কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও নীতিগত প্রস্তুতির প্রতীকী দৃশ্য

প্রযুক্তি এগোচ্ছে, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের নীতির গতি কোথায়?

AI ইতোমধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছে গেছে। কিন্তু নীতি, দক্ষতা, ডেটা নিরাপত্তা ও জবাবদিহির দিক থেকে দেশ কতটা প্রস্তুত? AI অর্থনীতির সুযোগের পাশাপাশি বড় ঝুঁকিগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI এখন আর ভবিষ্যতের কোনো প্রযুক্তি নয়। এটি ইতোমধ্যে মানুষের কাজের ধরন, ব্যবসা, শিক্ষা, যোগাযোগ, তথ্যপ্রবাহ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি বদলে দিতে শুরু করেছে।

কিন্তু AI-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি হয়তো প্রযুক্তির ভেতরে নয়—রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের জায়গায়।

একটি AI সিস্টেম ভুল সিদ্ধান্ত নিলে দায় কার? কোনো মানুষের কণ্ঠ বা চেহারা নকল করে প্রতারণা হলে সেটি ঠেকাবে কে? নির্বাচনী প্রচারণা, রাজনৈতিক বিতর্ক কিংবা সামাজিক অস্থিরতায় AI -নির্মিত মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তার মোকাবিলা কীভাবে হবে? আবার AI যদি লাখো মানুষের কাজের ধরন বদলে দেয়, তাহলে নতুন দক্ষতা তৈরির প্রস্তুতি কোথায়?

এই প্রশ্নগুলো এখন বিশ্বের বড় অর্থনীতি থেকে শুরু করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিনির্ধারকদের সামনে।

বাংলাদেশও এর বাইরে নয়।

বরং বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে দেশে AI ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে AI-কে ঘিরে সমন্বিত নীতি, জবাবদিহি, দক্ষতা ও প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজ এখনো অনেকটাই অসম্পূর্ণ।

তাহলে কি বাংলাদেশ AI বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত নয়?

উত্তরটি এত সরল নয়।

বাংলাদেশে কিছু উদ্যোগ আছে, নীতির খসড়াও হয়েছে, বিদ্যমান আইনের আওতায় কিছু অপরাধ মোকাবিলার সুযোগও রয়েছে। কিন্তু বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে অন্য জায়গায়—এই বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে একটি কার্যকর জাতীয় কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

AI-এর আসল চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তি নয়, প্রস্তুতি

AI নিয়ে আলোচনা হলে সাধারণত প্রথমে উঠে আসে ChatGPT, ছবি তৈরি, ভিডিও বানানো কিংবা স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের কথা।

কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য AI -এর চ্যালেঞ্জ অনেক বড়।

একটি AI টুল ব্যবহার করা আর AI-নির্ভর সমাজ পরিচালনা করা এক বিষয় নয়।

প্রথমটির জন্য একটি ভালো ইন্টারনেট সংযোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহার করার সক্ষমতা যথেষ্ট হতে পারে। দ্বিতীয়টির জন্য দরকার আইন, ডেটা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল, গবেষণা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠান।

এখানেই বাংলাদেশের প্রস্তুতির আসল পরীক্ষা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, AI নিয়ে বাংলাদেশের বড় দুর্বলতাগুলোর একটি হলো সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব। তার মতে, AI -এর কারণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দায়বদ্ধতা নির্ধারণের প্রশ্নটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সামনে প্রশ্নটি শুধু “AI কীভাবে ব্যবহার করব?” নয়।

প্রশ্ন হলো—

AI ব্যবহার করে ভুল হলে কে দায় নেবে?

বাংলাদেশ আগে থেকেই কিছুটা প্রস্তুতির চেষ্টা করেছে

বাংলাদেশের AI প্রস্তুতি একেবারে শূন্য থেকে শুরু হয়নি।

২০২০ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ একটি ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশল’ প্রণয়ন করেছিল। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও প্রশাসনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে AI ব্যবহারের সম্ভাব্য রূপরেখাও সেখানে ছিল।

কিন্তু বড় সমস্যা ছিল বাস্তবায়ন।

অর্থাৎ নীতি তৈরি করা এবং সেই নীতিকে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় পরিণত করার মধ্যে যে ব্যবধান, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পরবর্তীতে একটি National AI Policy-এর খসড়াও তৈরি করা হয়। সেখানে সরকারি সেবা, বিচারব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ, ডেটা গভর্ন্যান্স, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মতো খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এমনকি একটি স্বাধীন National Artificial Intelligence Center of Excellence প্রতিষ্ঠার ধারণাও খসড়ায় রাখা হয়েছিল।

কিন্তু এখানেই আবার সেই পুরোনো প্রশ্ন ফিরে আসে—

নীতির কাগজ আছে, কিন্তু বাস্তবায়নের কাঠামো কতটা প্রস্তুত?

AI-এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো Deepfake নয়

বাংলাদেশে AI নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় Deepfake, ভুয়া ভিডিও, নকল কণ্ঠস্বর ও রাজনৈতিক প্রচারণা বড় জায়গা দখল করেছে।

এটি অবশ্যই গুরুতর সমস্যা।

Generative AI ব্যবহার করে এখন মানুষের কণ্ঠ, চেহারা কিংবা বক্তব্যের মতো কনটেন্ট তৈরি করা সম্ভব। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে AI ব্যবহার করে প্রচারণা, কাউকে হেয় করা কিংবা রাজনৈতিকভাবে অপদস্থ করার মতো ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু AI -এর ঝুঁকি শুধু Deepfake -এ সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যাবে।

ধরা যাক, একটি AI সিস্টেম কোনো ব্যাংকের ঋণ আবেদন যাচাই করছে। সে যদি ভুলভাবে কাউকে ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহক হিসেবে চিহ্নিত করে?

অথবা কোনো নিয়োগ ব্যবস্থায় AI একটি নির্দিষ্ট ধরনের প্রার্থীকে বারবার অগ্রাধিকার দেয়?

অথবা সরকারি কোনো সেবায় AI ভুল তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়?

তখন প্রশ্ন হবে—মানুষ কি সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবে?

AI কি তার সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে?

এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—

দায়িত্বটি কার?

এই জবাবদিহির কাঠামো না থাকলে AI যত উন্নতই হোক, সেটি রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

বিদ্যমান আইন কি যথেষ্ট?

বাংলাদেশে AI নিয়ে আলাদা পূর্ণাঙ্গ আইন বা নীতি এখনো বড় প্রশ্নের জায়গা।

তবে প্রযুক্তি খাতের কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, AI দিয়ে সংঘটিত অপরাধের অনেকটাই বিদ্যমান আইনের আওতায় বিচার করা সম্ভব।

ফাইবার অ্যাট হোম লিমিটেডের চিফ ইনফরমেশন অফিসার সুমন আহমেদ সাবিরের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধটি AI দিয়ে হয়েছে কি না সেটিই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়; অপরাধের প্রকৃতি ও গুরুত্ব অনুযায়ী বিদ্যমান আইনের প্রয়োগও সম্ভব।

এই যুক্তির একটি শক্তিশালী দিক আছে।

কারণ প্রতারণা, মানহানি, জালিয়াতি বা হয়রানি—এসব অপরাধ AI আসার আগেও ছিল।

কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হচ্ছে নতুন ধরনের ব্যবহারে।

AI কোনো পুরোনো অপরাধকে আরও দ্রুত, সস্তা এবং ব্যাপক করে তুলতে পারে।

একজন প্রতারক আগে এক দিনে কয়েকজনকে টার্গেট করতে পারতেন। AI দিয়ে একই কাজ অনেক বড় পরিসরে করা সম্ভব।

একটি ভুয়া ছবি তৈরি করা আগে তুলনামূলক কঠিন ছিল। এখন তা কয়েক মিনিটের কাজ হতে পারে।

সুতরাং শুধু পুরোনো আইন প্রয়োগ করলেই হবে, নাকি নতুন প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী নতুন নীতিগত কাঠামোও দরকার—এ বিতর্কটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

বিশ্বের অন্য দেশগুলো কোথায়?

AI নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ একা নয়। বিশ্বের প্রায় সব দেশই কোনো না কোনোভাবে এই প্রশ্নের মুখোমুখি।

তবে পার্থক্য হচ্ছে—অনেক দেশ ইতোমধ্যে AI -কে কেন্দ্র করে নীতি, আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরির কাজ শুরু করেছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন AI Act -এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের AI ব্যবস্থাকে ঝুঁকির ভিত্তিতে আলাদা করার পথে গেছে। উচ্চ ঝুঁকির ব্যবস্থার জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও বাধ্যবাধকতাও তৈরি করা হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে AI নিয়ে বিভিন্ন আইন, নীতিমালা ও নির্বাহী উদ্যোগ রয়েছে।

ভারত ২০১৮ সালেই National Strategy for Artificial Intelligence গ্রহণ করে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো ও বাণিজ্যের মতো খাতে AI ব্যবহারের কৌশল নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রয়েছে ২০৩১ সাল পর্যন্ত AI কৌশল।

চীনও অ্যালগরিদম ব্যবহারের ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

অর্থাৎ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পথ এক নয়।

কিন্তু একটি বিষয়ে মিল আছে—

AI-কে পুরোপুরি বাজারের ওপর ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে আনার চেষ্টা।

বাংলাদেশ কোথায় পিছিয়ে?

বাংলাদেশের বড় সমস্যা সম্ভবত AI ব্যবহারের আগ্রহের অভাব নয়।

সমস্যা হলো, ব্যবহারের গতি এবং প্রতিষ্ঠান তৈরির গতি এক নয়।

মানুষ AI ব্যবহার করছে।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান AI ব্যবহার করছে।

শিক্ষার্থীরা AI ব্যবহার করছে।

কনটেন্ট তৈরি, সফটওয়্যার, ডিজাইন, অনুবাদ, গবেষণা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই AI ঢুকে পড়ছে।

কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে—

  • AI ব্যবহারের নীতিমালা কোথায়?
  • ডেটা ব্যবহারের সীমা কোথায়?
  • AI -ভিত্তিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কে করবে?
  • ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি কীভাবে প্রতিকার পাবেন?
  • AI -নির্ভর কর্মক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা তৈরি করবে কে?
  • সরকারি প্রতিষ্ঠানে AI ব্যবহারের মানদণ্ড কী হবে?

এসব প্রশ্নের সমন্বিত উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক বিএম মইনুল হোসেনের ভাষায়, বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ থাকলেও সমন্বিত ব্যবস্থা নেই; নীতি বা কৌশল থাকলে কে পর্যবেক্ষণ করবে, সেই কাঠামোও নির্ধারিত হওয়ার কথা।

এখানে মূল সমস্যা তাই প্রযুক্তির ঘাটতির চেয়ে Governance Gap বা শাসনব্যবস্থার ঘাটতি।

AI নিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে শুধু চাকরি হারানোর ভয়

AI নিয়ে সাধারণ আলোচনায় সবচেয়ে বেশি যে প্রশ্নটি আসে তা হলো—AI কি মানুষের চাকরি নিয়ে নেবে?

প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু চাকরি হারানোর আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে AI নীতি তৈরি করলে সেটি অসম্পূর্ণ হবে।

কারণ AI একই সঙ্গে কিছু কাজ বিলুপ্ত করতে পারে, আবার নতুন কাজও তৈরি করতে পারে।

আজকের একজন কর্মী যে কাজ করছেন, কয়েক বছর পর সেই কাজের একটি অংশ AI করে দিতে পারে। তখন কর্মীকে হয়তো অন্য ধরনের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।

এখানে বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগও আছে।

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, ফ্রিল্যান্সিং খাত এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তৃত পরিসর AI অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

কিন্তু দক্ষতা উন্নয়নের ব্যবস্থা না থাকলে একই প্রযুক্তি সুবিধার বদলে বৈষম্যও বাড়াতে পারে।

যারা AI ব্যবহার করতে জানবেন তারা দ্রুত এগিয়ে যাবেন।

যারা জানবেন না, তারা পিছিয়ে পড়বেন।

তাই AI প্রস্তুতি মানে শুধু সফটওয়্যার কেনা নয়।

মানুষকে প্রস্তুত করাও AI নীতির অংশ।

শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন দরকার

AI -এর যুগে শিক্ষার্থীদের শুধু তথ্য মুখস্থ করানো কতটা কার্যকর—এই প্রশ্নটিও নতুন করে ভাবতে হবে।

কারণ AI কয়েক সেকেন্ডে এমন অনেক তথ্য দিতে পারে, যার জন্য আগে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গবেষণা করতে হতো।

তাহলে শিক্ষার মূল লক্ষ্য কী হবে?

সম্ভবত তথ্য মনে রাখার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, যুক্তি বিশ্লেষণ, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধান এবং AI -এর ফলাফল যাচাই করার ক্ষমতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

একজন শিক্ষার্থী যদি AI -এর তৈরি একটি উত্তরকে যাচাই না করেই সত্য ধরে নেয়, তাহলে প্রযুক্তি তার জ্ঞান বাড়ানোর বদলে ভুল তথ্যও ছড়িয়ে দিতে পারে।

সুতরাং বাংলাদেশের AI প্রস্তুতির একটি বড় অংশ হওয়া উচিত AI Literacy— শুধু প্রযুক্তিবিদদের নয়, সাধারণ মানুষেরও।

AI এবং তথ্যের রাজনীতি

AI-এর সবচেয়ে গভীর রাজনৈতিক প্রভাবগুলোর একটি হতে পারে তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ।

আগে একটি মিথ্যা তথ্য তৈরি করতে সময় লাগত।

এখন AI দিয়ে একই সময়ে ছবি, ভিডিও, অডিও ও লিখিত বক্তব্য তৈরি করা সম্ভব।

ফলে ভবিষ্যতে একটি বড় রাজনৈতিক বা সামাজিক ঘটনার সময় মানুষ কোন তথ্য বিশ্বাস করবে—সেটি নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষ করে নির্বাচনের সময়, রাজনৈতিক সংকটের সময় বা কোনো বড় দুর্যোগের সময়ে AI -নির্মিত বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এ কারণে AI governance -কে শুধু প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না।

এর সঙ্গে নির্বাচন, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা, শিক্ষা, বিচার ও নাগরিক অধিকার— সবকিছুর সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য কেমন AI নীতি প্রয়োজন?

একটি কার্যকর জাতীয় AI নীতি তৈরি করতে হলে শুধু “AI ব্যবহার বাড়াতে হবে”—এমন লক্ষ্য যথেষ্ট নয়।

বরং অন্তত কয়েকটি স্তরে চিন্তা করা প্রয়োজন।

প্রথমত, নিরাপত্তা

  • AI ব্যবহারে নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে, তা পরিষ্কার করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, জবাবদিহি

  • AI -এর সিদ্ধান্তে ক্ষতি হলে দায় কার—সরকার, প্রতিষ্ঠান, সফটওয়্যার নির্মাতা নাকি ব্যবহারকারী—তা নির্ধারণের কাঠামো দরকার।

তৃতীয়ত, দক্ষতা

  • AI অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরি করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে।

চতুর্থত, গবেষণা ও উদ্ভাবন

  • শুধু বিদেশি AI টুল ব্যবহার করলে বাংলাদেশ AI অর্থনীতির ভোক্তা হয়ে থাকবে। নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি না করলে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে।

পঞ্চমত, প্রতিষ্ঠান

  • নীতিমালা বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান না থাকলে ভালো নীতিও কাগজেই আটকে যেতে পারে।

বাংলাদেশ কি AI -এর সুযোগ কাজে লাগাতে পারবে?

এখানে আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণও আছে।

বাংলাদেশে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী রয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের বিস্তার হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং ও সফটওয়্যার খাতে অভিজ্ঞতা তৈরি হয়েছে।

কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সরকারি সেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় AI ব্যবহারের সুযোগও রয়েছে।

খসড়া National AI Policy -তে সরকারি সেবা, বিচারব্যবস্থা, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের মতো খাতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি সেই সম্ভাবনারই ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সম্ভাবনা এবং বাস্তব সক্ষমতা এক জিনিস নয়।

বাংলাদেশের সামনে এখন মূল কাজ হলো— AI নিয়ে বিচ্ছিন্ন প্রকল্পের বদলে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামো তৈরি করা।

সবচেয়ে জরুরি হলো নীতির গতি

AI প্রযুক্তি অপেক্ষা করবে না।

একটি নতুন আইন তৈরিতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। কিন্তু AI প্রযুক্তির সক্ষমতা কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে যেতে পারে।

এখানেই নীতিনির্ধারকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

অতিরিক্ত কঠোর নিয়ম করলে উদ্ভাবন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আবার কোনো নিয়ম না থাকলে নাগরিক অধিকার, তথ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

তাই বাংলাদেশের প্রয়োজন এমন একটি নীতি, যা একদিকে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করবে, অন্যদিকে উচ্চঝুঁকির AI ব্যবহারে স্পষ্ট সীমা ও জবাবদিহি তৈরি করবে।

ইউনেস্কোর AI ethics framework-ও AI-এর সুফল সর্বোচ্চ করা এবং ঝুঁকি কমানোর ওপর গুরুত্ব দেয়। বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্র ২০২১ সালে এই কাঠামো অনুমোদন করেছিল।

শেষ কথা: বাংলাদেশকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—AI-এর ভোক্তা, নাকি অংশীদার?

বাংলাদেশের সামনে AI নিয়ে মূল প্রশ্নটি আসলে “AI আসবে কি না” নয়।

AI ইতোমধ্যেই এসেছে।

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে এগোবে।

শুধু বিদেশি AI টুল ব্যবহার করে একটি বড় ব্যবহারকারী বাজার হওয়া এক ধরনের পথ।

আরেকটি পথ হলো—নিজস্ব দক্ষতা, গবেষণা, নীতি, ডেটা অবকাঠামো এবং উদ্ভাবনের সক্ষমতা তৈরি করে AI অর্থনীতির অংশীদার হওয়া।

একই সঙ্গে নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জবাবদিহিমূলক কাঠামো তৈরি করাও জরুরি।

বাংলাদেশের ২০২০ সালের AI Strategy ছিল একটি সূচনা। পরবর্তী সময়ে National AI Policy-এর খসড়াও তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন প্রয়োজন নীতিকে বাস্তবায়নের সক্ষমতায় রূপান্তর করা।

কারণ AI-এর যুগে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি শুধু প্রযুক্তিতে পিছিয়ে পড়া নয়।

এটি শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসা, তথ্য, রাষ্ট্রীয় সেবা এবং নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রেও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি।

আর তাই বাংলাদেশের AI প্রস্তুতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হবে না—দেশে কতজন AI ব্যবহার করছেন।

বরং প্রশ্ন হবে—

AI যখন মানুষের জীবনে সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে, তখন সেই সিদ্ধান্তকে নিরাপদ, ন্যায়সংগত ও জবাবদিহিমূলক রাখার মতো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা কি বাংলাদেশের থাকবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই ঠিক করবে, AI বাংলাদেশের জন্য সুযোগ হয়ে উঠবে, নাকি নতুন ধরনের ঝুঁকি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *