২০১৪ সাল থেকে হুতি নিয়ন্ত্রণে থাকা ইয়েমেনের রাজধানী সানা, যেখানে ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এখনো সংঘাতের ছায়ায় দাঁড়িয়ে
হুতি তথা ইয়েমেনের এই সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাস, লক্ষ্য ও বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদে প্রায়ই একটি নাম ঘুরেফিরে আসে—হুতি (Houthis)। কখনও ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষে, কখনও সৌদি আরবের সঙ্গে উত্তেজনায়, আবার কখনও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় এই আন্দোলন বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
বিশেষ করে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর আশপাশে একের পর এক হামলার ঘটনায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ একাধিক দেশ সামরিক ও কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
তবে হুতিদের ইতিহাস সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত দিয়ে শুরু হয়নি। এই আন্দোলনের শিকড় কয়েক দশক আগে ইয়েমেনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। সময়ের সঙ্গে এটি একটি স্থানীয় আন্দোলন থেকে আঞ্চলিক এবং পরে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এই নিবন্ধে ধাপে ধাপে থাকছে হুতি আন্দোলনের উৎপত্তি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে তাদের ভূমিকা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের প্রভাব এবং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ।
হুতি কারা?
হুতি (Houthis), যাদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসার আল্লাহ (Ansar Allah), ইয়েমেনভিত্তিক একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক ও বিদ্রোহী আন্দোলন। তাদের মূল ঘাঁটি দেশটির উত্তরাঞ্চলের সা’দা (Sa’dah) প্রদেশে।
আন্দোলনটির সমর্থকদের বড় অংশ জায়দি (Zaydi) শিয়া মুসলিম সম্প্রদায়ের হলেও হুতিদের পরিচয় কেবল ধর্মীয় নয়। শুরুতে এটি ছিল একটি সামাজিক ও ধর্মীয় পুনর্জাগরণমূলক আন্দোলন। সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাত আন্দোলনটিকে সশস্ত্র রূপ দেয়।
বর্তমানে হুতিরা শুধু একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী নয়; তারা ইয়েমেনের উল্লেখযোগ্য অংশে প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং রাজধানী সানা (Sanaa)-সহ গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কার্যকর কর্তৃত্ব বজায় রেখেছে। এই বাস্তবতা তাদেরকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত করেছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অবশ্য হুতিদের পরিচয় নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান রয়েছে। কিছু দেশ তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অন্যদিকে জাতিসংঘ ইয়েমেনের সংঘাত সমাধানের আলোচনায় তাদেরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে।
‘হুতি’ নামের উৎপত্তি কোথায়?
“হুতি” নামটি এসেছে হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি (Hussein Badreddin al-Houthi)-র নাম থেকে। তিনি ছিলেন একজন জায়দি ধর্মীয় নেতা এবং ইয়েমেনের সংসদের সাবেক সদস্য। ১৯৯০-এর দশকে তিনি উত্তর ইয়েমেনে একটি ধর্মীয় ও সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন, যা পরে আনসার আল্লাহ আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
সংগঠনটি নিজেদের আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে অবশ্য “আনসার আল্লাহ” নামটিই ব্যবহার করে, যার অর্থ “আল্লাহর সমর্থক”।
.

হুতিদের সাংগঠনিক কাঠামো কেমন?
হুতি আন্দোলনের সাংগঠনিক কাঠামো একদিকে যেমন প্রথাগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অনুকরণে তৈরি, তেমনি ভেতরে ভেতরে চলে একটি সমান্তরাল কমান্ড ব্যবস্থা। আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা আবদুল-মালিক আল-হুতি, যিনি মূলত সামরিক ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রাখেন। তবে প্রকাশ্যে প্রশাসনিক কাজ চালায় Supreme Political Council নামে একটি সংস্থা, যা ২০১৬ সালে সানায় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং যার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মাহদি আল-মাশাত।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকৃত সামরিক ও নিরাপত্তা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় একটি পৃথক ও অনেকটাই অস্বচ্ছ কাঠামোর মাধ্যমে, যাকে বিশ্লেষকরা “Jihad Council” নামে অভিহিত করেন। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে—মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী এমনকি স্কুল পর্যায় পর্যন্ত—একটি “সুপারভাইজার” ব্যবস্থা কাজ করে, যেখানে হুতি-নিযুক্ত ব্যক্তিরা প্রথাগত কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বা তাদের ছাপিয়ে প্রকৃত সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করেন। পশ্চিমা গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নে এই ব্যবস্থাকে অনেকটা লেবাননের হিজবুল্লাহর সাংগঠনিক মডেলের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
.

হুতিদের স্লোগান ও প্রতীক: ‘সারখা’ কী বোঝায়?
হুতি আন্দোলনের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হলো তাদের স্লোগান, যা আরবিতে “সারখা” (Sarkha, অর্থ “চিৎকার” বা “সম্মিলিত প্রতিবাদধ্বনি”) নামে পরিচিত। সবুজ ও লাল রঙে লেখা এই স্লোগানটি অর্থানুবাদে দাঁড়ায়—”আল্লাহ মহান, আমেরিকার ধ্বংস হোক, ইসরায়েলের ধ্বংস হোক, ইহুদিদের প্রতি অভিশাপ, ইসলামের বিজয় হোক।”
গবেষকদের মতে, এই স্লোগানের কাঠামো ইরানের ইসলামি বিপ্লবের সময়কার একটি স্লোগানের আদলে তৈরি, যা হুতি ও ইরানের মধ্যকার আদর্শিক সাদৃশ্যের একটি ইঙ্গিত হিসেবে প্রায়ই আলোচিত হয়। ২০০২ সালে সা’দা প্রদেশে একটি স্থানীয় সমাবেশে প্রথম এই স্লোগান উচ্চারিত হয় বলে জানা যায়, আর ২০০৪ সালে হুসেইন আল-হুতির মৃত্যুর পর এটি আন্দোলনের অবিচ্ছেদ্য পরিচয়ে পরিণত হয়। হুতি মুখপাত্ররা মাঝে মাঝে দাবি করেন, স্লোগানটি আক্ষরিক অর্থে “মৃত্যু কামনা” নয়, বরং বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতীকী প্রতিবাদ। তবে সমালোচকদের মতে, স্লোগানটির ভাষা স্পষ্টভাবে ইহুদি-বিদ্বেষী ও উসকানিমূলক বলে বিবেচিত হওয়া উচিত।
ইয়েমেনের ইতিহাস: হুতি আন্দোলনের পটভূমি
হুতি আন্দোলনকে বোঝার জন্য শুধু সংগঠনটির ইতিহাস জানাই যথেষ্ট নয়। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক বৈষম্য ও আঞ্চলিক বিভাজন।
আজকের ইয়েমেন একসময় দুটি আলাদা রাষ্ট্র ছিল। উত্তর ইয়েমেনের আনুষ্ঠানিক নাম ছিল Yemen Arab Republic, আর দক্ষিণ ইয়েমেন পরিচিত ছিল People’s Democratic Republic of Yemen নামে—আরব বিশ্বের একমাত্র মার্কসবাদী রাষ্ট্র, যেখানে সোভিয়েত প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। ২২ মে ১৯৯০ সালে দুই রাষ্ট্র একীভূত হয়ে বর্তমান Republic of Yemen গঠিত হয়। তবে একীকরণের পরও ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে অসন্তোষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্বলতা থেকেই যায়।
এই সময়ে ইয়েমেনের রাজনীতিতে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন আলি আবদুল্লাহ সালেহ (Ali Abdullah Saleh), যিনি ১৯৭৮ সালে উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হন এবং একীকরণের পর প্রায় তিন দশকের বেশি সময় গোটা দেশের ক্ষমতায় থাকেন। সমালোচকদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও উন্নয়নের অসম বণ্টন দেশজুড়ে অসন্তোষ বাড়িয়ে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জায়দি (Zaydi) সম্প্রদায়ের অবস্থান। শতাব্দীর পর শতাব্দী উত্তর ইয়েমেনে জায়দি ইমামদের শাসন থাকলেও ১৯৬২ সালের বিপ্লবের পর তার অবসান ঘটে। পরবর্তী দশকগুলোয় অনেক জায়দি নেতার মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে তাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব কমে যাচ্ছে। এই অসন্তোষই ১৯৯০-এর দশকে জন্ম দেয় Believing Youth (আল-শাবাব আল-মু’মিন) নামে একটি ধর্মীয়-শিক্ষামূলক উদ্যোগের, যেখানে হুসেইন আল-হুতি অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। ক্রমে সরকার ও আন্দোলনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে, যা শেষ পর্যন্ত সশস্ত্র সংঘর্ষে রূপ নেয়।
কীভাবে ধর্মীয় আন্দোলন সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হলো?
২০০৪ সালকে হুতি আন্দোলনের ইতিহাসে মোড় পরিবর্তনের বছর হিসেবে ধরা হয়। ইয়েমেন সরকার অভিযোগ করে, হুসেইন আল-হুতির নেতৃত্বে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অবস্থান নিচ্ছে। অন্যদিকে হুতি সমর্থকদের দাবি ছিল, তারা নিজেদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার চেষ্টা করছিল।
সরকারি বাহিনী সা’দা প্রদেশে ব্যাপক অভিযান শুরু করলে কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুসেইন আল-হুতি নিহত হন। সরকার ভেবেছিল আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে, কিন্তু বাস্তবে ঘটে উল্টো। নেতৃত্ব গ্রহণ করেন তার পরিবারের সদস্য আবদুল-মালিক আল-হুতি (Abdul-Malik al-Houthi), যিনি আজও আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতা।
২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সরকার ও হুতিদের মধ্যে ছয় দফা যুদ্ধ হয়, যা সম্মিলিতভাবে Sa’dah Wars নামে পরিচিত। হাজারো মানুষ নিহত হন, লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, তবে প্রতিটি সংঘর্ষের পর হুতিরা বরং সামরিক ও সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বিশ্লেষকদের মতে এর পেছনে ছিল স্থানীয় সমর্থন, সা’দার দুর্গম পার্বত্য ভূখণ্ডের কৌশলগত সুবিধা, কেন্দ্রীয় সরকারের একাধিক ফ্রন্টে ব্যস্ততা এবং সংগঠনের দ্রুত অভিযোজন ক্ষমতা।
২০১১ সালে আরব বসন্তের ঢেউ ইয়েমেনেও পৌঁছালে প্রেসিডেন্ট সালেহর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় সালেহ ক্ষমতা ছাড়তে সম্মত হলে ২০১২ সালে আবদরাব্বুহ মানসুর হাদি (Abdrabbuh Mansur Hadi) অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। কিন্তু ক্ষমতার শূন্যতা ও দুর্বল প্রশাসন দেশটিকে আরও অস্থিতিশীল করে তোলে—আর হুতিরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ: পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের সূচনা
ক্ষমতা হস্তান্তরের পর অনুষ্ঠিত National Dialogue Conference নতুন সংবিধান ও রাজনৈতিক সমঝোতার লক্ষ্যে ডাকা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। হুতিরা অভিযোগ করে, তাদের দাবি যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে হুতিরা ধীরে ধীরে রাজধানী সানার দিকে অগ্রসর হয় এবং সেপ্টেম্বরে কার্যত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। প্রেসিডেন্ট হাদি গৃহবন্দি হন, পরে আডেনে চলে যান এবং শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে আশ্রয় নেন। এর ফলে ইয়েমেনে তৈরি হয় দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাকেন্দ্র—সানাকেন্দ্রিক হুতি প্রশাসন, আর আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার।
এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক মোড়: সাবেক প্রেসিডেন্ট সালেহ, যিনি একসময় হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়েছিলেন, রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে তাদের সঙ্গে অস্থায়ী জোট গড়েন। তবে ২০১৭ সালে সেই জোট ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই সংঘর্ষে তিনি নিহত হন।
২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক জোট—সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি আরব দেশ নিয়ে গঠিত—ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে, লক্ষ্য ছিল হাদি সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা ও হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো। বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি সীমান্ত নিরাপত্তা, মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ইরানের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ—এই কারণগুলোই ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সংকটকে বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনীতির অংশ করে তোলে।
