সোফায় পাশাপাশি বসে থাকা এক দম্পতি, দুজনেই নিজ নিজ স্মার্টফোনে মগ্ন, একে অপরের দিকে না তাকিয়ে

প্রতীকী ছবি: স্মার্টফোন কীভাবে দাম্পত্য সম্পর্কে অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করছে

ঘরে ফিরেই ফোনে ডুবে যাওয়া, কথা বলার সময় স্ক্রিনে চোখ আটকে থাকা—এগুলো ছোট অভ্যাস মনে হলেও ধীরে ধীরে দাম্পত্য সম্পর্কে বড় ফাটল তৈরি করছে। জেনে নিন কীভাবে বুঝবেন সমস্যাটা শুরু হয়েছে, আর কীভাবে ফিরে পাবেন হারানো সেই আন্তরিকতা।

১৭ আগস্ট ২০২৬ | লাইফস্টাইল ডেস্ক

একটা সময় ছিল, যখন সারাদিনের কাজ শেষে ঘরে ফিরে সঙ্গীর মুখোমুখি বসাটাই ছিল দিনের সবচেয়ে আরামের মুহূর্ত। “আজ কেমন গেল দিনটা?”—এই একটা প্রশ্নেই যেন জমে থাকত সারাদিনের সব ক্লান্তি ভাগ করে নেওয়ার তাগিদ। এখন সেই দৃশ্যটা বদলে গেছে। ঘরে ফেরার পর দুজন পাশাপাশি বসে থাকেন ঠিকই, কিন্তু চোখ থাকে হাতের ফোনে। কথা হয় কম, স্ক্রল হয় বেশি।

এটা কোনো একটা সংসারের গল্প নয়—এটা এখন ঘরে ঘরে চেনা দৃশ্য। প্রযুক্তি আমাদের দূরের মানুষকে কাছে এনেছে ঠিকই, কিন্তু পাশের মানুষটাকে যেন একটু একটু করে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

সমস্যাটা ফোনে সময় দেওয়া নয়, সমস্যাটা কাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন

ফোন কতক্ষণ ব্যবহার করছেন, সেটা আসল প্রশ্ন নয়। আসল প্রশ্ন হলো—সঙ্গীর একটা হাসি, একটা অভিমানী কথা বা একসঙ্গে কাটানো নীরব মুহূর্তের চেয়ে যদি স্ক্রিনের নোটিফিকেশন বেশি টানতে শুরু করে, তাহলে বুঝতে হবে সম্পর্কে একটা ফাটল ধরতে শুরু করেছে। নিচের লক্ষণগুলো মিলিয়ে দেখুন—হয়তো নিজের সংসারেও এর কোনোটা চেনা লাগবে।

আরও পড়ুন : দু’জনের শরীর, দু’টি জীবন: ‘ওয়েলনেস গ্যাপ’ কি সত্যিই সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ায়?

যখন প্রথম কাজ হয় ফোন হাতে নেওয়া, সঙ্গীর দিকে তাকানো নয়

সন্ধ্যাটা কীভাবে শুরু হয়, একবার ভেবে দেখুন তো। বাড়ি ফিরেই কি দুজনে যে যার মতো ইনস্টাগ্রাম বা ইউটিউবে ডুবে যান? সারাদিন পর সঙ্গীকে “কেমন কাটল দিনটা” জিজ্ঞেস করার বদলে যদি হাতটা আগে ফোনের দিকে যায়, তাহলে বুঝতে হবে ছোট ছোট যে কথাগুলো একটা সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে, সেগুলোই ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আর এই হারিয়ে যাওয়াটা টের পাওয়া যায় না সহজে—একদিন হঠাৎ খেয়াল হয়, মাঝখানে অনেকটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে।

