১৭ জুলাই ২০২৬ | সাহিত্য-রাজনীতি | TheBuzzLens
একজন নারী লেখক যিনি সমগ্র এশিয়ায় মৃত্যু হুমকির লক্ষ্য হয়েছেন, তিনি এখন বিজয়ীর মুকুট নিয়ে ফিরছেন তার দ্বিতীয় জন্মভূমি কলকাতায়। আগামী ১ অগস্ট, শনিবার, রবীন্দ্র সদনে। এই ফেরাটি শুধু একটি সাহিত্যিক অনুষ্ঠান নয় — এটি দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা, মুক্ত চিন্তা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতীক।
শুরু: একটি উপন্যাস যা তুমুল ঝড় তুলেছিল
১৯৯৩ সাল। তসলিমা নাসরিন তার যুগান্তকারী উপন্যাস “লজ্জা” (Shame) প্রকাশ করেন যেখানে তিনি বাংলাদেশে ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে বাঙালি হিন্দুদের সম্মুখীন হওয়া সহিংসতা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন এবং হত্যাকাণ্ড চিত্রিত করেন। দশ লক্ষ কপি দ্রুত বিক্রি হয়েছিল কিন্তু ধর্মীয় সংগঠনগুলির তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
তার সবচেয়ে বিস্ফোরক বিবৃতি ১৯৯৪ সালের মে মাসে আসে যখন কলকাতা স্টেটসম্যানে তাকে উদ্ধৃত করা হয় যে কুরআন “পুরোপুরিভাবে সংশোধন করা উচিত”। এই মন্তব্য বিশাল প্রতিবাদ জাগায়, যার মধ্যে তার মৃত্যুর দাবি এবং তার হত্যার জন্য অর্থ সহ বৃহত্তর এবং আরও উচ্চকণ্ঠ প্রদর্শনী রয়েছে। তাকে আস্থা প্রদান করে যে তার বিবৃতি শরীয়ত, ইসলামিক আইন সম্পর্কে ছিল, কুরআন নয়। তবে প্রতিবাদ অব্যাহত থাকে এবং সরকার ১৯ শতকের ব্লাসফেমি আইন ব্যবহার করে তার গ্রেফতারের দাবি করে।

নির্বাসন: সুইডেন থেকে বন্ধুত্বহীন পৃথিবী
তসলিমা নাসরিন ১৯৯৪ সালের পর থেকে নির্বাসিত রয়েছেন, যার সাথে একাধিক ফতোয়া তার মৃত্যুর জন্য রয়েছে। তিনি বাংলাদেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন এবং স্টেটসম্যান মিডিয়া রিপোর্ট যে তিনি একটি গোপন স্থানে লুকিয়ে ছিলেন।
এরপরের ত্রিশ বছর ছিল একটি ভ্রান্ত যাত্রা:
🔹সুইডেন: প্রথম আশ্রয়স্থল যেখানে তিনি লুকিয়ে থাকেন
🔹ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্র: দশক জুড়ে অস্থায়ী পদবি
🔹ভারত: ২০০४ সালে কলকাতায় পৌঁছান, যেখানে তিনি বাংলা ভাষাকে তার সাংস্কৃতিক আশ্রয় বলে মনে করেন
কলকাতায় আসা: একটি নতুন বাড়ির খোঁজ
তসলিমা নাসরিন ২০০४ সালে কলকাতায় পৌঁছান এবং এটি তার গ্রহণকৃত শহর হয়ে ওঠে। তবে তার থাকাও বিতর্ক দিয়ে চিহ্নিত হয়েছিল। তার স্বয়ংজীবনী কর্ম “দ্বিখণ্ডিত” (Dwikhandito – Divided) বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরোধিতার মুখোমুখি হয়, যা প্রতিবাদ এবং আইনি চ্যালেঞ্জ পরিচালনা করে। বই অবশেষে তত্কালীন লেফট ফ্রন্ট সরকার দ্বারা পশ্চিমবঙ্গে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
আবার নির্বাসন: ২০০७ এর ঝড়
ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। ২০০७ সালে, তসলিমা নাসরিনের উপস্থিতি এবং লেখা নিয়ে কলকাতায় সহিংস প্রতিবাদ দেখা দেয়। নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং রাজনৈতিক চাপের মধ্যে, নাসরিনকে শহর থেকে সরানো হয়। তিনি পরবর্তীতে দিল্লিতে সরকারী সুরক্ষার অধীনে সময় কাটান। তাকে ২০০७ সালে হায়দ্রাবাদে একটি জনসভায় আক্রমণ করা হয়েছিল এমন কর্মীদের দ্বারা যারা তাকে ইসলামের বিরুদ্ধে বক্তৃতা করার অভিযোগ দিয়েছিল।
তার বিতর্কিত লেখা: সাহস এবং সমালোচনা
তসলিমা নাসরিনের লেখা শুধুমাত্র ইসলাম সমালোচনা নয়। তার কাজগুলি নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বৃহত্তর সামাজিক সমস্যাকে সম্বোধন করে।
প্রধান লেখা:
🔸লজ্জা (১৯९३): সম্প্রদায়গত সহিংসতার সাথে একটি পরিবারের লড়াই চিত্রিত করে
🔸দ্বিখণ্ডিত (২००३): তার স্বয়ংজীবনী — দমন এবং নির্বাসনের বছরের উপর ভিত্তি করে
🔸নিরবচিত কলাম: স্তম্ভগুলি যা তার প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার জিতেছিল (আনন্দ পুরস্কার, ১৯९२)
তার সবচেয়ে বিতর্কিত অবস্থান:
🔸ইউনিফর্ম সিভিল কোড সমর্থন: তৃতীয় তালাক এবং ব্যক্তিগত আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন
🔸ধর্মীয় সমালোচনা: তিনি বলেছেন ইসলামের সমালোচনা হল ইসলামিক দেশগুলিতে ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়
🔸মহিলাদের অধিকার: ধর্মীয় আইনের মাধ্যমে মহিলাদের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ
তার বিরুদ্ধে সমালোচনা: সাম্প্রদায়িক আঘাত?
ISF নেতা এবং ভাঙড়ের বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি তার কলকাতা সফর সমালোচনা করেছেন, দাবি করেছেন যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ BJP সরকার মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে। তিনি তসলিমা নাসরিনকে মুসলিম-বিদ্বেষী হিসাবেও মন্তব্য করেন।
ত্রিণমূল কংগ্রেস (TMC) অভিযোগ করেছে যে বিজেপি এই পরিদর্শনকে রাজনীতিকরণ করছে। TMC বিধায়ক আখরুজ্জামান অভিযোগ করেছেন যে শাসক পক্ষ নাসরিনকে সম্মান জানাচ্ছে কারণ তার ইসলাম এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মন্তব্য রয়েছে। “কেউ যদি মুসলিমদের বিরুদ্ধে কথা বলে, ডাবল ইঞ্জিন সরকার তাদের সম্মান করবে।”
অন্যরা যুক্তি দেন যে তিনি শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্তৃপক্ষকে সমালোচনা করছেন, মুসলিমদের নয়। প্রশান্ত ভূষণ এবং সোনাম ওয়াংচুকের মতো কর্মীরা তার মুক্ত মনোভাব রক্ষা করেছেন।
দুটি সরকারের ব্যর্থতা: বাম ও ত্রিণমূল
তসলিমা নাসরিনের কেস একটি জটিল উত্তরাধিকার ফেলেছে। যখন তিনি কলকাতায় ছিলেন তখন বাম সরকার তার বই নিষিদ্ধ করেছিল — একটি সিদ্ধান্ত যা সাংস্কৃতিক কর্মীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিল। পরে, ত্রিণমূল সরকারও প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠনগুলির চাপের মুখে তার উপস্থিতি সুবিধা দেয়নি।
সালমান রুশদির সাথে তুলনা: বৈশ্বিক গুরুত্ব
তসলিমা নাসরিনের অবস্থান প্রায়শই স্যালম্যান রুশদির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যিনি “দ্য স্যাটানিক ভার্স” (১৯८८) এর জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন এবং হত্যার হুমকির সম্মুখীন হয়েছিলেন। (Encyclopedia Britannica) উভয়ই ধর্মের সমালোচনা করেছেন এবং নির্বাসনের মূল্য পরিশোধ করেছেন। তবে তসলিমা এর পরবর্তী ভাষা প্রকাশাধিকার রক্ষাকারী হিসাবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমান রাজনীতি: BJP এর কৌশল?
তসলিমা নাসরিনের প্রত্যাবর্তন পশ্চিমবঙ্গে একটি রাজনৈতিক সংঘর্ষকে জ্বালিয়ে দিয়েছে যেখানে বিজেপি বলেছে যে এটি “নতুন বাংলা” এর প্রতীক যা অন্তর্বস্তু রক্ষা করে বৌদ্ধিক মৌলবাদ অপশমনের পরিবর্তে। Chief Minister Suvendu Adhikari এবং অর্থমন্ত্রী Swapan Dasgupta সহ উল্লেখযোগ্য লেখক Shirshendu Mukhopadhyay ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যাশিত।
এটি একটি প্রতীকী পদক্ষেপ যা তিনটি বিভাগকে স্পর্শ করে: সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িক সম্পর্ক এবং শক্তিশীল অবস্থান রাজনীতিতে।
দুটি দেশ, একটি নারীবাদী
তসলিমার আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গ স্পষ্ট:
🔹নিরাপত্তা ঘোষণা: সরকার তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন
🔹আইনি অবস্থান: অনুষ্ঠান আয়োজকরা জোর দিয়ে বলেছেন পশ্চিমবঙ্গে তার আসার কোনো আইনি বাধা নেই
🔹সাংস্কৃতিক প্রাসঙ্গিকতা: কলকাতার সাথে তার বন্ধুত্বকে “সাংস্কৃতিক বাড়ি” হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে
💬 আপনার মতামত জানান
তসলিমা নাসরিনের ফিরে আসা কি সত্যিই মুক্ত বাক এবং নারীবাদী কণ্ঠের বিজয়, নাকি এটি বৃহত্তর সাম্প্রদায়িক সংকটের নতুন অধ্যায়ের সূচনা? এবং বিজেপি কি তার লেখা ও বিশ্বাসকে সম্মান করছে, নাকি কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে? জানান কমেন্টে 👇
তথ্যসূত্র : Republic World, Encyclopedia Britannica, Organiser Weekly, The Week, Wikipedia, NDTV, European Parliament.
