাটির ক্ষয়রোধ কিংবা পাহাড়ি এলাকায় যে সব উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড হবে তা রক্ষায় এই ঘাসের ব্যবহার করা যেতে পারে।

অধ্যাপক ইসলাম বলছিলেন, “কোন কোন সেক্টরে আমরা এটা ব্যবহার করতে পারি, কতখানি ব্যবহার করতে পারবো সেটা নির্ধারিত হবে সবার সাথে আলোচনার পর। বিশেষ করে এলজিইডি, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কিংবা সরকারের কৃষি এগুলোতে ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আপাতত এসব জায়গায় ব্যবহার হবে এই ঘাস”।

কোন Mood-এ লিখব?

  1. Professional News — BBC / Reuters / AP Style
  2. Hooking + Punching — High CTR
  3. Think Tank — Deep Analysis
  4. Excitement — High Emotion

১+৩ এটাও বিবিসি হতে নেয়া, সূতরাং টোটাল স্ট্রাকচারটাই পাল্টে দেবে। নেট হতে তথ্য নেবে, এ ঘাস সম্পর্কে সায়েন্স কি বলছে, অন্য কোন দেশে থাকলে তার উদাহরণও টানতে পারো। বাংলাদেশে এ প্রজেক্টের সূযোগ সূবিধা, ও ভবিষ্যৎ ইত্যাদি।

বিন্না ঘাস: সাধারণ আগাছা থেকে বাংলাদেশের বাঁধ-সড়ক রক্ষার ‘সবুজ প্রযুক্তি’?

মাঠের পাশে যে ঘাসকে অনেকেই আগাছা মনে করেন, সেটিই এবার বাংলাদেশের বাঁধ, পাহাড় ও সড়ক রক্ষায় কাজে লাগানোর কথা ভাবছে সরকার। কিন্তু বিন্না ঘাস কি সত্যিই এত শক্তিশালী? বিজ্ঞান কী বলছে, আর বাংলাদেশে এর সম্ভাবনাই বা কতটা?

বিন্না ঘাস বা ভেটিভার (Vetiver) দেখতে খুব সাধারণ। কিন্তু মাটির নিচে এর আসল শক্তি লুকিয়ে আছে।

এর ঘন ও গভীর শিকড় মাটির স্তরকে আঁকড়ে ধরে। ফলে বৃষ্টির পানিতে মাটি ধুয়ে যাওয়া কমতে পারে। একই সঙ্গে ঢালের ওপর পানির প্রবাহের গতি কমিয়ে ক্ষয়ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এ কারণেই বিশ্বজুড়ে এটিকে ‘bio-engineering’ বা জীবন্ত প্রকৌশল সমাধান হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশেও এখন এই ঘাসের সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সরকারের গঠিত টেকনিক্যাল কমিটি কোন কোন প্রকল্পে ভেটিভার ব্যবহার করা যেতে পারে, তা যাচাই করছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—একটি ঘাস দিয়ে কি সত্যিই পাহাড়ধস, নদীভাঙন বা বাঁধের ক্ষয় ঠেকানো সম্ভব?

আসলে কী এই বিন্না ঘাস?

বিন্না ঘাসের বৈজ্ঞানিক নাম Chrysopogon zizanioides। ইংরেজিতে এটি বেশি পরিচিত ‘Vetiver’ নামে।

এটি বহুবর্ষজীবী ঘাস। লম্বা সরু পাতার কারণে দূর থেকে অন্য অনেক ঘাসের মতোই দেখতে।

তবে এর শিকড়ই একে আলাদা করে।

ভেটিভারের শিকড় মাটির গভীরে প্রায় ৩ থেকে ৪ মিটার পর্যন্ত যেতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। পাশাপাশি শিকড়গুলো ঘন জালের মতো ছড়িয়ে মাটিকে ধরে রাখে।

এখানেই এর প্রকৌশলগত গুরুত্ব।

বৃষ্টির পানি যখন খোলা মাটির ওপর দিয়ে দ্রুত নেমে যায়, তখন মাটির কণাও সঙ্গে নিয়ে যায়। ভেটিভারের ঘন গোছা সেই প্রবাহের গতি কমাতে পারে। আবার শিকড় মাটির ভেতরে এক ধরনের প্রাকৃতিক শক্তিবৃদ্ধি তৈরি করে।

ফলে এটি শুধু ওপরের মাটি ঢেকে রাখে না। মাটির ভেতর থেকেও ঢালকে কিছুটা শক্ত করে।

বিজ্ঞান কি সত্যিই ভেটিভারের পক্ষে?

এখানে শুধু প্রচলিত ধারণার ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন নেই। ভেটিভার নিয়ে একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়েছে।

২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বাংলাদেশের চট্টগ্রামের পাহাড়ি মাটি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। কৃত্রিম ভারী বৃষ্টির পরিস্থিতিতে ভেটিভার লাগানো মডেল এবং খোলা মাটির মডেলের তুলনা করা হয়।

গবেষণায় বালুমিশ্রিত মাটিতে ভেটিভার ব্যবহারে মাটির ক্ষয় প্রায় ৯৪ থেকে ৯৭ শতাংশ কমে যায়। একই পরীক্ষায় গড় পানিপ্রবাহও কমেছিল। তবে ফলাফল মাটির ধরন ও ঘাসের বিন্যাসের ওপর নির্ভর করেছে।

বাংলাদেশের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে সিলেট অঞ্চলের মাটি নিয়ে।

২০২৫ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভেটিভার ব্যবহারে পরীক্ষামূলক ঢালে মাটির ক্ষয় প্রায় ৭৫.৬ থেকে ৭৭.৫ শতাংশ কমেছে। গবেষণায় ভেটিভারযুক্ত মাটির নিরাপত্তা-মানও খালি মাটির তুলনায় বেশি পাওয়া যায়।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের মাটিতেও এর কার্যকারিতার পরীক্ষামূলক প্রমাণ রয়েছে।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা আছে।

ভেটিভার কোনো জাদুর ঘাস নয়।

একটি গবেষণায় চট্টগ্রামের পাহাড়ি ঢালের মডেল নিয়ে দেখা গেছে, ভেটিভার কিছু ধরনের ঢালে নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। কিন্তু গভীর স্তরের পাহাড়ধস ঠেকাতে এটি একা যথেষ্ট নয়।

তাহলে পাহাড়ধস পুরোপুরি ঠেকাবে?

না।

এটাই সম্ভবত বিন্না ঘাস নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ভেটিভার মূলত পৃষ্ঠীয় ক্ষয় এবং অগভীর ঢাল অস্থিতিশীলতা কমাতে বেশি কার্যকর। কিন্তু পাহাড়ের অনেক গভীরে যদি বড় ধরনের ভূমি সরে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়, শুধু ঘাস লাগিয়ে তা থামানো সম্ভব নয়।

সেখানে প্রয়োজন হতে পারে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, রিটেইনিং স্ট্রাকচার, জিওটেক্সটাইল, গ্যাবিয়ন বা অন্যান্য প্রকৌশল ব্যবস্থা।

বিশ্বব্যাংকের নথিতেও একই সতর্কতা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, উদ্ভিদ দিয়ে ঢাল রক্ষা সব পরিস্থিতিতে যথেষ্ট নয়। বেশি খাড়া বা অস্থিতিশীল ঢালে অন্যান্য প্রকৌশল ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ সবচেয়ে কার্যকর মডেল হতে পারে—

ঘাস + সঠিক পানি নিষ্কাশন + প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকৌশল ব্যবস্থা।

নদীর পাড়েও কি কাজে লাগবে?

সম্ভাবনা আছে। তবে এখানেও জায়গা ও পানির প্রবাহ গুরুত্বপূর্ণ।

ভেটিভারের শিকড় নদীর পাড়ের মাটিকে শক্ত করতে সহায়তা করতে পারে। ২০২৬ সালের একটি গবেষণায় নদীর পাড়ের মাটিতে ভেটিভার ব্যবহারের প্রভাব পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখানে উদ্ভিদযুক্ত ঢালে ক্ষয়ের পরিমাণ কমেছে এবং ঢালের স্থিতিশীলতার নিরাপত্তা-মানও বেড়েছে।

তবে প্রবল স্রোতের নদীতে শুধু ভেটিভারের ওপর নির্ভর করা যাবে না।

বাংলাদেশের নদীগুলোর চরিত্রও এক নয়। কোথাও ধীরগতির ক্ষয়, আবার কোথাও প্রচণ্ড স্রোতে তীর ভেঙে যায়।

তাই নদীতীর রক্ষায় স্থানভেদে প্রকৌশল নকশা জরুরি।

বিশ্বের কোথায় ব্যবহার হচ্ছে?

ভেটিভার ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো—এটি শুধু গবেষণাগারের বিষয় নয়। বিভিন্ন দেশে বাস্তব অবকাঠামো রক্ষায় এর ব্যবহার হয়েছে।

ভিয়েতনামে সড়ক রক্ষায় ভেটিভার

ভিয়েতনামের হো চি মিন হাইওয়ের বিভিন্ন অংশে ভেটিভার ব্যবহার করা হয়েছে ঢাল রক্ষায়।

Vetiver Network-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ এই মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে ভেটিভার প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি ও খাড়া ঢালেও এর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।

তবে বড় ধরনের গভীর ভূমিধস সবসময় ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এই অভিজ্ঞতাই দেখায়, ভেটিভার কার্যকর হলেও এটি সব ধরনের বিপদের বিকল্প নয়

লাওসেও ‘সবুজ প্রকৌশল’

লাওসে সড়ক ও ঢাল রক্ষায় ভেটিভারকে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনট্যুর বরাবর ভেটিভার লাগালে পানির প্রবাহ ধীর হয়। এতে পানি মাটিতে ঢোকার সুযোগ পায় এবং শিকড় মাটিকে শক্ত করে।

থাইল্যান্ড ও চীন

থাইল্যান্ডে মহাসড়কের ঢাল ও মাটি ক্ষয় নিয়ন্ত্রণে ভেটিভার ব্যবহারের বিভিন্ন প্রকল্প রয়েছে। চীনেও মহাসড়কের ঢাল স্থিতিশীল করতে ভেটিভার ব্যবহারের গবেষণা ও প্রয়োগের নজির পাওয়া যায়।

অর্থাৎ বাংলাদেশ যে ধারণাটি নিয়ে এগোচ্ছে, সেটি একেবারে নতুন কোনো পরীক্ষা নয়।

বাংলাদেশের জন্য কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ?

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বাস্তবতা ভেটিভারের মতো উদ্ভিদভিত্তিক সমাধানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে।

একদিকে রয়েছে প্রচণ্ড বর্ষণ। অন্যদিকে রয়েছে নদীভাঙন, পাহাড়ি ঢাল, বাঁধ ও রাস্তার পাশের মাটি ক্ষয়ের সমস্যা।

বিশেষ করে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটসহ পাহাড়ি অঞ্চলে বর্ষার পানিতে মাটি ক্ষয়ের ঝুঁকি রয়েছে।

আবার দেশের বিভিন্ন নদী ও খালের পাড়েও মাটি সরে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়।

এখানে ভেটিভারের একটি বড় সুবিধা হলো—এটি স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায় এবং তুলনামূলক কম খরচে রোপণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে এর কার্যকারিতা নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে। ২০১৩ সালের একটি গবেষণায় ভেটিভারের শিকড়যুক্ত মাটির শক্তি খালি মাটির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়া যায়। গবেষণাটি বাংলাদেশের বাঁধ ও নদীতীরের প্রেক্ষাপটও বিবেচনা করেছে।

সরকারের সামনে কী সুযোগ?

সরকার যদি পরিকল্পিতভাবে এগোয়, তাহলে বিন্না ঘাসের ব্যবহার কয়েকটি ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা যেতে পারে।

প্রথমত, সড়কের পাশের ঢাল।

নতুন রাস্তা নির্মাণের পর কাটা ঢাল বৃষ্টিতে দ্রুত ক্ষয়ে যায়। সেখানে ভেটিভার একটি জীবন্ত প্রতিরক্ষা স্তর তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, খাল ও বাঁধের পাড়।

খাল খননের পর নতুন মাটির ঢাল তৈরি হয়। সেগুলো বৃষ্টিতে ক্ষয় হলে আবার খাল ভরাট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সঠিক নকশায় ভেটিভার ব্যবহার এই ক্ষয় কমাতে পারে।

তৃতীয়ত, পাহাড়ি ঢাল।

চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের কিছু অপেক্ষাকৃত কম ঝুঁকির ঢালে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

চতুর্থত, কৃষিজমি ও জলাধারের আশপাশ।

ঢালু জমিতে কনট্যুর বরাবর ভেটিভারের সারি পানির গতি কমাতে এবং পলি আটকে রাখতে পারে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণা ও কারিগরি নথিতে এই ধরনের ব্যবহারের কথা উল্লেখ রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সুবিধা—খরচ কম হতে পারে

ভেটিভার নিয়ে আগ্রহের একটি বড় কারণ এর সম্ভাব্য কম খরচ।

প্রথাগতভাবে ঢাল বা বাঁধ রক্ষায় কংক্রিট, পাথর, জিওটেক্সটাইল কিংবা অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এসবের প্রয়োজন অবশ্যই থাকবে অনেক ক্ষেত্রে।

তবে যেখানে শুধু পৃষ্ঠীয় ক্ষয় নিয়ন্ত্রণ দরকার, সেখানে উদ্ভিদভিত্তিক ব্যবস্থা তুলনামূলক সাশ্রয়ী হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন নথিতেও ভেটিভারকে কম খরচের মাটি সংরক্ষণ পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরাসরি কত টাকা সাশ্রয় হবে, তা এখনই বলা ঠিক হবে না।

কারণ খরচ নির্ভর করবে জমির ধরন, রোপণের ঘনত্ব, রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশন ও প্রকল্পের নকশার ওপর।

শুধু ঘাস লাগালেই হবে না

এখানেই বাংলাদেশের সম্ভাব্য প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

ভেটিভারকে ‘সব সমস্যার সমাধান’ হিসেবে ব্যবহার করলে বরং বিপদ হতে পারে।

প্রথমে জানতে হবে—

  • কোন মাটিতে এটি ভালো কাজ করবে?
  • কত দূরত্বে লাগাতে হবে?
  • কত দিনের মধ্যে কার্যকর শিকড় তৈরি হবে?
  • কোন ঢালে এটি ব্যবহার নিরাপদ?
  • নদীর কী ধরনের স্রোতে এটি টিকবে?
  • কোথায় ঘাসের সঙ্গে জিওটেক্সটাইল বা গ্যাবিয়ন প্রয়োজন?
  • বর্ষার অতিরিক্ত পানি কীভাবে বের হবে?

এসব প্রশ্নের উত্তর না নিয়ে বড় প্রকল্পে চলে যাওয়া ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে ভালো মডেল কী হতে পারে?

বিশেষজ্ঞদের গবেষণা ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার।

ভেটিভারকে কংক্রিটের বিকল্প হিসেবে না দেখে ‘প্রকৌশলের সহযোগী’ হিসেবে ব্যবহার করাই বেশি বাস্তবসম্মত।

যেখানে বড় কাঠামো দরকার, সেখানে সেটি থাকবে। আর যেখানে বৃষ্টির পানির কারণে মাটির ওপরের স্তর ক্ষয় হচ্ছে, সেখানে ভেটিভার যুক্ত হতে পারে।

এই পদ্ধতিকে বলা যায় nature-based engineering

বাংলাদেশের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ভবিষ্যতে এই পদ্ধতির গুরুত্ব বাড়তে পারে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভারী বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বাড়লে কম খরচের পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

সামনে কী করা উচিত?

সরকারের বর্তমান টেকনিক্যাল কমিটির কাজ তাই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছোট আকারে পরীক্ষামূলক প্রকল্প নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে খরচ, মাটির ক্ষয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা পরিমাপ করা দরকার।

তারপর ফল ভালো হলে ধাপে ধাপে বড় প্রকল্পে নেওয়া যেতে পারে।

কারণ বিন্না ঘাসের গল্পটা শুধু একটি ঘাসের গল্প নয়।

এটি আসলে বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় প্রকৃতি ও প্রকৌশলকে একসঙ্গে ব্যবহার করার একটি সম্ভাবনা

মাঠের পাশে পড়ে থাকা একটি সাধারণ ঘাস যদি সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তাহলে সেটি হয়তো বাঁধ, রাস্তা কিংবা পাহাড় রক্ষার খরচ কমাতে পারে।

তবে শেষ কথা বলবে মাঠের ফলাফল।

বিন্না ঘাসকে তাই এখনই ‘ম্যাজিক সমাধান’ নয়—বরং পরীক্ষিত ও পরিকল্পিত একটি সম্ভাবনাময় সবুজ প্রযুক্তি হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসঙ্গত।

ব্যবহৃত গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *