অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চীন উত্তেজনা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। ফাইল ছবি
১৮-ই আগস্ট, ২০২৬ : বাজলেন্স আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে চীনা বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি টহল পয়েন্টে ভারতীয় সেনাদের প্রবেশের সুযোগ কমে গেছে—এমন দাবি করেছে অরুণাচল প্রদেশের ক্ষমতাসীন জোটের শরিক একটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের অনুসন্ধানী দল।
আল জাজিরার ১৭ আগস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম আপার সুবানসিরি জেলার তকসিং এলাকায় সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে এসব অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগকে ‘ভুল ও ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঘটনাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ২০২০ সালের লাদাখ সংঘর্ষের পর ভারত-চীন সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। সেপ্টেম্বরে ভারতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্ভাব্য সফর নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে অরুণাচলের নতুন এই অভিযোগ দুই দেশের সম্পর্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
আরও পড়ুন : ইরান ইস্যুতে ‘বাধা হলে’ ওমানে বোমা হামলার হুমকি ট্রাম্পের
কী ঘটছে অরুণাচল সীমান্তে?
অরুণাচল প্রদেশের পিপলস পার্টি অব অরুণাচল (PPA)-এর একটি অনুসন্ধানী দল সম্প্রতি আপার সুবানসিরি পরিদর্শন করে। দলটি বিজেপি নেতৃত্বাধীন নর্থ ইস্ট ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের অংশ।
দলের দাবি, তকসিং এলাকায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের কারণে ভারতীয় সেনাদের নিয়মিত টহল পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে চীনা বাহিনী সীমান্ত এলাকায় তুলনামূলকভাবে সক্রিয় থাকে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের সদস্য জেরাং আল জাজিরাকে জানান, স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন—২০২৩ সালে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষের পর ভারতীয় বাহিনী শেরা-৫ নামের একটি সীমান্ত টহল পয়েন্ট থেকে সরে যায়।
স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, এর ফলে তারা ঐতিহ্যগত শিকারের কিছু এলাকাতেও যেতে পারছেন না।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা হয়নি এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী অনুপ্রবেশের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
চীনের অনুপ্রবেশ নিয়ে কেন নতুন করে আলোচনা?
আপার সুবানসিরির দুর্গম ভূপ্রকৃতি সীমান্ত নজরদারিকে কঠিন করে তোলে। বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ায় নিয়মিত টহল চালানোও চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে।
স্থানীয় উপজাতীয় সংগঠন নাহ ওয়েলফেয়ার সোসাইটিও গত মাসে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে সীমান্ত এলাকায় চীনা তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে।
সংগঠনটির অভিযোগ, চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় যতটা সম্ভব ভূমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই দাবিরও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
অর্থাৎ, নতুন করে যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে তা শুধু ‘চীনা সেনা ঢুকেছে কি না’—এমন নয়। বরং দুর্গম সীমান্তে ভারতের টহল, যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো কতটা কার্যকর, সেটিও আলোচনায় এসেছে।
ভারত কী বলছে?
ভারতীয় সেনাবাহিনী গণমাধ্যমে প্রকাশিত চীনা অনুপ্রবেশের অভিযোগকে সরাসরি ‘ভুল এবং ভিত্তিহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য ছিল তুলনামূলকভাবে সতর্ক। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, সীমান্ত পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ভারত বেইজিংকে জানিয়েছে যে সীমান্তের পরিস্থিতি দুই দেশের বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলবে।
অন্যদিকে চীনও অভিযোগটি সরাসরি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন জানান, চীন ও ভারত সম্প্রতি সীমান্তবিষয়ক ৩৬তম বৈঠক করেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যানেলে যোগাযোগ বজায় রেখে সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুই দেশ একমত হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ভারত-চীন সীমান্ত এতটা স্পর্শকাতর কেন?
ভারত ও চীনের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৪৮৮ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীর, লাদাখ, সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের পাশ দিয়ে বিস্তৃত এই সীমান্তের বড় অংশই বিতর্কিত।
বিশেষ করে অরুণাচল প্রদেশ নিয়ে দুই দেশের অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভারত ম্যাকমোহন লাইনকে পূর্ব সীমান্তের ভিত্তি হিসেবে মানে। অন্যদিকে চীন এই সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে অরুণাচল প্রদেশের পুরো অঞ্চলকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে উল্লেখ করে।
অন্যদিকে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চীন নিয়েও ভারত ও পাকিস্তানের ভূখণ্ডগত দাবি রয়েছে।
এই বিরোধের কারণে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা বা LAC দুই দেশের মধ্যে একটি সংবেদনশীল বাস্তব সীমারেখা হয়ে আছে।
গালওয়ান থেকে ডোকলাম—বারবার মুখোমুখি ভারত-চীন
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের একাধিকবার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
২০২০ সালের জুনে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় সংঘর্ষে অন্তত ২০ ভারতীয় ও চার চীনা সেনা নিহত হন। এরপর সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি ও অবকাঠামো নির্মাণ দুই দেশই বাড়িয়েছে।
সিকিমের নাকু লা এলাকাতেও ২০২০ ও ২০২১ সালে দুই দেশের সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
এর আগে ২০১৭ সালে ভুটান-ভারত-চীন ত্রিসীমান্তের ডোকলাম মালভূমিতে চীনের সড়ক নির্মাণকে কেন্দ্র করে ৭৩ দিনের সামরিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল।
এই ইতিহাসের কারণে সীমান্তে ছোট কোনো ঘটনাও দ্রুত বড় কূটনৈতিক বা সামরিক সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বাণিজ্য বাড়ছে, কিন্তু সীমান্ত বিরোধ কাটেনি
ভারত-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। সীমান্তে উত্তেজনা থাকলেও দুই দেশের বাণিজ্য গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ভারতের বেইজিং দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দুই দেশের পণ্যবাণিজ্য ১৫১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৭১ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
তবে বাণিজ্য ভারসাম্য ভারতের বিপক্ষে আরও বড় হয়েছে। ওই সময়ে চীন থেকে ভারতের আমদানি ৬১ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১৩১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিপরীতে চীনে ভারতের রপ্তানি বেড়েছে ১০ দশমিক ১৭ বিলিয়ন থেকে ১৯ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলারে।
অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হলেও সীমান্ত বিরোধের মূল প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।
সামনে কী হতে পারে?
অরুণাচল নিয়ে নতুন অভিযোগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভারত ও চীন যখন সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছে, তখন সীমান্তের স্থানীয় বাস্তবতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে।
একদিকে দুই দেশ সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ ধরে রাখছে। অন্যদিকে সীমান্তে টহল, অবকাঠামো এবং ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় অভিযোগও সামনে আসছে।
ফলে দিল্লি-বেইজিং সম্পর্ককে এখনই পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা কঠিন। বরং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি সীমান্তে নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা চলতে থাকার চিত্রই বেশি স্পষ্ট।
অরুণাচলের সর্বশেষ অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত কতটা সত্য প্রমাণিত হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারত-চীন সীমান্ত বিরোধের মূল সমস্যাগুলো সমাধান না হলে সাময়িক কূটনৈতিক উষ্ণতার মধ্যেও নতুন উত্তেজনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
