মানচিত্রে শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’ ঘিরে ভারতের ঘোষিত ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড।
২২ আগস্ট, ২০২৬ | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে দেশটির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শিলিগুড়ি করিডোর বা ‘চিকেনস নেক’-এর নিরাপত্তা আরও জোরদার করছে নয়াদিল্লি। এই করিডোরকে ঘিরে ‘বিশেষ ত্রিকোণীয় নিরাপত্তা গ্রিড’ গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির রানিডাঙ্গায় সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি)-এর উত্তরবঙ্গ ফ্রন্টিয়ার সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চোপড়া, কিষাণগঞ্জ ও আসামের ধুবড়িকে ঘিরে নিরাপত্তা কাঠামো জোরদার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে করিডোরজুড়ে নজরদারি, সামরিক উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
চিকেন নেক কী এবং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?—এ বিষয়ে TheBuzzLens-এর বিস্তারিত Explainer পড়তে পারেন: এখানে “Chicken’s Neck কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? ভারতের মানচিত্রের এই সরু পথ ঘিরে এত কৌশলগত আলোচনা কেন?”
তিন ঘাঁটি ঘিরে নতুন নিরাপত্তা কাঠামো
অমিত শাহ বলেন, শিলিগুড়ি করিডোর ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরু এই ভূখণ্ড দিয়েই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বজায় থাকে।
করিডোরটি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের কাছাকাছি হওয়ায় এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। ভারতীয় সরকারের দৃষ্টিতে, এই ভৌগোলিক অবস্থান করিডোরটিকে বিশেষ নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রাখে।
অমিত শাহের ঘোষিত কাঠামোতে উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং আসামের ধুবড়ি—এই তিন এলাকাকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অবস্থান হিসেবে সামনে আনা হয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব অবস্থান থেকে পুরো করিডোরে নজরদারি ও নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়ানো হবে।
এর পাশাপাশি ‘তিস্তা প্রহার’-এর মতো সামরিক মহড়ার মাধ্যমে প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বজায় রাখার কথাও বলা হয়েছে।
শুধু সেনা নয়, সীমান্ত অবকাঠামোতেও জোর
চিকেনস নেকের নিরাপত্তা পরিকল্পনা শুধু সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সীমান্ত নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত।
শিলিগুড়ির অনুষ্ঠানে এসএসবির বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আবাসিক প্রকল্পের উদ্বোধন এবং ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। সরকারি হিসাবে এসব প্রকল্পে প্রায় ১৭৯ কোটি রুপি ব্যয় হচ্ছে।
এর আগে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত এলাকায় ‘স্মার্ট বর্ডার’ ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছে। এতে সীমান্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ফেন্সিংয়ে অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যালার্ম ব্যবস্থা ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
অমিত শাহ আরও জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিএসএফ ও এসএসবির জন্য ১ হাজার ১২৯ একর জমি হস্তান্তর করেছে। সীমান্ত বেড়া নির্মাণসহ নিরাপত্তা অবকাঠামো সম্প্রসারণে এই জমি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ-চীন আঞ্চলিক হুমকিতে ভারতের জরুরী পদক্ষেপ — শিলিগুড়ি করিডোর রক্ষায় চতুর্দিক নজরদারি কৌশল
দিল্লি-শিলিগুড়ি যোগাযোগেও বড় পরিকল্পনা
নিরাপত্তার পাশাপাশি শিলিগুড়িকে ভারতের বৃহত্তর যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন অমিত শাহ।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে দিল্লি-শিলিগুড়ি হাইস্পিড রেল করিডোরের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দিল্লি থেকে শিলিগুড়িতে যাতায়াতের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।
অন্যদিকে ‘ভাইব্রেন্ট ভিলেজেস প্রোগ্রাম ২.০’-এর আওতায় বাংলাদেশ ও ভুটান সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও চলছে। ভারতীয় সরকারের এই উদ্যোগ সীমান্ত অঞ্চলে যোগাযোগ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ।
বাংলাদেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে?
শিলিগুড়ি করিডোরে ভারতের নিরাপত্তা বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সরাসরি কোনো ‘বাংলাদেশবিরোধী’ পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের জন্য এর কিছু কৌশলগত ও বাস্তব প্রভাব তৈরি হতে পারে।
১. সীমান্তে নজরদারি আরও বাড়তে পারে
চিকেনস নেকের একটি অংশ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তের খুব কাছাকাছি। ফলে ভারতের নতুন নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে নজরদারি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জোরদার হলে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে সীমান্ত পারাপার, চোরাচালান ও অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে ভারতীয় বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে কোনো সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
২. উত্তরবঙ্গের যোগাযোগের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়বে
চিকেনস নেকের নিরাপত্তা ভারতের কাছে যত গুরুত্বপূর্ণ হবে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানও তত বেশি কৌশলগত গুরুত্ব পাবে।
কারণ বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের মধ্যবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চলের পাশে অবস্থান করছে। ফলে ভবিষ্যতে আঞ্চলিক যোগাযোগ, ট্রানজিট ও বাণিজ্য নিয়ে আলোচনায় বাংলাদেশের ভূগোল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
৩. ট্রানজিট ও বাণিজ্যে সুযোগও তৈরি হতে পারে
নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি ভারত যদি শিলিগুড়ি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা দ্রুত উন্নত করে, তাহলে বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি শুধু নিরাপত্তার নয়—অর্থনৈতিক সুযোগেরও হতে পারে।
বাংলাদেশের বন্দর ও সড়কপথ ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য পরিবহনসহ আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা রয়েছে। নিরাপদ ও স্থিতিশীল যোগাযোগব্যবস্থা তৈরি হলে এ ধরনের বাণিজ্যিক উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
৪. সীমান্তে ভারতের ‘নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গি’ আরও কঠোর হতে পারে
সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় সরকার সীমান্ত নিরাপত্তা, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সীমান্ত অবকাঠামোকে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করছে।
চিকেনস নেকে নতুন নিরাপত্তা গ্রিড, সীমান্তে জমি হস্তান্তর এবং স্মার্ট বর্ডার প্রযুক্তির ব্যবহার—সব মিলিয়ে ভারতের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা আরও কঠোর ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হতে পারে, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ভবিষ্যতে আরও বেশি নজরদারি ও কড়াকড়ির মুখোমুখি হওয়া।
তাহলে কি বাংলাদেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে?
এই মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য নেই।
অমিত শাহের ঘোষণার মূল লক্ষ্য হিসেবে ভারত তার নিজস্ব কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের নিরাপত্তা জোরদারের কথা বলেছে। বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের নৈকট্যকে এই অঞ্চলের কৌশলগত বাস্তবতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এর ফলে একটি বিষয় স্পষ্ট—শিলিগুড়ি করিডোরকে ভারত এখন শুধু একটি যোগাযোগপথ হিসেবে দেখছে না। এর নিরাপত্তা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সামরিক প্রস্তুতি এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে একই কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে নেওয়া হচ্ছে।
আর বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই পরিবর্তনের প্রভাব সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাধ্যমে না এলেও সীমান্ত নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্য, ট্রানজিট এবং ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত সম্পর্কের ওপর পড়তে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আগামী দিনগুলোতে এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবে কতটা বিস্তৃত হয় এবং সীমান্ত ও আঞ্চলিক যোগাযোগে ভারতের নীতিতে কী পরিবর্তন আনে—সেদিকেই নজর থাকবে।
