রংপুরে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারের চার সদস্য হত্যাকাণ্ড নিয়ে এলাকায় শোক ও উৎকণ্ঠা।
দ্য বাজলেন্স | রংপুর
রংপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে নিহত দুই নারীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে কি না, তা নিয়ে মর্গের ডোম ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে।
এদিকে নিহতদের স্বজনদের দাবি, মাত্র দুইজনের পক্ষে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা সম্ভব নয়। তাদের সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে।
আরও পড়তে পারেন : রংপুরে শিক্ষক পরিবার হত্যা: পুলিশের ব্যাখ্যায় আস্থা নেই স্বজন-স্থানীয়দের
দুইজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা সম্ভব নয়: স্বজন
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুরে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান শুরুর আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই গোপীনাথ চক্রবর্তী।
তিনি বলেন, দুইজনের পক্ষে চারজনকে হত্যা করে দীর্ঘ সময় ঘটনাস্থলে থাকা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন না। তার সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডের পেছনে ‘বড় কোনো শক্তি’ ও অন্য কারও সম্পৃক্ততা থাকতে পারে।
তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সন্দেহের কথা জানাননি তিনি।
তদন্ত নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন গোপীনাথ। তার প্রশ্ন, প্রশাসন যদি একের পর এক ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিবারের পক্ষ থেকে আর কী করার থাকে?
এ সময় বিদ্যুৎ সংযোগ আগে থেকেই বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি জানান তিনি।
আরও পড়তে পারেন : ‘স্যার’ ও ‘কাকি’ ডাকত যারা, তারাই একে একে চারজনকে হত্যা: এরপর খেজুর-শসা খাওয়ার দাবি পুলিশের
ধর্ষণের আলামত নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য
নিহত দুই নারীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে কি না, তা নিয়েই এখন নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আগে জানানো হয়েছিল, নিহত দুই নারীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে রংপুর মেডিকেল কলেজের মর্গের ডোম যতন দাবি করেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর শরীরে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আগামী চক্রবর্তীর মায়ের শরীরেও ধর্ষণের আলামত ও বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক এই দাবি নাকচ করেছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবুলকুমার বিশ্বাস জানান, ময়নাতদন্তে ধর্ষণের চেষ্টার কোনো লক্ষণ তারা পাননি।
তার ভাষ্য, যেসব নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল, সেগুলো মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়। পরীক্ষায় সেখানেও ধর্ষণের আলামত পাওয়া যায়নি।
ফলে ডোমের বক্তব্য ও চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য দেখা দিয়েছে। এ বিষয়টি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরও পড়তে পারেন : পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় গায়ে ছিল গেঞ্জি, পরে শার্ট: সিদ্ধার্থের বাবা
দুই যুবককে মূল আসামি করা নিয়ে প্রশ্ন
গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে তাদেরই হত্যাকাণ্ডের মূল আসামি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
তাদের কেউ কেউ ঘটনাটিকে ‘সাজানো নাটক’ বলেও দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য নিয়েও রয়েছে ভিন্নতা। শুরুতে হত্যার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ডাকাতির কথা বলা হলেও পরে পুলিশ জানায়, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড ঘটে।
তবে পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।
অ্যাসিড ব্যবহারের ধারণাও মেলেনি ময়নাতদন্তে
এর আগে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও পুলিশের প্রাথমিক ধারণা ছিল, নিহতদের মুখমণ্ডলে তরল পদার্থ পাওয়া যাওয়ায় কোনো রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, মরদেহে রাসায়নিক বা অ্যাসিডে পোড়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তার মতে, দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকায় স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ায় মুখ কালচে ও বিকৃত হয়ে থাকতে পারে।
এখন নিহতদের শরীরে ধর্ষণের আলামত, হত্যার প্রকৃত কারণ এবং ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরই তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে ময়নাতদন্ত ও ল্যাব পরীক্ষার চূড়ান্ত তথ্যের দিকেও নজর রয়েছে।
