Cold War: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই চলা দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন। দুপক্ষের হাতে ছিল পারমাণবিক অস্ত্র, বিশাল সেনাবাহিনী এবং বিশ্বজুড়ে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা। তবু প্রায় ৪৫ বছর তারা একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামেনি।
তাহলে যুদ্ধটা কোথায় ছিল?
ছিল অস্ত্রে, আদর্শে, গোয়েন্দা তৎপরতায়, মহাকাশ প্রতিযোগিতায়, অর্থনীতিতে এবং অন্য দেশের মাটিতে সংঘটিত প্রক্সি যুদ্ধে। এই দীর্ঘ সংঘাতই ইতিহাসে পরিচিত Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ নামে।
Cold War কী?
Cold War বা স্নায়ুযুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দীর্ঘ রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও আদর্শিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সাধারণভাবে এর সময়কাল ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ধরা হয়।
তবে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা দরকার—এটি প্রচলিত অর্থে সরাসরি যুদ্ধ ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সেনাবাহিনী পরস্পরের বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে নামেনি। বরং দুই পরাশক্তি নিজেদের প্রভাব বাড়াতে এবং প্রতিপক্ষের বিস্তার ঠেকাতে বিশ্বজুড়ে নানা উপায়ে প্রতিযোগিতা করেছে। এই কারণেই একে “Cold” War বলা হয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কেন শুরু হলো?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একই শিবিরে ছিল। নাৎসি জার্মানিকে পরাজিত করতে তারা একসঙ্গে লড়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই সহযোগিতা দ্রুত ভেঙে পড়ে, কারণ দুই দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।
যুক্তরাষ্ট্র ছিল পুঁজিবাদী ও উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রধান শক্তি। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল কমিউনিস্ট রাষ্ট্রব্যবস্থার নেতৃত্বে। ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুই পক্ষের পরিকল্পনা আলাদা ছিল। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত প্রভাব বাড়তে থাকলে পশ্চিমা দেশগুলো আশঙ্কা করতে শুরু করে, কমিউনিজম আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে মস্কোর দৃষ্টিতে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিক ঘেরাও ছিল বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ। ফলে যুদ্ধ শেষ হলেও অবিশ্বাস শেষ হয়নি—বরং শুরু হয় নতুন ধরনের সংঘাত।
কেন সরাসরি যুদ্ধ হলো না?
এটাই Cold War-এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দুই পক্ষের কাছেই দ্রুত এমন পরিমাণ পারমাণবিক অস্ত্র জমা হয়, যার ফলে সরাসরি যুদ্ধ ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারত। এই পরিস্থিতিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয় Mutually Assured Destruction বা MAD ধারণা।
সহজভাবে বললে, একটি পক্ষ পারমাণবিক হামলা করলে অন্য পক্ষও পাল্টা হামলা চালাতে পারত। ফলে বিজয়ী হওয়ার বদলে উভয় পক্ষই ধ্বংসের মুখে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র দুই পরাশক্তিকে শুধু শক্তিশালী করেনি—একই সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকিও ভয়াবহ করে তুলেছিল। তাই তারা একে অপরের বিরুদ্ধে শক্তি দেখিয়েছে, কিন্তু সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে গেছে।
NATO ও Warsaw Pact: দুই শিবিরের সামরিক কাঠামো
Cold War ধীরে ধীরে শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব থাকেনি। বিশ্ব রাজনীতি দুটি বড় সামরিক ও রাজনৈতিক শিবিরে ভাগ হতে শুরু করে। ১৯৪৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা NATO বা North Atlantic Treaty Organization গঠন করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সদস্য দেশগুলোর সম্মিলিত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এর কয়েক বছর পর, ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো নিয়ে গঠিত হয় Warsaw Pact।
ফলে ইউরোপে তৈরি হয় একটি স্পষ্ট সামরিক বিভাজন—একদিকে NATO, অন্যদিকে Warsaw Pact। তবে পৃথিবীর প্রতিটি দেশ এই দুই শিবিরের কোনো একটিতে যোগ দেয়নি। এখান থেকেই পরে Non-Aligned Movement-এর মতো তৃতীয় অবস্থানের ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
Cold War-এর আসল যুদ্ধ কোথায় হয়েছিল?
যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সরাসরি যুদ্ধ না করলেও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেমে ছিল না। বরং তারা বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের মিত্র ও প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। এর অন্যতম উদাহরণ Korean War। ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ায় আক্রমণ করলে সংঘাত দ্রুত আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। উত্তর কোরিয়ার পক্ষে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন, দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে জাতিসংঘের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ সামরিকভাবে অংশ নেয়। কোরিয়ার যুদ্ধ দেখিয়ে দেয়, Cold War-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘর্ষগুলো সরাসরি Washington ও Moscow-তে না হয়ে অন্য দেশের মাটিতেও ঘটতে পারে। এ ধরনের সংঘাতকে বলা হয় Proxy War বা প্রক্সি যুদ্ধ।
ভিয়েতনাম যুদ্ধও ছিল Cold War-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্সি সংঘাত। উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট নেতৃত্বের বিপরীতে দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন করে যুক্তরাষ্ট্র, অন্যদিকে উত্তর ভিয়েতনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পায়। ফলে একটি স্থানীয় রাজনৈতিক সংঘাত ধীরে ধীরে বৃহত্তর Cold War প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম থেকে সরে যায় এবং ১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামের বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। এখানে Cold War-এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়—দুই পরাশক্তি সরাসরি লড়েনি, কিন্তু তাদের প্রতিযোগিতার মূল্য দিয়েছে অন্য দেশের মানুষ।
Berlin Wall কেন Cold War-এর প্রতীক?
Cold War-এর সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি ছিল Berlin Wall। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানি ভাগ হয়ে যায়, একইভাবে বার্লিন শহরও বিভক্ত হয়। ১৯৬১ সালে পূর্ব জার্মানি পশ্চিম বার্লিনকে ঘিরে দেয়াল নির্মাণ করে। দেয়ালটি শুধু একটি শহরকে ভাগ করেনি—এটি মূলত ইউরোপের দুই রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিভাজনের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমে ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা, পূর্বে ছিল সোভিয়েত প্রভাবাধীন সমাজতান্ত্রিক ব্লক। ১৯৮৯ সালে Berlin Wall ভেঙে পড়া Cold War-এর অবসানের অন্যতম বড় প্রতীক হয়ে ওঠে।
Cuba Missile Crisis: পৃথিবী কতটা বিপদের কাছাকাছি গিয়েছিল?
Cold War-এর সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলোর একটি ছিল Cuban Missile Crisis। ১৯৬২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনের উদ্যোগ নিলে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়, কারণ কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছেই অবস্থিত। কয়েক দিন ধরে বিশ্বজুড়ে আশঙ্কা তৈরি হয়—দুই পরাশক্তি কি এবার সত্যিই পারমাণবিক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে? শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান হয়। তবে এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছিল, Cold War কতটা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছিল—একটি ভুল সিদ্ধান্তও পুরো বিশ্বকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারত।
গোয়েন্দা যুদ্ধও ছিল Cold War-এর বড় অস্ত্র
Cold War শুধু রাষ্ট্রীয় বিবৃতি বা সামরিক মহড়ার যুদ্ধ ছিল না। এর আরেকটি বড় ক্ষেত্র ছিল intelligence। যুক্তরাষ্ট্রের CIA এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের KGB নিজেদের দেশের স্বার্থে তথ্য সংগ্রহ, গুপ্তচরবৃত্তি এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন দেশে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি করা হয়, গোপন অভিযান পরিচালিত হয় এবং প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তবে জনপ্রিয় সিনেমায় যেভাবে সবকিছুকে শুধু গুপ্তচরের গল্প হিসেবে দেখানো হয়, বাস্তবতা তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল ছিল।
মহাকাশও হয়ে গেল ক্ষমতার মঞ্চ
Cold War-এর একটি আশ্চর্য দিক ছিল Space Race। সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ সালে Sputnik 1 উৎক্ষেপণ করে বিশ্বের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠায় মহাকাশে। এরপর মহাকাশ প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়—১৯৬১ সালে সোভিয়েত মহাকাশচারী Yuri Gagarin প্রথম মানুষ হিসেবে মহাকাশে যান। যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে থাকেনি। ১৯৬৯ সালে Apollo 11 মিশনের মাধ্যমে Neil Armstrong ও Buzz Aldrin চাঁদের মাটিতে পা রাখেন।
দেখতে এটি ছিল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা, কিন্তু এর পেছনে ছিল আরও বড় রাজনৈতিক বার্তা। কে বেশি উন্নত প্রযুক্তি তৈরি করতে পারে? কে বেশি শক্তিশালী? কে ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে? মহাকাশ তখন জাতীয় সক্ষমতা প্রদর্শনের মঞ্চে পরিণত হয়েছিল।
অর্থনীতিও ছিল যুদ্ধের অংশ
Cold War-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ছিল অর্থনীতি। যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে, অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের Marshall Plan পশ্চিম ইউরোপের পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখে—এর মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপের অর্থনীতি পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়া হয় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপে নিজস্ব অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো গড়ে তোলে।
অর্থাৎ Cold War-এ প্রশ্নটি শুধু “কার সেনাবাহিনী শক্তিশালী?” ছিল না। প্রশ্ন ছিল—কার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা বেশি কার্যকর?
Propaganda: মানুষের মনও ছিল যুদ্ধক্ষেত্র
Cold War-এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র ছিল propaganda। রেডিও, সংবাদপত্র, চলচ্চিত্র, বই ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দুই পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা তুলে ধরত এবং প্রতিপক্ষের ব্যবস্থা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করার চেষ্টা করত। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কমিউনিজম ছিল স্বাধীনতার জন্য হুমকি, আর সোভিয়েত প্রচারণায় পুঁজিবাদী পশ্চিমকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। অর্থাৎ যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হচ্ছিল না—মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের মধ্যেও যুদ্ধ চলছিল।
Cold War কি শুধু যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল?
না। দুই পরাশক্তি ছিল এর কেন্দ্রীয় শক্তি, কিন্তু Cold War-এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যে। অনেক নতুন স্বাধীন দেশ তখন এমন একটি বিশ্বে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছিল, যেখানে দুই পরাশক্তি নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। এখানে Global South-এর দেশগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। অনেক দেশ সরাসরি কোনো সামরিক ব্লকের অধীনে যেতে চায়নি; তারা নিজেদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখার চেষ্টা করে। ফলে Cold War-কে শুধু দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে এর বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতার একটি বড় অংশ বাদ পড়ে যায়।
Cold War কখন শেষ হলো?
১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। সোভিয়েত নেতা Mikhail Gorbachev সংস্কারের উদ্যোগ নেন—তাঁর Glasnost ও Perestroika নীতির মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় পরিবর্তনের চেষ্টা করা হয়। এরপর পূর্ব ইউরোপে একের পর এক কমিউনিস্ট সরকার দুর্বল হতে শুরু করে। ১৯৮৯ সালে Berlin Wall ভেঙে পড়ে, আর ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায়। এর মধ্য দিয়েই Cold War-এর দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
Cold War শেষ হলেও তার প্রভাব কি শেষ হয়েছে?
একেবারেই নয়। আজকের আন্তর্জাতিক রাজনীতির অনেক কাঠামো Cold War-এর সময় তৈরি হয়েছে বা শক্তিশালী হয়েছে। NATO এখনও বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক জোট। ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো, পারমাণবিক deterrence এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক উপস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রেও Cold War-এর ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে, আজকের US-China strategic competition নিয়ে আলোচনা করতেও Cold War-এর ইতিহাস বারবার ফিরে আসে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি “নতুন Cold War” বলা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সরাসরি মতপার্থক্য আছে। যারা একে “Cold War II” বলেন, তারা যুক্তি দেন যে চীনের অর্থনৈতিক আকার—যুক্তরাষ্ট্রের GDP-এর ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়া—এমন একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র আগে কখনো মোকাবিলা করেনি। অন্যদিকে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক Thomas Christensen-এর মতো বিশ্লেষকরা যুক্তি দেখান, মূল Cold War-কে সংজ্ঞায়িত করা তিনটি উপাদান—তৃতীয় দেশগুলোর মন জয়ের আদর্শিক লড়াই, প্রক্সি যুদ্ধ তৈরি করতে পারা সামরিক জোট এবং পারমাণবিক সংকটের ঝুঁকি—এই তিনটির কোনোটিই US-China প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পষ্টভাবে উপস্থিত নেই।
আসল পার্থক্যটা মূলত অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতায়। আজকের বিশ্ব অর্থনীতি Cold War-এর সময়ের তুলনায় অনেক বেশি interconnected। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা তীব্র হলেও দুই দেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কও রয়েছে—যা যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে কখনোই ছিল না। এখানেই বর্তমান বিশ্ব Cold War-এর সময়ের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা।
Cold War থেকে আজকের বিশ্বের জন্য শিক্ষা কী?
Cold War-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে, সরাসরি যুদ্ধ না থাকলেও আন্তর্জাতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অত্যন্ত গভীর হতে পারে। অস্ত্র প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তি, গোয়েন্দা কার্যক্রম, জোট, তথ্যযুদ্ধ ও প্রক্সি সংঘাত—সবকিছু মিলেই একটি দীর্ঘ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। আর পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে ভুল হিসাবের মূল্য হতে পারে ভয়াবহ।
আজকের পৃথিবীতে ক্ষমতার কেন্দ্রও বদলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পাশাপাশি চীন, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বেড়েছে। তাই Cold War বোঝা শুধু ইতিহাস পড়া নয়—এটি বোঝার একটি পথ, কীভাবে ক্ষমতা, ভয়, অর্থনীতি, প্রযুক্তি এবং জোট মিলে একটি বিশ্বব্যবস্থা তৈরি করে।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
Cold War কত বছর স্থায়ী হয়েছিল? সাধারণভাবে ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত—প্রায় ৪৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে।
Cold War-এ কেন সরাসরি যুদ্ধ হয়নি? পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে তৈরি হওয়া Mutually Assured Destruction বা MAD পরিস্থিতির জন্য—সরাসরি যুদ্ধ হলে উভয় পক্ষই ধ্বংসের মুখে পড়তে পারত।
বর্তমান US-China প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কি “নতুন Cold War” বলা যায়? বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ আছে। কেউ কেউ চীনের অর্থনৈতিক আকারের কারণে একে “Cold War II” বলেন, আবার অনেকে যুক্তি দেন যে মূল Cold War-এর ideological rivalry, প্রক্সি যুদ্ধ তৈরিকারী জোট বা পারমাণবিক সংকটের উপাদান এখানে অনুপস্থিত। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো, আজকের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে গভীর অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা রয়েছে, যা US-Soviet সম্পর্কে কখনো ছিল না।
Cold War কীভাবে শেষ হয়েছিল? ১৯৮৯ সালে Berlin Wall ভেঙে পড়া এবং ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আনুষ্ঠানিক পতনের মধ্য দিয়ে Cold War -এর সমাপ্তি ঘটে।
Related Reading
- Multipolar World কী? একমেরু বিশ্ব থেকে বহু-মেরু বিশ্বে কীভাবে গেল পৃথিবী?
- Geopolitics কী? ভূগোল কীভাবে বিশ্বরাজনীতি, যুদ্ধ ও ক্ষমতার হিসাব বদলে দেয়
- NATO কী? কেন গঠিত হয়েছিল, কীভাবে কাজ করে এবং কোন কোন দেশ এর সদস্য?
তথ্যসূত্র:
- U.S. Department of State — Office of the Historian: The Cold War
- NATO — A Short History of NATO
- U.S. Department of State — Cuban Missile Crisis
- Atlantic Council — Is the US-China strategic competition a cold war?: https://www.atlanticcouncil.org/blogs/new-atlanticist/is-the-us-china-strategic-competition-a-cold-war/
- War on the Rocks — Deep Rivalry or Elite Obsession? Washington’s Search for Dominance Over China: https://warontherocks.com/2025/05/deep-rivalry-or-elite-obsession-washingtons-search-for-dominance-over-china/