এই দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ ইয়েমেনিদের। জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, খাদ্য সংকট ব্যাপক আকার নিয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়েছে এবং লক্ষাধিক শিশু অপুষ্টির ঝুঁকিতে পড়েছে। এ কারণেই ইয়েমেনকে বহু বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুতর মানবিক সংকটগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একই সঙ্গে উল্লেখ করে, সংঘাতে জড়িত সব পক্ষের কর্মকাণ্ডই সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

হুতিদের আদর্শ ও প্রধান লক্ষ্য কী?
হুতি আন্দোলনকে শুধু একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্র পুরোপুরি বোঝা যায় না। এটি একই সঙ্গে রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক আন্দোলন, যার লক্ষ্য ও কৌশল সময়ের সঙ্গে বদলেছে।
তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বহু বছর ধরে উত্তর ইয়েমেনের জনগণ রাজনৈতিকভাবে অবহেলিত ছিল এবং কেন্দ্রীয় সরকার সম্পদের সুষম বণ্টনে ব্যর্থ হয়েছে—তাই তারা নিজেদের একটি “সংস্কারমুখী আন্দোলন” হিসেবে তুলে ধরে। তারা নিয়মিত দাবি করে, ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া উচিত এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সমালোচনা তাদের বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমালোচকদের মতে অবশ্য, হুতিদের সামরিক কর্মকাণ্ডই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করেছে।
২০০৪ সালের প্রথম সংঘর্ষে সীমিত সক্ষমতা থাকলেও গত দুই দশকে তারা ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি ও সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা গড়ে তুলেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক নিয়ে কী জানা যায়?
হুতিদের নিয়ে সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর একটি ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। এই প্রশ্নের সহজ “হ্যাঁ” বা “না” উত্তর নেই—বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল, পশ্চিমা গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে ইরান ও হুতিদের মধ্যে বিভিন্ন মাত্রায় সম্পর্ক রয়েছে—সামরিক প্রযুক্তি আদান-প্রদান, ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন সহায়তা, রাজনৈতিক সমর্থন ও কৌশলগত সহযোগিতার অভিযোগসহ। তবে এসব মূল্যায়নেও নিশ্চিততার মাত্রা এক নয়; প্রায়ই “সম্ভাব্য”, “অভিযোগ” বা “বিশ্লেষকদের মতে”—এমন ভাষা ব্যবহৃত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছে, ইরান হুতিদের সামরিক-প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় এবং ইয়েমেনে ব্যবহৃত অস্ত্রের নকশায় ইরানি প্রযুক্তির মিল পাওয়া গেছে বলে দাবি করে। এই ভিত্তিতে ওয়াশিংটন একাধিকবার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে বলে আসছে, তারা ইয়েমেনের জনগণের রাজনৈতিক অবস্থান সমর্থন করে, তবে সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করে এবং সংকটের সমাধান রাজনৈতিক সংলাপেই সম্ভব বলে মনে করে।
হুতিরা নিজেদের একটি স্বাধীন ইয়েমেনি আন্দোলন হিসেবে বর্ণনা করে, যদিও ফিলিস্তিন ইস্যু ও কিছু আঞ্চলিক প্রশ্নে ইরানসহ বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সংহতি প্রকাশ করেছে তারা।
এই বিতর্ক শুধু ইয়েমেনে সীমাবদ্ধ নয়—একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন পেলে সংঘাতের প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলেই সৌদি আরব, আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য বিষয়টিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখে। তবে সম্পর্কের প্রকৃতি ও মাত্রা নিয়ে গবেষক-নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখনো ভিন্নমত রয়েছে।
অক্ষ প্রতিরোধ’ (Axis of Resistance): হুতিরা কি একা?
হুতিদের বোঝার জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো তথাকথিত “অক্ষ প্রতিরোধ” বা Axis of Resistance ধারণা। এই শব্দবন্ধ দিয়ে বোঝানো হয় ইরান ও তার সঙ্গে রাজনৈতিক-সামরিকভাবে সংযুক্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক গোষ্ঠীর একটি অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ককে—যার মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইরাকের বিভিন্ন শিয়া মিলিশিয়া এবং সিরিয়া-সংশ্লিষ্ট বাহিনী। বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে হুতিরা এই নেটওয়ার্কের ইয়েমেনি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পরিকল্পনায় লেবাননের হিজবুল্লাহর পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েল-হামাস সংঘাত শুরুর পর হুতিরা নিজেদের প্রকাশ্যে এই “প্রতিরোধ অক্ষ”-এর অংশ হিসেবে তুলে ধরে এবং লোহিত সাগরে হামলাকে ফিলিস্তিনি সংহতির প্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। তবে এই সংযোগের প্রকৃত মাত্রা—অর্থাৎ এটি কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত কোনো কমান্ড কাঠামো, নাকি আদর্শিক সহানুভূতির ভিত্তিতে আলগাভাবে যুক্ত একাধিক স্বতন্ত্র গোষ্ঠী—এ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী তালিকাভুক্তি: কূটনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস
হুতিদের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে একাধিকবার পরিবর্তন এসেছে, যা বিষয়টির রাজনৈতিক জটিলতা তুলে ধরে। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগে ট্রাম্প প্রশাসন হুতিদের “Foreign Terrorist Organization” এবং “Specially Designated Global Terrorist” উভয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই বাইডেন প্রশাসন এই তালিকাভুক্তি প্রত্যাহার করে নেয়, মূলত মানবিক সহায়তা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে।
২০২৩ সালের শেষে লোহিত সাগরে হামলা শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি ফের বদলায়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাইডেন প্রশাসন হুতিদের আংশিকভাবে ফের “Specially Designated Global Terrorist” হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, যদিও পূর্ণাঙ্গ FTO মর্যাদা তখন পুনর্বহাল করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসন হুতিদের পূর্ণাঙ্গ Foreign Terrorist Organization হিসেবে পুনরায় তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেয়, যার লক্ষ্য হিসেবে বলা হয় হুতিদের সামরিক সক্ষমতা ও সম্পদপ্রবাহ সীমিত করা।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, হুতিরা একটি সীমিত সক্ষমতার স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী থেকে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী সামরিক সংগঠনে রূপান্তরিত হয়েছে, যাদের কার্যক্রম এখন নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়েছে।
লোহিত সাগরে হুতিদের হামলা কেন বিশ্বজুড়ে এত আলোচনায়?
