ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত, হরমুজ প্রণালী এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে বক্তব্য রাখছেন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রায়ান ক্রোকার। (ছবি: সংগৃহীত)
১৯ জুলাই | ঢাকা | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে শক্তিশালী করেনি; বরং যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান আরও জটিল ও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত রায়ান ক্রোকার। তাঁর মতে, কেবল বিমান হামলা বা সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে নতি স্বীকার করানো সম্ভব নয়। বরং এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর পরিবর্তে বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং কূটনৈতিক পথকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও কুয়েতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ক্রোকার সম্প্রতি CNN-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র যে অবস্থানে ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে বেশি কঠিন। সংঘাত শুরুর পর ওয়াশিংটনের কৌশলগত সুবিধা বাড়ার বদলে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য পূরণ করেছে?
ক্রোকারের মূল্যায়নে, ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া এখন আর বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়। তাঁর ভাষায়, বর্তমান ইরানি নেতৃত্ব আগের তুলনায় আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং দীর্ঘ সংঘাত তাদের দুর্বল না করে বরং আরও সংগঠিত করেছে। তাই শুধুমাত্র সামরিক চাপ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
তিনি বলেন, যুদ্ধের মাধ্যমে যদি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের আশা করা হয়, তবে সেটি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের উচিত এমন লক্ষ্য নির্ধারণ করা, যা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

‘ইরানকে শুধু বোমা মেরে পরাজিত করা যাবে না’
সাক্ষাৎকারে রায়ান ক্রোকার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “You don’t win wars from the air alone.” অর্থাৎ, শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনো যুদ্ধ জেতা যায় না। তাঁর মতে, ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে দীর্ঘমেয়াদি বিমান হামলা তাদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করবে—এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি আরও বলেন, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে বেড়ে উঠেছে। ফলে চাপ বাড়লে তারা দ্রুত ভেঙে পড়বে—এমনটি ধরে নেওয়া ভুল হবে।
হরমুজ প্রণালীই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু
ক্রোকারের মতে, বর্তমান সংকটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের বড় একটি অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল নির্বিঘ্ন রাখা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
তিনি মনে করেন, এ লক্ষ্য অর্জনে তিনটি
🔹বিষয় একসঙ্গে প্রয়োজন—
🔹কূটনৈতিক উদ্যোগ,
🔹অর্থনৈতিক চাপ,
প্রয়োজনে সীমিত সামরিক পদক্ষেপ।
এই সমন্বিত কৌশল ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা কঠিন হবে বলে তাঁর মত।
যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতির গুরুত্ব বেশি
সাবেক এই মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। তাই তিনি যুদ্ধ বাড়ানোর পরিবর্তে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে সতর্কবার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েন অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থান সেই উদ্বেগই বাড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র : CNN Transcripts, Reuters, AP News,
