হাসপাতালে অনশনে থাকা সোনম ওয়াংচুক। ফাইল ছবি
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন বিজ্ঞানী ও সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তাঁর দাবি, দেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করতে প্রয়োজন একটি ‘শান্তিপূর্ণ বিপ্লব’—আর সেই পরিবর্তনের বৃহত্তর প্রয়াসকেই তিনি ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ভারতের স্বাধীনতা দিবসের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ওয়াংচুক নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান, দলীয় পরিচয়ের বাইরে সৎ, সাহসী, যোগ্য ও নিঃস্বার্থ ব্যক্তিদের নেতৃত্বে নিয়ে আসার পথ খুঁজতে।
কেন হঠাৎ ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের’ ডাক?
ওয়াংচুকের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের নেতৃত্ব নির্বাচনের বর্তমান ব্যবস্থা। তাঁর মতে, ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার শতবর্ষে ভারতকে একটি উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে হলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা জরুরি।
তিনি নাগরিকদের উদ্দেশে বলেন, শুধু বুদ্ধিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক মহলের ওপর নির্ভর না করে প্রত্যেক এলাকার সাধারণ মানুষকে নিজেদের মধ্যে থেকে যোগ্য ও সৎ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে হবে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য কোনো সরকারকে সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং নেতৃত্ব নির্বাচনের পদ্ধতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন আনা—এটাই ওয়াংচুকের বার্তার মূল সুর।
এমপিদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার প্রসঙ্গ
নিজের বক্তব্যে ভারতের সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে থাকা ফৌজদারি মামলার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন ওয়াংচুক।
তিনি দাবি করেছেন, প্রায় অর্ধেক এমপির বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে এবং প্রায় এক-তৃতীয়াংশের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ ও অপহরণের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব সংখ্যা ওয়াংচুকের বক্তব্য হিসেবে এসেছে; সেগুলোকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরিসংখ্যান হিসেবে উপস্থাপন না করাই সতর্ক সাংবাদিকতার দিক থেকে যুক্তিযুক্ত।
তাঁর যুক্তি, রাজনীতিতে এমন অভিযোগের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে দুর্বল করতে পারে। তাই রাজনৈতিক নেতৃত্বে সততা, সক্ষমতা ও জনকল্যাণের মানসিকতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
‘নতুন ভারতের’ জন্য নাগরিকদের নাম দিতে বললেন
ওয়াংচুকের প্রস্তাবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—যোগ্য নেতৃত্ব খুঁজে বের করার দায়িত্ব শুধু রাজনৈতিক দলের হাতে না রেখে সাধারণ নাগরিকদেরও এতে যুক্ত করা।
নিজ নিজ এলাকা থেকে সৎ, নির্ভীক, যোগ্য ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ধারণা, স্থানীয় পর্যায় থেকেই যদি ভালো নেতৃত্ব উঠে আসে, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণেই তিনি বিষয়টিকে একটি বৃহত্তর নাগরিক আন্দোলন হিসেবে দেখছেন।
২০৪৭ সালকে সামনে রেখে কেন এত গুরুত্ব?
ভারত ২০৪৭ সালে স্বাধীনতার ১০০ বছর পূর্ণ করবে। সেই সময়ের মধ্যে দেশকে উন্নত ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্য ভারতীয় রাজনৈতিক পরিসরে বহুবার আলোচিত হয়েছে।
ওয়াংচুকের বক্তব্য হলো, শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন দিয়ে সেই লক্ষ্য অর্জন যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের নেতৃত্বে সৎ ও সক্ষম মানুষ থাকা এবং নাগরিকদের আস্থা বজায় রাখা equally গুরুত্বপূর্ণ।
তাই তাঁর আহ্বান মূলত রাজনৈতিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকে ঘিরে।
আন্দোলনের ভাষা কেন ‘শান্তিপূর্ণ’?
ওয়াংচুক তাঁর আহ্বানকে ‘peaceful revolution’ বা শান্তিপূর্ণ বিপ্লব হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁর প্রস্তাবের কেন্দ্রে রয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, বরং নাগরিক অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব বাছাইয়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা।
এ কারণেই ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’ শব্দবন্ধটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, ওয়াংচুকের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে এটিকে মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুধু রাজনীতি নয়, শিক্ষাব্যবস্থাও তাঁর উদ্বেগের জায়গা
রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্কারের পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়েও শিক্ষাব্যবস্থার অনিয়ম ও পরীক্ষার দুর্নীতি নিয়ে সরব হয়েছেন ওয়াংচুক। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবির প্রতিও তিনি সমর্থন জানিয়েছেন।
ফলে তাঁর সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে উঠে আসছে—রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংস্কার এবং শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা।
এখন প্রশ্ন, এই ডাক কতটা সাড়া ফেলবে?
সোনম ওয়াংচুকের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন’ –এর ডাক ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তৈরি করতে পারে। তবে এটি বাস্তবে কতটা বিস্তৃত নাগরিক উদ্যোগে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে সাধারণ মানুষ, নাগরিক সংগঠন এবং রাজনৈতিক মহলের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
এই মুহূর্তে ওয়াংচুকের আহ্বানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি রাজনৈতিক পরিবর্তনের আলোচনা শুধু দলীয় রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে নেতৃত্ব নির্বাচনে নাগরিকদের ভূমিকা সামনে এনেছেন।
আর সেখানেই তাঁর প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিচ্ছে—২০৪৭-এর ভারতকে নেতৃত্ব দেবেন কারা?
