নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠতা ও আন্তরিকতার দৃশ্য, পেছনে ভারতীয় সেনাবাহিনী

নরেন্দ্র মোদি ও শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের চিত্র।

‘ভারতকে যা দিয়েছি, সারাজীবন মনে রাখবে’—শেখ হাসিনার বহু বছর আগের মন্তব্য নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আবার আলোচনায়। ভারতে তাঁর অবস্থান ও সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে প্রশ্ন উঠছে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনে আবারও সামনে এসেছে শেখ হাসিনার বহু বছর আগের একটি মন্তব্য। ২০১৮ সালে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার প্রসঙ্গ তুলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশ ভারতকে যা দিয়েছে, দেশটি তা ‘সারাজীবন মনে রাখবে’।

তখন বক্তব্যটি ছিল দুই দেশের নিরাপত্তা ও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে। কিন্তু কয়েক বছর পর বদলে গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা সেখানেই অবস্থান করছেন। আর তাঁর ভারতে অবস্থান এখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু।

পুরোনো বক্তব্য, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা

শেখ হাসিনার ওই মন্তব্যের পেছনে ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রসঙ্গ। বিশেষ করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতার কথা তখন আলোচনায় ছিল।

২০১৮ সালের বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ভারতকে বাংলাদেশ যে সহায়তা করেছে, তা দেশটির মনে রাখা উচিত। সেই সময় তাঁর সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ককে দুই দেশের ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার অন্যতম উদাহরণ হিসেবে দেখা হতো।

কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ অনেকটাই বদলে যায়।

৫ আগস্টের পর কোথায় হাসিনা?

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ান শেখ হাসিনা। এরপর তিনি ভারতে চলে যান।

তাঁর ভারতে অবস্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ার পর তাঁকে দেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বিষয়—ভারত থেকে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য।

দিল্লি থেকে বক্তব্য, ঢাকায় প্রতিক্রিয়া

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। তাঁর বক্তব্যের কারণে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কেও নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে, ভারতে অবস্থান করে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে ভারতীয় পক্ষ বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছে, শেখ হাসিনার অবস্থান ও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তাদের নিজস্ব আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ।

ফলে ২০১৮ সালের ‘সারাজীবন মনে রাখবে’ মন্তব্যটি এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভিন্ন অর্থে আলোচিত হচ্ছে।

ভারত কি হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে?

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন—এটি বাস্তবতা। তিনি ভারত থেকে বক্তব্যও দিয়েছেন—এটিও প্রকাশ্য। কিন্তু তাঁকে ভারত সরকার পরিকল্পিতভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করছে—এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য স্বাধীন প্রমাণ নেই।

তাই বিষয়টিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক বিতর্ক ও অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

একইভাবে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ ‘ভারতের কাছে বন্ধক’ ছিল—এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক মূল্যায়ন; এটি কোনো নিরপেক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।

তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান যত দীর্ঘ হচ্ছে, বিষয়টি তত বেশি বাংলাদেশের রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতির আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।

একদিকে তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বিচারপ্রক্রিয়া, অন্যদিকে ভারতে তাঁর অবস্থান—দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢাকা-নয়াদিল্লির সম্পর্কও পড়ছে নতুন পরীক্ষার মুখে।

আর সেই কারণেই ২০১৮ সালের পুরোনো সেই কথাটি—‘আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, ভারত তা সারাজীবন মনে রাখবে’—আজ আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

তখন এটি ছিল সহযোগিতার বার্তা। আজ, বদলে যাওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায়, একই বক্তব্যকে ঘিরে উঠছে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন।

ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোন দিকে যাবে, শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান কতদিন চলবে এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে কতটা প্রভাব ফেলবে—এসব প্রশ্নের উত্তরই এখন সামনে আসা সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু।

আরও পড়ুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *