গিরিশ চন্দ্র সেনই কি কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক—ইতিহাসের তথ্য কী বলছে?
| BuzzLens FactCheck Seriese
বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম অনুবাদক হিসেবে গিরিশ চন্দ্র সেনের নাম বহু বছর ধরে প্রচলিত। বিভিন্ন বই, সংবাদ প্রতিবেদন ও অনলাইন লেখায় তাঁকে সরাসরি ‘কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক’ বলা হয়েছে।
কিন্তু ইতিহাসের পাতাগুলো একটু গভীরভাবে দেখলে প্রশ্নটি এতটা সরল থাকে না।
কারণ গিরিশ চন্দ্র সেনের আগে বাংলায় কোরআনের অংশবিশেষের অনুবাদ বা কোরআনের কাহিনি অবলম্বনে রচনা থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। আবার তাঁর ক্ষেত্রে যে বিষয়টি তুলনামূলকভাবে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত—তা হলো তিনি পুরো কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ সম্পন্ন ও প্রকাশ করেন।
তাহলে প্রচলিত দাবিটি কতটা সত্য?
রায়: আংশিক সত্য, তবে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপিত।
দাবিটি কী?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিভিন্ন ওয়েবসাইট ও সাধারণ আলোচনায় প্রায়ই বলা হয়—
“গিরিশ চন্দ্র সেনই বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম অনুবাদক।”
দাবিটির মধ্যে একটি সত্য আছে, কিন্তু ‘প্রথম অনুবাদক’ এবং ‘প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদক’—এই দুটি বিষয়কে এক করে ফেললেই বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
বাংলাপিডিয়া গিরিশ চন্দ্র সেনকে বাংলা ভাষায় কোরআনের “first creditable and full translation”-এর সঙ্গে যুক্ত করেছে। অর্থাৎ এখানে মূল গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদকে।
অন্যদিকে কোরআনের বাংলা অনুবাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণামূলক লেখাগুলোতে তাঁর আগে বিভিন্ন অংশের অনুবাদ ও কোরআনভিত্তিক রচনার উল্লেখ পাওয়া যায়।
সুতরাং প্রথমেই পার্থক্যটি পরিষ্কার করা জরুরি:
প্রথম বাংলা কোরআন অনুবাদ ≠ প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা কোরআন অনুবাদ।
তাহলে গিরিশ চন্দ্র সেনের আগে কী ছিল?
এখানেই গল্পটি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
বাংলা ভাষায় কোরআনের ভাব, কাহিনি ও আয়াতের অর্থ উপস্থাপনের ইতিহাস উনিশ শতকে হঠাৎ শুরু হয়নি। এর শিকড় আরও পুরোনো।
গবেষণামূলক একটি প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলা ভাষায় কোরআনের কিছু অংশের ভাবানুবাদ বা কাহিনিভিত্তিক উপস্থাপনা মধ্যযুগ থেকেই দেখা যায়। বিশেষ করে কবি শাহ মুহম্মদ সগীরের ‘ইউসুফ-জুলেখা’-র সঙ্গে কোরআনের সূরা ইউসুফের সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শাহ মুহম্মদ সগীর ছিলেন চতুর্দশ শতকের শেষভাগ ও পঞ্চদশ শতকের শুরুর দিকের কবি। তাঁর ইউসুফ-জুলেখা গ্রন্থে গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের প্রশংসামূলক পদ রয়েছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা দরকার।
‘ইউসুফ-জুলেখা’কে পুরো সূরা ইউসুফের আক্ষরিক বাংলা অনুবাদ বলা ঠিক হবে না।
এটি মূলত কোরআনের সূরা ইউসুফের কাহিনি অবলম্বনে রচিত কাব্যিক উপস্থাপনা। গবেষণাতেও একে কোরআনের সরাসরি পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের বদলে কাব্যিক রূপান্তর বা ভাবানুবাদের ধারায় দেখা হয়েছে।
অর্থাৎ—
শাহ মুহম্মদ সগীরকে ‘প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা কোরআন অনুবাদক’ বলা যাবে না।
কিন্তু তাঁকে বাদ দিয়ে বাংলা ভাষায় কোরআনের ভাব ও কাহিনি উপস্থাপনের ইতিহাসও সম্পূর্ণ করা যাবে না।
১৮০৮ সালে আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার অনুবাদ
এরপর আসে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম—আমীর উদ্দীন বসুনিয়া।
গবেষণামূলক সূত্র ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, রংপুরের আমীর উদ্দীন বসুনিয়া ১৮০৮ সালের দিকে কোরআনের ৩০তম পারা বা আমপারা বাংলায় অনুবাদ করেন। এটি ছিল পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ নয়।
বাংলা কোরআন অনুবাদের ইতিহাস নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণায়ও আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার ১৮০৮ সালের অনুবাদের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এটি কোরআনের ৩০তম পারার অনুবাদ ছিল এবং পূর্ণাঙ্গ কোরআন অনুবাদের অনেক আগে এই কাজ হয়েছিল।
অর্থাৎ গিরিশ চন্দ্র সেনের ১৮৮০-এর দশকের কাজের বহু আগে বাংলায় কোরআনের অন্তত একটি বড় অংশ অনুবাদের উদ্যোগ ছিল।
এখানেই প্রচলিত দাবির প্রথম বড় সমস্যা।
যদি প্রশ্ন হয়—
“গিরিশ চন্দ্র সেনের আগে বাংলায় কোরআনের কোনো অংশ অনুবাদ হয়েছিল কি?”
উত্তর: হ্যাঁ।
কিন্তু তাহলে গিরিশ চন্দ্র সেনকে ‘প্রথম’ বলা হয় কেন?
এখানে আসল রহস্যটি লুকিয়ে আছে ‘পূর্ণাঙ্গ’ শব্দটির মধ্যে।
গিরিশ চন্দ্র সেন ১৮৮১ থেকে ১৮৮৬ সালের মধ্যে কোরআনের বাংলা অনুবাদের কাজ সম্পন্ন করেন। তাঁর অনুবাদ ধাপে ধাপে প্রকাশিত হতে শুরু করে এবং ১৮৮৬ সালের মধ্যে পুরো কাজ সম্পন্ন হয় বলে Banglapedia ও গবেষণামূলক সূত্রগুলোতে উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ তাঁর আগে বিচ্ছিন্ন আয়াত, পারা কিংবা কোরআনের কাহিনি নিয়ে বাংলা রচনা থাকলেও পুরো কোরআনকে বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক।
এ কারণেই বিভিন্ন বিশ্বকোষ, গবেষণা ও জনপ্রিয় লেখায় তাঁকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা কোরআন অনুবাদক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সুতরাং ‘প্রথম’ শব্দটি একেবারে ভুল নয়।
সমস্যা হলো—কীসের প্রথম?
গিরিশ চন্দ্র সেন কে ছিলেন?
গিরিশ চন্দ্র সেন শুধু অনুবাদক ছিলেন না; তিনি ছিলেন উনিশ শতকের একজন লেখক, সাংবাদিক, ধর্মতাত্ত্বিক গবেষক এবং ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি।
Banglapedia অনুযায়ী, তিনি ১৮৩৫ সালে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চদোনায় জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে কেশবচন্দ্র সেনের প্রভাবে ব্রাহ্ম সমাজের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৮৬৯ সালে কেশবচন্দ্র সেন চারজনকে বিভিন্ন ধর্ম নিয়ে বিশেষভাবে অধ্যয়নের দায়িত্ব দেন। গিরিশ চন্দ্র সেনের দায়িত্ব ছিল ইসলাম সম্পর্কে অধ্যয়ন করা। পরে তিনি ১৮৭৬ সালে লখনৌ গিয়ে আরবি ও ইসলামি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করেন।
গবেষণামূলক সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি মাওলানা এহসান আলীর কাছে আরবি ভাষা ও ব্যাকরণ শেখেন এবং দেশে ফিরে ঢাকার মাওলানা আলীমউদ্দীনের কাছ থেকেও আরবি সাহিত্য, ইতিহাস ও তাফসির বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।
এরপরই কোরআন অনুবাদের কাজটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হয়ে ওঠে।
অনুবাদটি কি সরাসরি আরবি থেকে করা হয়েছিল?
এখানেও কিছু সতর্কতা প্রয়োজন।
গিরিশ চন্দ্র সেনের অনুবাদ নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় তাঁর আরবি শিক্ষা এবং ইসলামি সাহিত্য অধ্যয়নের কথা বলা হয়েছে। তবে তাঁর অনুবাদ পদ্ধতি নিয়ে পরবর্তী সময়ে আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।
একটি গবেষণামূলক মূল্যায়নে তাঁর অনুবাদের ভাষা, ব্যাখ্যা এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রাহ্মধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব নিয়ে সমালোচনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গিরিশ চন্দ্র সেনের নিজের অনুবাদ-সংক্রান্ত ভূমিকায় তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে কোরআন অধ্যয়ন এবং তা বাংলায় অনুবাদ করাই আরবি শেখার তাঁর প্রধান উদ্দেশ্যগুলোর একটি ছিল।
তাই তাঁকে শুধু ‘প্রকাশক’ বলে দাবি করা যেমন যথেষ্ট প্রমাণিত নয়, তেমনি তাঁর অনুবাদকে কোনো সমালোচনা ছাড়াই নিরঙ্কুশভাবে ‘নিখুঁত’ বলাও ইতিহাসসম্মত হবে না।
Fact Check-এর দৃষ্টিতে দুটো বিষয় আলাদা রাখতে হবে:
তিনি অনুবাদ করেছেন কি না?
→ প্রমাণের ভার বলছে, হ্যাঁ।
তাঁর অনুবাদ নিয়ে মতভেদ ও সমালোচনা আছে কি?
→ হ্যাঁ।
তাহলে ‘গিরিশ শুধু প্রকাশক’—এই দাবির কী হলো?
এই দাবিটিও অনলাইনে দেখা যায়।
কিছু লেখায় দাবি করা হয়েছে, গিরিশ চন্দ্র সেন নিজে কোরআন অনুবাদ করেননি; বরং অন্য কারও অনুবাদ সংগ্রহ করে বই আকারে প্রকাশ করেছিলেন।
কিন্তু এই দাবির পক্ষে শক্তিশালী প্রামাণ্য ভিত্তি পাওয়া কঠিন।
বরং Banglapedia সরাসরি তাঁকে বাংলা কোরআনের পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছে। গবেষণামূলক প্রবন্ধেও ১৮৮১–১৮৮৬ সময়কালে তাঁর অনুবাদ সম্পন্ন করার কথা বলা হয়েছে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণগুলোর একটি হলো তাঁর নিজের অনুবাদগ্রন্থের ভূমিকাসদৃশ বক্তব্য, যেখানে তিনি বলেন যে কোরআন অধ্যয়ন ও অনুবাদ করাই আরবি শেখার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এবং তিনি কোরআন বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করেছেন।
অতএব—
“গিরিশ চন্দ্র সেন শুধু প্রকাশক ছিলেন, অনুবাদক ছিলেন না”—এই দাবিকে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ আমরা পাইনি।
১৮৩৬ সালে মৌলভী নঈমুদ্দীন কি গিরিশের আগে পূর্ণ কোরআন অনুবাদ করেছিলেন?
এই প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি সতর্কতার দাবি রাখে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু ওয়েবসাইটে একটি দাবি পাওয়া যায়—১৮৩৬ সালে মৌলভী নঈমুদ্দীন নাকি পুরো কোরআন বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন।
যদি এটি সত্য হয়, তাহলে গিরিশ চন্দ্র সেনকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক বলা যায় না।
কিন্তু অনুসন্ধানে এই দাবির ক্ষেত্রে গুরুতর অসঙ্গতি দেখা যায়।
একটি বিস্তারিত ফ্যাক্ট-চেকধর্মী অনুসন্ধানে দেখানো হয়েছে যে নঈমুদ্দীনের জন্মতারিখই ১৮৩৬ সালের দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সেখানে তাঁর জন্ম ১৮৩২ বা ১৮৩৮ সালের মতো বিভিন্ন তারিখে উল্লেখ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে ১৮৩৬ সালে তাঁর পক্ষে পূর্ণ কোরআন অনুবাদ সম্পন্ন করার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে কোরআনের বাংলা অনুবাদ নিয়ে যে গবেষণামূলক সূত্রগুলো আমরা পেয়েছি, সেগুলো গিরিশ চন্দ্র সেনের আগে আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার আংশিক অনুবাদ এবং আরও পুরোনো কোরআনভিত্তিক কাব্যিক রচনার কথা উল্লেখ করে; কিন্তু ১৮৩৬ সালের একটি নির্ভরযোগ্য পূর্ণাঙ্গ নঈমুদ্দীন অনুবাদকে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে দেখায় না।
তাই Fact Check-এর ক্ষেত্রে এই দাবিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই।
রায়: অপ্রমাণিত/বিভ্রান্তিকর দাবি।
ইতিহাসের টাইমলাইন কী বলছে?
বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্বকোষীয় সূত্র একসঙ্গে বিবেচনা করলে একটি মোটামুটি পরিষ্কার ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়।
মধ্যযুগ — শাহ মুহম্মদ সগীর
শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা কোরআনের সূরা ইউসুফের কাহিনির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। এটি সরাসরি পুরো কোরআনের অনুবাদ নয়; বরং কোরআনভিত্তিক কাব্যিক উপস্থাপনা।
১৮০৮ — আমীর উদ্দীন বসুনিয়া
রংপুরের আমীর উদ্দীন বসুনিয়া কোরআনের ৩০তম পারা বা আমপারা বাংলায় অনুবাদ করেন বলে একাধিক সূত্রে উল্লেখ আছে। এটিও পূর্ণ কোরআনের অনুবাদ ছিল না।
১৮৮১–১৮৮৬ — গিরিশ চন্দ্র সেন
গিরিশ চন্দ্র সেন কোরআনের পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদের কাজ করেন এবং ১৮৮৬ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন করেন। Banglapedia তাঁকে বাংলা ভাষায় প্রথম পূর্ণাঙ্গ ও কৃতিত্বপূর্ণ কোরআন অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
এই ধারাবাহিকতা থেকেই বোঝা যায়, ‘বাংলায় কোরআনের প্রথম অনুবাদক’ এবং ‘বাংলায় কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক’—একটি নয়, দুটি আলাদা ঐতিহাসিক দাবি।
তাহলে সবচেয়ে নির্ভুল উত্তর কী?
প্রশ্নটি যদি হয়—
“গিরিশ চন্দ্র সেন কি বাংলায় কোরআনের প্রথম কোনো অংশ অনুবাদ করেছিলেন?”
না।
তাঁর আগে কোরআনের অংশবিশেষ বা কোরআনভিত্তিক কাহিনি বাংলায় উপস্থাপনের নজির ছিল। শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা এবং আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার ১৮০৮ সালের আমপারা অনুবাদ তার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
“গিরিশ চন্দ্র সেন কি প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা কোরআন অনুবাদক হিসেবে স্বীকৃত?”
হ্যাঁ—এটাই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী ঐতিহাসিক পরিচয়।
Banglapedia তাঁকে বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম কৃতিত্বপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেছে।
“তাঁর আগে ১৮৩৬ সালে নঈমুদ্দীন পুরো কোরআন অনুবাদ করেছিলেন—এ দাবি কি প্রতিষ্ঠিত?”
না।
এই দাবির সময়কাল নিয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে এবং নির্ভরযোগ্য গবেষণামূলক সূত্রে এটি প্রতিষ্ঠিত নয়।
কেন এই পার্থক্য এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইতিহাসে ‘প্রথম’ শব্দটি খুব শক্তিশালী।
কেউ যদি বলেন—
“গিরিশ চন্দ্র সেনই প্রথম বাংলা কোরআন অনুবাদক”
তাহলে পাঠকের মনে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা তৈরি হবে যে তাঁর আগে বাংলায় কোরআনের কোনো অংশও অনূদিত হয়নি।
কিন্তু সেটি ইতিহাসের পুরো চিত্র নয়।
আবার কেউ যদি বলেন—
“গিরিশ চন্দ্র সেনের আগে বাংলা ভাষায় কোরআনের অনুবাদ ছিল, তাই গিরিশের কোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব নেই”
সেটিও ভুল।
কারণ তাঁর কাজের বিশেষত্ব ছিল পুরো কোরআনকে একটি পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদ হিসেবে সম্পন্ন ও প্রকাশ করা। এই কারণে বাংলা কোরআন অনুবাদের ইতিহাসে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ দুই ধরনের অতিরঞ্জনই এড়িয়ে চলতে হবে।
Fact Check Verdict
🟡 রায়: আংশিক সত্য / বিভ্রান্তিকর
দাবি: “গিরিশ চন্দ্র সেনই কোরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক।”
যা সত্য: গিরিশ চন্দ্র সেন ১৮৮০-এর দশকে কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাংলা অনুবাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। Banglapedia-ও তাঁকে বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম কৃতিত্বপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
যা অসম্পূর্ণ: তাঁর আগে বাংলায় কোরআনের অংশবিশেষের অনুবাদ এবং কোরআনভিত্তিক কাব্যিক রচনা ছিল। শাহ মুহম্মদ সগীরের ইউসুফ-জুলেখা এবং ১৮০৮ সালের আমীর উদ্দীন বসুনিয়ার আমপারা অনুবাদ তার উদাহরণ।
যা প্রমাণিত নয়: ১৮৩৬ সালে মৌলভী নঈমুদ্দীন গিরিশের আগে পুরো কোরআন বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন—এমন দাবি নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।
তাই সবচেয়ে নির্ভুল বাক্য:
“গিরিশ চন্দ্র সেন বাংলা ভাষায় কোরআনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদক হিসেবে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত; তবে তাঁর আগে কোরআনের অংশবিশেষ ও কোরআনভিত্তিক রচনা বাংলায় অনূদিত বা উপস্থাপিত হয়েছিল।”
এই বাক্যটিই ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরকে সবচেয়ে সঠিকভাবে ধরে।
