ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা নতুন মোড় নেওয়ায় উদ্বিগ্ন মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : সংগ্রহীত।
২০ জুলাই | ঢাকা | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানকে আরও চাপে রাখতে সামরিক ও অর্থনৈতিক কৌশল জোরদার করছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই নীতি শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে—কেবল সামরিক চাপ প্রয়োগ করে তেহরানের অবস্থান বদলানো কঠিন, বরং এতে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি, বাব আল-মান্দেব জলপথ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধবিরতির পর ফের উত্তেজনা
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবেশ ভেঙে যাওয়ার পর ওয়াশিংটন আবারও চাপের কৌশলে ফিরেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য হলো, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত প্রভাব সীমিত করা এবং তেহরানকে নিজেদের শর্তে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।
তবে কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকায় পূর্ণমাত্রার সংঘাতের আশঙ্কা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বৈশ্বিক বাজারেও প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক উত্তেজনা বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে। তেলের দামে অস্থিরতা, শিপিং খরচ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা ইতোমধ্যেই বৈশ্বিক বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে যেকোনো অস্থিতিশীলতা বিশ্ববাজারে দ্রুত প্রতিফলিত হয়।
ইরানের পাল্টা বার্তা
তেহরানও পাল্টা সতর্কবার্তা দিয়েছে। ইরানের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বা অবকাঠামো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা হলে তার জবাব শুধু সীমান্তের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর মাধ্যমে বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সম্ভাব্য নতুন লক্ষ্যবস্তু
মার্কিন গণমাধ্যম ও রয়টার্সের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ইরানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা, তেল রপ্তানি অবকাঠামো এবং ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনা হয়েছে।
তবে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলে তা রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক—তিন ক্ষেত্রেই বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সামরিক চাপ কি কার্যকর হবে?
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং Atlantic Council-এর বিশ্লেষক Jonathan Panikoff মনে করেন, আরও হামলা চালিয়ে ইরানের নীতিগত অবস্থান বদলে যাবে—এমন ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ নেই।
তার ভাষায়, অতিরিক্ত সামরিক চাপ অনেক সময় প্রতিপক্ষকে আরও অনমনীয় করে তোলে এবং আলোচনার পথ আরও সংকুচিত করে।
হোয়াইট হাউসের অবস্থান
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখনো কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দেয়। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে সামরিক শক্তিও ব্যবহার করা হবে।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশনীতি এখন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাত, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—এসব বিষয় আগামী নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পারমাণবিক আলোচনা এখনও অচল
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে স্থায়ী সমঝোতার কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানে আটক এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পেয়েছেন। তবে ইরানের বিচার বিভাগ সেই দাবি অস্বীকার করেছে।
সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার।
ইরান ইতোমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের হামলা হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের স্বার্থও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশটির হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
ইসরায়েলের Institute for National Security Studies (INSS)-এর গবেষক Danny Citrinowicz মনে করেন, শুধুমাত্র সামরিক চাপ প্রয়োগ করে ইরানের নেতৃত্বকে নীতিগতভাবে পিছু হটানো কঠিন।
তার মতে, সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, ততই উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া বাড়ার সম্ভাবনা থাকবে এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র : Reuters, Atlantic Council, Institute for National Security Studies (INSS),
U.S. Department of Defense, U.S. Energy Information Administration (Hormuz),
BBC News – Middle East
