নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে ঢাকাসহ তিন শহরে ১৪টি গোলাপি বাস চালু করেছে সরকার।
২০ আগস্ট, ২০২৬ । বাজলেন্স ডেস্ক
গোলাপি বাস। নারী চালক। নারী কন্ডাক্টর। উদ্দেশ্য—নারীর নিরাপদ যাতায়াত। কিন্তু বাস রাস্তায় নামার পরই শুরু হয়েছে উল্টো প্রশ্ন: আলাদা বাস কি সত্যিই নারীর নিরাপত্তার সমাধান, নাকি মূল সমস্যাকে পাশ কাটানোর আরেকটি উদ্যোগ?
১৮ আগস্ট ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়ায় নারীদের জন্য ১৪টি বাস চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর সবাই নারী। এমনকি তাদের পোশাক এবং বাসের রংও গোলাপি।
ফলে শুরু থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এগুলো পরিচিতি পেয়েছে ‘পিংক বাস’ নামে।
উদ্যোগটির পক্ষে যেমন প্রশংসা এসেছে, তেমনি উঠেছে নানা আপত্তি। কেউ প্রশ্ন তুলছেন নারীকে আলাদা পরিবহনব্যবস্থায় পাঠানো নিয়ে। আবার কেউ মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এমন বাস নারীদের চলাচলে স্বস্তি দিতে পারে।
তাহলে আসল প্রশ্নটা কোথায়?
নিরাপত্তার জন্য আলাদা বাস—নাকি আলাদা করে ফেলা?
বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীর হয়রানি নতুন কোনো বিষয় নয়। ভিড়ের বাসে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি, যৌন হয়রানি এবং নিরাপদে ওঠানামা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ রয়েছে।
এই বাস্তবতায় নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর যুক্তি সহজেই বোঝা যায়।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন আরও গভীরে।
যে গণপরিবহনে নারী-পুরুষ দুজনেরই সমানভাবে চলাচলের অধিকার থাকার কথা, সেখানে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আলাদা বাস কেন দরকার হবে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের ব্যবস্থা নারীর চলাচলের পরিসরকে আরও আলাদা করে দিতে পারে। তাদের যুক্তি, নিরাপদ পরিবহনব্যবস্থা হওয়া উচিত সবার জন্য। শুধু নারীদের আলাদা করে নিরাপত্তা দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়।
প্রথম দিনেই ছড়াল নানা ভিডিও, শুরু ট্রলও
বাস চালুর প্রথম দিন থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ভিডিও ও পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।
এর মধ্যে একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি পাবলিক বাসে ওঠার সময় এক নারীর সামনে একজন পুরুষ দরজায় হাত দিয়ে রেখেছেন। তবে ওই নারীকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা ভিডিওটির পুরো প্রেক্ষাপট কী—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তারপরও ভিডিওটির স্ক্রিনশট ব্যবহার করে অনেকে নারীর গণপরিবহনে চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আবার একটি গোলাপি বাসকে ‘বলাকা’ নামের একটি বাস ধাক্কা দিয়েছে—এমন বিষয় নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ দেখা গেছে।
তবে এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে পুরো প্রকল্পের কার্যকারিতা বিচার করা যাবে কি না, সেটিও প্রশ্ন।

নারী চালককে ঘিরে আরেক বিতর্ক
বাস চালুর পর রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় একটি গোলাপি বাস ফ্লাইওভারে ওঠার সময় সমস্যায় পড়েছিল—এমন খবর কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
পরে একজন পুরুষ চালকের সহায়তায় বাসটি সরানো হয় বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
তবে ঘটনাটি ঠিক কীভাবে ঘটেছিল, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
তারপরও ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কিছু পোস্টে সরাসরি নারী চালকের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়।
এখানে বিতর্কটি আরও একটি দিকে মোড় নেয়—নারী চালক কোনো সমস্যায় পড়লেই সেটিকে কি তার লিঙ্গের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত?
নাকি পুরুষ চালকের ক্ষেত্রেও যেভাবে একটি সাধারণ ড্রাইভিং-সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবে দেখা হতো, নারী চালকের ক্ষেত্রেও সেটিই হওয়া উচিত?
‘গোলাপি খাঁচা’ চান না অনেকে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার একটি বড় অংশ এসেছে নারীকে আলাদা করার ধারণা নিয়ে।
মারওয়া জান্নাত মাইশা নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, তারা বিশেষ দয়া বা ‘গোলাপি খাঁচা’ চান না। তার মতে, লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে নারী-পুরুষ একই গণপরিবহনে নিরাপদে চলাচল করতে পারেন।
অন্যদিকে রূদ্রাক্ষ রায়হান নামে একজন প্রশ্ন তুলেছেন, একজন নারী যদি তার বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ স্বামী কিংবা অন্য কোনো পুরুষ স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চান, তাহলে এই বাসে তার সুযোগ থাকবে কি না।
এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মূল বিতর্কটি আরও স্পষ্ট হয়েছে—নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নামে ব্যবস্থাটি কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে?
আবার অনেকে বলছেন, আগে নিরাপত্তা—তারপর বিতর্ক
সবাই অবশ্য উদ্যোগটির বিরোধিতা করছেন না।
অনেকের মতে, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় নারীদের জন্য আলাদা বাস অন্তত একটি নিরাপদ বিকল্প তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত গণপরিবহনে হয়রানি বা অস্বস্তির মুখে পড়েন, তাদের জন্য এটি স্বস্তির জায়গা হতে পারে।
নারী অধিকারকর্মী ও আইনজীবী সালমা আলীও উদ্যোগটিকে সরাসরি সমালোচনা করতে চান না।
তার মতে, গণপরিবহনে নারীরা ব্যাপকভাবে হয়রানির শিকার হন। তাই নির্দিষ্ট সময় বা রুটে নারীদের জন্য আলাদা বাস বাড়ানো হলে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন।
তবে একই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলেছেন—নারীর ক্ষমতায়নের চূড়ান্ত লক্ষ্য যদি নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ হয়, তাহলে শুধু গোলাপি রঙে আলাদা করে দেওয়াই কি সেই লক্ষ্য পূরণ করে?
এর আগেও হয়েছিল, কিন্তু টেকেনি
নারীদের জন্য আলাদা বাস বাংলাদেশে নতুন কোনো ধারণা নয়।
১৯৯৮ সালে বিআরটিসি প্রথম এমন উদ্যোগ নিয়েছিল। পরে ২০১৮ সালে বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকায় ‘দোলনচাঁপা’ নামে নারীদের জন্য বাস সার্ভিস চালু হয়।
কিন্তু দুটির কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে টেকেনি।
এই ইতিহাসই বর্তমান উদ্যোগের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এবার কী আলাদা হবে?
বাসের সংখ্যা বাড়বে কি না, যাত্রী পাওয়া যাবে কি না, পরিচালন ব্যয় কতটা টেকসই হবে এবং নারীরা নিয়মিত এই সেবা ব্যবহার করবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ের সঙ্গে পাওয়া যাবে।
বিশেষজ্ঞদের মতও এক নয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, আগের উদ্যোগগুলো কেন টেকেনি, সেটি আগে বিশ্লেষণ করা দরকার।
তার মতে, গণপরিবহনে নারীর অনিরাপত্তার পেছনে যৌন হয়রানি ও অন্যান্য সামাজিক সমস্যা রয়েছে। তাই শুধু আলাদা বাস চালু করলেই মূল সমস্যার সমাধান হবে না।
তিনি আরও মনে করেন, গণপরিবহনকে বাস্তবে পুরুষের পরিসর হিসেবে দেখার সামাজিক মানসিকতা পরিবর্তন করা জরুরি।
অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক এখনই প্রকল্পটিকে নেতিবাচকভাবে বিচার করতে নারাজ।
তার মতে, নতুন কোনো উদ্যোগের প্রভাব বুঝতে সময় দেওয়া প্রয়োজন। অন্তত ছয় মাস থেকে এক বছর পর দেখা যেতে পারে, এতে নারীর চলাচল বেড়েছে কি না এবং তারা আগের তুলনায় কতটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।
তারপর ফলাফল অনুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
তাহলে গোলাপি বাসের ভবিষ্যৎ কী?
এখন পর্যন্ত বিতর্কের দুই দিকই স্পষ্ট।
এক পক্ষ বলছে, নারীর নিরাপত্তার জন্য আলাদা বাস দরকার।
অন্য পক্ষের প্রশ্ন, নারীকে আলাদা না করে সাধারণ গণপরিবহনকেই নিরাপদ করা উচিত।
দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যেই একটি অভিন্ন জায়গা আছে—নারীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা।
তবে পথটি কোনটি হবে, সেটিই বিতর্কের বিষয়।
কারণ গোলাপি বাস ১৪টি দিয়ে শুরু হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের লাখো নারীর প্রতিদিনের গণপরিবহন সংকট ১৪টি বাসে শেষ হওয়ার নয়।
শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে বাসের রং নয়; নির্ধারণ করবে নারীরা বাস্তবে কতটা নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারছেন।
