একমেরু বিশ্ব থেকে বহুমেরু বিশ্বে পরিবর্তনের প্রতীকী চিত্র

বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, ভারত ও অন্যান্য শক্তির প্রভাব বাড়ছে।

একমেরু বিশ্বের যুগ কি শেষের পথে? যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, ভারত, BRICS ও Global South-এর উত্থান কীভাবে বিশ্ব ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে এই Think Tank বিশ্লেষণে।

একসময় মনে হয়েছিল, পৃথিবীর ক্ষমতার কেন্দ্র একটাই। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্র শুধু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতি বা সামরিক শক্তি ছিল না; আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ম-কানুন নির্ধারণেও তার প্রভাব ছিল অসাধারণ।

কিন্তু সেই যুগ কি শেষ হয়ে যাচ্ছে?

আজকের বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র এখনো সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর একটি। একই সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত উত্থান, রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা, ভারতের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং Global South-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বিশ্বব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে।

ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু “কে সবচেয়ে শক্তিশালী?”—এমন নয়।

প্রশ্ন হলো, বিশ্বের ক্ষমতা কি ধীরে ধীরে একটি কেন্দ্র থেকে একাধিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে যাচ্ছে?

একমেরু বিশ্ব কীভাবে তৈরি হয়েছিল?

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে Cold War-এর অবসান ঘটে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আর কোনো সমপর্যায়ের বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী থাকল না।

এই সময়টিকে অনেক বিশ্লেষক Unipolar Moment হিসেবে দেখেন।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছিল—

  • বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি
  • সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা
  • বৈশ্বিক জোটের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক
  • ডলারের আন্তর্জাতিক আধিপত্য
  • প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বড় সুবিধা
  • আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর ব্যাপক প্রভাব

তবে একমেরু বিশ্ব মানে এই নয় যে পৃথিবীর অন্য সব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অধীন ছিল।

বরং এর অর্থ হলো, বিশ্বের সামগ্রিক ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি রাষ্ট্র এতটাই এগিয়ে ছিল যে অন্য কোনো রাষ্ট্র এককভাবে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারছিল না।

এই ব্যবস্থাই এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে।

পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ: চীনের উত্থান

নতুন বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভবত চীনের উত্থান।

গত কয়েক দশকে চীন বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটি প্রযুক্তি, শিল্প উৎপাদন, অবকাঠামো, বাণিজ্য এবং সামরিক সক্ষমতায় বড় বিনিয়োগ করেছে।

চীনের শক্তি শুধু তার নিজস্ব অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়।

এশিয়া, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্কও বেড়েছে।

ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা এখন শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই নেই।

এটি ছড়িয়ে পড়েছে—

চিপ → AI → বাণিজ্য → জ্বালানি → সমুদ্রপথ → সরবরাহব্যবস্থা → প্রযুক্তি → বিনিয়োগ

প্রায় সব ক্ষেত্রেই।

এ কারণেই US-China rivalry-কে শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

এটি আসলে ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিযোগিতা।

তবে কি যুক্তরাষ্ট্রের পতন হচ্ছে?

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাটি হলো—ক্ষমতার ভারসাম্য বদলানো আর যুক্তরাষ্ট্রের পতন একই বিষয় নয়।

যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের অন্যতম প্রধান সামরিক শক্তি। তার রয়েছে বিশাল অর্থনীতি, উন্নত প্রযুক্তি, বৈশ্বিক সামরিক ঘাঁটি ও দীর্ঘদিনের মিত্রজোট।

NATO-সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি সুবিধা দেয়, যা শুধু GDP বা সামরিক বাজেট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না।

এ ছাড়া ডলার এখনো আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে।

তাই “যুক্তরাষ্ট্র শেষ” ধরনের সরল সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।

বরং বেশি গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা হলো—

যুক্তরাষ্ট্রের একক আধিপত্যের জায়গায় প্রতিযোগিতামূলক বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব তৈরি হচ্ছে।

ভারত কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

এই পরিবর্তনের আরেকটি বড় চরিত্র ভারত।

ভারতের জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক আকার, প্রযুক্তি খাত, সামরিক সক্ষমতা এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ করে তুলছে।

তবে ভারতকে চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো একই ধরনের শক্তি হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

ভারতের কৌশল অনেক বেশি Strategic Autonomy-নির্ভর।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতা বাড়ছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। আবার Global South-এর দেশগুলোর মধ্যেও ভারত নিজের প্রভাব বাড়াতে চাইছে।

অর্থাৎ ভারত এমন একটি শক্তি হয়ে উঠছে, যে শুধু কোনো একটি শিবিরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা ধরে রেখে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়।

এটাই ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হতে পারে।

রাশিয়া কি এখনো বিশ্বশক্তি?

রাশিয়ার অর্থনৈতিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের সঙ্গে তুলনীয় নয়।

কিন্তু বিশ্বশক্তি হওয়ার জন্য শুধু অর্থনীতি প্রয়োজন হয় না।

রাশিয়ার রয়েছে বড় সামরিক সক্ষমতা, পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার এবং জ্বালানি সম্পদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব।

ইউক্রেন যুদ্ধও দেখিয়েছে, রাশিয়া এখনো ইউরোপীয় নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে রাশিয়ার অবস্থানও একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়েছে—

রাশিয়া কি নিজস্ব শক্তির কেন্দ্র হিসেবে থাকবে, নাকি ক্রমেই চীনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ একটি অংশীদার হয়ে উঠবে?

এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যৎ ক্ষমতার ভারসাম্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

BRICS কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ভিত্তি?

BRICS-এর গুরুত্ব এখানেই।

মূলত ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্ম পরবর্তীতে আরও বিস্তৃত হয়েছে।

এর পেছনে একটি বড় রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলোর একটি অংশ মনে করে, আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান কাঠামো তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বকে যথেষ্ট প্রতিফলিত করে না।

তবে BRICS-কে সরাসরি “পশ্চিমবিরোধী জোট” হিসেবে দেখাও অতিরঞ্জিত।

কারণ এর সদস্যদের স্বার্থ এক নয়।

চীন ও ভারতের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। বিভিন্ন সদস্যের পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে আলাদা অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আবার ডলার থেকে দূরে যাওয়ার প্রশ্নেও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

তাই BRICS-এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে একটি বড় প্রশ্নের ওপর—

এটি কি শুধু বিকল্প রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থাকবে, নাকি সত্যিই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে পারবে?

Global South কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশ্বব্যবস্থার পরিবর্তনের আরেকটি বড় সংকেত আসছে Global South থেকে।

এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশ এখন আর যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতায় সরাসরি কোনো একটি পক্ষ বেছে নিতে চায় না।

তারা চায়—

বাণিজ্য চাই, বিনিয়োগ চাই, প্রযুক্তি চাই—কিন্তু পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীনতাও চাই।

এই অবস্থান পশ্চিমা শক্তির জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, তেমনি চীনের জন্যও।

কারণ Global South-এর দেশগুলো চীনের বিনিয়োগ গ্রহণ করলেও সবসময় চীনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে একমত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

একইভাবে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও তারা সব আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পশ্চিমের অবস্থান সমর্থন করবে—এমনটিও নয়।

ফলে ভবিষ্যতের বিশ্বে Middle Powers এবং Global South-এর দেশগুলোর দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়তে পারে।

ক্ষমতা শুধু ট্যাংক বা ক্ষেপণাস্ত্রে নেই

পুরোনো ভূরাজনীতিতে সামরিক শক্তিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে দেখা হতো।

কিন্তু আজ ক্ষমতার সংজ্ঞা অনেক বড়।

একটি রাষ্ট্রের শক্তি নির্ধারণে এখন গুরুত্বপূর্ণ—

অর্থনীতি + প্রযুক্তি + AI + Semiconductor + Energy + Supply Chain + Currency + Data + Military + Diplomacy

এগুলোর সমন্বয়।

উদাহরণ হিসেবে Semiconductor শিল্পের কথাই ধরা যায়।

একটি ছোট প্রযুক্তিগত উপাদান এখন উন্নত অস্ত্র, AI, গাড়ি, মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে আধুনিক শিল্পের ভিত্তি।

অর্থাৎ ভবিষ্যতের ভূরাজনীতিতে একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কখনো কখনো তার সামরিক শক্তির মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র কোথায়?

বর্তমান প্রবণতা দেখে একটি বিষয় পরিষ্কার।

বিশ্ব সম্ভবত একটি মাত্র শক্তিকেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে না।

বরং কয়েকটি শক্তিকেন্দ্র পাশাপাশি শক্তিশালী হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র

সামরিক শক্তি, প্রযুক্তি, ডলার ও বৈশ্বিক জোটের কারণে এখনো প্রধান কেন্দ্র।

চীন

উৎপাদন, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সামরিক সক্ষমতার মাধ্যমে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী।

ভারত

বড় বাজার, জনসংখ্যা, প্রযুক্তি, সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থানের কারণে দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে।

ইউরোপ

একক রাষ্ট্র নয়, কিন্তু অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক ক্ষমতার কারণে এখনো গুরুত্বপূর্ণ শক্তিকেন্দ্র।

রাশিয়া

সামরিক ও পারমাণবিক শক্তি এবং জ্বালানি সম্পদের কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

Global South

সমষ্টিগতভাবে বড় বাজার, প্রাকৃতিক সম্পদ, শ্রমশক্তি ও কূটনৈতিক সমর্থনের কারণে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব শক্তি সমান নয়।

কেউ সামরিকভাবে শক্তিশালী। কেউ অর্থনৈতিকভাবে। কেউ প্রযুক্তিতে। কেউ আবার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থা সম্ভবত হবে অসম বহুমেরু বিশ্ব।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী?

বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে বাংলাদেশের মতো মধ্যম আকারের দেশের জন্য সুযোগ এবং ঝুঁকি—দুটিই বাড়ে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থান বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়াতে পারে।

এদিকে ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি।

কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

অন্যদিকে একাধিক শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশ নিজের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে পারে।

অর্থাৎ নতুন বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু—

“আমরা কার সঙ্গে?”

বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—

“আমরা কীভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করব?”

একমেরু বিশ্বের শেষ—নাকি শুধু রূপান্তর?

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসা যাক।

একমেরু বিশ্বের শেষ কি সত্যিই শুরু হয়ে গেছে?

সম্ভবত হ্যাঁ—কিন্তু সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পতন হিসেবে দেখা ভুল হবে।

বরং গত কয়েক দশকের পরিবর্তন বলছে, বিশ্বের ক্ষমতা ধীরে ধীরে আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক ও বহুকেন্দ্রিক হচ্ছে।

তবে Multipolar World মানেই শান্তিপূর্ণ বিশ্ব নয়।

বরং একাধিক শক্তি যখন একই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তখন ভুল হিসাব, Proxy War, Trade War, Cyber Conflict এবং সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

বিশ্বের সামনে তাই একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।

কোনো একক শক্তি হয়তো পুরো পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

কিন্তু একই সঙ্গে কোনো শক্তিই হয়তো অন্যদের উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো বিশ্ব চালাতেও পারবে না।

এটাই সম্ভবত নতুন বিশ্বব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য।

শেষ কথা: ক্ষমতা কার হাতে যাচ্ছে?

ক্ষমতা আসলে একজনের হাত থেকে আরেকজনের হাতে যাচ্ছে না।

বরং ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনো বিশাল ক্ষমতা আছে। চীন সেই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছে। ভারত নিজের জায়গা তৈরি করছে। ইউরোপ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব ধরে রেখেছে। রাশিয়া সামরিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাব বজায় রেখেছে। আর Global South ক্রমেই নিজের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর-কষাকষির জায়গা তৈরি করছে।

তাই আগামী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়তো হবে না—

“পরবর্তী Superpower কে?”

বরং প্রশ্ন হবে—

“কে কতগুলো শক্তির সঙ্গে একই সময়ে প্রতিযোগিতা, সহযোগিতা এবং দর-কষাকষি করতে পারে?”

কারণ ২১ শতকের বিশ্ব সম্ভবত কোনো একক সাম্রাজ্যের বিশ্ব হবে না।

এটি হবে ক্ষমতার জন্য একাধিক কেন্দ্রের প্রতিযোগিতার বিশ্ব।

আর সেই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু যার অস্ত্র বেশি, তার নয়।

যে রাষ্ট্র অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জোট, কূটনীতি এবং ভূগোল—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে, ভবিষ্যতের বিশ্বব্যবস্থায় তার প্রভাবই সবচেয়ে বেশি হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *