সিলেটে একের পর এক ছিনতাই ও অপরাধের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ; আলোচনায় মূল হোতাদের ভূমিকা। প্রতীকী ছবি।
সিলেটকে একসময় তুলনামূলক শান্ত শহর হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ধারাবাহিক ঘটনায় সেই পরিচিতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে নগরীর ব্যস্ত সড়কেও প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে মহানগর এলাকায় হত্যা, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের ৩১৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২৪টি হত্যা, ৪৪টি ধর্ষণ, ১৮৪টি চুরি, ৮টি ডাকাতি ও ৫৪টি ছিনতাইয়ের মামলা।
তবে এসব মামলার পরও আলোচিত কয়েকটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় মূল হামলাকারী বা পরিকল্পনাকারীদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অপরাধের নেপথ্যে কারা কাজ করছে, তাদের রাজনৈতিক বা স্থানীয় কোনো প্রভাব রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।
দিনের আলোতেও নিরাপদ নয় পথ
সিলেট নগরীর ক্বীন ব্রিজ, বন্দরবাজার, আম্বরখানা, টিলাগড়সহ বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগ রয়েছে। কখনো পথচারী, কখনো সিএনজিচালিত অটোরিকশার যাত্রী, আবার কখনো ব্যবসায়ীদের অর্থ বহনের সময় টার্গেট করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি ও মার্চে দুটি ছিনতাইয়ের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
২৪ ফেব্রুয়ারি হাউজিং এস্টেট এলাকায় দিনের বেলায় একটি সিএনজিতে থাকা এক নারীর কাছ থেকে অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মালামাল ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। ওই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীরা এখনো গ্রেপ্তার হয়নি বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
এর কিছুদিন পর ৫ মার্চ সকালে সাগরদীঘির পাড় এলাকায় এক বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রীর পথ আটকে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ঘটনায় রশিদ নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও অন্যদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানা গেছে।
১২ লাখ টাকার ছিনতাই, গ্রেপ্তার একজন
গত বছরের ২৬ অক্টোবর কদমতলী এলাকায় এনা পরিবহণের এক কর্মকর্তার কাছ থেকে ১২ লাখ ৪০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পাঁচটি মোটরসাইকেলে করে ১০ জন ওই ঘটনায় অংশ নেয়। তবে এখন পর্যন্ত একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ধরনের ঘটনায় অভিযুক্তদের একটি অংশ ধরা পড়লেও পুরো চক্রের সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
৫০ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায়ও প্রশ্ন
৮ মে সিলেটে বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইনের একটি প্রতিষ্ঠানের ৫০ লাখ ৭০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
মামলায় প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়জনকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তবে অস্ত্রের মুখে গাড়ি থামিয়ে টাকা নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার এবং লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের বিষয়ে এখনো অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ করেছেন নাসিম হোসাইন।
তার ভাষ্য, ছিনতাইয়ের পুরো ঘটনার ভিডিও ফুটেজ পুলিশকে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মোটরসাইকেলের নম্বরও দেখা যায়। তারপরও মূল অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার না হওয়ায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন।
শিশুর গলায় ছুরি, বাবার কাছ থেকে টাকা ছিনতাই
৪ এপ্রিল আম্বরখানা থেকে শাহী ঈদগাহ যাওয়ার পথে ঘটে আরও একটি ভয়ংকর ঘটনা।
বালাগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক ও স্থানীয় সাংবাদিক ওহী আলম রেজা তার তিন বছর বয়সী শিশুপুত্রকে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাচ্ছিলেন। অভিযোগ, যাত্রীবেশে থাকা এক ব্যক্তি হঠাৎ শিশুটির গলায় ধারালো অস্ত্র ধরে।
শিশুকে জিম্মি করে চিৎকার না করার জন্য হুমকি দেওয়া হয়। এ সময় বাবার কাছ থেকে প্রায় ২০ হাজার টাকা নিয়ে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ।
ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া যায়নি।
১৩ মার্চ কুমারগাঁও এলাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগেও কাউকে আইনের আওতায় আনা যায়নি বলে জানা গেছে।
শুধু ছিনতাই নয়, বাড়ছে অন্য অপরাধও
এসএমপির এক বছরের পরিসংখ্যান বলছে, মহানগর এলাকায় শুধু ছিনতাই নয়, অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলাও হয়েছে।
এক বছরে ২৪টি হত্যা, ৪৪টি ধর্ষণ, ১৮৪টি চুরি এবং ৮টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিশেষ করে প্রবাসীদের খালি বাড়ি, বন্ধ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাতে অপেক্ষাকৃত নির্জন আবাসিক এলাকায় চুরির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-সুনামগঞ্জ মহাসড়ক এবং প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকাতেও ডাকাতির অভিযোগ রয়েছে।
এর বাইরে নগরীতে ‘হানিট্র্যাপ’ ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ ধরনের বিরোধ কখনো কখনো সহিংসতায়ও গড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
অপরাধীদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়—এমন অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের নিয়ে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অপরাধী চক্রের পেছনে রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ভূমিকা আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুলিশের পক্ষ থেকে প্রমাণ বা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হোসাইন অভিযোগ করেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে পুলিশ ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশিত তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তার দাবি, বড় ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে বিএনপির।
পুলিশের বক্তব্য কী?
অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ মনজুরুল আলম বলেন, নগরীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে।
তার ভাষ্য, ছিনতাইয়ের যেসব ঘটনায় মামলা হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত চলছে। অভিযুক্তদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে।
প্রশ্ন এখন একটাই—মূল চক্র কোথায়?
সিলেটে অপরাধের পরিসংখ্যান যেমন উদ্বেগ তৈরি করছে, তেমনি আলোচিত কয়েকটি ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের পাশাপাশি অর্থের উৎস, পরিকল্পনাকারী ও পেছনের সহযোগীদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে কি না—সেটিই এখন বড় বিষয়।
কারণ, একটি ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করলেই যদি পুরো চক্র ধরা না পড়ে, তাহলে একই ধরনের ঘটনা আবারও ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
সিলেটের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই শুধু মামলা দায়ের বা বিচ্ছিন্ন গ্রেপ্তার নয়, অপরাধের পুরো নেটওয়ার্ক শনাক্ত করাই এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় পরীক্ষা।
