বাংলাদেশ বেতার দুর্নীতি নিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ

বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন প্রকল্প, স্টুডিও সংস্কার ও শাহবাগ বেতার কেন্দ্র নিয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ে ১২ দফা লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।

বাংলাদেশ বেতারে শত শত কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়ম, স্টুডিও সংস্কার, ট্রান্সমিটার আধুনিকায়ন ও শাহবাগ বেতার কেন্দ্র নিয়ে শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ১২ দফা লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি।

ঢাকা | The BuzzLens


বাংলাদেশ বেতারের সাবেক প্রশাসনিক কার্যক্রম, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি লিখিত অভিযোগ। নাট্যকার, উপস্থাপক ও আইনজীবী জোবাইদুল ইসলাম তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি এবং বাংলাদেশ বেতারের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তুলেছেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে মোট ১২টি পৃথক অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বেতারের বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব অভিযোগ এখনো কোনো স্বাধীন তদন্ত বা সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

স্টুডিও সংস্কারে ৭৯ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ঢাকা বেতার কেন্দ্রের পাঁচটি স্টুডিও সংস্কারের জন্য প্রথমে প্রায় ২৫ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হলেও পরে সেটি বাড়িয়ে ৭৯ কোটি টাকা করা হয়।

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের নামে প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করা হলেও বাস্তবে সীমিত কিছু কম্পিউটার ও সরঞ্জাম ছাড়া উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়নি। ফলে প্রকল্প ব্যয়ের বড় একটি অংশ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়েছে।

শাহবাগ বেতার কেন্দ্র নিয়ে অভিযোগ

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো রাজধানীর শাহবাগ বেতার কেন্দ্র ঘিরে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিবন্ধীদের পুনর্বাসনের নামে শাহবাগ বেতার কেন্দ্রের জায়গা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের জন্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, পূর্বে নির্মিত ভবনের ওপর অতিরিক্ত তলা নির্মাণের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম হয়েছে।

ধামরাই ট্রান্সমিটার প্রকল্পেও প্রশ্ন

বাংলাদেশ বেতারের ধামরাই ট্রান্সমিটার আধুনিকায়ন প্রকল্প নিয়েও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৬৫০ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী প্রকল্প সম্পন্ন হয়নি। ফলে সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী।

শিল্পীদের সম্মানী খাত নিয়ে অভিযোগ

বাংলাদেশ বেতারের শিল্পীদের সম্মানী বরাদ্দ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় ৯০০ জন চুক্তিভিত্তিক ব্যক্তিকে অনিয়মিত শিল্পী হিসেবে দেখিয়ে সম্মানী খাত থেকে অর্থ প্রদান করা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এদের মধ্যে অনেকেই প্রকৃত শিল্পী ছিলেন না; বরং বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সহায়ক পদে যুক্ত ব্যক্তিদের শিল্পী হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

এছাড়া নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
রক্ষণাবেক্ষণ ও গাড়ি ভাড়ায় ব্যয়ের অভিযোগ

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ বেতারের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য বাজেট বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে খুব সামান্য ব্যয় করা হয়েছে।

একই সঙ্গে গাড়ি ভাড়া খাতে বছরে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, নিজস্ব যানবাহন ক্রয় করলে দীর্ঘমেয়াদে সরকারের ব্যয় অনেক কম হতে পারত।

বদলি ও পদায়নেও অনিয়মের অভিযোগ

লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বহু কর্মকর্তা দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করেছেন।

অডিশন বোর্ড গঠন, শিল্পী নির্বাচন, বদলি এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও স্বচ্ছতার অভাব ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তদন্তের দাবি

অভিযোগকারী জোবাইদুল ইসলাম বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সেই লক্ষ্য থেকেই তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে এই অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন।

তার দাবি, বাংলাদেশ বেতারের উন্নয়ন প্রকল্প, আর্থিক ব্যয়, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত।

সরকারি অবস্থান

অভিযোগকারী জানিয়েছেন, অভিযোগপত্র গ্রহণের পর বিষয়টি তদন্তের জন্য মৌখিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন।

তবে এ বিষয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।

এছাড়া শেখ হাসিনা, সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, কর্মকর্তা কিংবা বাংলাদেশ বেতারের পক্ষ থেকেও এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
The BuzzLens স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। তদন্ত শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তই এ বিষয়ে চূড়ান্ত বিবেচিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *