পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মানচিত্র—দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক ও বর্তমান ভূরাজনৈতিক সমীকরণের প্রতীকী চিত্র।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পাকিস্তান ও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার-সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্স (আইএসআই)-এর প্রসঙ্গ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যে বিষয়টি আবারও ঘন ঘন সামনে আসছে।
বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বক্তব্য দেওয়ার পর পাকিস্তান ও আইএসআই নিয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সজীব ওয়াজেদ জয় অভিযোগ করেন, বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের প্রভাব বেড়েছে এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন নেতাও এর আগে একই ধরনের অভিযোগ করেছেন।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে—আওয়ামী লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও আইএসআইয়ের প্রসঙ্গ সামনে আনছে? এর পেছনে কি শুধু নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ, নাকি এর সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক কৌশলও জড়িত?
আওয়ামী লীগের বক্তব্যে পাকিস্তান প্রসঙ্গ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সরাসরি যুক্ত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অভিধানে পাকিস্তান একটি বিশেষ সংবেদনশীল বিষয়।
আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। বিপরীতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মতো রাজনৈতিক দলগুলোকে পাকিস্তানের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত বিভিন্ন প্রসঙ্গের মাধ্যমে সমালোচনা করাও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্যের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
ফলে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের প্রসঙ্গ সামনে আনা আওয়ামী লীগের জন্য সম্পূর্ণ নতুন কোনো কৌশল নয়।
২০১৪ সালে গোপালগঞ্জে এক বক্তব্যে শেখ হাসিনাও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে পাকিস্তান প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করার প্রবণতা অতীতেও দেখা গেছে।
২০২৪ সালের পর বদলে গেছে রাজনৈতিক সমীকরণ
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী ভারতে অবস্থান করছেন।
একই সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিপরীতে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে দেখা গেছে।
দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ, বাণিজ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সম্পর্ক বাড়ানোর উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে।
এই পরিবর্তন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাড়তে থাকা সম্পর্ককে আওয়ামী লীগের নেতারা গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরছেন বলে মনে করেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
ভারতকে বার্তা দেওয়ার রাজনৈতিক হিসাব?
কিছু বিশ্লেষকের মতে, আওয়ামী লীগের পাকিস্তান ও আইএসআই প্রসঙ্গ তোলার পেছনে ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতে পাকিস্তান একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইস্যু। বিশেষ করে দেশটির ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে পাকিস্তান ও সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব পায়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের পরিচালক অধ্যাপক তৌফিক এম হকের মতে, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদের প্রসঙ্গ সামনে এনে তাদের পুরোনো রাজনৈতিক কৌশলই অনুসরণ করছে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ভারতসহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে একটি নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে।
তবে এটি বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, আওয়ামী লীগের আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত কোনো কৌশল নয়।
শুধু ভারত নয়, পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিও কি লক্ষ্য?
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বক্তব্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, পাকিস্তান ও জঙ্গিবাদের মতো পুরোনো বিষয় সামনে এনে আওয়ামী লীগ আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে।
তবে তাঁর মতে, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় শুধু পাকিস্তান বা জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করা আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের বিশ্লেষণ কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, ভারতীয় সমাজে পাকিস্তান নিয়ে যে ধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে, আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যেও ঐতিহাসিক কারণে পাকিস্তানবিরোধী মনোভাব রয়েছে। ফলে দলীয় সমর্থকদের রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত রাখতেও এই প্রসঙ্গ ব্যবহার করা হতে পারে।
‘আইএসআই সক্রিয়’—অভিযোগের প্রমাণ কোথায়?
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের তৎপরতার অভিযোগ তুলেছেন।
কিন্তু এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এর পক্ষে প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ কতটা রয়েছে?
প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশে আইএসআইয়ের কথিত কার্যক্রমের ব্যাপকতা বা রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেনও এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য থাকার কথা বলেননি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দা সংস্থা কূটনৈতিক কাঠামোর আড়ালে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে—এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো দেশের গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রমের মাত্রা সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত মন্তব্য করা কঠিন।
এখানেই রাজনৈতিক অভিযোগ এবং যাচাইযোগ্য তথ্যের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও এসেছে
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বক্তব্যে পাকিস্তানও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি আইএসআইয়ের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তান হস্তক্ষেপ করে না বলেও তিনি দাবি করেন।
অর্থাৎ, একদিকে আওয়ামী লীগের অভিযোগ এবং অন্যদিকে পাকিস্তানের অস্বীকার—দুই দেশের রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন যাচাই এখনো কঠিন।
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক কেন আওয়ামী লীগের জন্য অস্বস্তিকর?
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ২০২৪ সালের পর নতুন মাত্রা পেয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের সফর ও যোগাযোগ বেড়েছে। বাণিজ্যিক সম্পর্ক উন্নয়ন, সরাসরি বিমান যোগাযোগ, শিক্ষা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের এই উন্নয়ন আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
কারণ আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিপরীত পক্ষ হিসেবে রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করেছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠতা বাড়ার প্রতিটি ঘটনা আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন তৈরি করছে।
পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারতের ‘র’-কেও ঘিরে আলোচনা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু আইএসআই নয়, ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা র (RAW) নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে।
সম্প্রতি ভারতের ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের ঢাকা সফর নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যক্রম স্বভাবতই গোপন হওয়ায় প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে তাদের নির্দিষ্ট কর্মকাণ্ড সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা দেশগুলোর মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা আদান-প্রদানের ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত নানা দাবি এবং বাস্তব গোয়েন্দা কার্যক্রমকে এক করে দেখা ঠিক নয়।
পাকিস্তান ইস্যুতে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বার্তা কী?
সবকিছু মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক বক্তব্যে পাকিস্তান ও আইএসআই প্রসঙ্গের কয়েকটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখা যায়।
প্রথমত, ভারতের কাছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিবর্তনকে নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরা।
দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক পাকিস্তানবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানকে পুনরায় সামনে আনা।
তৃতীয়ত, নিজেদের সমর্থকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তানবিরোধী রাজনৈতিক আবেগকে সক্রিয় রাখা।
চতুর্থত, বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের বাড়তে থাকা সম্পর্ককে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বক্তব্যের কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করা।
তবে এসব উদ্দেশ্যকে নিশ্চিত রাজনৈতিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো মূলত সাম্প্রতিক বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে তৈরি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা।
সামনে কি এই ইস্যু আরও বাড়বে?
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যত বাড়বে এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েন যত দীর্ঘায়িত হবে, পাকিস্তান ও আইএসআই প্রসঙ্গও বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে।
তবে এই ইস্যুর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর পক্ষে যাচাইযোগ্য তথ্য-প্রমাণ সামনে আসে কি না তার ওপর।
কারণ গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে রাজনৈতিক অভিযোগ সহজেই জনমনে প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।
শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের পাকিস্তান ও আইএসআই প্রসঙ্গ তোলাকে শুধু নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে দেখলে বাংলাদেশের বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার একটি অংশই দেখা হবে। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার নতুন যোগাযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের চেষ্টা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি একটি বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বার্তা।

1 thought on “আওয়ামী লীগ কেন বারবার পাকিস্তান ও ‘আইএসআই’য়ের কথা বলছে?”