২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে হুতিদের কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন মাত্রা পায়, যখন তারা লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব (Bab el-Mandeb) প্রণালীর আশপাশে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। একটি দেশের উপকূলে সংঘটিত হামলা কীভাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে—এর উত্তর লুকিয়ে আছে এই সমুদ্রপথের কৌশলগত গুরুত্বে।
বাব আল-মান্দেব প্রণালী একদিকে লোহিত সাগর, অন্যদিকে এডেন উপসাগর ও পরে ভারত মহাসাগরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে, আর উত্তরে গিয়ে মিশে যায় সুয়েজ খালের সঙ্গে—এশিয়া থেকে ইউরোপের বাণিজ্যপথের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রতি বছর হাজার হাজার বাণিজ্যিক জাহাজ এই পথ ব্যবহার করে পণ্য ও তেল পরিবহনে। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে চলাচল করে, যে কারণে একে বিশ্বের অন্যতম Strategic Chokepoint বলা হয়।
২০২৩ সালের শেষে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হুতিরা ঘোষণা দেয়, তারা ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করবে—ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশ ও ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। তবে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন বিভিন্ন দেশের পতাকাবাহী জাহাজও হামলার শিকার হয় বা ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে অনেক শিপিং কোম্পানি নিরাপত্তার কারণে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের Cape of Good Hope ঘুরে চলাচল শুরু করে, যাতে যাত্রাপথ কয়েক হাজার কিলোমিটার বেড়ে যায় এবং পরিবহন ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ে।
সামরিক পর্যবেক্ষণ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী হামলায় অ্যান্টি-শিপ মিসাইল, ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল, ড্রোন এবং সমুদ্র-ড্রোন বোট ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, যদিও প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সবসময় সম্ভব হয়নি। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য এই সমুদ্রপথে নৌ নিরাপত্তা জোরদার করে এবং হুতিদের সামরিক স্থাপনায় একাধিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় বলে জানায়, যার লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ হামলার সক্ষমতা কমানো ও আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল সুরক্ষিত রাখা। হুতিরা পাল্টা দাবি করে, এসব হামলা তাদের অবস্থান বদলাবে না।
দীর্ঘ সময় ধরে এমন পরিস্থিতি চললে এর প্রভাব শুধু শিপিং শিল্পে নয়, ভোক্তা পণ্যের মূল্য, উৎপাদন খরচ ও বৈশ্বিক বাজারেও পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
.

নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে হুতিদের শাসন কেমন?
হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দৈনন্দিন জীবন কেমন, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে একাধিক উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের গ্রেপ্তার এবং বিচারবহির্ভূত আটকের অভিযোগ রয়েছে হুতি প্রশাসনের বিরুদ্ধে। এছাড়া নারীদের চলাফেরা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপের অভিযোগও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় শিশু সেনা নিয়োগের অভিযোগও একাধিকবার উঠেছে, যদিও হুতি কর্তৃপক্ষ বরাবর এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। অর্থনৈতিকভাবে, দীর্ঘ যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে হুতি-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে জ্বালানি সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং সরকারি কর্মীদের বেতন বকেয়া থাকার মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলমান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে হুতি কর্তৃপক্ষ নিজেদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে কর আদায়, বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং সীমিত পরিসরে প্রশাসনিক সেবা পরিচালনা করে থাকে বলেও পর্যবেক্ষকরা জানান।
এই মূল্যায়নগুলো মূলত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা, এবং হুতি কর্তৃপক্ষ এসবের একাংশ প্রত্যাখ্যান করে থাকে—তাই বিষয়টি মূল্যায়নের সময় উভয় পক্ষের অবস্থান বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?
লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীর অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যও প্রাসঙ্গিক একটি বিষয়। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের ইউরোপমুখী চালান, সুয়েজ খাল হয়ে এই পথ ব্যবহার করে। জাহাজগুলোকে বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে হলে পরিবহন খরচ ও সময় বাড়ে, যা রপ্তানিকারকদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যের দামে অস্থিরতা দেখা দিলে তার প্রভাব দেশের আমদানি ব্যয় ও সার্বিক মূল্যস্ফীতিতেও পড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়িয়ে?
প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর হুতিরা আজ ইয়েমেনের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি। তারা দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা, রাজধানী সানা এবং লোহিত সাগর উপকূলের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ ইয়েমেনে এখনো কোনো একক কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ পুরো দেশ পরিচালনা করছে না।
গত কয়েক বছরে জাতিসংঘ, ওমান ও সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় একাধিকবার যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংঘর্ষের মাত্রা কিছুটা কমলেও স্থায়ী রাজনৈতিক সমঝোতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ক্ষমতা ভাগাভাগি, নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা—এসব প্রশ্নে সমঝোতা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে?
ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়, তবে বিশ্লেষকরা কয়েকটি সম্ভাব্য দৃশ্যপটের কথা বলেন। সবচেয়ে ইতিবাচক সম্ভাবনা হলো, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো রাজনৈতিক চুক্তিতে পৌঁছে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকার গঠনের পথ তৈরি করবে। অনেকের মতে আবার, বড় ধরনের যুদ্ধ না হলেও রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই একটি দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সংঘাত তীব্র হলে ইয়েমেনের পরিস্থিতিও দ্রুত অবনতির দিকে যেতে পারে। আর লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকলে আন্তর্জাতিক শিপিং ও সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদি চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।
হুতি নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা (Myth vs Reality)
❌ Myth: হুতিরা পুরো ইয়েমেন নিয়ন্ত্রণ করে।
✅ Reality: না। তারা উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও পুরো দেশ তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়।
❌ Myth: হুতি একটি রাষ্ট্র।
✅ Reality: না। হুতি একটি রাজনৈতিক-সশস্ত্র আন্দোলন (Ansar Allah), যা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি।
❌ Myth: সব ইয়েমেনি হুতিদের সমর্থন করে।
✅ Reality: না। ইয়েমেনি সমাজ রাজনৈতিক ও আঞ্চলিকভাবে বৈচিত্র্যময়; সমর্থন-বিরোধিতা দুটোই বিদ্যমান।
❌ Myth: ইয়েমেনের সংঘাত শুধু ধর্মীয়।
✅ Reality: এটি মূলত রাজনৈতিক ক্ষমতা, আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির জটিল সমন্বয়।
❌ Myth: লোহিত সাগরের সংকট শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যা।
✅ Reality: না। এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে।
.

জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
হুতি কারা?
হুতি বা আনসার আল্লাহ হলো ইয়েমেনভিত্তিক একটি রাজনৈতিক-সশস্ত্র আন্দোলন, যার উৎপত্তি উত্তর ইয়েমেনের সা’দা অঞ্চলে।
“হুতি” নামটি কোথা থেকে এসেছে?
আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নাম থেকে।
হুতিদের মূল ঘাঁটি কোথায়?
উত্তর ইয়েমেনের সা’দা প্রদেশ এবং রাজধানী সানাসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল।
ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক কী?
বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন রয়েছে। বিভিন্ন দেশ সম্পর্কের অভিযোগ তুললেও ইরান সরাসরি সামরিক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করে।
লোহিত সাগরে হামলা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট, যেখানে অস্থিরতা বৈশ্বিক শিপিং ও জ্বালানি সরবরাহে প্রভাব ফেলে।
ইয়েমেনের সংঘাত কি শেষ হয়েছে?
না। তীব্রতা সময়ে সময়ে বদলালেও এখনো স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি।
উপসংহার
হুতি আন্দোলনের ইতিহাস দেখায়, একটি স্থানীয় ধর্মীয়-সামাজিক উদ্যোগ কীভাবে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বৈষম্য, দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি—সব মিলিয়ে হুতি আন্দোলন আজ শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
তবে হুতিদের মূল্যায়ন করতে গেলে একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গির বদলে যাচাইযোগ্য তথ্য, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। কারণ ইয়েমেনের সংকট বহুস্তরীয়, আর এর স্থায়ী সমাধানও সম্ভবত শুধু সামরিক নয়, বরং রাজনৈতিক সমঝোতা, মানবিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি আস্থা তৈরির মধ্য দিয়েই সম্ভব।
💬 আপনার মতামত কী? কমেন্ট করে জানান।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষণ পড়ুন → হুতি কি লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথের জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি? (Think Tank)
