সেলিব্রেটি গর্ভফুল প্লাসেন্টা খাওয়া প্রসব পরবর্তী

সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টা ক্যাপসুল গ্রহণের বিতর্কিত ট্রেন্ড অনুসরণ করেছেন একাধিক হলিউড তারকা। ছবি: সংগৃহীত

কিম কার্দাশিয়ান, জানুয়ারি জোন্স, অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোনসহ একাধিক তারকা সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা খেয়েছেন। জানুন এই বিতর্কিত চর্চার আসল কারণ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের মত।

সৌন্দর্য ও যৌবন ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা মানব ইতিহাসে বহু পুরনো। যুগে যুগে নারীরা নানা রকম অপ্রচলিত পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন এই লক্ষ্যে, যার কিছু বাস্তবসম্মত, আবার কিছু ছিল কল্পনা ও লোককথায় মোড়ানো। আধুনিক যুগে এসেও সেই আগ্রহ কমেনি— বরং হলিউড ও বিশ্বজুড়ে বিনোদন জগতের অনেক তারকার হাত ধরে নতুন এক বিতর্কিত চর্চা আলোচনায় এসেছে: সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা বা গর্ভফুল গ্রহণ করা।

ইতিহাসের ছায়া: কাউন্টেস ব্যাথরির কিংবদন্তি

সৌন্দর্যচর্চার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত নাম সম্ভবত এলিজাবেথ ব্যাথরি— হাঙ্গেরির এই অভিজাত নারী “ব্লাড কাউন্টেস” নামে পরিচিত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, যৌবন ধরে রাখার আশায় তিনি তরুণীদের রক্ত ব্যবহার করতেন বলে কথিত আছে। তবে এই কাহিনির সিংহভাগই ঐতিহাসিক বিতর্ক ও লোককথার মিশ্রণ, যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ইতিহাসবিদদের কাছেও সীমিত। এই পুরনো কিংবদন্তির সঙ্গে আধুনিক প্লাসেন্টা-ভক্ষণের কোনো সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, উভয়ের পেছনেই কাজ করছে একই আকাঙ্ক্ষা— শরীর ও সৌন্দর্যকে ধরে রাখার প্রাচীন মানবিক তাড়না।

প্লাসেন্টোফেজি: কী এই চর্চা?

চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় নিজের প্লাসেন্টা গ্রহণ করার এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় “প্লাসেন্টোফেজি”। সাধারণত এটি তিনভাবে করা হয়— শুকিয়ে ক্যাপসুল বানিয়ে, স্মুদিতে মিশিয়ে, অথবা রান্না করে সরাসরি খাওয়ার মাধ্যমে। এনক্যাপসুলেশন প্রক্রিয়ায় একজন বিশেষজ্ঞ হাসপাতাল থেকে প্রসূতির প্লাসেন্টা সংগ্রহ করে সেটি কেটে, শুকিয়ে ও গুঁড়ো করে ক্যাপসুলে পরিণত করেন, যা সাধারণ ভিটামিনের বড়ির মতোই দেখতে হয়।

যারা এই চর্চায় বিশ্বাসী, তাদের দাবি— এটি প্রসব-পরবর্তী ক্লান্তি কমাতে, মানসিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে, বুকের দুধ উৎপাদন বাড়াতে এবং শক্তি জোগাতে সহায়ক। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান এখনো এসব দাবির স্বপক্ষে দৃঢ় প্রমাণ পায়নি। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টের এক বিশেষজ্ঞের ভাষ্য অনুযায়ী, প্লাসেন্টা গ্রহণের কোনো প্রমাণিত শারীরবৃত্তীয় উপকারিতা নেই— এতে প্রোটিন থাকলেও তা প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা প্রতিরোধ, ঘুম উন্নত করা বা দুধ উৎপাদন বাড়ানোর মতো দাবিগুলোকে সমর্থন করে না।

যেসব তারকা এই চর্চায় যুক্ত হয়েছেন

কিম কার্দাশিয়ান ও পরিবার


রিয়েলিটি টিভি তারকা কিম কার্দাশিয়ান তার দ্বিতীয় সন্তান সেইন্টের জন্মের পর প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা এড়াতে প্লাসেন্টা ফ্রিজ-ড্রাই করে ট্যাবলেট আকারে গ্রহণ করেছিলেন। তার বোন কোর্টনি কার্দাশিয়ান তৃতীয় সন্তান রেইনের জন্মের পর একই পথ বেছে নেন এবং সামাজিক মাধ্যমে লেখেন, তার এই “বড়ি” ফুরিয়ে গেলে তিনি দুঃখিত হবেন, কারণ এগুলো তার জীবন বদলে দিয়েছে। আরেক বোন খলোয়া কার্দাশিয়ানও তার সন্তান জন্মের পর একই পদ্ধতি অনুসরণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, বোনদের অভিজ্ঞতা দেখেই।

জানুয়ারি জোন্স


জনপ্রিয় টিভি সিরিজ “ম্যাড মেন”-এর অভিনেত্রী জানুয়ারি জোন্স ২০১১ সালে পুত্রসন্তানের জন্ম দেওয়ার পর কাজে দ্রুত ফিরতে হয়েছিল বলে জানান। তার বিশ্বাস, প্লাসেন্টা ক্যাপসুল গ্রহণের ফলেই তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পেরেছিলেন। শুরুতে দ্বিধায় থাকলেও পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ্যে বলেন, এতে জাদুবিদ্যার কিছু নেই— বরং প্রতিটি মাকেই তিনি এটি চেষ্টা করার পরামর্শ দেন।

অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোন


হলিউড অভিনেত্রী অ্যালিসিয়া সিলভারস্টোন ২০১১ সালে পুত্রসন্তানের মা হওয়ার পর প্লাসেন্টা গ্রহণ করেন এবং একে “সুখী বড়ি” নামে আখ্যায়িত করেন।

ক্যাথরিন হেইগল


তিন সন্তানের জননী এই অভিনেত্রী তার নিজের গর্ভজাত সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টা একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠান, যারা সেটি শুকিয়ে ক্যাপসুলে রূপান্তরিত করে।

ক্রিসি টেইগেন


মডেল ও টিভি ব্যক্তিত্ব ক্রিসি টেইগেন তার প্রথম সন্তান লুনার জন্মের পর প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতায় ভুগেছিলেন। দ্বিতীয় সন্তান মাইলসের জন্মের পর তিনি প্লাসেন্টা স্মুদি বানিয়ে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং রসিকতা করে বলেন, লস অ্যাঞ্জেলেসে এটি একেবারেই স্বাভাবিক ব্যাপার।

পদ্মা লক্ষ্মী ও অন্যান্যরা


রন্ধনশিল্প বিশেষজ্ঞ ও টিভি উপস্থাপক পদ্মা লক্ষ্মীও প্রসব-পরবর্তী মানসিক চাপ ও ক্লান্তি থেকে বাঁচতে এই পদ্ধতি অবলম্বনের কথা জানিয়েছেন। এ ছাড়া হিলারি ডাফ, মায়িম বিয়ালিক, এল কিং, ক্রিস্টিনা অ্যানস্টেড ও তামেরা মওরির মতো তারকারাও একই অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ্যে শেয়ার করেছেন। বিজ্ঞানভিত্তিক টিভি সিরিজ “বিগ ব্যাং থিওরি”-খ্যাত অভিনেত্রী মায়িম বিয়ালিক তো একধাপ এগিয়ে এই চর্চার পক্ষে একটি ব্লগ পোস্টই লিখে ফেলেন, যেখানে তিনি নিজেকে ও অন্য প্লাসেন্টা-গ্রহণকারী তারকাদের পক্ষে সাফাই দেন।

ব্যতিক্রমী উদাহরণ: ম্যাথিউ ম্যাককনাহি ও ক্যামিলা আলভেস

সব তারকা অবশ্য ক্যাপসুল বা স্মুদির পথে হাঁটেননি। অভিনেতা ম্যাথিউ ম্যাককনাহি ও তার স্ত্রী ক্যামিলা আলভেস ভিন্ন এক উপায় বেছে নেন— তারা বাড়ির আঙিনায় একটি আম গাছ রোপণ করে প্লাসেন্টা সার হিসেবে ব্যবহার করেন। ম্যাককনাহি পরবর্তীতে জানান, নয় বছর পর সেই গাছে প্রথমবারের মতো ফল ধরেছিল, যা তারা পরিবারসহ একসঙ্গে উপভোগ করেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞান কী বলছে?


প্লাসেন্টা গ্রহণের জনপ্রিয়তা বাড়লেও, চিকিৎসা মহলে এ নিয়ে সতর্কতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্লাসেন্টা গ্রহণের শারীরিক ও মানসিক উপকারিতা নিয়ে প্রচার থাকলেও এর স্বপক্ষে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে প্লাসেন্টা প্রক্রিয়াজাতকরণের কোনো মানসম্মত নিয়মও নেই, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে অপর্যাপ্তভাবে প্রক্রিয়াজাত বা সংরক্ষিত প্লাসেন্টায় ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের উপস্থিতি নবজাতকের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই চর্চা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।

প্রকৃতির নিয়ম: প্রাণিজগতে প্লাসেন্টা ভক্ষণ


আকর্ষণীয় বিষয় হলো, মানুষ ছাড়া প্রায় সব স্তন্যপায়ী প্রাণীই সন্তান জন্মের পর নিজের প্লাসেন্টা খেয়ে ফেলে। জীববিজ্ঞানীদের ধারণা, প্রসবকালে হারানো পুষ্টি ও শক্তি দ্রুত পুনরুদ্ধার করা এবং প্লাসেন্টার গন্ধের মাধ্যমে শিকারি প্রাণীর দৃষ্টি এড়ানোই এই সহজাত আচরণের পেছনের কারণ। এই যুক্তিতেই কিছু চর্চাকারী মনে করেন, মানুষও এই প্রাকৃতিক প্রবৃত্তির বাইরে নয়— যদিও আধুনিক মানব সমাজে খাদ্যাভ্যাস, সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যবিধির প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

শেষ কথা


সন্তান জন্মের পর প্লাসেন্টা গ্রহণের এই চর্চা মূলধারার চিকিৎসাবিজ্ঞানে এখনো বিতর্কিত এবং অপ্রমাণিত হলেও, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একের পর এক তারকা প্রকাশ্যে এর সমর্থনে কথা বলে চলেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ একটাই— এ ধরনের যেকোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত, কারণ এখানে প্রমাণিত উপকারিতার চেয়ে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রসঙ্গটিই চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *