সীরাতুন্নবী (সা.) সেমিনারে বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
২০২৪ সালের আন্দোলনকে চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে দেখার সুযোগ নেই—এটি ছিল চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি বা মহড়া। এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।
রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (আইডিইবি) মিলনায়তনে সীরাতুন্নবী (সা.) সেমিনার ও রচনা প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
‘২৪-এর আন্দোলন ছিল ফাইনাল যুদ্ধের রিহার্সেল’
শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনে যারা জেগে উঠেছিলেন, তারা এখনো সজাগ রয়েছেন। তাঁর ভাষায়, মূল যুদ্ধের আগে একটি বাহিনীকে প্রস্তুত করা হয় এবং মহড়া দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালকে যেন কেউ ‘ফাইনাল যুদ্ধ’ মনে না করেন। তাঁর দাবি, সেটি ছিল ফাইনাল যুদ্ধের ‘রিহার্সেল’।
একই বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের পর তিনি আশা করেছিলেন দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ফ্যাসিবাদের ‘পঙ্কিলতা, ময়লা ও আবর্জনা’ পরিষ্কার হবে। তবে তাঁর অভিযোগ, সেটি হয়নি; বরং ‘আবর্জনার পরিমাণ’ আরও বেড়েছে।
বর্তমান সরকার নিয়েও শফিকুর রহমানের অভিযোগ
এরপর বক্তব্যের একটি বড় অংশে বর্তমান সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে সমালোচনা করেন জামায়াত আমির। তিনি ফ্যাসিবাদকে ‘সংক্রামক ব্যাধি’র সঙ্গে তুলনা করেন।
শফিকুর রহমানের অভিযোগ, গত ১৫ বছর যে পথে ফ্যাসিবাদী সরকার চলেছে, বর্তমান সরকারও একই পথে হাঁটছে। তিনি এই পথ পরিবর্তনের আহ্বান জানান।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এটি ‘আয়নাঘরের পথ’ এবং বিনা বিচারে মানুষ হত্যার পথ। বাংলাদেশের মানুষ কাউকে এই পথে চলতে দেবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জুলাই জাদুঘর নিয়ে উঠল ইতিহাস মুছে ফেলার অভিযোগ
এদিকে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর থেকে ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সরিয়ে ফেলার অভিযোগও তোলেন শফিকুর রহমান।
তিনি বলেন, সচেতন নাগরিকদের প্রত্যেকেরই জাদুঘরটি পরিদর্শন করা উচিত। তবে তাঁর অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেখানে জাতির দুঃখের ঘটনাগুলো তুলে ধরা হলেও পরে এর অনেক উপাদান সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
বিশেষ একটি দেশ ও রাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য এসব উপাদান সরানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে বক্তব্যে তিনি এ দাবির পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন কি না, তা উল্লেখ করেননি।
শফিকুর রহমান আরও দাবি করেন, ১৯৪৬-৪৭ সাল থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তির স্মৃতিও সেখানে তুলে ধরা হয়েছিল। পরে এর কিছু অংশ আর নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফেলানী ও দেলাওয়ার হোসেনের স্মৃতিও সরানোর দাবি
জুলাই জাদুঘর প্রসঙ্গে শফিকুর রহমান ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন এবং সীমান্তে নিহত ফেলানীর প্রসঙ্গও তোলেন।
তিনি দাবি করেন, দেলাওয়ার হোসেনের ওপর নির্যাতনের স্মৃতি জাদুঘরে ছিল, সেটিও সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একইভাবে সীমান্তে ফেলানীকে ঝুলিয়ে হত্যার স্মৃতিচিহ্নও আর নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে এসব বক্তব্যকে শফিকুর রহমানের অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের বাইরে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের কোনো ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনের সূত্রে পাওয়া যায়নি।
‘
ক্ষমতায় এলেই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ’
বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
তিনি বলেন, ক্ষমতায় আসার পর প্রায় সবাই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলে। কিন্তু তাঁর মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের অনেকেই কোনো না কোনোভাবে ইতিহাস বিকৃতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
অর্থাৎ, তাঁর বক্তব্যে ইতিহাসের রাজনৈতিক ব্যবহার এবং ক্ষমতার সঙ্গে ইতিহাসের বয়ান পরিবর্তনের প্রশ্নটি আবারও সামনে আসে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েও হতাশা
শেষদিকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও পাসপোর্টের শক্তি নিয়েও কথা বলেন শফিকুর রহমান।
স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ প্রত্যাশিতভাবে এগোতে পারেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, বিশ্বের কাছে একটি দেশের মানুষের সম্মানের অন্যতম মানদণ্ড হলো সেই দেশের পাসপোর্টের শক্তি।
বাংলাদেশের পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থান হতাশাজনক বলেও মন্তব্য করেন জামায়াত আমির।
শফিকুর রহমানের বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা অবশ্য ২০২৪ সালের আন্দোলনকে ‘ফাইনাল যুদ্ধ’ না বলে ‘ফাইনাল যুদ্ধের রিহার্সেল’ হিসেবে বর্ণনা করা। একইসঙ্গে বর্তমান সরকারকে সাবেক সরকারের পথ অনুসরণের অভিযোগ তোলায় তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে।
TheBuzzLens-এর প্রাসঙ্গিক রাজনৈতিক প্রতিবেদন থাকলে এখানে internal link যুক্ত করা যাবে। যাচাই ছাড়া কোনো URL যোগ করা উচিত নয়।
:
