রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজন হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবককে নিয়ে পুলিশের সংবাদ সম্মেলন।
২৩ আগস্ট, | ২০২৬ বাজলেন্স ডেস্ক
রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ও তাঁর পরিবারের তিন সদস্যকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই যুবককে নিয়ে তদন্তে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের দাবি, মাদক সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে একে একে চারজনকে হত্যা করেন মুগ্ধ দাস (২৩) ও সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। হত্যার পরও তারা ওই বাড়িতে কিছু সময় অবস্থান করেন, গোসল করেন এবং খেজুর ও শসা খান।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য ও ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা বিভিন্ন আলামত বিশ্লেষণ করে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আরও পড়তে পারেন : ‘রাত ১২টায় পুকুরপাড়ে দেখা করলে ফ্যামিলি কার্ড!” বিএনপি নেতার প্রস্তাব
‘স্যার’ ও ‘কাকি’ ডাকতেন, তবু কেন হত্যা?
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নিহত পরিবারের পরিচিত ছিলেন। তারা গণপতি চক্রবর্তীকে ‘স্যার’ এবং তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তীকে ‘কাকি’ বলে ডাকতেন। পরিবারের ছোট ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের সঙ্গেও তাদের পরিচয় ছিল। এমনকি তাদের ছোট ভাইয়েরা প্রিয়মের সঙ্গে খেলাধুলা করত বলে পুলিশ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, নিহতদের বাড়ির ছাদে মাদক সেবনকে কেন্দ্র করেই ঘটনার সূত্রপাত বলে তদন্তকারীদের দাবি। বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) রাতের শেষ দিকে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিলেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
আরও পড়তে পারেন : সিলেটে এত ছিনতাই, ধরা পড়ছে কারা—আর কারা থাকছে আড়ালে?
একে একে চারজনকে হত্যার দাবি
পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, ছাদে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীর সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। এরপর তাঁকে হত্যা করা হয়।
শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা বেরিয়ে এলে তাঁকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি। পরে মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এগিয়ে এলে তিনিও হামলার শিকার হন। সবশেষে ঘুমন্ত ১২ বছর বয়সী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে হত্যা করা হয়।
পুলিশের দাবি, চারজনকে হত্যার পর বাড়ি থেকে স্বর্ণালংকারসহ কিছু জিনিস নেওয়া হয়। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কেউ জড়িত কি না বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

হত্যার পরও বাড়িতেই ছিলেন
এই হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিকগুলোর একটি উঠে এসেছে ঘটনাস্থলের আলামত থেকে। পুলিশ কমিশনার জানান, হত্যার পর অভিযুক্তরা বাড়িতেই কিছু সময় অবস্থান করেন। তারা সেখানে গোসল করেন এবং পরে খেজুর ও শসা খান বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। এরপর সেখানেই আবার ইয়াবা সেবনের আলামতও পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থল থেকে খেজুরের বিচি এবং ফ্রিজে থাকা শসার কামড়ানো অংশ পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এসব আলামত অভিযুক্তদের শনাক্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে পুলিশ দাবি করেছে।
এ ছাড়া একটি চুড়িতে আগুনে পোড়ানোর দাগ পাওয়ার কথাও জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার। তদন্তকারীরা এসব আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তের চেষ্টা করেন।
আরও পড়তে পারেন : শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘শাহবাগ বেতার কেন্দ্র’ দখলের অভিযোগ, তথ্য মন্ত্রণালয়ে ১২ দফা লিখিত অভিযোগ
‘স্যার’ থেকে হত্যার শিকার
নিহত গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল ছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মকে নিয়ে ছিল পরিবারটি।
শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরের কামালকাছনা-মাছুয়াপাড়া এলাকার একটি বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে রাতভর অভিযান চালিয়ে মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পরস্পরের মামাতো ভাই এবং একই এলাকার বাসিন্দা। তাদের একজন মাছের দোকানে এবং অন্যজন স্বর্ণের দোকানে কাজ করেন। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরও পড়তে পারেন : সেক্রেটারি হতে ৫০ লাখ খরচ করেছি, তোরা পৌরসভায় আসবি না’: বিএনপি নেতার অডিও ভাইরাল
ধর্ষণের আলামত মেলেনি
পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলনে জানান, ঘটনাস্থলে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া গেছে। ঘটনাটির আগে বা পরে অভিযুক্তরা মাদক সেবন করেছিলেন বলে তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন।
এখন তদন্তের মূল প্রশ্ন—গ্রেপ্তার দুই যুবকের দেওয়া তথ্য ও ঘটনাস্থলের আলামত কতটা পরস্পরের সঙ্গে মেলে এবং হত্যাকাণ্ডে তাদের বাইরে আর কেউ যুক্ত ছিল কি না। পুলিশ জানিয়েছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত চার্জশিট দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
