ডুমুরিয়ার দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
২৬ আগস্ট, ২০২৬ : বাজলেন্স ডেস্ক
খুলনার ডুমুরিয়ায় দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এ অর্থ ফেরত দেওয়া হয়েছে।
তবে সরকারি অর্থ ফেরত দেওয়ার এই উদ্যোগের পাশাপাশি প্রকল্পের কাজের মান ও অগ্রগতি নিয়ে অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাস্তবে কাজের অগ্রগতি কম থাকলেও নথিপত্রে অনেক বেশি কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন : পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার সময় গায়ে ছিল গেঞ্জি, পরে শার্ট: সিদ্ধার্থের বাবা
দুই খালে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি টাকার বেশি
ডুমুরিয়া এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের আওতায় দুটি খাল পুনঃখনন প্রকল্প নেওয়া হয়।
এর মধ্যে কৃষ্ণনগর নিমতলা থেকে বিল ডাকাতিয়া হয়ে রংপুর সাড়াতলা খাল ৭ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৩২ টাকা।
প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ১৩ মে এবং শেষ হওয়ার কথা ছিল ৩০ জুন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ৫ দশমিক ১ কিলোমিটার খনন করা হয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানানো হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে ৮২ লাখ ২১ হাজার ৫৭৪ টাকা।
অন্যদিকে সাহস ডোলডাঙ্গা থেকে কাঠবুনিয়া বড় দোয়ানিয়া হয়ে তেলিখালী গেট অভিমুখে ভদ্রা নদী খাল ৩ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।
এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২৪ এপ্রিল। এতে ৯০ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৬ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। খননকাজ শেষ হলেও কিছু আনুষঙ্গিক কাজ বাকি রয়েছে বলে প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে।
আরও পড়তে পারেন : ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ পুলিশের এএসআই গ্রেপ্তার
ফেরত গেল ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা
দুটি প্রকল্পেই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ করা সম্ভব হয়নি। ফলে অব্যয়িত অর্থ আর খরচ না করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী দুটি প্রকল্পের অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ১৯ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
এটি সরকারি প্রকল্পে অব্যয়িত অর্থ ফেরতের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—কেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হলো না এবং বরাদ্দের অর্থে যতটুকু কাজ হয়েছে, তার মান ও বাস্তব অগ্রগতি কতটা?
আরও পড়তে পারেন : ‘তারেক রহমান আমাদের নজরুল’—তেলের দাম বাড়েনি, কারণ ‘আমাদের নজরুল’ নাকি বাড়াননি!
‘খাতায় কাজ বেশি দেখানো হয়েছে’—অভিযোগ
প্রকল্প দুটির বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে অভিযোগও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি অর্ধেকেরও কম থাকলেও কাগজপত্রে ৭১ শতাংশ থেকে শতভাগ কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে। এরপর দ্রুত জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এই অভিযোগের পক্ষে কোনো স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন বা নিরীক্ষার তথ্য এখানে উল্লেখ নেই। ফলে এটিকে আপাতত অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আরও পড়তে পারেন : রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে ফ্যামিলি কার্ড!” বিএনপি নেতার প্রস্তাব
পানি না সরিয়েই খননের অভিযোগ
খনন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, খালের পানি পুরোপুরি অপসারণ না করেই ভাসমান ভেকু দিয়ে খালের পাড়ের মাটি তোলা হয়েছে। পরে সেই মাটিই আবার খালের পাড়ে ফেলা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের আশঙ্কা, বর্ষার পানিতে পাড়ের মাটি ধসে আবার খালের ভেতরে পড়লে অল্প সময়ের মধ্যেই খাল ভরাট হয়ে যেতে পারে। এতে জলাবদ্ধতা নিরসনের যে উদ্দেশ্যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, সেটিই ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ডুমুরিয়া ও বিল ডাকাতিয়া অঞ্চলের মতো জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। খাল পুনঃখননের পরও যদি পলি ও মাটি দ্রুত খালে ফিরে আসে, তাহলে সরকারি অর্থ ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
আরও পড়তে পারেন : ‘স্যার’ ও ‘কাকি’ ডাকত যারা, তারাই একে একে চারজনকে হত্যা: এরপর খেজুর-শসা খাওয়ার দাবি পুলিশের
কেন কাজ শেষ হলো না?
খুলনা জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম অবশ্য প্রকল্পের কাজ অসম্পূর্ণ থাকার পেছনে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিনি বলেন, অতিবৃষ্টি ও মাটির প্রকৃতিগত সমস্যার কারণে প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষ করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে ৩০ জুনের পর কাজ করার সুযোগ ছিল না।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনেই অবশিষ্ট টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ সরকারি অর্থের একটি বড় অংশ ফেরত গেলেও প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত ফল কতটা পাওয়া গেছে, সেটি এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
টাকা ফেরত—কিন্তু জলাবদ্ধতা কি কমবে?
এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে। একদিকে, অব্যয়িত ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় একটি ইতিবাচক দিক।
অন্যদিকে, খাল পুনঃখননের কাজ কতটা কার্যকর হয়েছে এবং বর্ষায় খালের ধারণক্ষমতা ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা উন্নত হবে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থ খরচ করা নয়; ডুমুরিয়ার জলাবদ্ধতা কমানো এবং মানুষের পানি নিষ্কাশনের সমস্যা দূর করা।
তাই এখন প্রকল্পের আর্থিক হিসাবের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের কাজের মান, বাস্তব অগ্রগতি এবং বর্ষার পর খালের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