কথা বলতে গিয়ে বারবার উপেক্ষিত হওয়া

কল্পনা করুন—আপনি একটা ভালো খবর শেয়ার করছেন, বা মনের মধ্যে জমে থাকা কোনো কথা বলছেন, আর ওপাশের মানুষটার চোখ স্ক্রিনে আটকে। প্রথমবার হয়তো তেমন গায়ে লাগে না। কিন্তু এটা যখন বারবার ঘটতে থাকে, তখন নিজেকে গুরুত্বহীন মনে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক একটা প্রতিক্রিয়া। আর এই “উপেক্ষিত হওয়া”র অনুভূতিই আসলে সম্পর্কে দূরত্বের প্রথম বীজ বুনে দেয়।

আরও পড়ুন : দ্য নস্টালজিয়া ইকোনমি: ৯০-এর দশক বা ২০০০-এর পপ-কালচার কেন ব্যাক করছে?

নীরবতাও এখন আর নিরাপদ নেই

একসময় দুজনে চুপচাপ পাশাপাশি বসে থাকাটাও ছিল আরামের—কথা না বলেও একসঙ্গে থাকার একটা স্বস্তি ছিল তাতে। কিন্তু এখন সেই নীরবতার প্রতিটা মুহূর্তই যেন ফোন হাতে নেওয়ার একটা অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়। ফলাফল—একই ঘরে বসে থেকেও দুজন মানুষ আসলে দুটো আলাদা ডিজিটাল দুনিয়ায় বাস করতে শুরু করেন। একসঙ্গে থাকার যে ছোট্ট, নিরিবিলি আনন্দটুকু ছিল, সেটাই ক্রমশ ফিকে হয়ে যায়।

স্ক্রিন টাইম নিয়ে ঝগড়াই আসলে অন্য কিছুর ইঙ্গিত

“তুমি সারাক্ষণ ফোন নিয়ে পড়ে থাকো”—এই অভিযোগ কি চেনা লাগছে? কিংবা আপনিই কি সঙ্গীকে এই কথা বলেন? ফোন ব্যবহারের সময় নিয়ে যদি বারবার মনোমালিন্য হতে থাকে, তাহলে বুঝে নিতে হবে—সমস্যাটা আসলে ফোন নয়। সমস্যাটা হলো উপেক্ষিত হওয়ার অনুভূতি, আর সেই চেনা মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। ফোনটা তখন শুধু সেই না-বলা অভিমানের একটা দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

আরও পড়ুন : Gen Z কেন এমন? তাদের মানসিকতা, স্টাইল ও জীবনযাপনের বদলে যাওয়া গল্প

অচেনা মানুষদের খবর মুখস্থ, প্রিয় মানুষটার মনের খবর অজানা

কোনো সেলিব্রিটি কার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছেন, বা পুরোনো কোনো বন্ধু আজ কী পোস্ট করেছেন—এসব হয়তো নখদর্পণে। কিন্তু নিজের সঙ্গী আজকাল কী নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন, বা মনের মধ্যে কোন ছোট্ট আনন্দটা লুকিয়ে রেখেছেন—সেটা কি জানা আছে? যেদিন থেকে অচেনা মানুষদের গল্প প্রিয় মানুষটার মনের খবরের চেয়ে বেশি জায়গা দখল করে নেয়, বুঝতে হবে সম্পর্কের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে।

তাহলে উপায় কী?

ফোন ছুড়ে ফেলে দেওয়াটা সমাধান নয়—বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তি এখন জীবনেরই অংশ। তবে ছোট কিছু অভ্যাস বদলাতে পারলেই অনেকটা ফারাক তৈরি হয়। যেমন—বাড়ি ফিরে প্রথম দশ মিনিট ফোন হাতে না নিয়ে সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলা, খাবার টেবিলে ফোন দূরে রাখা, ঘুমানোর আগে অন্তত কিছুক্ষণ শুধু গল্প করা। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে একটা সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে। প্রশ্ন একটাই—পাশের মানুষটাকে ফিরে পাওয়ার এই ছোট্ট চেষ্টাটুকু করতে আপনি রাজি তো?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *