Proxy War-এ বড় শক্তির সমর্থনে অন্য দেশের মাটিতে সংঘাতের প্রতীকী চিত্র

বড় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে অস্ত্র, অর্থ ও কৌশলগত সহায়তার মাধ্যমে অন্য দেশের সংঘাতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

Proxy War কী? কেন বড় শক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে অন্য দেশ বা গোষ্ঠীকে অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেয়—Cold War থেকে Sudan ও Ukraine-এর আধুনিক উদাহরণে জানুন।

একটি যুদ্ধ চলছে। সৈন্যরা লড়ছে, শহর ধ্বংস হচ্ছে, মানুষ মারা যাচ্ছে।

কিন্তু যুদ্ধরত দুই পক্ষের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আরও কিছু শক্তিশালী দেশ। তারা হয়তো সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে নিজেদের সেনা পাঠাচ্ছে না। তবে অস্ত্র দিচ্ছে, অর্থ দিচ্ছে, গোয়েন্দা তথ্য দিচ্ছে, প্রশিক্ষণ দিচ্ছে কিংবা কূটনৈতিক সমর্থন দিচ্ছে।

তাহলে যুদ্ধটা আসলে কার? এখানেই আসে Proxy War বা প্রক্সি যুদ্ধ ধারণাটি।

সহজভাবে বললে, কোনো বড় শক্তি যখন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করে অন্য কোনো দেশ, গোষ্ঠী বা সশস্ত্র পক্ষকে ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক, সামরিক বা কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, তখন তাকে Proxy War বলা হয়। Proxy War মানেই এমন নয় যে যুদ্ধরত পক্ষটি পুরোপুরি বাইরের কোনো দেশের “পুতুল”। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় পক্ষের নিজস্ব রাজনৈতিক, জাতিগত, ধর্মীয় বা আঞ্চলিক স্বার্থও থাকে।

অর্থাৎ প্রক্সি যুদ্ধ সাধারণত দুটি স্তরে চলে—local conflict এবং great-power competition। এই দুই স্তর একসঙ্গে মিশে গেলেই একটি স্থানীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির বড় খেলায় পরিণত হয়।

Proxy War-এর সহজ উদাহরণ কী?

ধরুন, দেশ A এবং দেশ B সরাসরি যুদ্ধ করতে চায় না। কারণ সরাসরি যুদ্ধ হলে বিপুল সৈন্য মারা যেতে পারে, অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।

তাই দেশ A কোনো তৃতীয় দেশের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র ও অর্থ দিল। দেশ B-ও অন্য একটি পক্ষকে সমর্থন করল। এখন যুদ্ধ হচ্ছে তৃতীয় দেশের মাটিতে। তবে সংঘাতের পেছনে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতাও কাজ করছে। এটাই Proxy War-এর মূল ধারণা।

বড় শক্তিগুলো নিজেরা সরাসরি যুদ্ধ করে না কেন?

প্রথম কারণ খরচ। সরাসরি যুদ্ধ অত্যন্ত ব্যয়বহুল—সৈন্য মোতায়েন, অস্ত্র, লজিস্টিকস, গোয়েন্দা তৎপরতা, যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনী সবকিছুর জন্য বিপুল অর্থ প্রয়োজন। Proxy support তুলনামূলকভাবে কম খরচে কোনো অঞ্চলে প্রভাব তৈরির সুযোগ দিতে পারে।

দ্বিতীয় কারণ ঝুঁকি কমানো। দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশ যদি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। তাই তারা অনেক সময় এমন সংঘাত বেছে নেয়, যেখানে সরাসরি সংঘর্ষের বদলে স্থানীয় পক্ষকে সমর্থন করা হয়।

তৃতীয় কারণ “plausible deniability” বা অস্বীকার করার সুযোগ। কোনো রাষ্ট্র চাইলে বলতে পারে, “আমরা সরাসরি এই যুদ্ধে নেই”—যদিও বাস্তবে তারা অর্থ, অস্ত্র বা প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো পক্ষকে সাহায্য করছে। এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কৌশলগত সুবিধা দিতে পারে।

Cold War: Proxy War-এর সবচেয়ে বড় যুগ

Proxy War বোঝার জন্য Cold War একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু তারা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে যায়নি, কারণ দুই পক্ষের কাছেই ছিল ভয়ংকর সামরিক ক্ষমতা এবং পরে পারমাণবিক অস্ত্র।

ফলে প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে পড়ে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে। এসব সংঘাতের অনেকগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি যুদ্ধ না করেও বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করেছে। এ কারণেই Cold War বোঝার ক্ষেত্রে Proxy War অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা।

১৯৫০ সালে কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধ শুরু হয়, যেখানে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়া আক্রমণ করে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা দক্ষিণ কোরিয়াকে সমর্থন করে, অন্যদিকে চীন উত্তর কোরিয়াকে বড় ধরনের সামরিক সহায়তা দেয় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নও উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন করে। এটিকে পুরোপুরি একটি সরল Proxy War বলা ঠিক হবে না, কারণ কোরিয়ার নিজস্ব রাজনৈতিক সংঘাত ও জাতীয় বিভাজনও ছিল। তবে খুব দ্রুত এটি Cold War-এর বৃহত্তর প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে যায়—স্থানীয় সংঘাত আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার সঙ্গে মিশে যায়, এটাই Proxy War-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

ভিয়েতনাম যুদ্ধও একইভাবে Cold War-এর power competition-এর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। উত্তর ভিয়েতনামকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন বিভিন্নভাবে সহায়তা করেছিল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন করে সরাসরি বিশাল সামরিক অভিযান চালায়। তবে ভিয়েতনামের নিজস্ব জাতীয়তাবাদ ও উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামও ছিল। তাই একে শুধু “আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রক্সি যুদ্ধ” বললে ভিয়েতনামের নিজস্ব ইতিহাসকে ছোট করা হয়। বরং বলা যায়, একটি স্থানীয় ও জাতীয় সংঘাত Cold War-এর বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ করে, যার বিরুদ্ধে বিভিন্ন আফগান প্রতিরোধ গোষ্ঠী বা মুজাহিদিন গড়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও অন্যদের সহায়তায় এই গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ও অর্থ পায়। ওয়াশিংটনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সোভিয়েত শক্তিকে চাপে রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ হয়ে ওঠে, ফলে আফগানিস্তান হয়ে ওঠে Cold War-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও দেখা গেছে।

Proxy War কি শুধু দুই দেশের মধ্যে হয়?

না, এটি আরও জটিল হতে পারে। একটি সংঘাতে একাধিক বহিঃশক্তি যুক্ত হতে পারে—Power A হয়তো সমর্থন করছে Group X-কে, Power B সমর্থন করছে Group Y-কে, আবার Power C সমর্থন করছে Group Z-কে। একই দেশের ভেতরে বিভিন্ন পক্ষের নিজস্ব লক্ষ্য থাকতে পারে, ফলে সংঘাতের গঠন হয়ে যায় অত্যন্ত জটিল। কেউ ক্ষমতা চায়, কেউ ভূখণ্ড চায়, কেউ regime change চায়, আবার কেউ শুধু নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।

Middle East-এ Proxy War কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

মধ্যপ্রাচ্য প্রক্সি যুদ্ধের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি আসে, কারণ এখানে একাধিক আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। বিশেষ করে ইরান ও সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক rivalry বিভিন্ন সংঘাতের ওপর প্রভাব ফেলেছে। ইয়েমেন, সিরিয়া, ইরাক ও লেবাননের মতো জায়গায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তির সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে প্রতিটি সংঘাতের নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, তাই কোনো সংঘাতকে শুধু “ইরান বনাম সৌদি আরব” হিসেবে দেখলে পুরো বাস্তবতা বোঝা যায় না।

ইয়েমেনের সংঘাতকে প্রায়ই ইরান-সৌদি rivalry-এর দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখা হয়। Houthi ও ইয়েমেনের অন্যান্য পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি-প্রতিযোগিতা যুক্ত হয়েছে। সৌদি আরব-নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন একদিকে, আর Houthi-দের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আলোচনা রয়েছে। তবে ইয়েমেনের সংঘাতের মূল কারণ শুধু এই rivalry নয়—দেশটির রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার: বাইরের শক্তি সংঘাতকে প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু স্থানীয় কারণকে মুছে দেয় না।

সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ Proxy War-এর জটিলতা বোঝার আরেকটি উদাহরণ। একদিকে সিরীয় সরকার, অন্যদিকে বিভিন্ন বিরোধী গোষ্ঠী এবং তার সঙ্গে ISIS-এর মতো চরমপন্থী সংগঠন। বাইরে থেকে রাশিয়া, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পক্ষে যুক্ত হয়েছে। ফলে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ধীরে ধীরে একটি internationalized conflict-এ পরিণত হয়—একই যুদ্ধক্ষেত্রে একাধিক দেশের আলাদা আলাদা কৌশলগত স্বার্থ থাকতে পারে।

Sudan: চলমান বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রক্সি সংঘাত

আধুনিক প্রক্সি যুদ্ধের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ এখন সুদানে দেখা যাচ্ছে। ২০২৩ সালে সুদানের সেনাবাহিনী (SAF) ও আধা-সামরিক বাহিনী Rapid Support Forces (RSF)-এর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। Responsible Statecraft-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই যুদ্ধ ধীরে ধীরে একটি আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতে রূপ নিয়েছে—সংযুক্ত আরব আমিরাত (UAE) সমর্থন দিচ্ছে RSF-কে, অন্যদিকে মিশর ও তুরস্ক অস্ত্র, ড্রোন ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করছে সেনাবাহিনীকে।

২০২৫ সালের অক্টোবরে দারফুরের এল-ফাশের শহর RSF-এর দখলে যাওয়ার পর তিন দিনে ছয় হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়, যাকে জাতিসংঘ “গণহত্যার লক্ষণ” বলে বর্ণনা করেছে। Refugees International-এর তদন্ত অনুযায়ী, UAE-সমর্থিত বিদেশি ভাড়াটে সেনা ও উন্নত ড্রোন প্রযুক্তিই এই আক্রমণে সহায়তা করেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে, যদিও আমিরাত এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সংঘাতের প্রভাব সুদানের সীমানা ছাড়িয়ে প্রতিবেশী দেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। চাদ দীর্ঘদিন ধরে UAE-এর অস্ত্র স্থানান্তরের একটি কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার ইথিওপিয়া ২০২৬ সালের মে মাসে RSF-কে সহায়তা দিতে শুরু করে বলে জানা গেছে। এদিকে জাতিসংঘের ৯০ কোটি ডলারের ত্রাণ আবেদন ২০২৬ সাল পর্যন্ত মাত্র ২১ শতাংশ পূরণ হয়েছে—যা দেখায়, প্রক্সি যুদ্ধের মানবিক মূল্য কতটা উপেক্ষিত থেকে যায়।

Ukraine কি Proxy War?

এটি অত্যন্ত sensitive এবং বিতর্কিত প্রশ্ন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মূলত রাশিয়ার ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক আগ্রাসনের পর একটি বড় আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড রক্ষার জন্য যুদ্ধ করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটোভুক্ত দেশ ও ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে অস্ত্র, অর্থ, প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে।

এই সহায়তার পরিমাণ বিশাল। Kiel Institute-এর Ukraine Support Tracker অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পশ্চিমা দেশগুলোর মোট প্রতিশ্রুতি (সামরিক, আর্থিক ও মানবিক মিলিয়ে) ৩০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে শুধু সামরিক সহায়তাই ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। শুধু ২০২৫ সালেই ইউক্রেন প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলারের নিরাপত্তা সহায়তা পেয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি। তবে ২০২৬ সালে এসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে—যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক সহায়তা কার্যত স্থগিত রেখেছে, ফলে ইউরোপীয় মিত্ররা এই ঘাটতি পূরণে এগিয়ে এসেছে এবং ন্যাটোর নতুন তহবিল কাঠামোর মাধ্যমে ২০২৬ সালে ৬০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা পৌঁছানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

এই কারণে রাশিয়া বহুবার এই যুদ্ধকে পশ্চিমাদের সঙ্গে বৃহত্তর সংঘাত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ইউক্রেনকে কেবল “প্রক্সি” বলা সমস্যাজনক, কারণ ইউক্রেনের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা উদ্বেগ এই যুদ্ধের কেন্দ্রে রয়েছে। তাই আরও নির্ভুলভাবে বলা যায়—রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সঙ্গে বৃহত্তর রাশিয়া-পশ্চিম ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা গভীরভাবে যুক্ত, আর পশ্চিমা সামরিক সহায়তা যুদ্ধের চরিত্রকে আন্তর্জাতিক ক্ষমতা-প্রতিযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এটি Proxy War ধারণাটি কতটা জটিল হতে পারে, তার একটি আধুনিক উদাহরণ।

Proxy War-এ কী কী দেওয়া হয়?

Proxy support শুধু অস্ত্র দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একটি রাষ্ট্র কোনো পক্ষকে দিতে পারে অস্ত্র, গোলাবারুদ, অর্থ, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, স্যাটেলাইট চিত্র, লজিস্টিক সহায়তা, সাইবার সক্ষমতা এবং কূটনৈতিক সমর্থন। এমনকি আন্তর্জাতিক ফোরামে রাজনৈতিক backing-ও এর অংশ হতে পারে। অর্থাৎ আধুনিক Proxy War অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে থেকেও পরিচালিত হয়।

Information War ও Cyber যুদ্ধের ভূমিকা কোথায়?

একটি সংঘাতের সময় শুধু সৈন্যরা লড়াই করে না। সামাজিক মাধ্যমে narrative তৈরি হয়—এক পক্ষ বলে “আমরা স্বাধীনতার জন্য লড়ছি”, অন্য পক্ষ বলে “আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়ছি”। এই narrative battle মানুষের মতামত ও আন্তর্জাতিক সমর্থনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই আধুনিক সংঘাতে Proxy War-এর সঙ্গে Information Warfare-এর সম্পর্ক ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

একইভাবে, একটি দেশের অবকাঠামো আক্রমণ করতে এখন সবসময় মিসাইল প্রয়োজন হয় না। সাইবার হামলার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত করা যেতে পারে পাওয়ার গ্রিড, ব্যাংকিং সিস্টেম বা সরকারি নেটওয়ার্ক। কোনো রাষ্ট্র যদি সরাসরি দায়িত্ব স্বীকার না করে কোনো cyber group-এর মাধ্যমে হামলা চালায়, তাহলে attribution কঠিন হয়ে যায়—এখানে আবার আসে সেই plausible deniability। তাই আধুনিক Proxy War শুধু বন্দুকের যুদ্ধ নয়; এটি হতে পারে military, cyber, information ও economic উপাদানের সমন্বয়।

Economics কীভাবে Proxy War-এর অস্ত্র হয়?

এখানেই Proxy War এবং Geoeconomics-এর সংযোগ তৈরি হয়। কোনো দেশকে দুর্বল করার জন্য সরাসরি সৈন্য পাঠানো ছাড়াও ব্যবহার করা যায় sanctions, বাণিজ্য বিধিনিষেধ, আর্থিক চাপ, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ জব্দকরণ। একটি সংঘাত-এলাকার অর্থনীতি দুর্বল হলে যুদ্ধ চালানোর ক্ষমতাও কমতে পারে। আবার কোনো পক্ষকে অর্থনৈতিক সহায়তা দিলে তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ আধুনিক conflict-এ অর্থনীতিও যুদ্ধক্ষেত্রের অংশ হয়ে উঠেছে।

বড় শক্তিগুলোর লাভ কোথায়?

একটি বড় শক্তি কেন অন্য দেশের যুদ্ধকে সমর্থন করবে? কারণ এর মাধ্যমে তারা নিজেদের কৌশলগত প্রভাব বাড়াতে পারে। প্রথমত, এটি প্রতিদ্বন্দ্বীর সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল করে দিতে পারে। দ্বিতীয়ত, এর মাধ্যমে কোনো অঞ্চলে friendly government বা গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা যায়। তৃতীয়ত, বন্দর, সামরিক প্রবেশাধিকার বা গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর প্রভাব অর্জন করা যায়। চতুর্থত, বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন অস্ত্র বা সামরিক প্রযুক্তির কার্যকারিতা পরীক্ষার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পঞ্চমত, এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্ক ও জোট নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা যায়।

Proxy War-এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি কার?

সাধারণত যে দেশের মাটিতে যুদ্ধ হয়, সেই দেশের জনগণ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বড় শক্তিগুলো হয়তো দূর থেকে অস্ত্র পাঠায়, কিন্তু ধ্বংস হয় স্থানীয় শহর, অবকাঠামো, অর্থনীতি ও মানুষের জীবন। একটি সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থী সংকট তৈরি হতে পারে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে পারে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। সুদানের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা এখন স্পষ্ট—দেশটির প্রায় ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষ এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৩ লাখ বেশি। এ কারণেই Proxy War-এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—যারা সিদ্ধান্ত নেয়, তারা অনেক সময় যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে থাকে।

Proxy War কি যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে?

কখনো কখনো হ্যাঁ। কারণ স্থানীয় কোনো পক্ষ যদি বাইরের অর্থায়ন, অস্ত্র বা রাজনৈতিক সমর্থন পেতে থাকে, তাহলে তার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা বাড়ে। অন্যদিকে বহিঃশক্তিও নিজের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সমর্থন চালিয়ে যেতে পারে, ফলে peace negotiation কঠিন হয়ে ওঠে। তবে এটিও সব ক্ষেত্রে সত্য নয়—কখনো বাইরের চাপ বা মধ্যস্থতা যুদ্ধ থামাতেও সাহায্য করতে পারে।

Proxy War বনাম সরাসরি যুদ্ধ

দুটি বিষয় এক নয়।

বিষয়Direct WarProxy War
প্রধান যোদ্ধারাষ্ট্র নিজেস্থানীয় রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী
বহিঃশক্তির ভূমিকাসরাসরি অংশ নেয়পরোক্ষভাবে সমর্থন করতে পারে
অস্ত্র ব্যবহারনিজস্ব বাহিনী ব্যবহার করেপ্রক্সিকে সরবরাহ করা হয়
রাজনৈতিক দায়তুলনামূলক বেশি স্পষ্টতুলনামূলকভাবে অস্পষ্ট থাকতে পারে
ঝুঁকিসরাসরি বেশিতুলনামূলকভাবে কম হতে পারে
যুদ্ধক্ষেত্রসরাসরি প্রতিপক্ষের সঙ্গেতৃতীয় দেশের ভূখণ্ডে হতে পারে

তবে বাস্তব পৃথিবীতে এই সীমারেখা সবসময় পরিষ্কার নয়। একটি সংঘাত শুরু হতে পারে Proxy War হিসেবে, পরে সরাসরি হস্তক্ষেপের দিকে যেতে পারে। আবার একটি সরাসরি যুদ্ধের মধ্যেও প্রক্সি actor যুক্ত হতে পারে।

Cold War ছিল মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের দীর্ঘমেয়াদি global rivalry। Proxy War ছিল সেই rivalry পরিচালনার একটি কৌশল মাত্র। অর্থাৎ Cold War হলো বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, আর Proxy War সেই প্রতিযোগিতা পরিচালনার একটি পদ্ধতি। এ কারণে দুটিকে এক জিনিস মনে করা ঠিক নয়।

NATO, BRICS ও Global South-এর সঙ্গে সম্পর্ক কী?

NATO নিজে কোনো Proxy War organization নয়—এটি একটি collective defence alliance। তবে NATO সদস্য দেশ কোনো সংঘাতে কোনো পক্ষকে সামরিক সহায়তা করলে সেই সহায়তা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, যেমনটা ইউক্রেনের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তবে NATO আর “Proxy War” একই জিনিস—এমন বলা সঠিক নয়।

একইভাবে BRICS কোনো Proxy War জোট নয়। তবে BRICS-এর বিভিন্ন সদস্য এবং বৃহত্তর Global South বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। অনেক উন্নয়নশীল দেশ সরাসরি কোনো বড় power bloc-এর সঙ্গে যুক্ত না হয়ে নিজেদের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে চায়। এ কারণে বর্তমান multipolar world-এ Proxy War-এর গতিপ্রকৃতি Cold War-এর তুলনায় আরও জটিল—একদিকে US-led alliances, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব, আর তার সঙ্গে ভারত, তুরস্ক, উপসাগরীয় দেশ ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির নিজস্ব স্বার্থ। ফলে বিশ্ব এখন শুধু দুই ভাগে বিভক্ত নয়।

Multipolar world-এ Proxy War বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কারণ এখানে শুধু দুটি superpower নেই—বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চায়। ফলে কোনো একটি সংঘাতে একাধিক বহিঃশক্তি যুক্ত হতে পারে, যেমনটা সুদানে দেখা যাচ্ছে—একটি দেশ নিরাপত্তা সহায়তা দিচ্ছে, আরেকটি বিনিয়োগ করছে, আরেকটি অস্ত্র দিচ্ছে, আরেকটি কূটনৈতিক backing দিচ্ছে। এটাই আধুনিক Proxy War-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

সবচেয়ে বড় সমস্যা: Proxy সবসময় নিয়ন্ত্রণে থাকে না

এটি Proxy War-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। বড় শক্তি ভাবতে পারে, “আমরা এই গোষ্ঠীকে ব্যবহার করব।” কিন্তু গোষ্ঠীটিরও নিজস্ব agenda থাকে। আজ যে গোষ্ঠী মিত্র, কাল সে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যেতে পারে। আজ যে অস্ত্র একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধে ব্যবহার হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটি অন্য সংঘাত-এলাকায় চলে যেতে পারে। অর্থাৎ proxy সম্পর্কের মধ্যে একটি “principal-agent problem” তৈরি হতে পারে। এ কারণেই Proxy War অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ভূরাজনৈতিক কৌশল।

ভবিষ্যতের Proxy War কেমন হতে পারে?

আগের Proxy War-এর প্রধান অস্ত্র ছিল রাইফেল, মিসাইল ও ট্যাংক। ভবিষ্যতের সংঘাত আরও বহুমাত্রিক হতে পারে—এর মধ্যে থাকতে পারে AI, cyber warfare, ড্রোন, স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য, information warfare, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সাপ্লাই-চেইন চাপ। এমনকি ডিজিটাল মুদ্রা ও আর্থিক অবকাঠামো নিয়েও প্রতিযোগিতা হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতের Proxy War হয়তো এমন হবে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্র শুধু একটি দেশের সীমান্তে থাকবে না—যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে মাটি, আকাশ, সমুদ্র, ইন্টারনেট, অর্থনীতি ও তথ্যের প্রতিটি স্তরে।

তাহলে Proxy War আসলে কী?

সবকিছু মিলিয়ে Proxy War-কে একটি বাক্যে বলা যায়—বড় শক্তিগুলোর সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে অন্য কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীকে ব্যবহার করে নিজেদের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের প্রতিযোগিতাই Proxy War। তবে এটিকে শুধু “বড় দেশ ছোট দেশকে দিয়ে যুদ্ধ করাচ্ছে”—এভাবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যাবে না। কারণ প্রতিটি প্রক্সির নিজস্ব agenda থাকে, প্রতিটি সংঘাতের স্থানীয় ইতিহাস থাকে, আর প্রতিটি বড় শক্তিরও আলাদা কৌশলগত স্বার্থ থাকে।

তাই Proxy War বুঝতে হলে তিনটি প্রশ্ন করতে হয়—প্রথমত, স্থানীয় সংঘাত কেন শুরু হলো? দ্বিতীয়ত, কোন বাইরের শক্তি কাকে এবং কেন সমর্থন করছে? তৃতীয়ত, এই সংঘাত থেকে কার ভূরাজনৈতিক লাভ হচ্ছে? এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যায়, একটি যুদ্ধ সত্যিই শুধু একটি দেশের যুদ্ধ, নাকি তার পেছনে চলছে আরও বড় কোনো geopolitical game।

প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

Proxy War কী? কোনো বড় শক্তি যখন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করে অন্য কোনো দেশ বা সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অস্ত্র, অর্থ বা প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে, তাকে Proxy War বলা হয়।

সুদানের যুদ্ধ কি একটি Proxy War? বিশ্লেষকরা একে ক্রমেই একটি আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করছেন, যেখানে UAE সমর্থন দিচ্ছে RSF-কে, আর মিশর ও তুরস্ক সমর্থন দিচ্ছে সুদানের সেনাবাহিনীকে। তবে সংঘাতের মূলে সুদানের নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা-দ্বন্দ্বও রয়েছে।

Proxy War আর সরাসরি যুদ্ধের মূল পার্থক্য কী? সরাসরি যুদ্ধে রাষ্ট্র নিজের বাহিনী দিয়ে সরাসরি লড়ে, আর Proxy War-এ রাষ্ট্র অন্য কোনো পক্ষকে সমর্থন দিয়ে পরোক্ষভাবে যুক্ত থাকে—রাজনৈতিক দায় ও ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।

NATO কি একটি Proxy War সংগঠন? না। NATO একটি collective defence alliance। তবে এর সদস্য দেশগুলো কোনো সংঘাতে সামরিক সহায়তা দিলে তা বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।


তথ্যসূত্র:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *