ছেঁড়া-মলিন শাড়ি পরা রেহানা খাতুন বাঁশের খুঁটির পাশে সন্তানদের নিয়ে বসে আছেন

মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের অপেক্ষায় বাঁশের কাঠামোর পাশে সন্তানদের নিয়ে বসে আছেন রেহানা খাতুন। ছবি: সংগৃহীত

দুই সন্তানের ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে নিজের চুল বিক্রি করেছেন রেহানা খাতুন। এখন রেললাইনের পাশে বাঁশের কাঠামোয় নিরাপদ আশ্রয়ের অপেক্ষায় দিন কাটছে তার।

দুই সন্তানকে নিয়ে মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ ঠাঁই চান রেহানা খাতুন। কিন্তু সেই সামান্য চাওয়াটুকুও পূরণ হচ্ছে না। ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া দিতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের মাথার চুল বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। এখন দুই সন্তানকে নিয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে খোলা জায়গায় দিন কাটছে তার।

বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুনের এই অসহায়ত্ব স্থানীয়দের মধ্যে গভীর মর্মবেদনা তৈরি করেছে। এলাকাবাসী বলছেন, একজন মায়ের এমন পরিস্থিতি শুধু দারিদ্র্যের নির্মম চিত্রই নয়, অসহায় মানুষের নিরাপদ আবাসনের প্রয়োজনীয়তাও সামনে নিয়ে এসেছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রেহানা আগে দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ভাড়া করা ঝুপড়ি ঘরে থাকতেন। দীর্ঘদিন ভাড়া দিতে না পারায় একপর্যায়ে সেই আশ্রয়ও হারাতে হয় তাকে। এরপর সন্তানদের নিয়ে রেললাইনের পাশের সরকারি জমিতে আশ্রয় নেন তিনি।

সেখানে স্থানীয়দের সহযোগিতায় রেলব্রিজের পাশে বাঁশের খুঁটি দিয়ে একটি ঘরের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সেটি এখনো ঘর হয়ে ওঠেনি। টিন ও বেড়ার ব্যবস্থা করার মতো অর্থ নেই রেহানার। ফলে প্রখর রোদ, বৃষ্টি আর নানা অনিশ্চয়তার মধ্যেই দুই সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে তাকে।

৫০০ টাকার জন্য বিক্রি করতে হলো চুল

রেহানার অসহায়ত্বের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনাটি সামনে আসে তার চুল বিক্রির মধ্য দিয়ে।

এক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, মাথা গোঁজার জায়গা না থাকায় রেহানা একসময় পাশের একটি বাড়িতে অস্থায়ীভাবে থাকতেন। একদিন তাকে মাথায় চুল ছাড়া দেখতে পান ওই ব্যক্তি। কারণ জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা জানান, ঘরের ৫০০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করতেই নিজের চুল বিক্রি করেছেন তিনি।

একজন মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা যেখানে সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রত্যাশা, সেখানে মাত্র ৫০০ টাকা জোগাড় করতে নিজের শরীরের অংশ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ার এই ঘটনা দারিদ্র্যের কঠিন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

রেহানা বলেন, “দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে কষ্ট সহ্য করি। ঘর নেই, খাওয়ারও কষ্ট আছে। নিরুপায় হয়ে চুল বিক্রি করেছি। আমি সরকারের কাছে সাহায্য চাই। সন্তানদের নিয়ে একটু নিরাপদে থাকতে চাই।”

আছে বাঁশের কাঠামো, নেই ঘর

সন্তোষপুর গ্রামের প্রবেশমুখে রেললাইনের পাশে এখনো দাঁড়িয়ে আছে বাঁশের তৈরি সেই কাঠামো। সেটিই রেহানার স্বপ্নের ঘর। সন্তানদের নিয়ে সেখানে নিরাপদে থাকার আশা তার।

কিন্তু টিন ও বেড়ার অভাবে কাঠামোটি এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি। ফলে ঘর থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে মাথার ওপর ছাদ নেই রেহানা ও তার সন্তানদের।

আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, রেহানার অবস্থা অত্যন্ত করুণ। দুই সন্তানকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে তার। সরকারের কাছে দ্রুত একটি ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে রেহানার জন্য সরকারি আবাসন প্রকল্পের আওতায় একটি ঘরের ব্যবস্থা করার দাবি উঠেছে। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় আকাশ-দৃষ্টিতে রেহানা

রেহানার জন্য স্থানীয়দের পক্ষ থেকে সহায়তার দাবি উঠলেও তার পরিবার এখনো নিরাপদ আশ্রয় পায়নি। নিজের চুল বিক্রি করে ভাড়া পরিশোধ করার মতো পরিস্থিতিতে পৌঁছানোর পরও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি খোলা জায়গায় বসবাস করছেন।

এমন পরিস্থিতিতে অসহায় এই পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা কবে পৌঁছাবে, সেটিই এখন প্রশ্ন। রেহানার বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য বা পদক্ষেপের তথ্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রেহানার চাওয়া খুব বেশি নয়। মাথার ওপর একটি টিনের ছাউনি, যেখানে বৃষ্টির দিনে সন্তানদের ভিজতে হবে না এবং রাতে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবেন তারা।

দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন এই মা। কিন্তু তার সেই লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন এখন একটি নিরাপদ আশ্রয়—যে আশ্রয়ের জন্য তাকে আর নিজের চুল বিক্রি করতে না হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *