দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণে স্ব-চালিত আর্টিলারির ভূমিকা। ছবি: সংগৃহীত
দক্ষিণ এশিয়ার সামরিক আধুনিকীকরণের প্রতিযোগিতায় স্থল যুদ্ধাস্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো স্ব-চালিত হাউইটজার (সেলফ-প্রোপেলড আর্টিলারি)। ভারত এই ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তিতে তৈরি K9 বজ্র-টি কামান দিয়ে যে গতিতে এগোচ্ছে, তার তুলনায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রতিরক্ষা পর্যবেক্ষকদের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, ছবিটা যতটা একপেশে মনে হয়, ততটা নয়।
ভারতের K9 বজ্র-টি: একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম
দক্ষিণ কোরিয়ার হানওয়া এরোস্পেসের (সাবেক সামসাং টেকউইন) K9 থান্ডার প্ল্যাটফর্মের ভারতীয় সংস্করণ K9 বজ্র-টি তৈরি করছে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান লারসেন অ্যান্ড টুব্রো (L&T), প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির আওতায়। ২০১৭ সালে ১০০টি কামানের প্রথম চুক্তি সইয়ের পর ২০২১ সালেই নির্ধারিত সময়ের আগেই সরবরাহ সম্পন্ন হয়। এরপর ২০২৩-২৪ সালে আরও ১০০টির অর্ডার অনুমোদিত হয়, যার ফলে বর্তমানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে প্রায় ২০০টি K9 বজ্র-টি রয়েছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় সেনাবাহিনী আরও ৩০০টির বেশি কামান কেনার একটি প্রায় ২৩ হাজার কোটি রুপির প্রস্তাব প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠিয়েছে, যা অনুমোদিত হলে মোট সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
কারিগরি দিক থেকে, K9 বজ্র-টি একটি ১৫৫ মিলিমিটার/৫২-ক্যালিবারের ট্র্যাকড হাউইটজার, যার ওজন প্রায় ৪৭ টন এবং সর্বোচ্চ ফায়ারিং রেঞ্জ প্রায় ৪০ কিলোমিটার বা তার বেশি (উন্নত গোলাবারুদ ব্যবহারে আরও বেশি দূরত্বে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করা হয়)। এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা হলো “শুট অ্যান্ড স্কুট” সক্ষমতা — অর্থাৎ গুলি করার পরপরই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে শত্রুর কাউন্টার-ব্যাটারি ফায়ার এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। এই প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে K10 নামের একটি রোবোটিক গোলাবারুদ সরবরাহকারী যান, যা মানুষবিহীনভাবেই যুদ্ধক্ষেত্রে কামানে গোলা সরবরাহ করতে পারে — এই দিক থেকে এটি নিছক একটি অস্ত্র নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ সমন্বিত কামান-ব্যবস্থা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই প্ল্যাটফর্মের ৮০ শতাংশের বেশি কাজ ভারতে স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হচ্ছে, যা প্রায় এক হাজার শিল্প-সহযোগীর একটি সরবরাহ শৃঙ্খল সক্রিয় রেখেছে।
এর পাশাপাশি ভারত নিজস্ব ATAGS (অ্যাডভান্সড টোড আর্টিলারি গান সিস্টেম) কর্মসূচিতেও বিনিয়োগ করছে, যা দেশীয়ভাবে তৈরি একটি ১৫৫ মিলিমিটার/৫২-ক্যালিবার টোড হাউইটজার। এই কর্মসূচির লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে বিদেশনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর আর্টিলারি উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করা।
বাংলাদেশের প্রকৃত চিত্র: যতটা ভাবা হয়, ততটা শূন্য নয়
জনপ্রিয় ধারণার বিপরীতে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাতে স্ব-চালিত আর্টিলারি একেবারেই নেই — এই দাবিটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বাস্তবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সার্বিয়ার তৈরি নোরা বি-৫২ (Nora B-52) নামের ৮x৮ চাকাযুক্ত স্ব-চালিত হাউইটজার ব্যবহার করছে, যার সংখ্যা প্রায় ৩৬টি। এই ১৫৫ মিলিমিটার কামানগুলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী দূরপাল্লার আর্টিলারি সক্ষমতা হিসেবে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি এই বহরের একটি আধুনিকীকরণ কর্মসূচিও নেওয়া হয়েছে, যাতে এগুলোকে নোরা বি-৫২ এনজি (পরবর্তী প্রজন্মের সংস্করণ) মানে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে এটাও সত্য যে, ভারতের K9-এর মতো ভারী ট্র্যাকড (চেইন-চালিত) স্ব-চালিত হাউইটজার বাংলাদেশের হাতে নেই। বাংলাদেশের প্রধান আর্টিলারি সক্ষমতা এখনো মূলত টোড (টেনে নেওয়া) কামাননির্ভর — যার মধ্যে রয়েছে চীনা টাইপ ৮৩ ও ডি-৩০ ১২২ মিলিমিটার কামান, চীনা টাইপ ৫৯-১ ১৩০ মিলিমিটার কামান, এবং এম৫৬/এল১০এ১ ১০৫ মিলিমিটার হাউইটজার। সম্প্রতি তুরস্কের তৈরি MKE বোরান ১০৫ মিলিমিটার লাইটওয়েট হাউইটজারও ১৮টি সংযোজিত হয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বহরে।
চীনা প্রযুক্তির দিকে বাংলাদেশের ঝোঁক
গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ইতিমধ্যেই চীনের নরিনকো (NORINCO) থেকে ট্রাক-মাউন্টেড ১৫৫ মিলিমিটার স্ব-চালিত হাউইটজার এসএইচ-১৫ কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি প্রতিনিধি দল চীনে গিয়ে এই কামানের লাইভ-ফায়ারিং পরীক্ষা পর্যবেক্ষণ করে। প্রায় ২৫ টন ওজনের এই কামান পাকিস্তান সেনাবাহিনীও ব্যবহার করছে এবং এটি পরিবহন বিমানে সহজে বহনযোগ্য হওয়ায় দ্রুত মোতায়েনযোগ্য একটি সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তুরস্কের T-155 ফিরতিনা: একই প্রযুক্তির আরেক সংস্করণ
আলোচনায় থাকা আরেকটি বিকল্প হলো তুরস্কের T-155 ফিরতিনা, যা মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার K9 থান্ডার প্ল্যাটফর্মেরই তুরস্কীয় সংস্করণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর চুক্তির মাধ্যমে তৈরি। ২০০১ সালে কর্মসূচি শুরুর পর থেকে তুরস্ক ২৮০টির বেশি ফিরতিনা কামান নিজেদের বাহিনীতে যুক্ত করেছে, আর সাম্প্রতিক সময়ে এর উন্নত সংস্করণ ফিরতিনা-২ও বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। এই কামানের সর্বোচ্চ ফায়ারিং রেঞ্জ প্রায় ৩০ থেকে ৫৬ কিলোমিটার পর্যন্ত, যা গোলাবারুদের ধরনের ওপর নির্ভরশীল।
বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত প্রশ্ন
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে মোবাইল আর্টিলারির গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। টোড কামান পুনঃস্থাপনে সময় বেশি লাগে বলে শত্রুর কাউন্টার-ব্যাটারি রাডার সহজেই এর অবস্থান শনাক্ত করে ফেলতে পারে, যেখানে স্ব-চালিত ও দ্রুত-চলনক্ষম প্ল্যাটফর্ম “শুট অ্যান্ড স্কুট” কৌশলে টিকে থাকার সক্ষমতা বাড়ায়। বাংলাদেশের হাতে থাকা ৩৬টি নোরা বি-৫২ এক্ষেত্রে একটি ভিত্তি তৈরি করে দিলেও, ভারী ট্র্যাকড হাউইটজারের ক্ষেত্রে এখনো সক্ষমতার ঘাটতি স্পষ্ট।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, তুরস্ক, দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের মতো দেশ থেকে প্রযুক্তি হস্তান্তরসহ নতুন প্ল্যাটফর্ম সংগ্রহ করা হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় মেইনটেন্যান্স ও সীমিত উৎপাদন সক্ষমতা তৈরির সুযোগও তৈরি হতে পারে — যেমনটা ভারত ও তুরস্ক ইতিমধ্যেই করে দেখিয়েছে K9 থান্ডার প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে। তবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও সামরিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায়, নতুন প্ল্যাটফর্ম নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভূখণ্ড উপযোগিতা, খরচ, রক্ষণাবেক্ষণের সহজলভ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তি হস্তান্তরের শর্ত — এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উপসংহার
দক্ষিণ এশিয়ার আর্টিলারি সক্ষমতার তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত ভারী ট্র্যাকড স্ব-চালিত হাউইটজারের সংখ্যা ও দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা—উভয় ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য এগিয়ে রয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এই ব্যবধান আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা ক্রয় পরিকল্পনা থেকে স্পষ্ট। তবে বাংলাদেশের আর্টিলারি সক্ষমতা “কার্যত শূন্য” — এমন ধারণা সঠিক নয়; বরং দেশটি ইতিমধ্যেই সীমিত পরিসরে স্ব-চালিত কামান (নোরা বি-৫২) পরিচালনা করছে এবং চীন ও তুরস্কের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে এই সক্ষমতা সম্প্রসারণের পথে হাঁটছে। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু নতুন অস্ত্র কেনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণ ও উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলা, যা প্রকৃত অর্থে জাতীয় প্রতিরক্ষা স্বয়ংসম্পূর্ণতার ভিত্তি তৈরি করবে।
হ
