প্রতীকী এই সম্পাদকীয় ইলাস্ট্রেশনে G7 ও BRICS-এর ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তনের ইঙ্গিত তুলে ধরা হয়েছে। (Illustration: The BuzzLens)
বিশ্ব রাজনীতির নতুন মোড়—একক নেতৃত্ব থেকে বহুমেরু বিশ্বের পথে?
এক সময় বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা নীতির বড় অংশই নির্ধারিত হতো হাতে গোনা কয়েকটি উন্নত দেশের সিদ্ধান্তে। আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকট থেকে শুরু করে বৈশ্বিক বাণিজ্য, নিষেধাজ্ঞা, উন্নয়ন সহযোগিতা কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বড় ইস্যুতে পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বই ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। এই নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী জোট G7।
কিন্তু গত এক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করেছে। চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উত্থান, ভারতের দ্রুত সম্প্রসারিত বাজার, রাশিয়ার ভূরাজনৈতিক অবস্থান, উপসাগরীয় শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং তথাকথিত Global South-এর কণ্ঠ আরও জোরালো হওয়ায় নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। সেই বাস্তবতার কেন্দ্রেই উঠে এসেছে BRICS।
এখন প্রশ্ন উঠছে—G7 কি সত্যিই তার আগের মতো প্রভাবশালী নেই? নাকি BRICS-এর উত্থানকে অতিরঞ্জিতভাবে দেখা হচ্ছে? আবার, এই পরিবর্তন কি কেবল অর্থনীতির, নাকি এটি আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে যাওয়ারও ইঙ্গিত?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সহজ নয়। কারণ G7 ও BRICS—দুটিই ভিন্ন উদ্দেশ্য, ভিন্ন কাঠামো এবং ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠেছে। তাই শুধু সদস্যসংখ্যা বা মোট জিডিপি তুলনা করলেই পুরো চিত্র স্পষ্ট হয় না। বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ইতিহাসে, দেখতে হবে উভয় জোটের জন্ম, তাদের উদ্দেশ্য, অর্জন, সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতায় তাদের অবস্থান।
কেন এখন G7 বনাম BRICS নিয়ে এত আলোচনা?
বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বারবার একটি বিষয় তুলে ধরছে—আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কেন্দ্র কি ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে অন্যত্র সরে যাচ্ছে?
এই প্রশ্নের পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে।
প্রথমত, বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য বদলেছে। গত দুই দশকে এশিয়ার অর্থনীতি দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে এবং ভারতও বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি।
দ্বিতীয়ত, Global South নামে পরিচিত উন্নয়নশীল দেশগুলোর একটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি প্রতিনিধিত্ব দাবি করছে। তাদের অভিযোগ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী যে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর কাঠামো আজকের বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তৃতীয়ত, ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং জ্বালানি নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুন রূপ নিচ্ছে।
চতুর্থত, BRICS-এর সম্প্রসারণ এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে। নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার ফলে এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক ফোরাম নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও আলোচনায় এসেছে।

G7: একটি সংকট থেকে জন্ম নেওয়া শক্তিশালী ক্লাব
আজকের G7 -এর ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭০-এর দশকের অর্থনৈতিক অস্থিরতার সময়।
তেল সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বিশ্বের বড় শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নেতারা নিয়মিত আলোচনার প্রয়োজন অনুভব করেন।
১৯৭৫ সালে ফ্রান্সের উদ্যোগে প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শুরুতে সদস্য ছিল ছয়টি দেশ। পরে কানাডা যুক্ত হলে এটি G7 -এ পরিণত হয়।
বর্তমান সদস্যরা হলো—
- কানাডা
- ফ্রান্স
- জার্মানি
- ইতালি
- জাপান
- যুক্তরাজ্য
- যুক্তরাষ্ট্র
এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নও সম্মেলনে অংশ নেয়, যদিও এটি পূর্ণ সদস্য নয়।
G7 কোনো চুক্তিভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা নয়। এর নিজস্ব সংবিধান, স্থায়ী সচিবালয় বা বাধ্যতামূলক আইনি কাঠামো নেই। বরং এটি বিশ্বের প্রধান শিল্পোন্নত গণতান্ত্রিক অর্থনীতিগুলোর একটি অনানুষ্ঠানিক নীতি-সমন্বয় প্ল্যাটফর্ম।
তবুও কয়েক দশক ধরে এই জোটের বৈশ্বিক প্রভাব ছিল অসাধারণ।
কারণ সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তি, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, সামরিক সক্ষমতা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তাদের অবস্থান বিশ্বের বহু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছে।
কেন G7 এত বছর বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবশালী ছিল?
G7-এর শক্তি শুধু সদস্যসংখ্যায় নয়; বরং সদস্যদের সামগ্রিক সক্ষমতায়।
বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী আর্থিক বাজার, বৃহৎ প্রযুক্তি কোম্পানি, শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বৈশ্বিক বিনিয়োগ ব্যাংক এবং উন্নত সামরিক জোটের বড় অংশই G7 দেশগুলোতে অবস্থিত।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক, OECD এবং বিভিন্ন বহুপাক্ষিক আর্থিক ব্যবস্থায়ও G7 সদস্যদের দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, ঋণ পুনর্গঠন, উন্নয়ন সহায়তা, জলবায়ু অর্থায়ন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা—এসব ক্ষেত্রেও G7 প্রায়ই সমন্বিত অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে, বিশ্বের রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলারের আধিপত্য এবং পশ্চিমা আর্থিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা G7-এর প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ফলে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অনেক বিশ্লেষক “rules-based international order” নামে অভিহিত করেছেন, যেখানে পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়।
কিন্তু পরিবর্তনের শুরু কোথায়?
একবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই দৃশ্যপট ধীরে ধীরে বদলাতে থাকে।
চীন শুধু বিশ্বের উৎপাদনকেন্দ্রই হয়ে ওঠেনি; বরং প্রযুক্তি, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগেও দ্রুত এগিয়ে গেছে।
ভারত বিশাল ভোক্তা বাজার, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জনসংখ্যাগত সুবিধার কারণে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিল কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায়, রাশিয়া জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পদে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা আফ্রিকান মহাদেশের প্রবেশদ্বার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই ধীরে ধীরে জন্ম নিতে থাকে এমন একটি জোট, যা পশ্চিমা নেতৃত্বের বিকল্প না হলেও অন্তত একটি বিকল্প প্ল্যাটফর্ম তৈরির চেষ্টা শুরু করে।
সেই জোটের নাম—BRICS।

BRICS-এর জন্ম—কীভাবে একটি অর্থনৈতিক ধারণা বৈশ্বিক জোটে পরিণত হলো
আগের অংশে আমরা দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় G7 দীর্ঘ সময় ধরে প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে পশ্চিম থেকে এশিয়া ও অন্যান্য উদীয়মান অঞ্চলের দিকে সরে যেতে শুরু করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—যদি বিশ্বের অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায়, তবে আন্তর্জাতিক ক্ষমতার কাঠামোও কি বদলাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই BRICS -এর গল্প শুরু।
BRICS: শুরুটা ছিল একটি অর্থনৈতিক ধারণা
আজ BRICS-কে অনেকে পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখলেও এর জন্ম রাজনৈতিকভাবে হয়নি।
২০০১ সালে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান Goldman Sachs-এর অর্থনীতিবিদ Jim O’Neill একটি গবেষণা প্রতিবেদনে প্রথম BRIC শব্দটি ব্যবহার করেন। তখন এতে ছিল চারটি দেশ—
- ব্রাজিল
- রাশিয়া
- ভারত
- চীন
প্রতিবেদনটির মূল বক্তব্য ছিল, আগামী কয়েক দশকে এই চার দেশের অর্থনীতি এত দ্রুত বাড়বে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
তখন এটি কোনো জোট ছিল না, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে একটি বিশ্লেষণাত্মক ধারণা।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই সেই ধারণা বাস্তব রাজনৈতিক রূপ নিতে শুরু করে।
অর্থনৈতিক ধারণা থেকে কূটনৈতিক জোট
২০০৬ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক করেন।
২০০৯ সালে রাশিয়ার ইয়েকাতেরিনবার্গে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম BRIC শীর্ষ সম্মেলন।
এরপর ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে জোটটির নাম হয় BRICS।
এই পরিবর্তন কেবল সদস্যসংখ্যা বাড়ার ঘটনা ছিল না। এটি দেখিয়ে দেয় যে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় ও সহযোগিতার জন্য একটি স্থায়ী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়।
BRICS কেন গঠিত হয়েছিল?
BRICS-এর প্রতিষ্ঠাতারা শুরু থেকেই নিজেদের G7-এর বিকল্প হিসেবে ঘোষণা করেননি।
তাদের মূল লক্ষ্য ছিল কয়েকটি বিষয়ে সমন্বয় বাড়ানো—
- আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি
- IMF ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কারের দাবি
- দক্ষিণ-দক্ষিণ (South-South) সহযোগিতা জোরদার করা
- বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি
- প্রযুক্তি, কৃষি, জ্বালানি ও অবকাঠামোতে সহযোগিতা
- বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থায় আরও ভারসাম্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা
অর্থাৎ BRICS-এর সূচনা ছিল “পশ্চিমবিরোধী জোট” হিসেবে নয়; বরং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর কণ্ঠস্বর শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবে।
তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে, আর সেই পরিবর্তনের কারণে BRICS-কে ঘিরে রাজনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে।
New Development Bank: শুধু আলোচনা নয়, বাস্তব প্রতিষ্ঠান
২০১৪ সালে BRICS একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়।
তারা প্রতিষ্ঠা করে New Development Bank (NDB)।
এই ব্যাংকের উদ্দেশ্য ছিল—
- উন্নয়নশীল দেশে অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন
- টেকসই উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ
- বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকের বিকল্প অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা
বিশ্বব্যাংক বা IMF-এর তুলনায় NDB এখনও আকারে অনেক ছোট। তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব বড়, কারণ এটি দেখায় যে উদীয়মান অর্থনীতিগুলো নিজেদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলতে সক্ষম।
এছাড়া BRICS দেশগুলো Contingent Reserve Arrangement (CRA) চালু করে, যার লক্ষ্য সদস্যদের আর্থিক সংকটে সহায়তা দেওয়া।
BRICS-এর সম্প্রসারণ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
দীর্ঘ সময় BRICS ছিল পাঁচ সদস্যের একটি জোট।
কিন্তু ২০২৩ সালের জোহানেসবার্গ সম্মেলনের পর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
পরবর্তীতে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে BRICS-এর ভৌগোলিক বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে।
এর ফলে জোটটির উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়—
- মধ্যপ্রাচ্যে
- আফ্রিকায়
- এশিয়ায়
- লাতিন আমেরিকায়
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—বিশ্বের বহু উন্নয়নশীল দেশ নিজেদের কৌশলগত বিকল্প বাড়াতে আগ্রহী।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, BRICS-এ যোগ দেওয়া মানেই কোনো দেশ G7 বা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করছে—এমন নয়। অনেক দেশই উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে বহুমুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে।
BRICS-এর শক্তি কোথায়?
BRICS-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তার বৈচিত্র্য।
এই জোটে রয়েছে—
- বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুই দেশ (চীন ও ভারত)
- বিশাল জ্বালানি সম্পদের দেশ (রাশিয়া)
- কৃষি উৎপাদনে শীর্ষস্থানীয় দেশ (ব্রাজিল)
- আফ্রিকার অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনীতি (দক্ষিণ আফ্রিকা)
- এবং সম্প্রসারণের পর মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর উপস্থিতি।
ফলে জনসংখ্যা, জ্বালানি, কৃষি, খনিজ সম্পদ, উৎপাদন এবং বাজার—সব মিলিয়ে BRICS একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করেছে।
এই কারণেই অনেক গবেষক মনে করেন, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির বড় অংশ উদীয়মান অর্থনীতি থেকেই আসতে পারে।
Global South কেন BRICS-এর দিকে তাকিয়ে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “Global South” শব্দটি আন্তর্জাতিক আলোচনায় বারবার উঠে আসছে।
এটি কোনো আনুষ্ঠানিক জোট নয়; বরং এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বহু উন্নয়নশীল দেশের একটি বিস্তৃত ধারণা।
এই দেশগুলোর অনেকেরই অভিন্ন কিছু উদ্বেগ রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সীমিত প্রভাব
- উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি
- জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে অসন্তোষ
- বৈশ্বিক বাণিজ্যে বৈষম্য
- প্রযুক্তি ও বিনিয়োগে অসম সুযোগ
BRICS নিজেদের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে, যেখানে এসব দেশের স্বার্থ আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা যায়।
তবে এই দাবির বাস্তবতা কতটা, সেটি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। কারণ BRICS -এর সদস্য দেশগুলোর স্বার্থ সব সময় এক নয়, এবং তাদের মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতাও বিদ্যমান।
BRICS কি সত্যিই G7-এর বিকল্প?
এখানেই আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
BRICS -এর উত্থান নিঃসন্দেহে বৈশ্বিক ক্ষমতার পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
কিন্তু এই মুহূর্তে এটিকে G7 -এর সরাসরি বিকল্প বলা অনেক বিশেষজ্ঞের মতে অতিসরলীকরণ হবে।
কারণ আন্তর্জাতিক প্রভাব নির্ধারণে শুধু জিডিপি বা জনসংখ্যা নয়, আরও অনেক বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—
- প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব
- বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা
- উদ্ভাবন
- সামরিক সক্ষমতা
- আন্তর্জাতিক জোট
- সফট পাওয়ার
- বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব
এসব সূচকে G7 এখনও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
তবে এটাও স্পষ্ট যে, BRICS -এর সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
আর সেই কারণেই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—সংখ্যার বিচারে কে বড়, সেটি নয়; বরং প্রভাবের বিচারে আগামী দশকে কোন জোট আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে বেশি প্রভাবিত করতে পারবে?

G7 বনাম BRICS— সংখ্যার বাইরে প্রকৃত শক্তির লড়াই
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই একটি দাবি শোনা যায়—“BRICS এখন G7-কে ছাড়িয়ে গেছে।”
এই বক্তব্যের পেছনে কিছু বাস্তব তথ্য রয়েছে, আবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপটও রয়েছে যা অনেক সময় আলোচনায় অনুপস্থিত থাকে।
একটি দেশের বা জোটের বৈশ্বিক প্রভাব কেবল অর্থনীতির আকার দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। অর্থনৈতিক উৎপাদন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা, সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব—সবকিছু মিলিয়েই একটি শক্তির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারিত হয়।
সেই কারণেই G7 ও BRICS -এর তুলনা করতে হলে একাধিক সূচক একসঙ্গে দেখতে হবে।
অর্থনীতির মাপকাঠিতে কে এগিয়ে?
BRICS-এর সমর্থকরা সাধারণত Purchasing Power Parity (PPP) ভিত্তিক জিডিপির কথা উল্লেখ করেন।
PPP এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে বিভিন্ন দেশের জীবনযাত্রার ব্যয় ও স্থানীয় মূল্যস্তর বিবেচনা করে অর্থনীতির আকার তুলনা করা হয়।
এই সূচকে BRICS দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থনীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে G7-কে অতিক্রম করেছে বলে IMF-এর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ, বৈশ্বিক আর্থিক বাজার এবং অধিকাংশ আন্তর্জাতিক লেনদেনে Nominal GDP বেশি ব্যবহৃত হয়।
এই সূচকে G7 এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ব্লকগুলোর একটি।
অর্থাৎ—
- PPP বলছে, উদীয়মান অর্থনীতির বাস্তব উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বেড়েছে।
- Nominal GDP দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রভাব এখনও অত্যন্ত শক্তিশালী।
দুটি তথ্যই সঠিক, তবে তারা ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে।
জনসংখ্যা ও বাজার: BRICS-এর বড় সুবিধা
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ BRICS সদস্য দেশগুলোতে বসবাস করে।
চীন ও ভারত একাই বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ।
সম্প্রসারণের পর BRICS-এর আওতায় এসেছে আরও কয়েকটি কৌশলগত বাজার ও জ্বালানি উৎপাদক রাষ্ট্র।
এর ফলে—
- ভোক্তা বাজার বড় হয়েছে।
- শ্রমশক্তির পরিমাণ বেড়েছে।
- দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই জনসংখ্যাগত সুবিধা আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বড় জনসংখ্যা সব সময় বড় আয় বা উচ্চ উৎপাদনশীলতার সমান নয়। মাথাপিছু আয়, শিক্ষা, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রযুক্তিতে কে এগিয়ে?
বিশ্ব রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে প্রযুক্তি এখন সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি।
এই ক্ষেত্রে চিত্রটি কিছুটা জটিল।
চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বৈদ্যুতিক গাড়ি, উচ্চগতির রেল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ডিজিটাল উৎপাদনে দ্রুত এগিয়েছে।
ভারত সফটওয়্যার, ডিজিটাল পেমেন্ট, মহাকাশ গবেষণা এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেখলে—
বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানির বড় অংশ এখনও G7 দেশগুলোতে অবস্থিত।
উন্নত সেমিকন্ডাক্টর, উচ্চমানের গবেষণা, ফার্মাসিউটিক্যাল উদ্ভাবন, বিমান নির্মাণ, অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণায় G7 এখনও উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে।
অর্থাৎ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে BRICS দ্রুত এগোলেও, নেতৃত্ব পুরোপুরি বদলে গেছে—এমন দাবি করার মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি।
বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় কার প্রভাব বেশি?
এটি সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিশ্বের অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এখনও মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আন্তর্জাতিক ঋণ, বৈশ্বিক বন্ড বাজার এবং আন্তঃসীমান্ত আর্থিক লেনদেনেও ডলারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই আর্থিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে—
- যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক বাজার
- পশ্চিমা ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক
- আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা
- বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা
ফলে G7-এর অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু উৎপাদনের ওপর নয়, আর্থিক ব্যবস্থার ওপরও প্রতিষ্ঠিত।
ডি-ডলারাইজেশন: বাস্তবতা নাকি অতিরঞ্জন?
BRICS নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো De-dollarization।
অনেকেই মনে করেন BRICS খুব দ্রুত ডলারের বিকল্প তৈরি করছে।
বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন।
BRICS সদস্যরা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
কিছু ক্ষেত্রে জাতীয় মুদ্রায় লেনদেনও বেড়েছে।
তবে এখনো—
- বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারই প্রাধান্যশীল।
- আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারভিত্তিক।
- আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও আর্থিক বাজারেও ডলারের অবস্থান শক্তিশালী।
অর্থাৎ ডলারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও, তাৎক্ষণিকভাবে ডলারের বিকল্প তৈরি হয়ে গেছে—এমনটি বলা তথ্যসম্মত হবে না।
বরং অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, ভবিষ্যতে বিশ্ব ধীরে ধীরে “আরও বহুমুদ্রাভিত্তিক” (multi-currency) ব্যবস্থার দিকে যেতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদি এবং ধাপে ধাপে ঘটার সম্ভাবনাই বেশি।
সামরিক ও কৌশলগত প্রভাব: G7 এখনও কোথায় এগিয়ে?
অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বৈশ্বিক প্রভাব নির্ধারণে নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতাও বড় বিষয়।
G7 সদস্যদের অনেকেই NATO -এর প্রধান শক্তি।
বিশ্বজুড়ে তাদের—
- সামরিক ঘাঁটি,
- প্রতিরক্ষা জোট,
- গোয়েন্দা সহযোগিতা,
- উন্নত অস্ত্র প্রযুক্তি,
- নৌ উপস্থিতি,
- সাইবার সক্ষমতা
দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
অন্যদিকে BRICS কোনো সামরিক জোট নয়।
এটির সদস্যদের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা সীমিত এবং তাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময় অভিন্নও নয়।
এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ G7-এর প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়; নিরাপত্তা স্থাপত্যেও গভীরভাবে প্রোথিত।
সফট পাওয়ার: যেটি সংখ্যায় মাপা যায় না
বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো Soft Power।
এতে অন্তর্ভুক্ত—
- সংস্কৃতি
- উচ্চশিক্ষা
- গবেষণা
- গণমাধ্যম
- প্রযুক্তি ব্র্যান্ড
- আন্তর্জাতিক সহায়তা
- কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা
বিশ্বের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়, বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম, বিনোদন শিল্প, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি ব্র্যান্ডের বড় অংশ এখনও G7 দেশগুলোতে কেন্দ্রীভূত।
এই সফট পাওয়ার বহু ক্ষেত্রে সামরিক শক্তির চেয়েও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সৃষ্টি করে।
তাহলে কি BRICS-এর উত্থান G7-এর পতনের সমান?
এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাটি তৈরি হয়।
BRICS-এর উত্থান একটি বাস্তবতা।
কিন্তু সেই বাস্তবতা G7-এর অবিলম্বে পতনের সমার্থক নয়।
বরং বর্তমানে যে পরিবর্তনটি দেখা যাচ্ছে, সেটি অনেক গবেষকের ভাষায় “ক্ষমতার পুনর্বণ্টন (Redistribution of Power)”, যেখানে নতুন অর্থনৈতিক শক্তিগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও বড় ভূমিকা চাইছে।
অর্থাৎ বিশ্ব হয়তো এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে, যেখানে G7 এখনও প্রভাবশালী থাকবে, কিন্তু এককভাবে বৈশ্বিক এজেন্ডা নির্ধারণ করা আগের তুলনায় আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
নতুন বিশ্বব্যবস্থা— G7-এর পতন, নাকি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস?
এ পর্যন্ত আলোচনায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে—BRICS-এর উত্থান বাস্তব, কিন্তু সেটিকে G7-এর পতনের সমার্থক হিসেবে দেখা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষকেরা বরং বলছেন, বিশ্ব এমন একটি পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে ক্ষমতা একক কেন্দ্র থেকে ধীরে ধীরে একাধিক কেন্দ্রে ছড়িয়ে পড়ছে।
তবে এই পরিবর্তন কতটা গভীর হবে, তা বোঝার জন্য BRICS-এর নিজস্ব সীমাবদ্ধতা এবং G7-এর অভিযোজনক্ষমতা—দুটিই সমানভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
BRICS-এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: সবাই কি একই লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে?
BRICS-এর শক্তি যেমন বৈচিত্র্য, তেমনি সেটিই এর সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও।
জোটটির সদস্যদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, আঞ্চলিক স্বার্থ এবং নিরাপত্তা অগ্রাধিকার একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা।
উদাহরণ হিসেবে—
- ভারত ও চীনের মধ্যে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ রয়েছে।
- রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সদস্যদের অবস্থান এক নয়।
- ব্রাজিলের পররাষ্ট্রনীতি সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হতে পারে।
- নতুন সদস্যদেরও অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকার একরকম নয়।
ফলে BRICS কোনো একক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে না এবং সব বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোও সহজ নয়।
এ কারণেই অনেক বিশ্লেষক BRICS-কে একটি “কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম” হিসেবে দেখেন, পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জোট হিসেবে নয়।
G7-এর শক্তি: শুধু অর্থনীতি নয়, প্রতিষ্ঠানও
অন্যদিকে G7-এর প্রভাবের বড় উৎস তার দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক।
যদিও G7 নিজে একটি অনানুষ্ঠানিক ফোরাম, তবে এর সদস্যরা যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, সেগুলোর সম্মিলিত প্রভাব অত্যন্ত বড়।
এর মধ্যে রয়েছে—
- আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান
- উন্নয়ন সহযোগিতা কাঠামো
- বৈশ্বিক গবেষণা ও উদ্ভাবন নেটওয়ার্ক
- নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব
- উচ্চশিক্ষা ও প্রযুক্তি ইকোসিস্টেম
এই প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তাই অনেক গবেষকের মতে, শুধু নতুন অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি হলেই এই প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব দ্রুত বদলে যাবে—এমনটি ধরে নেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
G7 কি পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে?
G7 -কে অনেক সময় স্থির বা প্রতিক্রিয়াশীল হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে গত কয়েক বছরে জোটটি নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
উদাহরণ হিসেবে—
- গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ
- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে সমন্বিত নীতিগত আলোচনা
- সাপ্লাই চেইন বৈচিত্র্যকরণ
- জলবায়ু অর্থায়ন বৃদ্ধি
- উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো বিনিয়োগের নতুন উদ্যোগ
এসব পদক্ষেপ ইঙ্গিত দেয় যে G7-ও বুঝতে পারছে, ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতা শুধু অর্থনীতিতে নয়; প্রযুক্তি, জ্বালানি, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং কৌশলগত সম্পদেও হবে।
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে একটি বিষয় বারবার উঠে আসে—বিশ্ব এখন “Power Transition” বা ক্ষমতার রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই রূপান্তরকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা হবে, সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।
একদল গবেষকের মতে—
BRICS-এর সম্প্রসারণ প্রমাণ করে যে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরও বেশি প্রভাব চাইছে। তাদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শাসন কাঠামো আজকের অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
অন্যদিকে আরেকদল গবেষকের মতে—
BRICS-এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বড় হলেও, সদস্যদের অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য ও পারস্পরিক স্বার্থের পার্থক্য এটিকে G7-এর মতো সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী জোটে পরিণত হতে বাধা দিতে পারে।
আবার কিছু বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন—
ভবিষ্যৎ বিশ্ব হবে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতার মিশ্র বাস্তবতা। কিছু ক্ষেত্রে G7 ও BRICS প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, আবার জলবায়ু পরিবর্তন, মহামারি, খাদ্য নিরাপত্তা বা বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতার মতো ইস্যুতে সহযোগিতাও করতে হবে।
তাহলে কি আমরা বহুমেরু (Multipolar) বিশ্বে প্রবেশ করছি?
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষায় Multipolar World বলতে এমন একটি বিশ্বব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে একাধিক শক্তিকেন্দ্র বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত ও প্রভাব ভাগাভাগি করে।
আজকের বাস্তবতায় অনেক বিশ্লেষক যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় শক্তি, চীন, ভারত এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে এই পরিবর্তনের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।
তবে “বহুমেরু বিশ্ব” মানেই সব শক্তির প্রভাব সমান—এমন নয়।
বরং বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ—
- প্রযুক্তিতে এক ধরনের নেতৃত্ব,
- জ্বালানিতে আরেক ধরনের,
- উৎপাদনে অন্য নেতৃত্ব,
- আর্থিক ব্যবস্থায় আবার অন্য নেতৃত্ব।
অর্থাৎ ভবিষ্যতের বিশ্ব আরও জটিল, আন্তঃনির্ভরশীল এবং বহুস্তরীয় হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এর অর্থ কী?
G7 ও BRICS-এর প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের জন্য একই সঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সুযোগগুলো হতে পারে—
- বিনিয়োগের নতুন উৎস
- অবকাঠামো অর্থায়নের বিকল্প
- রপ্তানি বাজারের বৈচিত্র্য
- প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বৃদ্ধি
অন্যদিকে চ্যালেঞ্জও রয়েছে—
- বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা
- সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তনের প্রভাব
- বৈশ্বিক আর্থিক অনিশ্চয়তা
- বাণিজ্যিক ও ভূরাজনৈতিক চাপ
তাই অনেক কূটনীতিক মনে করেন, ছোট ও মাঝারি অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য “ভারসাম্যপূর্ণ বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি” ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

G7-এর পতন নয়, বরং বিশ্ব রাজনীতির নতুন অধ্যায়
সব তথ্য ও বিশ্লেষণ একত্র করলে একটি ভারসাম্যপূর্ণ চিত্র সামনে আসে।
BRICS-এর উত্থান নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রতীক। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর ও Global South-এর কণ্ঠস্বর এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে G7 এখনও বিশ্বের প্রযুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থা, উদ্ভাবন, সামরিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ধরে রেখেছে।
অতএব, বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়—
বিশ্ব এখনও G7-নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি; বরং এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে নতুন শক্তিকেন্দ্রগুলো ক্রমশ প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য ধীরে ধীরে পুনর্গঠিত হচ্ছে।
সম্ভবত আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হবে—কে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে, তা নয়; বরং কীভাবে একাধিক শক্তিকেন্দ্র একই বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা—দুটিই পরিচালনা করবে।
গবেষণার জন্য নির্ভরযোগ্য অফিসিয়াল ও গবেষণা সূত্র
- G7 (Official)
- BRICS Information Portal
- New Development Bank
- International Monetary Fund (IMF)
- World Bank
- World Trade Organization (WTO)
- OECD
- United Nations
- Chatham House
- Center for Strategic and International Studies (CSIS)
- Council on Foreign Relations (CFR)
- Brookings Institution
- Atlantic Council

2 thoughts on “G7 কি ধীরে ধীরে তার বৈশ্বিক প্রভাব হারাচ্ছে? BRICS-এর উত্থান কি নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত?”