NATO জোট ও নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রতীকী চিত্র

NATO-কে ঘিরে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক শক্তির নতুন মেরুকরণ।

NATO কি শুধু ইউরোপের নিরাপত্তার জোট? নাকি রাশিয়া, চীন ও পশ্চিমা শক্তির প্রতিযোগিতায় এটি নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে?

১৯৪৯ সালে যখন NATO তৈরি হয়েছিল, তখন পৃথিবী ইতিমধ্যেই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির দিকে ভাগ হয়ে যাচ্ছিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও তার নেতৃত্বাধীন পূর্ব ইউরোপীয় ব্লক।

সেই সময় NATO-র উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার—সদস্যদের সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সম্ভাব্য আগ্রাসন ঠেকানো।

কিন্তু Cold War শেষ হয়েছে তিন দশকেরও বেশি আগে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন নেই। Warsaw Pact নেই। অথচ NATO আছে—বরং আরও বড় হয়েছে।

আজ NATO-তে ৩২টি দেশ রয়েছে। Finland ২০২৩ সালে এবং Sweden ২০২৪ সালে জোটে যোগ দিয়েছে।

তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—

যে শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য NATO তৈরি হয়েছিল, সেই শত্রু না থাকার পরও জোটটি কেন টিকে থাকল?

আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—

NATO কি ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, নাকি তার সম্প্রসারণ ও ভূরাজনৈতিক ভূমিকা নতুন করে বিশ্বকে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরে ভাগ করছে?

উত্তরটি সরল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নয়।

কারণ NATO একই সঙ্গে নিরাপত্তার প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতার রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র


NATO কেন এখনো টিকে আছে?

Cold War শেষ হওয়ার পর NATO বিলুপ্ত হয়ে যাবে—এমন ধারণা অস্বাভাবিক ছিল না।

কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটেনি।

কারণ ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে NATO ধীরে ধীরে শুধু সোভিয়েতবিরোধী সামরিক জোটের চেয়ে বড় কিছু হয়ে উঠেছিল।

এটি হয়ে ওঠে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মধ্যে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামো।

NATO-র Article 5-এর মূল নীতি হলো—এক সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং মিত্ররা আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করবে। তবে সেই সহায়তা কী ধরনের হবে, তা প্রত্যেক সদস্য নির্ধারণ করে; সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। NATO বলছে, ইতিহাসে Article 5 মাত্র একবার—২০০১ সালের 9/11 হামলার পর—আনুষ্ঠানিকভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে।

এই প্রতিশ্রুতিই NATO-র সবচেয়ে বড় শক্তি।

কারণ কোনো সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ জানে—

একটি NATO দেশকে আক্রমণ করা মানে শুধু একটি দেশের সঙ্গে যুদ্ধ নয়।

পুরো জোটের প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি নেওয়া।

এটাই Deterrence।


কিন্তু Cold War-এর পর NATO কেন বড় হলো?

এখানেই শুরু হয় বিতর্ক।

Cold War শেষ হওয়ার পর পূর্ব ইউরোপের বহু দেশ পশ্চিমা রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিল।

NATO-ও ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হয়েছে।

Poland, Hungary ও Czech Republic ১৯৯৯ সালে যোগ দেয়। এরপর ২০০৪ সালে আরও কয়েকটি পূর্ব ও মধ্য ইউরোপীয় দেশ সদস্য হয়। পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকে।

NATO-র নিজস্ব অবস্থান হলো, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে এবং সদস্যপদের দরজা খোলা থাকে। NATO-র Article 10-ও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারী ইউরোপীয় রাষ্ট্রের জন্য সদস্যপথ উন্মুক্ত রাখে।

কিন্তু রাশিয়া এই সম্প্রসারণকে অন্যভাবে দেখে।

মস্কোর দৃষ্টিতে NATO যত পূর্বদিকে এগিয়েছে, রাশিয়ার কৌশলগত নিরাপত্তা পরিসর তত সংকুচিত হয়েছে।

এই দ্বন্দ্বকে বোঝার জন্য একটি ধারণা গুরুত্বপূর্ণ—

Security Dilemma

এক দেশ নিজের নিরাপত্তার জন্য যা করে, অন্য দেশ সেটিকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।

NATO বলতে পারে:

“আমরা প্রতিরক্ষার জন্য শক্তিশালী হচ্ছি।”

রাশিয়া বলতে পারে:

“তোমরা শক্তিশালী হচ্ছ, তাই আমাদের নিরাপত্তা কমছে।”

এভাবেই একই পদক্ষেপ দুই পক্ষের কাছে দুই ধরনের অর্থ তৈরি করে।


NATO কি সত্যিই রাশিয়াকে ঘিরে ফেলছে?

এখানে আবেগের বদলে ইতিহাস ও ভূরাজনীতি আলাদা করে দেখা জরুরি।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে NATO সম্প্রসারণকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছে। বিশেষ করে ইউক্রেন ও জর্জিয়ার মতো দেশের সম্ভাব্য NATO সদস্যপদ নিয়ে মস্কোর উদ্বেগ ছিল তীব্র। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার নিরাপত্তা ধারণায় প্রতিবেশী অঞ্চলের ওপর প্রভাব এবং একটি কৌশলগত buffer-এর গুরুত্ব বড় ভূমিকা রাখে।

অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যুক্তি দেয়, NATO সম্প্রসারণকে শুধু রাশিয়াকে ঘেরাও করার প্রকল্প হিসেবে দেখা ভুল।

কারণ পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ নিজেদের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা খুঁজেছে এবং স্বেচ্ছায় পশ্চিমা জোটে যোগ দিয়েছে। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, NATO enlargement-এর পেছনে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিজস্ব নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পছন্দকে অস্বীকার করা যায় না।

অর্থাৎ এখানে দুটি সত্য একই সঙ্গে থাকতে পারে।

NATO সদস্যরা নিজেদের নিরাপত্তা বাড়াতে চাইতে পারে।

এবং একই সঙ্গে—

রাশিয়া সেই প্রক্রিয়াকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।

এই দ্বৈত বাস্তবতাই সমস্যাটিকে এত জটিল করেছে।


ইউক্রেন যুদ্ধ NATO-কে আবার কেন এত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলল?

২০১৪ সালের Crimea সংকট এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আক্রমণের পর ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামো নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।

NATO-র ২০২২ Strategic Concept-এ রাশিয়াকে মিত্রদের নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সরাসরি হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। একই নথিতে প্রথমবারের মতো চীনকেও NATO-র নিরাপত্তা, স্বার্থ ও মূল্যবোধের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

কারণ NATO-র দৃষ্টিতে নিরাপত্তার ধারণা এখন আর শুধু ইউরোপের প্রচলিত সামরিক প্রতিরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই।

Cyber, hybrid threats, technological change, resilience—সবকিছুই নিরাপত্তার অংশ হয়ে উঠেছে।

অর্থাৎ NATO-র কাজের ক্ষেত্র ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়েছে।


সবচেয়ে বড় irony: রাশিয়াকে ঠেকাতে গিয়ে NATO আরও শক্তিশালী হয়েছে

এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ irony আছে।

রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে NATO সম্প্রসারণকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছে।

কিন্তু ২০২২ সালের যুদ্ধের পর কী ঘটল?

Finland এবং Sweden—দুই দীর্ঘদিনের সামরিকভাবে non-aligned Nordic দেশ—NATO-তে যোগ দিল।

Finland ৪ এপ্রিল ২০২৩-এ ৩১তম সদস্য হয়। Sweden ৭ মার্চ ২০২৪-এ ৩২তম সদস্য হয়।

অর্থাৎ ইউক্রেন যুদ্ধ NATO-কে দুর্বল করার পরিবর্তে অন্তত সদস্যসংখ্যার দিক থেকে আরও বড় করেছে।

এটি রাশিয়ার কৌশলগত হিসাবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে।

NATO সম্প্রসারণ ঠেকানোর চেষ্টা কি শেষ পর্যন্ত NATO-কে আরও সম্প্রসারিত করল?

এখানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় paradox-গুলোর একটি।


কিন্তু NATO কি শুধু প্রতিরক্ষামূলক জোট?

NATO নিজেকে একটি defensive alliance হিসেবে বর্ণনা করে।

তার বর্তমান Strategic Concept-এ collective defence-কে জোটের মূল দায়িত্ব বলা হয়েছে। তিনটি core task হলো—

  • Deterrence and Defence
  • Crisis Prevention and Management
  • Cooperative Security

কিন্তু বাস্তব ভূরাজনীতিতে কোনো বড় সামরিক জোটকে শুধু তার ঘোষিত উদ্দেশ্য দিয়ে বিচার করা হয় না।

কারণ সামরিক জোটের অস্তিত্ব নিজেই ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।

NATO যত শক্তিশালী হয়, তার সদস্যদের নিরাপত্তা বাড়তে পারে।

কিন্তু একই সঙ্গে NATO-র বাইরে থাকা প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির কাছে হুমকির ধারণাও বাড়তে পারে।

এখানেই Security Dilemma আবার ফিরে আসে।


NATO কি নতুন Cold War তৈরি করছে?

এখানে ‘নতুন Cold War’ শব্দটি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।

আজকের বিশ্ব ১৯৫০ বা ১৯৬০-এর দশকের মতো দুইটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্লকে বিভক্ত নয়।

চীন পশ্চিমের সঙ্গে ব্যাপক বাণিজ্য করে। ইউরোপীয় দেশগুলোর স্বার্থও এক নয়। Global South-এর অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন—দুই পক্ষের সঙ্গেই সম্পর্ক রাখে।

তাই পুরোনো Cold War-এর হুবহু পুনরাবৃত্তি বলা ঠিক হবে না।

তবে strategic competition বাড়ছে।

একদিকে NATO ও তার প্রধান সদস্যদের নিরাপত্তা কাঠামো।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত এবং চীনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা।

NATO-র ২০২২ Strategic Concept-এ চীনকে সরাসরি নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জের আলোচনায় আনা এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তাই নতুন বাস্তবতাকে হয়তো বলা যায়—

Cold War নয়, কিন্তু Cold War-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতার কিছু বৈশিষ্ট্য ফিরে আসছে।


NATO-এর সবচেয়ে বড় শক্তি কি অস্ত্র, নাকি জোট?

NATO-র শক্তিকে শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মাপলে বড় একটি বিষয় বাদ পড়ে যাবে।

এর আসল শক্তি হলো collective capability

একটি রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা আর ৩২টি দেশের সম্মিলিত রাজনৈতিক, সামরিক, গোয়েন্দা, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা এক জিনিস নয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো interoperability—অর্থাৎ বিভিন্ন দেশের বাহিনী একসঙ্গে কাজ করতে পারার সক্ষমতা।

এই কারণে NATO শুধু অস্ত্রের জোট নয়।

এটি একটি institutionalised security network

তবে এর দুর্বলতাও এখানেই।

৩২টি দেশের স্বার্থ সবসময় এক হবে না।

কোনো সংকটে সবাই একই মাত্রায় ঝুঁকি নিতে চাইবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই।

ফলে NATO-র ভবিষ্যৎ শক্তির বড় প্রশ্ন হবে—

সংকটের সময় জোটটি কতটা ঐক্য ধরে রাখতে পারে?


NATO-র সামনে আরেকটি প্রশ্ন: যুক্তরাষ্ট্র কতটা নেতৃত্ব দেবে?

NATO-র কেন্দ্রীয় শক্তি দীর্ঘদিন ধরে ছিল transatlantic link—উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের নিরাপত্তা সম্পর্ক।

কিন্তু ভবিষ্যতে এই সম্পর্কের রাজনৈতিক ও আর্থিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন থাকবে।

ইউরোপীয় দেশগুলো প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি, ইউরোপের defence spending এবং burden-sharing নিয়ে বিতর্কও চলমান।

২০২৬ সালের NATO Summit-কে ঘিরেও ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন আলোচনা সামনে এসেছে।

এখানে একটি সম্ভাব্য পরিবর্তন হচ্ছে—

NATO হয়তো আগের মতো শুধু “US-led Europe” থাকবে না; বরং আরও বেশি European burden-sharing-এর দিকে যেতে পারে।

এটি জোটকে দুর্বলও করতে পারে, আবার দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়িয়ে শক্তিশালীও করতে পারে।


NATO কি বিশ্বকে দুই ভাগে ভাগ করছে?

এখন মূল প্রশ্নে ফিরে আসা যাক।

NATO কি নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রধান চালক?

আংশিকভাবে হ্যাঁ—কিন্তু এককভাবে নয়।

কারণ বর্তমান মেরুকরণের পেছনে শুধু NATO নেই।

আছে—

  • US-China strategic competition
  • Russia-West confrontation
  • প্রযুক্তি ও Semiconductor competition
  • Trade এবং tariff disputes
  • Energy security
  • Supply-chain realignment
  • Indo-Pacific rivalry
  • BRICS ও Global South-এর উত্থান

অর্থাৎ NATO বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি প্রধান প্রতিষ্ঠান, কিন্তু পুরো পরিবর্তনের একমাত্র কারণ নয়।

বরং বলা যায়—

বিশ্বে যে মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে, NATO তার প্রতিফলনও এবং একই সঙ্গে সেই মেরুকরণকে শক্তিশালী করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোও।


তাহলে NATO কি নিরাপত্তা দেয়, নাকি অনিরাপত্তাও তৈরি করে?

দুটিই সম্ভব।

একটি NATO সদস্যের দৃষ্টিতে জোটটি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে।

কারণ সে জানে, আক্রমণের ক্ষেত্রে সে একা থাকবে না।

কিন্তু NATO-র বাইরে থাকা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে একই জোটের সম্প্রসারণ তার নিরাপত্তা কমিয়ে দিতে পারে।

এটাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির কঠিন বাস্তবতা।

এক পক্ষের নিরাপত্তা অন্য পক্ষের অনিরাপত্তা তৈরি করতে পারে।

তাই NATO-কে শুধু “ভালো” বা “খারাপ”—এই দুই শব্দে বিচার করলে ভূরাজনীতির আসল জটিলতা হারিয়ে যায়।


সামনে কি NATO আরও শক্তিশালী হবে?

বর্তমান প্রবণতা দেখে তিনটি সম্ভাবনা দেখা যায়।

১. NATO আরও শক্তিশালী হবে

রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের আশঙ্কা এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তার উদ্বেগ সদস্যদের আরও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

Finland ও Sweden-এর যোগদানও উত্তর ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সাজিয়েছে।

২. NATO থাকবে, কিন্তু ইউরোপের ভূমিকা বাড়বে

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের defence capability বাড়াতে পারে।

এতে NATO-র চরিত্র বদলাবে, কিন্তু জোটটি থাকবে।

৩. বিশ্ব আরও বহুমেরু হয়ে উঠবে

NATO শক্তিশালী থাকলেও বিশ্ব শুধু NATO বনাম Russia/China—এই দুই ব্লকে আটকে থাকবে না।

India, Türkiye, Gulf states এবং Global South-এর বহু দেশ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সম্পর্ক তৈরি করতে চাইবে।

ফলে ভবিষ্যতের বিশ্ব সম্ভবত হবে competitive multipolarity—যেখানে জোট থাকবে, কিন্তু সবাই একই শিবিরে থাকবে না।


বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এর অর্থ কী?

বাংলাদেশ NATO সদস্য নয় এবং ইউরোপীয় নিরাপত্তা কাঠামোর সরাসরি অংশও নয়।

তবু বৈশ্বিক মেরুকরণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি, সমুদ্রপথ, সরবরাহব্যবস্থা এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

বিশ্ব যদি ক্রমেই প্রতিদ্বন্দ্বী ব্লকে বিভক্ত হয়, তাহলে ছোট ও মধ্যম শক্তির দেশগুলোর জন্য ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় বাজার।

অন্যদিকে চীন ও এশীয় অর্থনীতি।

এর পাশাপাশি ভারত মহাসাগর ও Indo-Pacific-এর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হতে পারে—

কোনো একটি শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পক্ষ হওয়ার চেয়ে নিজের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখা।

কারণ Multipolar World-এ ছোট ও মধ্যম শক্তির জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ হতে পারে strategic flexibility


শেষ কথা: NATO কি সমস্যার কারণ, নাকি সমস্যার প্রতিক্রিয়া?

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটির উত্তর একটি বাক্যে দেওয়া যায় না।

NATO নিঃসন্দেহে একটি নিরাপত্তা জোট। Article 5 এবং collective defence তার কেন্দ্রীয় ভিত্তি।

কিন্তু একই সঙ্গে NATO একটি বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র।

তার সম্প্রসারণ রাশিয়ার নিরাপত্তা-দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করেছে। রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত NATO-কে আরও শক্তিশালী করেছে। আর NATO-র শক্তিশালী হওয়া আবার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির নিরাপত্তা উদ্বেগ বাড়াতে পারে।

এটি একটি চক্র

ভয় → অস্ত্র → জোট → পাল্টা জোট → আরও ভয়।

এই চক্রই নতুন বৈশ্বিক মেরুকরণের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।

তবে NATO-কে মেরুকরণের একমাত্র চালক বলা ঠিক হবে না।

বরং বড় ছবিটি হলো—বিশ্ব নিজেই ক্ষমতার পুনর্বণ্টনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, আর NATO সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান মঞ্চ।

Cold War-এর মতো পৃথিবী হয়তো আর ফিরে আসবে না।

কিন্তু এককেন্দ্রিক বিশ্বও হয়তো আগের জায়গায় নেই।

সামনে যে বিশ্বটি তৈরি হচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ, রাশিয়া, ভারত এবং Global South—সবাই কোনো না কোনোভাবে নিজেদের প্রভাবের জায়গা তৈরি করতে চাইবে।

আর সেই বিশ্বে NATO-র সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে শুধু কতগুলো দেশ তার সঙ্গে আছে, সেটি নয়।

বরং—

কতটা ঐক্য নিয়ে তারা একটি ক্রমবর্ধমান বহুমেরু বিশ্বে নিরাপত্তা ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *